logo

বুধবার, ২৩ মে ২০১৮ | ৯ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৫

header-ad

যৌন হয়রানি রোধে উত্তরা ইউনিভার্সিটি দৃষ্টান্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক | আপডেট: ২৬ এপ্রিল ২০১৮

ঘড়িতে তখন ১২টা ৫৩ মিনিট। গত রোববার বাড্ডা লিংক রোড থেকে নিজের ক্যাম্পাসে যেতে তুরাগ পরিবহনের একটি বাসে ওঠেন উত্তরা ইউনিভার্সিটির এক ছাত্রী। তখন বাসে ৭-৮ জন যাত্রী ছিলেন। কিছুক্ষণ পর নতুন করে যাত্রী ওঠানো বন্ধ করে দেয় বাসটির হেলপার ও ড্রাইভার। একসময় বাসটি প্রগতি সরণিতে গেলে যাত্রীশূন্য হয়ে যায়। তখন বাসের হেলপার দরজা আটকে সেই ছাত্রীর পাশে বসে তাকে টেনেহিঁচড়ে পেছনের সিটের দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। এ অবস্থায় ওই ছাত্রী গাড়ি থেকে নামার চেষ্টা করলে হেলপার দরজা বন্ধ করে দেয়। এ সময় ওই ছাত্রী জোর করে বাস থেকে নামতে চাইলেও সেটি দ্রুত চলতে থাকে। একপর্যায়ে সেই ছাত্রী জীবনের মায়া ত্যাগ করে চলন্ত গাড়ি থেকে লাফ দিয়ে নেমে পড়েন। অন্য একটি বাসে চড়ে ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসে এসে বন্ধুদের কাছে সব খুলে বলেন। এ ঘটনায় যৌন হয়রানির প্রতিবাদ জানানোর জন্য অভিনব পথ বেছে নেন শিক্ষার্থীরা। দায়ীদের গ্রেপ্তার দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের রাস্তায় নেমে তুরাগ পরিবহনের গাড়ি আটক করতে শুরু করেন তারা। তারা মোট ৩৫টি তুরাগ বাস আটক করে রাখেন। শিক্ষার্থীরা এসব বাসে কোনো প্রকার ভাঙচুর করেননি, নিয়মমাফিক থানায় জিডি করেছেন। সারা রাত তারা এ বাসগুলো নিজেরাই পাহারা দিয়েও রাখেন।

সেই রাতে উত্তরা পূর্ব থানায় মালিকপক্ষের সঙ্গে আলোচনায় বসেন শিক্ষার্থীরা। এসময় তারা অভিযুক্ত বাসচালক ও সহকারীকে পুলিশে দেওয়ার দাবি করেন। মালিকপক্ষ সময় চাইলে সেটি প্রথমে নাকচ করে দেন শিক্ষার্থীরা। পরে উত্তরা পূর্ব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নূরে আলম সিদ্দিকীর হস্তক্ষেপে শিক্ষার্থীরা তুরাগ পরিবহনের মালিকপক্ষকে সোমবার বিকাল পর্যন্ত সময় বেঁধে দেন। এই সময়ের মধ্যে যদি মালিকপক্ষ অভিযুক্ত বাসচালক ও হেলপারকে পুলিশে সোপর্দ না করে তবে শিক্ষার্থীরা কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেন। ওই রাতেই এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ছাত্রীর পরিবারের পক্ষ থেকে গুলশান থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়।

গুলশান থানা পুলিশ গত সোমবার বিকালে ঢাকার সায়েদাবাদ থেকে সেই ছাত্রীকে নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত বাসের ড্রাইভার, হেলপার ও কন্ডাকটরকে আটক করে। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ ও ভুক্তভোগী ছাত্রীটির মাধ্যমে তাদের শনাক্ত করা হয়। অভিযুক্তরা আটক হওয়ায় সোমবার রাতেই আন্দোলন স্থগিত করে বাসগুলো পুলিশের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়।

তাদের আটকের পর আদালতে হাজির করে এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গুলশান থানার উপপরিদর্শক (এসআই) তাপস ওঁঝা সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন করলে ঢাকার মহানগর হাকিম গোলাম নবী প্রত্যেকের তিন দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিমান্ড মঞ্জুর হওয়া তিনজন হলো তুরাগ পরিবহনের ওই বাসের চালক রোমান, তার সহযোগী নয়ন ও মনির।

এ ঘটনাটির পর সবাই এখন অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করছেন। বিগত কয়েক মাসে চলন্ত বাসে একা পেয়ে টাঙ্গাইলের মধুপুরে আইডিয়াল ল’ কলেজের ছাত্রী রূপাকে ধর্ষণের পর হত্যা করে পরিবহন শ্রমিকরা। এ ঘটনায় জড়িতদের শাস্তি হলেও গণপরিবহনে থেমে নেই ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির ঘটনা। গত কয়েকদিনে চলন্ত বাসে ইডেন কলেজের এক ছাত্রীকে যৌন নিপীড়ন, ধামরাইয়ে পোশাক শ্রমিক ধর্ষণের মতো ঘটনাও ঘটেছে।

সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতি কতটা উদ্বেগজনক সাম্প্রতিক এক জরিপেও তার কিছুটা আভাস মিলেছে। ওই জরিপে বলা হয়, দেশে গণপরিবহনগুলোতে ৯৪ ভাগ নারী যাত্রী মৌখিক, শারীরিক ও যৌন নিপীড়নের শিকার হন। নিপীড়িতদের অধিকাংশই প্রতিবাদ করেন না আরও হয়রানি হওয়ার ভয়ে।

অনেকে মনে করছেন, উত্তরা ইউনিভার্সিটির ছাত্রীকে যৌন নিপীড়নের ঘটনাটিও আরও অনেক ঘটনার মতো ধামাচাপা পড়ে যেতে পারত। কিন্তু মেয়েটি এর প্রতিকার চেয়েছেন এবং উত্তরা ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাধ্যমে এক অসাধারণ নজির স্থাপন করেছেন।

এ প্রসঙ্গে উত্তরা ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীকে যৌন নিপীড়নের ঘটনায় প্রতিবাদকারী ছাত্রপরিষদের সমন্বয়ক পারভেজ হোসেন জানান, ‘উত্তরা ইউনিভার্সিটির ছাত্ররা দেখিয়ে দিয়েছেন, ভাঙচুর এবং জনদুর্ভোগ সৃষ্টি না করে কীভাবে শান্তিপূর্ণ উপায়ে আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায় করা যায়। আমরা কাউকে আঘাত করিনি। গাড়ি ভাঙচুর করিনি। আমাদের দাবি গুরুত্ব দিয়ে পুলিশ সহযোগিতা করেছে। আমরা কাউকে নাজেহাল করিনি। বাসে যৌন হয়রানির প্রতিবাদে এ ধরনের সফল কর্মসূচির কারণেই চালক ও তার সহযোগীরা গ্রেপ্তার হয়েছে।’

এমন শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের নজির সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ সর্বত্র ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে।

ফেমাসনিউজ২৪/আরআর/আরইউ