logo

রবিবার, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৭ | ৩ পৌষ, ১৪২৪

header-ad

নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে বারবার পরিবর্তন কেন বিএনপির?

ফেমাস নিউজ ডেস্ক | আপডেট: ১৮ নভেম্বর ২০১৭

কোন সরকারের অধীনে আগামী জাতীয় নির্বাচনে যাবে বিএনপি তা এখনো নির্ধারণ করতে পারেনি। নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে একেক সময় একেক ধরনের দাবি তুলে আসছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট। এতে বিভ্রান্তিতে পড়েছে জনগণ। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছিল বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট। আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট নির্বাচন করে ক্ষমতায় আসে। ২০ দলীয় জোটের আন্দোলন দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারেনি।

আগামী একাদশ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার থেকে সরে এসে অন্তবর্তীকালীন সরকারের দাবি তুলেছিন বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট। এরপর সহায়ক সরকারের দাবি তুলে বিএনপি জোট। এরই মধ্যে এক সমাবেশে বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ সহায়ক সরকার থেকে সরে এসে আবার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি তুলেন। গত রোববার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ‘নির্বাচকালীন সহায়ক সরকারের’ কথা না তুলে দলনিরপেক্ষ সরকারের কথা বলেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। আজ শুক্রবার বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সহায়ক সরকারের দাবি তুললেন। এভাবে বারবার পরিবর্তন করায় জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে যে, বিএনপি নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে আসলে কীভাবে এগুচ্ছে? তারা কী এ দাবি নিয়ে সফল হতে পারবে?

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সমাবেশে বলেছেন, দেশে নিরপেক্ষ নির্বাচন হতেই হবে। জনগণ যাতে নির্ভয়ে ভোট দিতে পারে সেই সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। নিরপেক্ষ নির্বাচন হতে হলে কোনো দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে না। হাসিনার অধীনে তো নির্বাচন হবেই না।

খালেদা জিয়া ১৮ অক্টোবর লন্ডন থেকে দেশে ফেরার পর আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠানে এতদিন ধরে যে দাবি করে আসছিলেন তা থেকে সরে দলনিরপেক্ষ সরকারের দাবি জানালেন। আগামী নির্বাচন কীভাবে অনুষ্ঠান হবে এ নিয়ে লন্ডনে অবস্থানরত দলের আরেক শীর্ষ নেতা তারেক রহমানের সঙ্গে আলোচনার পরই সহায়ক সরকার থেকে সরে গেলেন।

গত ২৩ অক্টোবর দলের সর্বোচ্চ জাতীয় নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও এ নিয়ে আলোচনা হয়। এ ব্যাপারে মতদ্বৈততা থাকলেও ওই বৈঠকেই নির্বাচনকালে ‘সহায়ক সরকার’ বাদ দিয়ে দলনিরপেক্ষ সরকারের দাবির ব্যাপারে সদস্যদের মধ্যে জোরালো আলোচনা হয়।

এ ব্যাপারে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ গণমাধ্যমকে জানান, তারা নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের দাবি তুলে আসছেন। কিন্তু এটা নিয়ে এক ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। তাই তারা আর সহায়ক সরকারের কথা বলবেন না। এখন থেকে সহায়ক সরকারের বদলে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি জানানোর কথা বলেন তিনি।

তিনি বলেন, যদি সহায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হয়, তাহলে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ওপর ক্ষমতা প্রয়োগ হবে। কারণ সহায়কের প্রধান থাকবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি থাকলে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন হবে না। এটি জনগণের সঙ্গে প্রতারণা। শুধু তাই নয়, ইসির মাঠ পর্যায়ে লোক নেই। তারা প্রশাসনকে কাজে লাগাবে। আর প্রশাসন মানেই প্রধানমন্ত্রীর আওতা।

‘১৯৯৬ সালে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে যোগ করা হয়েছিল। আপিল বিভাগ ২০১১ সালের ১০ মে এ ব্যবস্থা সম্পর্কিত সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল ঘোষণা করে। তবে একইসঙ্গে আদালত বলেছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে আরো দুটি সংসদ নির্বাচন হতে পারে। রায়ে আদালত উল্লেখ করেন, বিদায়ী প্রধান বিচারপতি এবং আপিল বিভাগের বিচারপতিদের বাদ রেখে সংসদ এ সরকার পদ্ধতি সংস্কার করতে পারে। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের নেতৃত্বে আপিল বিভাগের ছয়জন বিচারপতির বেঞ্চ এ রায় দেন। বেঞ্চে সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতির মতামতের ভিত্তিতে এ রায় দেয়া হয়। যদিও এর ১৬ মাস পর প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে আরো দুটি সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রসঙ্গটি বাদ দেয়া হয়’।

‘এরপর ২০১১ সালের ৩০ জুন সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার-ব্যবস্থার আনুষ্ঠানিক বিলুপ্তি ঘটে। কিন্তু পদত্যাগকারী প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে আপিল বিভাগ সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর বাতিল রায় রেখে দিলে তাতে উৎসাহিত হয়ে ওঠে বিএনপি।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন না হওয়ায় ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০দলীয় জোট। এরপর থেকেই দলটি নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের দাবি তুলে আসছিল। গত বছরের নভেম্বরে খালেদা জিয়া নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের জন্য যে প্রস্তাব দিয়েছিলেন তাতে বলেছিলেন, শিগগিরই নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের প্রস্তাব দেয়া হবে। খালেদা জিয়া চিকিৎসার জন্য লন্ডন গেলে বিএনপি থেকে বলা হয়েছিল, দলের চেয়ারপারসন দেশে ফেরার পরই সহায়ক সরকারের প্রস্তাব দেবেন। কিন্তু খালেদা জিয়া দেশে ফেরার পর সহায়ক সরকার নিয়ে আর দাবি তোলা হয়নি।

আজ শুক্রবার মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ৪১তম মৃত্যুবার্ষিকীর আলোচনা সভায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বিএনপির দেয়া প্রস্তাব অনুযায়ী সহায়ক সরকারের অধীনেই জাতীয় সংসদ নির্বাচন হতে হবে। সরকার যদি দাবি না মানে আন্দোলনের মাধ্যমে সহায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন আদায় করা হবে। এসময় তিনি আন্দোলনের জন্য নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার নির্দেশ দেন।

বিএনপি মহাসচিব বলেন, অত্যাচারী, নির্যাতনকারী, হত্যাকারী জালেম সরকার আমাদের বুকের ওপর বসে আছে। এ জালেম সরকার থেকে মুক্তি পেতে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছি। আল্লাহ যেন আমাদের সেই শক্তি দেন। আগামী সংসদ নির্বাচনে দেশের মানুষ যেন ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে, সে জন্য আন্দোলনে অংশগ্রহণের আহবান জানান তিনি।

এদিকে নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে দেশের প্রধান দুই দল বিপরীতমুখী অবস্থানে অনড়। আওয়ামী লীগের দাবি, নির্বাচনকালীন যে সরকার ক্ষমতায় থাকবে, অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশের মতো সেই সরকারই এটি। একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে নির্বাচন কমিশনকে সহযোগিতা করাই সরকারের কাজ। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) অধীনেই নির্বাচন হবে।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, বিএনপি জানে শেখ হাসিনা বা সরকারের অধীনে নয়, নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে নির্বাচন কমিশনের অধীনে। তারপরও বিএনপি নেতারা ব্ল্যাকমেইলিং বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছেন।
ফেমাসনিউজ২৪/এফএম/এমএম