logo

বুধবার, ১৫ আগস্ট ২০১৮ | ৩০ শ্রাবণ, ১৪২৫

header-ad

বাড়ছে ব্যক্তিগত গাড়ি, ভাঙছে সংসার!

মাহতাব শফি | আপডেট: ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

রাজধানী ঢাকায় বাড়ছে না সড়ক। অথচ প্রতিনিয়তই বাড়ছে গাড়ির চাপ, বাড়ছে যানজট। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাবে ঢাকার রাস্তায় বছরে ৯০ হাজার নতুন গাড়ি নামে, এসব গাড়ির ৮০ ভাগই ব্যক্তিগত ব্যবহারের। ব্যক্তিগত গাড়িগুলোই এ যানজটের অন্যতম কারণ। এদিকে মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, যানজটের কারণে সংসার ভাঙার ঝুঁকিও বেড়ে গেছে!

কানাডার সেন্টার ফর ড্রাগ অ্যাডিকশন অ্যান্ড মেন্টাল হেলথের গবেষণা বলছে, কেউ যদি যানজটের চাপ নিয়মিত গ্রহণ করে তবে তার অস্থিরতা বাড়ে তিনগুণ, বিষণ্নতার ঝুঁকি বাড়ে ৫০ শতাংশ এবং এর প্রভাবে সংসার ভাঙার ঝুঁকি বাড়ে ৫০ শতাংশ। 

জাতীয় মানিসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট ও হাসপাতালের অধ্যাপক মোহিত কামাল বলেন, যানজটের কারণে দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হওয়া মানসিক অস্থিরতার প্রভাব পড়ছে রাজধানীবাসির পারিবারিক জীবনে। শারীরিক ক্ষতির পাশাপাশি রাস্তায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থেকে বড় ধরনের মানসিক ক্ষতি হচ্ছে ঢাকার নাগরিকদের।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যায়ের গবেষণা অনুযায়ী রাজধানীতে বর্তমানে মোট গাড়ি রয়েছে সাড়ে ১৩ লাখ। এর মধ্যে ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা সাড়ে ১০ লাখ। ঢাকার রাস্তায় প্রতিদিন যোগ হয় ২৫০ গাড়ি অর্থাৎ বছরে ৯০ হাজার। এর মধ্যে ৭০ হাজারই ব্যক্তিগত গাড়ি। ফলে ঢাকায় প্রতিদিনই বাড়ছে গাড়ির চাপ, বাড়ছে যানজট।

নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. সারওয়ার জাহান বলেন, যানজট দূর করার জন্য ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি গণপরিবহনের মানও বাড়াতে হবে। প্রাইভেট গাড়ির ব্যবহারটা নিরুৎসাহী করতে হবে এবং যানজট নিরসনে শহরের রাস্তাগুলোও দখলমুক্ত করতে হবে।

নগর পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. এস এম সালেহ উদ্দিন বলেন, ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করা অনেকটাই কঠিন, তবে এটা হ্রাস অবশ্যই প্রয়োজন আছে। কিন্তু তাদেরকে বিকল্প ব্যবস্থা করে দিতে হবে। যানজট বিশেষজ্ঞ মারুফ হোসেন বলেন, ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য সহজ শর্তে লোন পাওয়া যাচ্ছে। তাই এর সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে মানসিক চাপের দশটি শহরের মধ্যে একটি ঢাকা। যার অন্যতম প্রধান কারণ যানজট। হিসেব বলছে, বিভিন্ন প্রয়োজনে যাতায়াতে ঢাকাবাসীর সময় ব্যয় হয় দৈনিক গড়ে দুই ঘণ্টা ৩৫ মিনিট। আর এর মধ্যে যানজটে আটকে থেকে নষ্ট হয় প্রায় দেড় ঘণ্টা। সকালে বাসা থেকে বের হয়ে ঠিক সময়ে কর্মস্থলে পৌঁছানোর দুশ্চিন্তা। আর কাজ শেষে বাসায় ফিরতে যানজটের ক্লান্তি সেইসঙ্গে বায়ু আর শব্দ দূষণের প্রভাব রাজধানীবাসীর ওপর তৈরি করছে মানসিক চাপ।

১৩টি পরিবেশবাদী সংগঠন থেকে অভিযোগ করে বলা হয়, রাজধানীর মানুষই প্রতিনিয়ত দুঃসহ যানজটের শিকার। আর যানজটের প্রধান কারণ গণপরিবহন ব্যবস্থার নৈরাজ্য ও অনিয়ন্ত্রিতভাবে প্রাইভেট কার বৃদ্ধি পাওয়া। রাজধানীর ৫ শতাংশ বাসিন্দা চলে প্রাইভেট কারে করে, এ জন্য সড়কের ৭০ ভাগ জায়গা দখল করে রাখে। এরপরও ঢাকা শহরে প্রতিদিন শতাধিক নতুন কারের নিবন্ধন দেওয়া হচ্ছে। যানজট নিরসনে প্রাইভেট কার নিয়ন্ত্রণ-বিষয়ক নীতিমালা করতে হবে।

এদিকে রাজধানী ঢাকায় ভয়াবহ যানজটের আরেকটি কারণ অভিজাত শ্রেণির দেড় শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ঘিরে অর্ধ লক্ষাধিক প্রাইভেট গাড়ির আনাগোনা। এসব গাড়ি শুধু শিক্ষার্থীকে স্কুলে পৌঁছে দেওয়া বা স্কুল থেকে নিয়ে যাওয়ার কাজেই ব্যবহার হয় না, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে গাড়ি দিনভর স্কুলের আশপাশের রাস্তায় কয়েক সারিতে পার্কিং করে অপেক্ষায় থাকে।

বিআরটিএ’র পরিসংখ্যান বলছে, গত আট বছরে এই শহরে প্রাইভেট কারের সংখ্যাই বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। যানজটের জন্য প্রাইভেট কারকে দায়ী করা হলেও এর ব্যবহার প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। তবে উন্নত দেশগুলোর মতো বাংলাদেশেও এই গাড়ির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বহুল আলোচিত সড়ক পরিবহন আইন-২০১৭-এর চূড়ান্ত খসড়ায় ব্যক্তি বা পরিবারপ্রতি গাড়ি সংখ্যা নির্ধারণ করে দেওয়ার বিধান রয়েছে।

পরিবহন বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. শামছুল হক বলেন, নগর যোগাযোগ ব্যবস্থায় যানজটের প্রধান কারণ প্রাইভেট কার। এটি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে ফ্লাইওভার, মেট্রো রেলে কোনো লাভ হবে না।

বাংলাদেশ পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক স্থপতি ইকবাল হাবিব জানান, প্রাইভেট কার নিয়ন্ত্রণ করা মানে নিষিদ্ধ নয়। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে প্রাইভেট গাড়ি নিয়ন্ত্রণে আনতে যে পদ্ধতি অনুসরণ করে আমাদেরও সে পদ্ধতির দিকে যেতে হবে।

বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিচার্জ ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ বলেন, ব্যক্তিগত গাড়ি সড়কের অর্ধেকের বেশি জায়গা দখল করে রাখে। অন্যদিকে, গণপরিবহনে একই পরিমাণ জায়গায় বসে ও দাঁড়িয়ে ১৫/১৬ জন যাত্রী চলাচল করতে পারেন। সেই হিসেবে যে পরিমাণ ব্যক্তিগত গাড়ি, তা ঢাকার রাস্তার অর্ধেকের বেশি দখল করে। বাকি অংশ থাকে গণপরিবহন ও অবৈধ দখলে।

ফেমাসনিউজ২৪/আরএ/আরইউ