logo

সোমবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ৯ আশ্বিন, ১৪২৫

header-ad

দায় নেবে কে?

ফেমাসনিউজ ডেস্ক | আপডেট: ১৩ মার্চ ২০১৮

নেপালের কাঠমান্ডুতে ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের বিমান দুর্ঘটনার খবরটি সারাবিশ্বেই গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ডামাডোলের মধ্যে নেপালের সব গণমাধ্যমেও খবরটি প্রাধান্য পেয়েছে। সেই সঙ্গে শিরোনাম হয়ে এসেছে, এর দায় নেবে কে? ল্যান্ড করা নিয়ে ককপিট আর এয়ার কন্ট্রোলের মধ্যে কোনো বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল কিনা সেই প্রশ্নও ঘুরপাক খাচ্ছে।

কাঠমাণ্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের (টিআইএ) এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল টাওয়ারের ভুল নির্দেশনার কারণেই বিএস-২২১ ফ্লাইটটি বিধ্বস্ত হয়েছে সন্দেহ করছে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ।

গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় ঢাকার বারিধারায় নিজস্ব কার্যালয়ে এক প্রেস ব্রিফিং-এ ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ইমরান আসিফ জানান, আমাদের কাছে যে ইনফরমেশন এসেছে, এটা আপনারা ইউটিউবে গেলেই পাবেন। ইউটিউবে একটা এটিসি কনভার্সেশনের ক্লিপ এসেছে।

তিনি জানান, আমাদের পাইলটদের সঙ্গে নেপালের কাঠমাণ্ডুর এটিসি টাওয়ারের সঙ্গে ল্যান্ডিংয়ের আগের একটি কনভার্সেশন। আপনারা শুনলে বুঝবেন, এখানে টাওয়ারের সঙ্গে পাইলটের কমিউনিকেশনে এটিসির পক্ষ থেকে একটা ভুল বার্তা দেয়ার, গাফেলতি হওয়ার টেন্ডেন্সি দেখা যাচ্ছে। আমরা এটাকে ইনভেস্টিগেট করছি।

ইমরান আসিফ জানান, আমরা সন্দেহ করছি যে, কাঠমান্ডু এটিসি টাওয়ারের পক্ষ থেকে গাফিলতি ছিল। তারা আমাদের পাইলটদের ভুল বার্তা দিয়েছিল। সে কারণেই এ দুর্ঘটনা ঘটেছে।

ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের সিইও বলেন, তাদের কথা হচ্ছিল পাইলট রানওয়ের কোন দিক দিয়ে ল্যান্ড করবেন। ৩ মিনিটের বক্তব্যে বিভিন্ন সময়ে আমাদের পাইলটকে বিভিন্ন বার্তা দেয়া হয়েছে। এ বার্তার কনফিউশনের জন্য এ ‍দুর্ঘটনা ঘটে থাকতে পারে বলে মনে করছি আমরা।

বিমানটিতে কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি ছিল কিনা- এ প্রশ্নের উত্তরে ইউএস বাংলার মুখপাত্র জানান, অবশ্যই না। এই বিমানটির বয়স ১৬ বছর। এই মডেলের চারটি বিমান আছে আমাদের। ক্যাপ্টেন আবিদ সুলতান এক্স-এয়ারফোর্সের একজন পাইলট। তার ফ্লাইং আওয়ার পাঁচ হাজারের বেশি। এই এয়ারক্র্যাফ্টে উনি ১৭০০ ঘণ্টার বেশি ফ্লাই করেছেন। উনি এই এয়ারক্র্যাফ্টের একজন ইন্সট্রাক্টর। এটিসি কনভার্সেশন শোনার পর আমাদের মনে হচ্ছে না যে, আমাদের বৈমানিকদের দিক থেকে কোনো গাফিলতি ছিল।

সোমবার দুপুর ১২টা ৫১ মিনিটে ঢাকার হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ইউএস-বাংলার বোম্বার্ডিয়ার ড্যাশ ৮ কিউ৪০০ মডেলের এস২-এজিইউ বিমানে ৭১ জন আরোহী নিয়ে কাঠমান্ডুর উদ্দেশ্যে রওনা করেন পাইলট আবিদ।

বিমানটি কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামার সময় রানওয়ে থেকে ছিটকে পড়ে এবং আগুন ধরে যায়। জানা গেছে, ত্রিভুবন বিমানবন্দরের এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলরুম (এটিসি) থেকে পাইলট আবিদকে অবতরণের ভুল নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল।

কন্ট্রোলরুমের সঙ্গে তার সর্বশেষ কথোপকথনের অডিও রেকর্ডে শোনা যায়, কন্ট্রোলরুম থেকে বিমানের পাইলটকে বিমানবন্দরের ডানদিকের দুই নাম্বার রানওয়েতে অবতরণের নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে। পরে আবিদ বলেন, ঠিক আছে স্যার।

নির্দেশনা অনুযায়ী, তিনি বিমানটি বিমানবন্দরের ডানদিকে নিয়ে যাওয়ার কথা জানান কন্ট্রোলরুমে। কিন্তু ডানদিকে রানওয়ে ফ্রি না থাকায় তিনি আবারও কন্ট্রোলরুমের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

এ সময় তাকে ভিন্ন বার্তা দেয়া হয়। এবারে প্রশ্ন করা হয়, আপনি কি বর্তমান অবস্থানে থাকতে পারবেন? এ সময় পাইলট আবিদ দুই নাম্বার রানওয়ে ফ্রি করার জন্য কন্ট্রোলরুমের কাছে অনুরোধ জানান। কিন্তু তাকে আবারও ভিন্ন বার্তা দেয়া হয়।

এর কিছুক্ষণ পর পাইলট আবিদ বলেন, স্যার, আমি আবারও অনুরোধ করছি রানওয়ে ফ্রি করুন। এরপর পরই বিমানটি বিকট শব্দ করতে শুরু করে। কিছুক্ষণ পর স্থানীয় সময় সোমবার বেলা ২টা ২০ মিনিটে বিমানটি ত্রিভুবন বিমানবন্দরের পাশের একটি ফুটবল মাঠে আছড়ে পড়ে। বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় ৭১ আরোহীর মধ্যে পাইলট আবিদসহ ৫১ জন নিহত হন।

কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের (টিআইএ) জেনারেল ম্যানেজার রাজকুমার ছেট্রি গণমাধ্যমকে বলেন, বিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছে ভুল পথে অবতরণের জন্য। যখন কন্ট্রোলরুম থেকে পাইলটের কাছে অবতরণের ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা আছে কিনা জানতে চাওয়া হয়, তখন তিনি বলেন যে, সবকিছু ঠিক আছে। কিন্তু উত্তর দিকের পরিবর্তে উত্তর-পূর্ব দিক দিয়ে অবতরণের চেষ্টা করা হয়।

রাজকুমার ছেট্রি বলেন, কন্ট্রোলরুমের পক্ষ থেকে পাইলটের কাছে আবারও জানতে চাওয়া হয় যে, সবকিছু ঠিক থাকলে বিমানটিকে অবতরণ করাচ্ছেন না কেন? উত্তরে তিনি বলেন যে, সবকিছু ঠিক আছে এবং তিনি অবতরণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কিন্তু অবতরণের জন্য কন্ট্রোলরুমের নির্দেশিত পথে ছিল না বিমানটি। যখন এ ব্যাপারে জানতে চাওয়া হয়, তখন কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।

বিমান দুর্ঘটনা নিয়ে একটি গ্রাফিক্স তৈরি করেছে ঐকান্তিপুর ডটকম। ওই দুর্ঘটনার একটি অডিও ইউটিউবে ছড়িয়ে পড়া নিয়ে বিশেষ খবর প্রকাশ করেছে নেপাল টাইমস।

বিমানটি অবতরণ করা নিয়ে শেষ কয়েক মিনিটে ককপিটের সঙ্গে এয়ার কন্ট্রোল টাওয়ারের (এটিসি) সঙ্গে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল বলে প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়।

কথোপকথনের বিবরণ তুলে ধরে নেপাল টাইমসে বলা হয়েছে, এটিসি থেকে পাইলটকে বলা হচ্ছে, আমি আবার বলছি, রানওয়ে ২০দিকে এগোবেন না। পাইলট বলেন, তিনি অপেক্ষা করছেন।

এরপর তিনি সেটিকে অবতরণ না করে অপেক্ষা করতে বলেন। কারণ আরেকটি বিমান ওই রানওয়ের দিকে এগিয়ে আসছে। কন্ট্রোল টাওয়ারের সঙ্গে ককপিটের যোগাযোগ নিয়ে বিভ্রান্তি ছিল কিনা, সেই প্রশ্ন তুলেছে নেপাল টাইমস।

বিমানটি ডানদিকে ঘুরে গেলে এটিসি থেকে জানতে চাওয়া হয়, পাইলট কি রানওয়ে জিরো টুতে (উত্তর প্রান্ত) ল্যান্ড করবেন নাকি রানওয়ে টু জিরোতে (দক্ষিণ প্রান্ত)। ইউএস বাংলার পাইলট জানান, তারা রানওয়ে টু জিরোতে (২০) ল্যান্ড করবেন।

তখন তার কাছে জানতে চাওয়া হয়, তিনি কি রানওয়ে দেখতে পাচ্ছেন? তিনি জবাব দেন, নেগেটিভ, অর্থাৎ না। কন্ট্রোল টাওয়ার থেকে তাকে ডানদিকে ঘুরতে বলা হয়। এরপরই পাইলট জানান, তিনি রানওয়ে দেখতে পাচ্ছেন।

এরপর পাইলট বলেন, রানওয়ে জিরো টু-তে অবতরণ করার জন্য প্রস্তুত। এটিসিও তাকে বলে জিরো টুতে নামার অনুমতি দেয়। (যদিও একটু আগেই টু জিরোতে নামার বিষয়ে পাইলটের সঙ্গে কন্ট্রোল টাওয়ারের কথা হয়েছে।)

এ সময় প্রায় দশ কিলোমিটার দূরে একটি সামরিক বিমানকে অপেক্ষায় রাখা হয়েছিল। কন্ট্রোল টাওয়ার জানিয়ে দেয়, বাংলাদেশের বিমানটিকে টু-জিরোতে নামার চূড়ান্ত অনুমতি দেয়া হয়েছে (একটু আগেই কথা হয়েছে জিরো টুর বিষয়ে)।

এরপর ইউএস বাংলার পাইলট জানতে চান, স্যার, আমরা কি অবতরণের অনুমতি পেয়েছি? কিছুক্ষণ নীরবতার পরই কন্ট্রোলের চিৎকার শোনা যায়, আমি আবার বলছি, ঘুরে যান। এরপরই ফায়ার ওয়ানকে ডাকা হয়, যার মানে একটি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এরপর নেপালি একজন পাইলটের প্রশ্নের জবাবে রানওয়ে বন্ধ বলে জানানো হয়।

একই বিষয়ে খবর প্রকাশ করেছে অন্নপূর্ণা পোস্ট। তাদের শিরোনাম খবর , বিমানবন্দরের বিমান নিয়ন্ত্রণের গোপন অডিও বার্তা। সেখানেও ওই অডিও যোগাযোগের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে।

এদিকে নেপালের কাঠমান্ডুতে বিধ্বস্ত ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের বিমানের প্রধান পাইলট আবিদ সুলতান মারা যাওয়ায় আসল তথ্য বেরিয়ে আসতে হয়তো বিলম্ব হতে পারে। তিনি বেঁচে থাকলে বিমান দুর্ঘটনার আসল কারণ সহজেই জানা যেত।

কাঠমান্ডুর নরভিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান আবিদ। মঙ্গলবার ভোররাতে তার উত্তরার বাসায় ইউএস-বাংলার পক্ষ থেকে অবহিত করা হয়। ফলে বিমানটিতে থাকা দুই পাইলট ও দুই ক্রুর মধ্যে শুধু ক্রু কে এইচ এম শাফি বেঁচে রইলেন। তার কাছ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে মনে করছেন বিমান বিশেজ্ঞরা।
ফেমাসনিউজ২৪/এফএম/এমএম