logo

বৃহস্পতিবার, ২৬ এপ্রিল ২০১৮ | ১৩ বৈশাখ, ১৪২৫

header-ad

স্বপ্নরা ফিরছে লাশ হয়ে

মাহতাব শফি | আপডেট: ১৯ মার্চ ২০১৮

অবশেষে অপেক্ষার অবসান হচ্ছে। স্বপ্ন ফেরি করা সেই পাখিরা ফিরছে আজ। যারা পৃথিবীর রঙিন স্বপ্ন নিয়ে ডানা মেলেছিল দূর আকাশে। সেই স্বপ্নের কারিগররা দিকশূন্যবাসী হয়ে আজ ফিরছেন আমাদের মাঝে। তবে লাশ হয়ে!

নেপালের আকাশে তাদের জন্য সেদিনের সকালটি ছিল অন্য আট দশটা দিনের মতোই স্বাভাবিক। তবে আকাশে ওড়া সেইসব পাখিদের কাছে সেদিনের সূর্যটা একটু বেশিই গাঢ় ছিল। কারণ তাদের চোখে ছিল তখন কেবলই আকাশে উড়ার স্বপ্ন। কাজের অবসরে কিংবা নতুন বিয়ের পর হানিমুনে যাবার স্বপ্নে বিভোর ছিলেন কেউ কেউ। কিন্তু সেই স্বপ্ন অধরাই রয়ে গেল তাদের। জীবনটা যেন এমনই হয় - ‘এ খেদ মোর মনে/ ভালবেসে মিটল না আশ- কুলাল না এ জীবনে/ হায়, জীবন এত ছোট কেনে?/ এ ভুবনে?...।

১২ মার্চ নেপালে বিমান দুর্ঘটনায় পাইলট ও কো-পাইলটসহ মোট ২৬জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছিলেন। এ দুর্ঘটনায় মোট নিহত হয়েছেন ৫১ জন। উড়োজাহাজ বিধ্বস্তের ঘটনায় ৩৬ বাংলাদেশি যাত্রীর ২৬ জনই নিহত হয়েছেন। বাকিরা কাঠমান্ডুর বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। উড়োজাহাজে ক্রুসহ ৭১ জন ছিলেন। নিহত বাংলাদেশি যাত্রীদের মধ্যে যাদের শনাক্ত করা হয়েছে তাদের আজ ঢাকায় নিয়ে আসা হচ্ছে। নিহতদের মধ্যে শনাক্ত করা হয়েছে ২৩ জনের মরদেহ। এই ২৩ জনের মধ্যে পাইলট আবিদ সুলতান, কো-পাইলট পৃথুলা রশীদ এবং কেবিন ক্রু খাজা হোসেন মো. শফি ও শারমিন আক্তার নাবিলা রয়েছেন। যাত্রীর মধ্যে ফয়সাল আহমেদ, বিলকিস আরা, বেগম হুরুন নাহার বিলকিস বানু, আখতারা বেগম, নাজিয়া আফরিন চৌধুরী, রকিবুল হাসান, হাসান ইমাম, আঁখি মনি, মিনহাজ বিন নাসির, ফারুক হোসেন প্রিয়ক, তার মেয়ে প্রিয়ন্ময়ী তামারা, মতিউর রহমান, এস এম মাহমুদুর রহমান, তাহিরা তানভিন শশী রেজা, বেগম উম্মে সালমা, মো. নুরুজ্জামান, রফিক জামান, তার স্ত্রী সানজিদা হক বিপাশা, তাদের ছেলে অনিরুদ্ধ জামানকে শনাক্ত করা হয়েছে। এদিকে খবর পেয়ে দাফনের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে নিহতদের পরিবার।

ইউএস বাংলার জনসংযোগ শাখার ব্যবস্থাপক কামরুল ইসলাম বলেন, ‘নেপালি কর্তৃপক্ষ আমাদের জানিয়েছে, আলিফুজ্জামান, পিয়াস রায় ও নজরুল ইসলামকে এখনও শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।’

নেপালে ইউএস বাংলা এয়ারলাইনসের বিমান দুর্ঘটনার এক সপ্তাহ পূর্ণ হয়েছে। হতাহতদের স্বজনরাই অপেক্ষায় ছিলেন, কবে আসবে সেই দিন, মাতৃভূমিতে নিয়ে যাবে আপনজনকে। ইউএস বাংলা এয়ারলাইনস কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ থেকে নেপালে আসা মেডিকেল দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সোমবার আহত-নিহতদের স্বজনসহ শণাক্তৃকৃত মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে বাংলাদেশে। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি বিশেষ উড়োজাহাজ ওই মরদেহগুলো বহন করে বিকেল ৪টার দিকে রাজধানীর কুর্মিটোলায় 'বঙ্গবন্ধু' বিমান ঘাঁটিতে অবতরণ করবে।

জানা গেছে, কফিন প্রস্তুত হলে নেপালি কর্তৃপক্ষ সেগুলো বাংলাদেশ দূতাবাসের হাতে তুলে দেবেন। দূতাবাস সেগুলো বিশেষ বিমানে করে ঢাকায় পাঠাবে। ঢাকায় আত্মীয় স্বজনদের কাছে মৃতদেহগুলো হস্তান্তর করা হবে।

নিহত রফিক জামানের পারিবারিক বন্ধু সুমন জাহিদ জানিয়েছেন, ঢাকায় জানাজার পর রফিক জামান, তার স্ত্রী সানজিদা হক বিপাশা ও তাদের সন্তান অনিরুদ্ধ জামানের মরদেহ তারা নোয়াখালীতে নিয়ে যাবেন দাফনের জন্য।

মেডিকেল দল জানায়, যাদের মরাদেহ শণাক্ত হবে না, ডিএনএ পরীক্ষার পর স্বজনদের কাছে লাশ হস্তান্তর করা হবে। মরদেহ হস্তান্তরের পাশাপাশি শাহীন ব্যাপারী নামে আহত একজন বাংলাদেশে পৌঁছেছে। আর বাকীদের ফিরিয়ে নেয়ার জন্য সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে নেপালে বাংলাদেশে দূতাবাস।

এ মৃত্যু আমাদের কাঁদায়। গলা ভারী হয়ে আসে , কণ্ঠ রোধ হয়ে আসে। কোন অনাকাঙ্খিত মৃত্যুই আমরা চায় না। যখন নেপাল বিমান দুর্ঘটনায় নিহত একজনের স্ত্রীর বুক ফাটা আর্তনাদ কানে বাজে , ‘তার সাথে সংসার করেতো আমার মন ভরে নাই’। অথবা আমেরিকান প্রবাসী স্বামী স্ত্রীকে শেষ বিদায় জানাতে বাংলাদেশে যাত্রাপথে যখন ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেন – ‘আমার জান, আমার কলিজা কেন তুমি আমাকে একা করে দিয়েছ? তুমি ছিলে আমার জীবনের সেরা পাওয়া। তুমি সবসময়, প্রতিটি দিন, প্রতিটি সেকেন্ড আমাকে পরিপূর্ণ করেছ। তুমি প্রতি মুহূর্তে আমার বেঁচে থাকার কারণ। তুমিতো তা জানতে তাহলে কেন এভাবে আমার বুক থেকে সারাজীবনের জন্য আকাশে লুকিয়ে গেলে?’

নিকটজন হারানো এ শোকের যেমন শেষ নেই তেমনই কারো জানা নেই এ অবস্থায় সান্ত্বনা দেবার কোনো ভাষা। এ ক্ষত কতটা গভীর সে উপলব্ধি কেবল তাদেরই আছে যারা অকালে হারিয়েছেন তাদের ভালোবাসার মানুষদের।

নেপালের ত্রিভুবন বিমানবন্দরেই এ ভুবন থেকে বিদায় নিয়েছেন যারা, তাদের প্রায় সবাই বয়সে তরুণ। তারা পরিবারকে, দেশকে দেবার মতো অনেক কিছু বাকি ছিল। তাদের স্বজনরা আজ কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। কাঁদছেন বন্ধুরা। এক বুক কান্না আর হাহাকার করা ছাড়া আর কিই বা করার আছে।
জীবন সুন্দর। আকাশ, বাতাস, পাহাড় সমুদ্র/ সবুজ বনানী ঘেরা প্রকৃতি সুন্দর, আর সবচেয়ে সুন্দর এই বেঁচে থাকা/ তবুও কি আজীবন বেঁচে থাকা যায় ? বিদায়ের সেহনাই বাজে, নিয়ে যাবার পালকি এসে দাঁড়ায় দুয়ারে/ সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে, এইযে বেঁচে ছিলাম/ দীর্ঘশ্বাস নিয়ে যেতে হয়, সবাইকে অজানা গন্তব্যে/ হঠাৎ ডেকে ওঠে নাম না জানা পাখি/ অজান্তেই চমকে উঠি, জীবন ফুরালো নাকি? / এমনি করে সবাই যাবে যেতে হবে..!

এ ধরনের আকস্মিক মৃত্যু বেঁচে থাকা মানুষের জন্যও অপূরণীয় ক্ষতি, কারণ, প্রত্যেকেই রেখে যায় অসমাপ্ত কাজ এবং স্বপ্নগুলো—যা আর কোনোদিন সমাপ্ত হয় না।

ফেমাসনিউজ২৪/আরআর/আরইউ