logo

সোমবার, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৮ | ৩ পৌষ, ১৪২৫

header-ad

বিমানযাত্রা, স্বপ্ন থেকে শঙ্কায়!

নিজস্ব প্রতিবেদক | আপডেট: ২১ মার্চ ২০১৮

আকাশে ওড়ার স্বপ্ন সবাই দেখে। ডানা মেলে না হোক যান্ত্রিকতার আশ্রয়ে ওড়াল। এও বা কম কীসে? বিমানে করে যাত্রা তাই এখনো এক স্বপ্নময় যাত্রা। কিন্তু সাম্প্রতিক তা দুঃস্বপ্নে রূপ নিচ্ছে। নেপাল ট্র্যাজেডির পর বিমানযাত্রাকে দুঃস্বপ্নই বলা যায়!

নেপালে ঘটে যাওয়া এ ঘটনায় নানা দিক থেকে নানা প্রশ্ন উঠেছে। বলা হয়েছে, তদন্ত হলে সঠিক কারণ বেরিয়ে আসবে, কিন্তু সার্বিকভাবে ব্যবস্থাপনাসংশ্লিষ্টদের অসতর্কতার বিষয়টি আড়াল করা যায়নি। এর মধ্যে আবার মাত্র সপ্তাহখানেকের মাথায় মঙ্গলবার বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইট যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে হজরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করেছে।

প্রশ্ন উঠেছে, শুধু কি হতাহতের ঘটনা ঘটলেই আমরা সেটাকে আমলে নেব? অন্যথায় গত কয়েক বছরে একের পর এক বিমান যাত্রায় বিভিন্ন মাত্রার ত্রুটির ঘটনা ঘটলেও কেন আমরা সতর্ক হতে পারিনি? সেই ঘটনাগুলোর চুলচেরা বিশ্লেষণ করে সেখান থেকে আমরা ‘করণীয়’ ঠিক করতে পারিনি। এটি বললে অত্যুক্তি হবে না যে, নেপালের ঘটনা বড় হলেও -সেটা একটা ধারাবাহিক ঘটনা মাত্র।
সব মিলিয়ে কি বিপজ্জনক হচ্ছে বিমান যাত্রা? অন্যান্য দেশের এয়ারলাইনসের ক্ষেত্রে এ প্রশ্নটি অনেকটা মীমাংসিত হলেও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অন্তত ইদানীংকালে এ প্রশ্ন জোরালো হয়ে উঠছে। আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে যাত্রীদের মনে। এমনকি নেপালের দুর্ঘটনার পর অনেক যাত্রী তাদের যাত্রাও বাতিল করেছেন। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যাপারে আগে থেকেই প্রশ্ন ছিল, এখন নতুন করে তা উঠছে বেসরকারি বিমান সংস্থাগুলোর ব্যাপারে। সেবার মান, ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন ত্রুটি নিয়ে যাত্রীরা কথা বলছেন।

২৮ মার্চ ২০১৫। এ দিন বিমান দুর্ঘটনার হাত থেকে অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছেন সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, জাতীয় পার্টির তৎকালীন মহাসচিব জিয়াউদ্দিন বাবলু ও তৎকালীন পানিসম্পদমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদসহ মোট ২০৬ জন যাত্রী। বাংলাদেশ বিমানের এয়ারবাস ৩১০ ফ্লাইট নং বিজি ০৮৫ সিঙ্গাপুরের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়ন করে। কিন্তু বাংলাদেশের আকাশসীমায় প্রবেশের পর চট্টগ্রামের শাহ আমানত (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ৭০ নটিক্যাল মাইল দূরে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বিমানটির দ্বিতীয় ইঞ্জিনে আগুন ধরে যায়। এরপর পাইলটরা বিমান থেকে প্রায় সব জ্বালানি তেল সাগরে ফেলে কিছু তেল রেখে আড়াই ঘণ্টা আকাশে চক্কর দেন। অবশেষে আংশিক জ্বলন্ত এয়ারবাসটি নিরাপদে হজরত শাহজালাল (রহ.) বিমানবন্দরে অবতরণ করানো হয়।

২৫ অক্টোবর ২০১৭। নীলফামারীর সৈয়দপুর বিমানবন্দর থেকে বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইট উড্ডয়নের সঙ্গে সঙ্গেই খুলে পড়ে যায় বিমানের একটি চাকা। সেই চাকা রেখেই পাইলট ঢাকায় চলে আসেন!

ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইটটি সৈয়দপুর বিমানবন্দরে অবতরণ করে। যাত্রী ওঠানামার পর বিমানটি ঢাকা যাওয়ার উদ্দেশে বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়নের পর পরই পেছনের একটি চাকা খুলে পড়ে যায়। চাকাটি রানওয়ের বাইরে ডোবায় পড়ে যায়।

২৭ নভেম্বর ২০১৬। হাঙ্গেরি সফরকালে প্রধানমন্ত্রীর যাত্রাপথে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বিমানের পাইলট তুর্কমেনিস্তানের রাজধানী আশখাবাদে জরুরি অবতরণ করতে বাধ্য হন। সেখানে ৪ ঘণ্টা অনির্ধারিত যাত্রাবিরতির পর ত্রুটি মেরামত করে ওই ফ্লাইটেই প্রধানমন্ত্রী বুদাপেস্টে পৌঁছেন।

এ ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটিগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়, এটা ‘মানবসৃষ্ট’। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে দুই দফায় প্রকৌশল বিভাগের নয়জনকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়। তদন্ত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী এ ঘটনায় ফৌজদারি মামলা করার ব্যাপারে সম্মতি দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

প্রায়ই এমন ঘটনা ঘটলেও সংশ্লিষ্টরা তা গায়ে মাখেনি। তাই ধারাবাহিকভাবে একটার পর একটা ঘটনা ঘটেই যাচ্ছে। এমনকি নেপালে ঘটে যাওয়া এত বড় দুর্ঘটনার পরও মাত্র ৮ দিনের মাথায় আরেকটি ফ্লাইটের জরুরি অবতরণের ঘটনা ঘটল।

এসব নিয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ালাইনসের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. এমএ মোমেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি আরও একটি ঘটনা যোগ করেন। ২০০৭ সালে একটি হজ ফ্লাইট ঢাকা থেকে জেদ্দা যাওয়ার জন্য উড্ডয়ন করে। সেটা করাচি যাওয়ার পর ইঞ্জিনে ট্রাবল শুরু করে। সেই ফ্লাইট শেষ পর্যন্ত জেদ্দা না গিয়ে আবার ঢাকায় ফিরে আসে।

বিমান যাত্রা কি বিপজ্জনক হয়ে উঠছে- এমন প্রশ্নে বিমান বাংলাদেশের সাবেক এ ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, এ প্রশ্নের উত্তরে সরাসরি ‘হ্যাঁ’ না বলে আমি একটু ব্যাখ্যা করতে চাই। যতগুলো ঘটনার কথা বলা হলো তার মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর ঘটনাটি বাদে বাকি সব যান্ত্রিক ত্রুটি। যন্ত্র থাকলে সেটাতে ত্রুটি হতেই পারে। কিন্তু ফ্লাই করার আগে জাহাজটি শতভাগ ফিট কিনা, এ ব্যাপারে নিশ্চিত হতে হবে। যদি সে ব্যাপারে কোনো গাফিলতি থাকে এবং তার জন্য কোনো দুর্ঘটনা ঘটে- তাহলে সেই দুর্ঘটনার দায় মানুষের। কিন্তু ঢালাওভাবে ‘বিপজ্জনক’ বললে তাতে আতঙ্ক সৃষ্টি হতে পারে এবং সেটা আখেরে আমাদের এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রির জন্যই ক্ষতি বয়ে আনবে।

ছয় ঘণ্টা দেরিতে সৈয়দপুরে বিমান

যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে মাঝপথ থেকে ফিরে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটটি মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টায় ঢাকা থেকে সৈয়দপুরের উদ্দেশে আবারও রওনা হয়। এর আগে, দুপুর সাড়ে ১২টায় ঢাকা থেকে সৈয়দপুরের উদ্দেশে রওনা দিলে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেওয়ায় ১৮ মিনিট পর শাহজালাল বিমানবন্দরে ফিরে আসে ফ্লাইটটি। পরে সন্ধ্যা ৬টায় ঢাকা থেকে সৈয়দপুরের উদ্দেশে আবারও রওনা দেয় ফ্লাইটটি। ফলে যাত্রীদের বিমানবন্দরের ভেতরে টানা ৬ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়।

বিমানবন্দর সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা থেকে সৈয়দপুরের উদ্দেশে ১২টা ২৮ মিনিটে ছেড়ে যায় বিমানের ফ্লাইট বিজি-৪৯৩। পরবর্তীতে উড়োজাহাজটিতে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে ১২টা ৪৪ মিনিটে সৈয়দপুরে না গিয়ে শাহজালাল বিমানবন্দরে ফিরে আসে এটি। ফ্লাইটটিতে ৬৭ জন যাত্রী ছিলেন।
শাহজালাল বিমানবন্দরের উপপরিচালক মোশাররফ হোসেন বলেন, মেজর সমস্যা হয়নি। বিমান বাংলাদেশের নিজস্ব কর্মীরাই সমাধান করেছেন। বড় সমস্যা হলে অবশ্যই আমাদের জানাতেন তারা।

তবে বিমানবন্দরের একটি সূত্রে জানা গেছে, ইঞ্জিনে প্রেসারজনিত সমস্যা দেখা দিয়েছিল। পরবর্তীতে সমস্যা সমাধান করে সন্ধ্যা ৬টায় যাত্রীদের নিয়ে রওনা দেয় সেই ফ্লাইটটি।

এদিকে, ফ্লাইটটির যাত্রীদের এ সময় বিমানবন্দরের লাউঞ্জে অপেক্ষা করতে হয়। বিমান বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তাদের জন্য দুপুরের খাবারের ব্যবস্থাও করা হয়।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) শাকিল মেরাজ বলেন, একটু সমস্যা হয়েছিল। পরে সব ঠিক হয়ে গেছে। সমস্যা হওয়া এয়ারক্রাফট বিজি-৪৯৩ ফ্লাইটেই যাত্রীদের সৈয়দপুরে নিয়ে যাওয়া হয়।

ফেমাসনিউজ২৪/আরআর/আরইউ