logo

মঙ্গলবার, ১৬ অক্টোবর ২০১৮ | ১ কার্তিক, ১৪২৫

header-ad

বাসে নিরাপত্তা নেই নারীর

নিজস্ব প্রতিবেদক | আপডেট: ২৪ এপ্রিল ২০১৮

ভারতের নির্ভয়া আর বাংলাদেশের রূপা হত্যাকাণ্ডের পর গণপরিবহনে নারীর নিরাপত্তা নিয়ে বিশ্বব্যাপী যে আওয়াজ উঠেছিল, তাতে কোনো কাজ হয়েছে বলে মনে হয় না। বলা যায়, দেশের গণপরিবহনে এখনো হরহামেশাই নারীরা যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় প্রতিদিনই ঘটছে এমন ঘটনা। তাও আবার সংবাদমাধ্যমের গোচরে এলেই আমরা সেসব ঘটনার পরিসংখ্যান করতে পারি। এ ছাড়াও আড়ালে রয়ে যায় এমন অসংখ্য ঘটনা।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যথাযথ তদারকির অভাবটাই গণপরিবহনে যৌন হয়রানির মূল কারণ। তদারকি বলতে তারা বিশেষ করে, সিসি ক্যামেরার ব্যবহারকে বোঝাচ্ছেন। কাজটি খুব কঠিন কিছু নয় কিন্তু তারপরও কেন এটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্তরা কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।

অতিসম্প্রতি রাজধানীর বাড্ডায় তুরাগ পরিবহনের বাসে উত্তরা ইউনিভার্সিটির এক ছাত্রীকে যৌন হয়রানির ঘটনায় শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে তুরাগ পরিবহনের প্রায় আড়াইশ বাস চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। গত রোববার সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত উত্তরায় এ পরিবহনের ৫০টিরও বেশি বাস আটকে চাবি নেন শিক্ষার্থীরা।

এর আগে গত শনিবার বেলা পৌনে ১টার দিকে ওই তরুণী বাড্ডা থেকে উত্তরা যেতে বাসে উঠেছিলেন। তখন বাসে যাত্রী সংখ্যা কম ছিল। তাদের মধ্যে যারা নেমে যান, তাদের বদলে কাউকে বাসে নতুন করে না তোলায় সন্দেহ হয় ওই তরুণীর। আর বাসটি যখন প্রায় খালি হয়ে যায় তখন চালকের সহকারী ওই তরুণীকে বাসের পেছনের আসনে গিয়ে বসতে বলেন। এ সময় বাসের আরেকজন সহকারী দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কোনো যাত্রী যেন না ওঠে সেটা নিশ্চিত করছিলেন।

এটা দেখে ওই তরুণীর সন্দেহ আরও বেড়ে যায়। তিনি তখন দরজার কাছে গিয়ে নামার চেষ্টা করেন। কিন্তু চালকের সহকারী ‘কই যান’ বলে তার হাত চেপে ধরেন। আর আরেকজন গেট লাগাতে শুরু করেন। এ সময় সজোরে দুই সহকারীকে ধাক্কা দিয়ে মেয়েটি চলন্ত বাস থেকে লাফিয়ে পড়েন।
চলতি বছরে নারী দিবসকে (৮ মার্চ) সামনে রেখে ‘নারীর জন্য যৌন হয়রানি ও দুর্ঘটনামুক্ত সড়ক’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন ব্র্যাকের জেন্ডার, জাস্টিস অ্যান্ড ডাইভারসিটি কর্মসূচির সমন্বয়কারী হাসনে আরা বেগম ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট কবিতা চৌধুরী।

গবেষণায় দেখা যায়, দেশে প্রতি ১০০ জন নারী যাত্রীর ৯৪ জনই যৌন হয়রানির শিকার। আর যারা হয়রানি করেন, তাদের মধ্যে বেশিরভাগই ৪১ থেকে ৬০ বছর বয়সী পুরুষ। এ হার ৬৬ শতাংশ। পরবর্তীতে আরও হয়রানির আশঙ্কায় প্রতিবাদও করতে পারেন না। ঘটনার শিকার হলে মেয়েরা কী পদক্ষেপ নিয়ে থাকেন-এ প্রশ্নের উত্তরে গবেষণার জরিপে ৮১ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, তারা চুপ করে থাকেন এবং ৭৯ শতাংশ বলেছেন, তারা আক্রান্ত হওয়ার স্থান থেকে দ্রুত সরে যান।

আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগ না থাকা, বাসে অতিরিক্ত ভিড়, যানবাহনে পর্যাপ্ত আলো না থাকা, তদারকির অভাবকে (সিসি ক্যামেরা) যৌন হয়রানির মূল কারণ হিসেবে তুলে ধরছেন গবেষকরা।

থমসন রয়টার্স ফাউন্ডেশনের করা আরেকটি জরিপে বলা হয়েছে, নারীর প্রতি যৌন সহিংসতা ও হয়রানির দিক দিয়ে বিশ্বের চতুর্থ খারাপ শহর হচ্ছে ঢাকা। এখানে সুযোগ পেলেই নারীদের উদ্দেশে নোংরা বাক্য ছুড়ে দেওয়া হচ্ছে। কাছাকাছি পেলে স্পর্শকাতর স্থানে হাত দেওয়া হচ্ছে। প্রকাশ্যে এরকম ঘটনা ঘটলেও তেমন কেউ প্রতিবাদ করেন না।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের তথ্যানুসারে, ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে ৮৬, ফেব্রুয়ারিতে ৯২, মার্চে ১৩৪, এপ্রিলে ১০৮, মে মাসে ১৪৭, জুনে ১২৯, জুলাইয়ে ১২৯ ও আগস্টে ১৫৯, সেপ্টেম্বরে ১৪৯ জন নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে রাজধানী ঢাকায়।

সম্প্রতি এসব ঘটনা আরও অনেক বেশি ঘটছে। ডিএমপির একটি সূত্রে জানা যায়, তাদের কাছে গণপরিবহনে যৌন হয়রানির এমন অভিযোগ প্রতিদিন ৪-৫টি করে আসছে। তারা ব্যবস্থা নেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টাও চালিয়ে যান কিন্তু ঘটনাগুলো চলন্ত রাস্তায় হওয়ার কারণে অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীরা পালিয়ে যেতে পারেন।

গণপরিবহনে সিসি ক্যামেরার ব্যবস্থা করতে হবে : মোজাম্মেল হক চৌধুরী

গাড়ীর মালিকরা তো কোটি টাকার বিনিয়োগ করেন, সেই তুলনায় অতি সামান্য টাকা খরচ করে যদি গাড়িতে সিসি ক্যামেরার ব্যবস্থা করেন তাহলে গণপরিবহনে যৌন হয়রানির ঘটনা অনেকখানি কমে আসবে বলে আমি মনে করি। সরকার চাইলে পরিবহন মালিকদের এ ব্যাপারে বাধ্যও করতে পারে। ক্যামেরা থাকলে এমনিতেই ঘটনাগুলো কমে আসবে, তারপরও যদি তেমনটা ঘটে তাহলে ক্যামেরার ফুটেজের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করে গণপরিবহনে যৌন হয়রানি রোধ করা সম্ভব। মালিক যে চালক এবং হেলপার নিয়োগ করলেন তাদের বায়োডাটা রাখতে হবে। একটা ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরি করে সব গণপরিবহনের সব চালক-হেলপারদের নামঠিকানা সরকারের কাছেও থাকতে পারে।

এ ছাড়া গাড়িগুলোকে ইতোমধ্যেই ডিজিটাল নম্বরপ্লেট দেওয়া হয়েছে, তাই এখন চাইলেই তাদের একটা ট্র্যাকিংয়ের মধ্যে নিয়ে আসা যায়। অর্থাৎ ডিজিটাল বাংলাদেশের যে সুফল সেটা যদি গণপরিবহনের ক্ষেত্রেও নিশ্চিত করা যায় তাহলে এই যৌন হয়রানি বন্ধ করা সম্ভব।

আরও একটা সমস্যা হচ্ছে, পরিবহনে কোনো নারী যৌন হয়রানির শিকার হলে তিনি কোথায় অভিযোগ করবেন ঠিক বুঝে উঠতে পারেন না। এজন্য মোবাইল কোর্ট সক্রিয় করা উচিত। রুট অনুযায়ী মোবাইল কোর্টের ফোন নাম্বার গণপরিবহনের প্রকাশ্য স্থানে লিখে রাখতে হবে। আর মালিকদের উচিত হবে বাসের কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া, মোটিভেশন প্রোগ্রামের ব্যবস্থা করা।

ফেমাসনিউজ২৪/আরআর/আরইউ