logo

সোমবার, ১৫ অক্টোবর ২০১৮ | ৩০ আশ্বিন, ১৪২৫

header-ad

নতুন সম্ভাবনা সোনালি আঁশে

কৃষিবিদ মো. আল-মামুন | আপডেট: ০৭ জানুয়ারি ২০১৮

পাট বাংলাদেশের একটি ঐতিহ্যময় আঁশ উৎপাদনকারী অর্থকরী ফসল। পাট চাষ ও পাট শিল্পের সঙ্গে বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি জড়িত। যুগ যুগ ধরে এ দেশের কৃষকের আর্থিক সচ্ছলতার মূলে ছিল পাট। পাট উৎপাদনকারী পৃথিবীর অন্য দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের পাটের মান সবচেয়ে ভালো এবং বর্তমানে উৎপাদনের বিবেচনায় ভারতের পরই দ্বিতীয় স্থানে আছে বাংলাদেশ।

এ বছর দেশে রের্কড পরিমাণ ৮ লাখ ৩০ হাজার হেক্টর জমিতে পাট এবং পাটজাতীয় (কেনাফ ও মেস্তা) ফসলের চাষাবাদ হয়েছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানিতে আয় হয় প্রায় ৭ হাজার ৭০০ কোটি টাকা, যা গত অর্থ বছরের (২০১৫-১৬) চেয়ে ৪ দশমিক ৬৬ শতাংশ বেশি। একদিকে সোনালি আঁশ, অন্যদিকে রুপালি কাঠি- দুয়ে মিলে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে পাট।

চীনসহ বিভিন্ন দেশে পাটকাঠির ছাই থেকে কার্বন পেপার, কম্পিউটার ও ফটোকপিয়ারের কালি, আতশবাজি ও ফেসওয়াশের উপকরণ, মোবাইলের ব্যাটারি, প্রসাধনপণ্য, এয়ারকুলার, পানির ফিল্টার, বিষ ধ্বংসকারী ওষুধ, জীবন রক্ষাকারী ওষুধ, দাঁত পরিষ্কারের ওষুধ ও ক্ষেতের সার ইত্যাদি পণ্য তৈরি করা হয়। পাট পাতা দেশের বহুল ব্যবহৃত একটি উপাদেয় শাক এবং শুকনো পাট পাতার পানীয় ‘চা’ হিসেবে ব্যবহারের প্রক্রিয়া উদ্ভাবন করা হয়েছে। কেনাফ আঁশ থেকে কাগজের পাল্প বা মণ্ড তৈরি করে নিউজপ্রিন্ট মিলের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার, কেনাফ খড়ি হার্ডবোর্ড বা পার্টেক্স মিলের কাঁচামাল ও চারকোল তৈরিতে ব্যবহারযোগ্য। আঁশ ছাড়াও কেনাফ বীজ থেকে ভোজ্য তেল এবং মেস্তার মাংসল বৃতি (শাঁস) থেকে জ্যাম, জেলি, জুস, আচার, চা ইত্যাদি প্রস্তুতের ব্যাপক সম্ভাবনা বিদ্যমান। পাট ও কেনাফ আঁশ পৃথিবীর বহু দেশে শিল্পজাত দ্রব্য হিসেবে কাগজের ম-, বোর্ড, জিও টেক্সটাইল চট, কম্বল, প্লেন পার্টস, মোটর কার পার্টস, কম্পিউটার পার্টস, কুটির শিল্পজাত দ্রব্য শিকা, মাদুর, জায়নামাজ, টুপি, স্যান্ডেল এবং কাপড়জাতীয় সোফার কভার, পর্দার কাপড়, বেডশিট, কুশন কভার, সাটিং-সুটিং, পাঞ্জাবি, সোয়েটার ছাড়াও বিভিন্ন কাজে ইনটেরিয়র ইনস্যুলেটর হিসেবেও এটি ব্যবহৃত হচ্ছে।

সোনালি আঁশ পাট বাংলার ঐতিহ্য। যুগ যুগ ধরে এ দেশের কৃষকের আর্থিক সচ্ছলতার মূলে ছিল পাট। অর্থকরী ফসল হিসেবে পাট বাংলার মানুষের জীবনমানে যতটা পরিবর্তন আনতে পেরেছিল অন্য কোনো ফসলের পক্ষে তা সম্ভব হয়নি। দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা পূরণে পাটের জমি খাদ্যশস্য উৎপাদনের জন্য ছেড়ে দিতে হচ্ছে এবং পাট চাষ স্থানান্তরিত হচ্ছে প্রান্তিক ও অপ্রচলিত (লবণাক্ত, পাহাড়ি ও চরাঞ্চল) জমিতে। তাছাড়া নগরায়ণ, শিল্পায়ন ও বাড়তি জনসংখ্যার বসতবাড়ি নির্মাণে প্রতি বছর প্রায় ০.৭ ভাগ হারে হ্রাস পাচ্ছে আবাদি জমি। এ অবস্থায় দেশে পাট উৎপাদন স্থিতিশীল রাখতে বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটে কর্মরত কৃষি বিজ্ঞানীদের নিরলস পরিশ্রমের মাধ্যমে দেশের কৃষি পরিবেশ ও কৃষকদের চাহিদা বিবেচনায় পাট ও পাট জাতীয় আঁশ ফসলের মোট ৪৯টি উন্নত জাত উদ্ভাবিত হয়েছে। এর মধ্যে দেশি পাট ২৫টি, তোষা পাট ১৭টি, কেনাফ ৪টি ও মেস্তা ৩টি। ৪৯টি জাতের মধ্যে বর্তমানে দেশি পাটের ১০টি, তোষা পাটের ৭টি, কেনাফের ৪টি এবং মেস্তার ৩টি জাতসহ সর্বমোট ২৪টি উন্নত জাত কৃষক পর্যায়ে চাষাবাদ হচ্ছে। পাটের শিল্প গবেষণায় প্রতিষ্ঠানটি এ পর্যন্ত ৪০টি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। এর মধ্যে ২৩টি প্রযুক্তি বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ব্যবহৃত হচ্ছে। বিজেআরআই-এর কারিগরি পরিদপ্তর প্রযুক্তি হিসেবে বাংলাদেশ পেটেন্ট অ্যান্ড ডিজাইন ডিপার্টমেন্ট কর্তৃক ২৯টিরও অধিক প্রযুক্তি পেটেন্ট নিবন্ধন করতে সক্ষম হয়েছে। এ বছর পাট বিজ্ঞানীরা পাট ও পাট জাতীয় আঁশ ফসলের ৪টি উচ্চ ফলনশীল জাত উদ্ভাবন করেছে। জাতগুলো হলো- দ্রুত বর্ধনশীল, মৃদু লবণাক্ততা সহিষ্ণু ও মোজাইক রোগ প্রতিরোধী বিজেআরআই দেশি পাট-৯, আগাম কর্তন উপযোগী ও উজ্জ্বল সোনালি রংয়ের আঁশবিশিষ্ট বিজেআরআই তোষা পাট-৭, দীর্ঘ বপনকাল, জলাবদ্ধতা সহিষ্ণু ও রোগ প্রতিরোধী ক্ষমতাসম্পন্ন লাল কেনাফের নতুন জাত বিজেআরআই কেনাফ-৪ এবং দ্রুত বর্ধনশীল, সম্পূর্ণ মসৃণ ও নেমাটোড প্রতিরোধী বিজেআরআই মেস্তা-৩। উদ্ভাবিত জাতগুলো কৃষক পযৃায়ে সম্প্রসারিত হলে পাটের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। ফলে দেশে পাটের আবাদি জমির পরিমাণ কম এবং ক্রমাগত প্রান্তিক ও নিকৃষ্ট জমিতে পাট আবাদ স্থানান্তরিত হলেও জাতীয় গড় উৎপাদন বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। সমুদ্র উপকূলবর্তী লবণাক্ত অঞ্চলে পাট চাষ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে উদ্ভাবিত মধ্যম মাত্রার লবণাক্ততা সহিষ্ণু দেশি পাট (বিজেআরআই দেশি পাট-৮) চাষ সফল হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের উঁচু, মধ্যম, নিচু, হাওর এলাকা, পাহাড়ি এলাকার ঢালু জমি এবং উপকূলীয় ও চরাঞ্চল ফসল উৎপাদনের উপযোগী নয় বা আউশ ফসলের জন্য লাভজনক নয়- এমন অনুর্বর জমিতেও অল্প পরিচর্যায় কেনাফ চাষ করে ভালো ফলন পাওয়া যায়। পাটের চেয়ে কেনাফের নিড়ানি ও পরিচর্যা কম লাগে এবং রোগবালাই প্রতিরোধ ক্ষমতাও বেশি। দেশে যেসব এলাকায় সেচের ব্যবস্থা নেই সেখানে ধানের চেয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি খরা ও জলাবদ্ধতা সহ্য ক্ষমতা সম্পন্ন কেনাফ চাষ কৃষকের প্রথম পছন্দ। উওরাঞ্চলের বন্যাকবলিত চর এলাকার চাষিদের আশার আলো দেখাচ্ছে অল্প পরিচর্যা ও স্বল্প খরচে অধিক ফলনশীল কেনাফ ফসলের নতুন জাত বিজেআআই কেনাফ-৪। দেশের দক্ষিণের খুলনা-বরিশাল উপকূলীয় অঞ্চলের বিশাল লবণাক্ততা ও খরাপ্রবণ এলাকায় হাজার হাজার একর জমিতে পাট উৎপাদন মৌসুমে (মার্চ-জুলাই) কোনো ফসল থাকে না বললেই চলে। লবণাক্ততা, খরা এবং অনাকাঙ্খিত বৃষ্টিপাত এই তিনটি পরিস্থিতি মোকাবেলা করেই কেনাফ বেড়ে উঠতে পারে। যেখানে লবণাক্ততার জন্য অন্য ফসল চাষ সম্ভব নয়, সেখানে অনায়াসেই কেনাফ চাষ সম্ভব এবং বীজের অঙ্কুরোদগম ও গাছ বৃদ্ধির সময় কেনাফ মধ্যম মাত্রার লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে। উপকূলীয় লবণাক্ত এলাকাসহ দেশে ফসল চাষের অনুপযোগী প্রায় ১০ লাখ হেক্টর জমি প্রতিবছর পতিত পড়ে আছে। অথচ এসব জমিতে অল্প পরিচর্যা ও স্বল্প খরচে অধিক ফলনশীল পাট ও কেনাফ ফসল চাষ করে বছরে প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকা আয় করা সম্ভব।

পাটকে বিশ্ব বাজারে তুলে ধরতে জুট ডাইভারসিফিকেশন প্রমোশন সেন্টারে (জেডিপিসি) ১৩৫ প্রকার বহুমুখী পাটপণ্যের স্থায়ী প্রদর্শনী ও বিক্রয় কেন্দ্র চালু হয়েছে। পাটখড়ি থেকে উচ্চমূল্যের চারকোল তৈরি করে বিদেশে রপ্তানি করা হচ্ছে, যা থেকে তৈরি হচ্ছে অতিমূল্যবান দ্রব্যাদি। পাটে প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ ভাগ সেলুলোজ রয়েছে। পাট থেকে পাল্প তৈরি করে পুনরায় সেলুলোজ রি জেনারেট করে এর থেকে ভিসকস তৈরি করা সম্ভব। আর এই ভিসকস তৈরি করতে পারলে তা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে। দেশে তুলার উৎপাদন কমে আসায় গতবছর বাংলাদেশ প্রায় ৬৫০ কোটি টাকার ৩৩ হাজার ৭৩৭ টন ভিসকস পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ, যেমন- চীন ও ভারত থেকে আমদানি করেছে। যদি বাংলাদেশে এ ভিসকস উৎপাদিত হয় তবে বিদেশ থেকে তা আর আমদানি করতে হবে না। পরিবেশ রক্ষায় এবং স্বাস্থ্য উন্নত হাইড্রোকার্বন মুক্ত জুট ব্লেচিং ওয়েল উন্নয়ন, জুট ফাইবারকে বিশেষ রাসায়নিক প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে অগ্নিরোধী পাটজাত বস্ত্র উৎপাদন, পরিবেশ দূষণকারী পলিথিন ব্যাগের বিকল্প স্বল্পব্যয়ে পাটের ব্যাগ তৈরি এবং দেশের নার্সারিগুলোতে গাছের চারা সংরক্ষণে পাটের ব্যাগ (নার্সারি পট) উদ্ভাবন করেছেন বিজ্ঞানীরা। এ ছাড়া পাট কাটিংস ও নিম্নমানের পাটের সঙ্গে নির্দিষ্ট অনুপাতে নারিকেলের ছোবড়ার সংমিশ্রণে প্রস্তুত করা হয় পরিবেশবান্ধব এবং ব্যয়সাশ্রয়ী জুট জিওটেক্সটাইল। জিওটেক্সটাইল ভূমিক্ষয় রোধ, রাস্তা ও বেড়িবাঁধ নির্মাণ, নদীর পাড় রক্ষা ও পাহাড় ধস রোধে ব্যবহৃত হচ্ছে। জিওটেক্সটাইলের অভ্যন্তরীণ বাজার এখন ৭০০ কোটি টাকার। স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন, রেল, সড়কসহ সরকারের বিভিন্ন বিভাগের অবকাঠামো তৈরিতে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল হিসেবে জিওটেক্সটাইলের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তাই বাংলাদেশ তো বটেই, বিশ্বজুড়ে নানা কাজে ‘মেটাল নেটিং’ বা পলিমার থেকে তৈরি সিনথেটিক জিওটেক্সটাইলের পরিবর্তে পরিবেশ উপযোগী ও উৎকৃষ্ট জুট জিওটেক্সটাইলের কদর বাড়ছে। বাংলাদেশে ২০০২ সালে পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। পাটের উৎপাদন ও ব্যবহার বৃদ্ধি, চাষ সম্প্রসারণ, গুণগত মান উন্নয়ন এবং পাট শিল্পকে সুরক্ষা দিতে অনুধিক ৩ বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ১ লাখ টাকা অর্থদ- বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রেখে পাট আইন-২০১৭ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। এর ফলে পাটজাত পণ্যের অভ্যন্তরীণ ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে এবং গত ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ২০ কোটি টাকার বস্তা ব্যবহৃত হয়েছে। সম্প্রতি সরকার ধান, চাল, গম, ভুট্টা, চিনি ও সারের সঙ্গে আরও ১১টি পণ্যের সরবরাহ ও বিতরণে কৃত্রিম মোড়কের ব্যবহারজনিত কারণে সৃষ্টি পরিবেশ দূষণরোধকল্পে বাধ্যতামূলকভাবে পাটজাত মোড়ক ব্যবহার নিশ্চিতকরণে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত পণ্যের মোড়ক হিসেবে ৭৫ শতাংশ পাট আছে- এমন উপাদান দিয়ে তৈরি মোড়ক ব্যবহারের বিধান রাখা হয়েছে। পণ্যে পাটজাত মোড়কের ব্যবহার বাধ্যতামূলক আইন-২০১০ পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা গেলে দেশে বার্ষিক পাটের ব্যাগের চাহিদা ৯০ হাজার পিস থেকে বেড়ে ৮৪ কোটি পিসে উন্নিত হবে। এতে ৫,৩৯,২০০ টন পাটের আঁশের প্রয়োজন হবে যা দেশের মোট পাট উৎপাদনের ৭৭ শতাংশ। চাহিদা ও যোগান যথাযথভাবে যাচাই সাপেক্ষে বিভিন্ন সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, বিভিন্ন সামরিক-বেসামরিক বাহিনীর আবাসস্থলগুলোতে বহুল ব্যবহৃত বিভিন্ন পণ্য যেমন পর্দা, কার্পেট, সোয়েটার, কম্বল ইত্যাদি পাটের তৈরি দ্রব্য প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে ব্যবহার নিশ্চিত করা যেতে পারে। পরিবেশ দূষণ রোধকল্পে পাট ও পাটজাতীয় দ্রব্য জনপ্রিয় করার জন্য বাজার ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি উন্নয়ন ও পণ্য প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হলে আমাদের পাটখাতও সমৃদ্ধ হবে।

বাংলাদেশের পাটশিল্পের অভিজ্ঞতা শতবর্ষ পুরনো, বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা পাটের জিনকোড আবিষ্কারের কৃতিত্বও দেখিয়েছেন। বিজেআরআই ২০১০ সালে তোষা পাটের জীবনরহস্য (জিনোম সিকোয়েন্স) আবিষ্কার, ২০১২ সালে পাটের কা- পচা রোগ প্রতিরোধী পাটজাত উদ্ভাবনের নিমিত্তে পাটসহ পাঁচ শতাধিক উদ্ভিদের জন্য ক্ষতিকারক ছত্রাক Macrophomina phaseolina-এর জীবন রহস্য উন্মোচন এবং ২০১৩ সালে দেশি পাটের জীবনরহস্য আবিষ্কারের ফলে এ সংক্রান্ত গবেষণায় সাফল্য দেখিয়েছে বাংলাদেশ। সম্প্রতি পাটের আঁশের মান, দৈর্ঘ্য ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার জন্য দায়ী চারটি জিনের পেটেন্ট (কৃতিস্বত্ব) পেয়েছে বাংলাদেশ। এর মধ্য দিয়ে পাটের নতুন যুগে প্রবেশ করল বাংলাদেশ।

এ ছাড়া ক্ষতিকারক ছত্রাক Macrophomina phaseolina-এর তিনটি জিন শনাক্ত করে সেগুলোর পেটেন্টও পেয়েছে বাংলাদেশ। বিশ্ব কৃতিস্বত্ব কর্তৃপক্ষের (ডব্লিউআইপিও) কাছ থেকে পাট ও ছত্রাকের এই সাতটি জিনের কৃতিস্বত্ব পাওয়ায় বিশ্বের কোথাও এ নিয়ে কোনো বাণিজ্যিক গবেষণা হলে বাংলাদেশের অনুমতি নিতে হবে এবং নিয়ম অনুযায়ী এই উদ্ভাবন থেকে কোনো আয় হলে তার একটি অংশ বা রয়্যালিটি বাংলাদেশকে দিতে হবে। গবেষকদল তোষা এবং দেশী পাটের প্রজাতির জিনোম সিকোয়েন্সিং করেছেন এবং এদের মধ্যে ফাংশনাল জিনোমিক্স পর্যায়ে তুলনা করেছেন, যা গত ৩০ জানুয়ারি, ২০১৭-তে জনপ্রিয় ‘নেচার প্ল্যান্ট’ জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। পাটের প্রজাতিদ্বয়ের মধ্যে এই তুলনামূলক জিনোম বিশ্লেষণ ভবিষ্যতে শিল্প-কারখানায় পাটআঁশের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটানোকল্পে উন্নত প্রজনন কৌশল উদ্ভাবনের এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার উম্মোচন করবে বলে বিজ্ঞানীরা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তাছাড়া, এই জিনোম সিকোয়েন্সিং পাট আঁশের জৈবসংশ্লেষণ বিষয়ে আমাদের জ্ঞান বৃদ্ধিতে একটি অমূল্য সম্পদ এবং কৌলিগতভাবে আঁশের উৎপাদনশীলতা ও গুণাগুণ বৃদ্ধির ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হবে। উন্মোচিত জীবনরহস্যের তথ্যকে কাজে লাগিয়ে বর্তমানে স্বল্প জীবনকাল সমৃদ্ধ প্রতিকূল পরিবেশ, রোগবালাই ও পোকামাকড় সহনশীল, বাজারের বিভিন্ন চাহিদা মাফিক পণ্য উৎপাদন উপযোগী কম লিগনিন সমৃদ্ধ উচ্চ ফলনশীল পাটের জাত উদ্ভাবনের গবেষণা এগিয়ে চলছে। বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করছেন পাটের জাতের মধ্যে এমন বৈশিষ্ট্যগুলো যুক্ত করা, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে যার চাহিদা রয়েছে। দেশের বস্ত্রশিল্পে কাপড় তৈরির উপযোগী সুতা বর্তমানে পাট থেকে পাওয়া যাচ্ছে না। কম লিগনিন সমৃদ্ধ জাত উদ্ভাবন সম্ভব হলে বস্ত্র শিল্পে তুলার বিকল্প হিসেবে অথবা তুলার সাথে সংমিশ্রনে পাটের ব্যবহারে প্রভূত উন্নতি সাধিত হবে।

বিশ্বব্যাপী জলবায়ু বির্পযয় তথা বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, পরিবেশ দূষণ, আবহাওয়া ও তাপমাত্রার পরিবর্তন এবং উপর্যুপরি প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন- খরা, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, সুনামি, আইলা, ক্যাটরিনা ও অন্যান্য সাইক্লোন, ভূমিকম্প ইত্যাদির প্রকোপ আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যাওয়াতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর পাশাপাশি উন্নত বিশ্বেও পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে গত আড়াই দশকে। এর ফলে জলবায়ু আন্দোলনের অংশ হিসেবে পানি, মাটি ও বায়ু দূষণকারী পলিব্যাগ উৎপাদন ও ব্যবহারের বিরুদ্ধে বিশ্ব জনমত তৈরি হয়েছে। তাছাড়া জাতিসংঘ কর্তৃক ২০০৯ সালকে ‘আন্তর্জাতিক প্রাকৃতিক তন্তু বর্ষ’ হিসেবে পালিত হওয়ায় বিশ্বব্যাপী প্রাকৃতিক তন্ত’র কদর আরও বৃদ্ধি পাওয়ার সুবাদে পাট ও পাটজাত পণ্যের হারানো চাহিদা পুনরুদ্ধার হতে থাকে।

বর্তমানে বাংলাদেশের পাট এখন পশ্চিমা বিশ্বের গাড়ি নির্মাণ, পেপার অ্যান্ড পাম্প, ইনসুলেশন শিল্পে, জিও টেক্সটাইল হেলথ কেয়ার, ফুটওয়্যার, উড়োজাহাজ, কম্পিউটারের বডি তৈরি, ইলেকট্রনিক্স, মেরিন ও স্পোর্টসশিল্পে ব্যবহৃত হচ্ছে। এ ছাড়া ইউরোপের বিএমডাব্লিউ, মার্সিটিজ বেঞ্চ, ওডি ফোর্ড, য্ক্তুরাষ্ট্রের জিএম মোটর, জাপানের টয়োটা, হোন্ডা কোম্পানিসহ নামিদামি সব গাড়ি কোম্পানিই তাদের গাড়ির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ও ডেশবোর্ড তৈরিতে ব্যবহার করছে পাট ও কেনাফ। বিএমডাব্লিউ পাট দিয়ে তৈরি করছে পরিবেশ সম্মত ‘গ্রিন কার’ যার চাহিদা এখন প্রচুর। পৃথিবীজুড়ে প্রতি মিনিটে ১০ লাখেরও বেশি প্লাস্টিক ব্যাগ ব্যবহৃত হয়। প্লাস্টিক ব্যাগের মূল উপাদান সিনথেটিক পলিমার তৈরি হয় পেট্রোলিয়াম থেকে। এই বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক ব্যাগ তৈরিতে প্রতি বছর পৃথিবীজুড়ে মোট খনিজ তেলের ৪ ভাগ ব্যবহৃত হয়। প্লাস্টিক ব্যাগ জৈববিয়োজনশীল নয়। এক টন পাট থেকে তৈরি থলে বা বস্তা পোড়ালে বাতাসে ২ গিগা জুল তাপ এবং ১৫০ কিলোগ্রাম কার্বন ডাই-অক্সাইড ছড়িয়ে পড়ে। অন্যদিকে এক টন প্লাস্টিক ব্যাগ পোড়ালে বাতাসে ৬৩ গিগা জুল তাপ ও ১৩৪০ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড মেশে। এসব ক্ষতিকারক বিবেচনা করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা খাদ্যশস্য ও চিনি মোড়কজাত করার জন্য পরিবেশবান্ধব পাটের বস্তা বা থলে ব্যবহারের সুপারিশ করেছে। সাম্প্রতিককালে বিশ্বের বিাভন্ন দেশ সিনথেটিক ব্যাগসহ পরিবেশ বিনাশক অন্যান্য উপাদানের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। ঝুঁকে পড়ছে প্রাকৃতিক তন্ত ব্যবহারের দিকে। এ ক্ষেত্রে পাটই হয়ে উঠেছে বিকল্প অবলম্বন। ২০১১ সালের জানুয়ারি মাসে প্লাস্টিক ব্যাগ ব্যবহার নিষিদ্ধ করে ইতালি। অথচ তারা ছিল পৃথিবীর সর্বাধিক প্লাস্টিক ব্যাগ ব্যবহারকারী দেশ। প্লাস্টিক ব্যাগ ব্যবহার নিষিদ্ধ করা দেশের মধ্যে আছে ব্রাজিল, ভুটান, চীন, কেনিয়া, রুয়ান্ডা, সোমালিয়া, তাইওয়ান, তানজানিয়া, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আমেরিকাসহ যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন রাজ্য। এ তালিকা প্রতি বছরই বাড়ছে। ওয়ালমার্ট, টেসকোর মতো বৃহৎ চেইন শপগুলো পাটের ব্যাগ ব্যবহারে আগ্রহ দেখাচ্ছে। বিখ্যাত চেইন শপ টেসকোর প্রতিমাসে ১ মিলিয়ন প্রাকৃতিক আঁশের তৈরি ব্যাগের প্রয়োজন। এ ব্যাগ তারা প্রধানত ভারত থেকে আমদানি করছে। বর্তমানে প্রতিবছর সারা পৃথিবীতে প্রায় ৫০০ বিলিয়ন পাটের ব্যাগের চাহিদা রয়েছে। বিশ্বের এই চাহিদা মেটাতে, পাটকে বিশ্বময় ছড়িয়ে দিতে আমাদের কাজ করতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে প্রতিমাসে ১ লক্ষ পাটের ব্যাগ রপ্তানী করা হয়। সম্প্রতি পাট ও পাটজাত বর্জ্যরে সেলুলোজ থেকে পরিবেশবান্ধব পলিব্যাগ উদ্ভাবন করেছে পরমানু শক্তি কমিশন, যা দুই থেকে তিন মাসের মধ্যেই মাটিতে মিশে যাবে। ফলে পরিবেশের ক্ষতি হবে না। বন ও পরিবেশ মন্ত্রনালয়ের হিসাব মতে শুধু ঢাকাতেই মাসে প্রায় ৪১ কোটি পলিব্যাগ ব্যবহার করা হয়। বিশ্বে প্রতিবছর ১ ট্রিলিয়ন মেট্রিকটন পলিথিন ব্যবহার করা হয়, যার ক্ষতিকর প্রভাবের শিকার ১০ লাখেরও বেশি পাখি এবং লক্ষাধিক জলজ প্রানী। বিদেশে প্রাইভেট কারসহ বিভিন্ন ইনটেরিয়র কাজের ইনস্যুলেটর ছাড়াও জুটেক্স ও জিওটেক্সটাইল তৈরি এবং পাট কাঠির ছাই থেকে চারকোল তৈরির নতুন সম্ভাবনা থাকায় পাট চাষ করে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের নতুন দুয়ার খুলে যেতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। কাঁচা পাট ও পাট পণ্যের বাজার সৃষ্টিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোকে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে।

প্রাচীনকাল থেকেই বাংলাদেশে পাটের চাষ ও এর বিভিন্ন ধরনের ব্যবহার হয়ে আসছে এবং বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবে ক্রমান্বয়ে প্রধান অর্থকরী ফসল হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। পাট একটি নবায়নযোগ্য পরিবেশ বান্ধব ফসল। মাটির স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সংরক্ষণে এর গুরুত্ব অপরিসীম। পাট ফসলের মূল মাটির ১০ থেকে ১২ ইঞ্চি বা তার বেশি গভীরে প্রবেশ করে, মাটির উপরিস্তরে সৃষ্ট শক্ত ‘প্লাউপ্যান’ ভেঙে দিয়ে এর নিচে থাকা অজৈব তরল খাদ্য উপাদান সংগ্রহ করে মাটির উপরের স্তরে নিয়ে আসে। ফলে অন্যান্য অগভীরমূলী ফসলের পুষ্টি উপাদান গ্রহণ সহজ হয় এবং মাটির ভৌত অবস্থার উন্নয়ন ঘটে। মাটিতে পানি চলাচল সহজ ও স্বাভাবিক থাকে। পাট ফসল উৎপাদন কালে হেক্টরপ্রতি ৫ থেকে ৬ টন পাট পাতা মাটিতে যোগ হয়। পাটের পাতায় প্রচুর নাইট্রোজেন, সোডিয়াম, পটাশিয়াম ও ক্যালসিয়াম থাকে। এ ছাড়াও পাট ফসল কর্তনের পর পাট গাছের গোড়াসহ শিকড় জমিতে থেকে যায়, যা পরবর্তীতে পচে মাটির সঙ্গে মিশে জৈব সারে পরিণত হয়। এতে পরবর্তী ফসল উৎপাদনের সময় সারের খরচ কম লাগে। এ কারণে যে জমিতে পাট চাষ হয়, সেখানে অন্যান্য ফসলের ফলনও ভালো হয়। পাট জাগ দেওয়ার পর ছালের আঁশ ভিন্ন অন্যান্য নরম পচে যাওয়া অংশ, জাগের ও ধোঁয়ার তলানি এবং পাট পচা পানি উৎকৃষ্ট জৈব সার হিসেবে ব্যবহারযোগ্য। পাট একটি বৃষ্টিনির্ভর ফসল এবং উৎপাদনে সার ও কীটনাশক ব্যবহার অন্যান্য ফসলের চেয়ে অপেক্ষাকৃত কম। পাট ফসলের কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ ক্ষমতা প্রতি বর্গমিটার জায়গায় ০.২৩ থেকে ০.৪৪ মিলিগ্রাম। পাট ফসল ১০০ দিনে হেক্টর প্রতি বাতাস থেকে প্রায় ১৪.৬৬ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে। ফলে পাট ফসল পৃথিবীর গ্রিন হাউজ গ্যাস ও তার পরিপ্রেক্ষিতে তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে কিছুটা হলেও ব্যাহত করে পৃথিবীকে তার পরিবেশ রক্ষায় সহায়তা করে। আবার অন্যদিকে, প্রতি হেক্টর পাট ফসল ১০০ দিন সময়ে ১০.৬৬ টন অক্সিজেন নিঃসরণ করে বায়ুম-লকে বিশুদ্ধ ও অক্সিজেন সমৃদ্ধ রাখে। পরিবেশ সুরক্ষার দিক চিন্তা করে বনের গাছ না কেটে পাট ও কেনাফ কাঠি দিয়ে স্বল্প ব্যয়ে পেপার পাল্প তৈরি করা যায়। পাট কাঠি (প্রায় ৩০ লাখ টন) জ্বালানির বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় বন উজাড়ের হাত থেকে কিছুটা হলেও পরিবেশ রক্ষা পায়।

জাতীয় ও আর্ন্তজাতিক বাস্তবতায়, পরিবর্তিত জলবায়ু বিবেচনায় নিয়ে পাট চাষের উন্নয়ন ও পাট আঁশের বহুমুখী ব্যবহারের লক্ষ্যে স্বল্প খরচে অধিক উৎপাদনসহ লাভজনক ভাবে উচ্চ ফলনশীল পাট উৎপাদন ও উন্নত মানের পাট আঁশ উৎপাদনের সময়োপযোগী ও অঞ্চলভিত্তিক আধুনিক কলাকৌশল ও প্রযুক্তি কৃষকের মাঠে পৌঁছানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বিজেআরআই এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই)-এর সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। জমির পরিমাণ না বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ফলন প্রাপ্তির লক্ষ্যে দেশে পাট আঁশ ও বীজ উৎপাদনের সর্বাধিক উপযোগী এলাকা/জমি নির্বাচন করে আধুনিক প্রযুক্তি ও উপকরণ যোগান ও ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পাটের বাজার মূল্য স্থিতিশীল রাখার জন্য পাটের ন্যূনতম বাজার মূল্য নির্ধারণ করা যেতে পারে। পাটচাষ থেকে পাটপণ্য উৎপাদন, বিক্রয় ও রপ্তানি প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের প্রায় ২ কোটি লোক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত রয়েছে। সেজন্য সরকার ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষার জন্য পাটের মোড়কের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার যে বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নিয়েছে, তা অতি দ্রুত বাস্তবায়ন প্রয়োজন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রাকৃতিক তন্তর চাহিদাকে কাজে লাগানোর লক্ষ্যে পাটের আধুনিক বাজার ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়াও প্রয়োজন। যেহেতু আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের কাঁচা পাট ও পাটপণ্যের শেয়ার যথাক্রমে প্রায় ৯০ এবং ৭০ শতাংশ এবং বিশ্বসেরা পাট বাংলাদেশে উৎপাদিত হয়, সেহেতু সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোক্তাদের যৌথ উদ্যোগে বাংলাদেশের পাটের একটি ব্র্যান্ডিং করা প্রয়োজন। পাটের কারিগরি (মৌলিক, প্রায়োগিক ও অ্যাডাপটিভ) গবেষণার মাধ্যমে প্রচলিত পাটজাত দ্রব্য সামগ্রীর মানোন্নয়ন করে বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক পণ্য উদ্ভাবন, পাটের বহুমুখী ব্যবহার বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন পদ্ধতি অনুসারে নতুন নতুন পণ্য তৈরির প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং পাট শিল্পকে কারিগরি সহায়তা প্রদান করা প্রয়োজন। সম্ভাবনাময় বিভিন্ন কারিগরি প্রযুক্তি ব্যবহার করে সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে ব্যাপক আকারে পাট পণ্য তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে। পাট পণ্যের ব্যবহার উৎসাহিত করতে তথ্যচিত্র নির্মাণ করে প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও সামাজিক গণমাধ্যমে প্রচার বৃদ্ধির ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। বর্তমানে দেশের পাট উৎপাদনের বিশেষত রপ্তানির বহুমুখিতার কারণে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। যদি মানসম্পন্ন বীজের নিয়মিত যোগান নিশ্চিত করা যায় এবং অধিকতর আর্থিক প্রণোদনা প্রদান করা হয়, তবে বাংলাদেশের পাট কেবল উৎপাদনই নয় বরং প্রক্রিয়াজাতকরণ, পাটজাতপণ্য তৈরি ও রপ্তানির ক্ষেত্রেও বিপুল সম্ভাবনা তৈরি হবে যা কৃষিখাতকে পুনরায় দেশের অর্থনৈতিক চালিকাশক্তিতে পরিণত করবে।

পাট বাংলাদেশের পরিচিতির অন্যতম অনুষঙ্গ। স্বাধীনতার পরও প্রায় এক যুগ ধরে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে পাটের অবদানই ছিল মুখ্য। সাম্প্রতিক সময়ে পরিবেশ সচেতনার কারণে বিশ্ববাজারে পাট ও পাটজাত পণ্যের চাহিদা ও দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় কৃষকরা নতুন করে পাট চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। পাট ও পাটপণ্য শুধু পরিবেশবান্ধব এবং সহজে পচনশীলই নয়, এটি পরিবেশে বিরাট অবদান রাখে এবং দেশের কৃষি ও বাণিজ্যের ভারসাম্য রক্ষা করে। তাছাড়া বিজেআরআই’র যুগান্তকারী পাটের জীবন রহস্য উন্মোচনের মাধ্যমে চাহিদামাফিক (কৃষিতাত্ত্বিক/পণ্যভিত্তিক) পাটের জাত উদ্ভাবন এবং পাট ও ছত্রাকের সাতটি জিনের পেটেন্ট কাজে লাগিয়ে শিল্পের উপযোগী পাটপণ্য উৎপাদন করতে পারলে তা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন ধারার সূচনা করবে। পাট শিল্পের পুনরুজ্জীবন ও আধুনিকায়নের ধারা বেগবান করা, পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার আইন বাস্তবায়ন, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে সরকার প্রতি বছর ৬ মার্চ পাট দিবস উদযাপনের ঘোষণা দিয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, পাট ও পাটজাত পণ্যের ব্যবহার আগামী দ্ইু থেকে তিন বছরের মধ্যেই সারা বিশ্বে তিনগুণ বেড়ে যাবে। ফলত পাটপণ্যের বাজারই সৃষ্টি হবে ১২ থেকে ১৫ বিলিয়নের। দুনিয়াব্যাপী পাটের ব্যাগের চাহিদা বৃদ্ধি ও আমাদের দেশের উন্নতমানের পাট এ দুই হাতিয়ার কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশেরও সফলতা আসতে পারে। পাশাপাশি পাটকাঠির ছাই ও পাটের পলিব্যাগ থেকে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় পাট চাষের সোনালি দিন ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। হ্রাস পাবে দারিদ্রতা এবং সমৃদ্ধ হবে সোনার বাংলা।

লেখক : ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, প্রজনন বিভাগ, বাংলাদেশ পাট গবেষনা ইনস্টিটিউট, ঢাকা।

ফেমাসনিউজ২৪/আরইউ