logo

মঙ্গলবার, ১৯ জুন ২০১৮ | ৫ আষাঢ়, ১৪২৫

header-ad

ইথোফেন ও কার্বাইড ক্ষতিকর নয় আমে

নিজস্ব প্রতিবেদক | আপডেট: ২৬ মে ২০১৮

ফলমূলে মেশানো রাসায়নিক আসলেই ক্ষতিকর নাকি স্রেফ কৃত্রিম ভীতি? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফল পাকাতে বা তার পচন রোধ করতে ফলের গায়ে রাসায়নিক প্রলেপ প্রদান বিশ্বস্বীকৃত। আমেরিকা বা রুশ প্রেসিডেন্টের টেবিলে যে তরতাজা আপেলটি হাসি ছড়িয়ে বসে থাকে তার জেল্লার রহস্য ওই রাসায়নিকই। কিন্তু সে রাসায়নিক মানবদেহের উপযোগী ইথোফেন।

ফলমূলে নির্দিষ্ট মাত্রার ইথোফেন ব্যবহার আইনসিদ্ধ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উন্নত বিশ্বে দ্রুত পাকাতে এবং সংরক্ষণ করতে ইথোফেন চেম্বারে রাখা হয় ফলমূল। আপেল, নাশপাতি, আঙ্গুর, মাল্টাসহ যত বিদেশি ফল বাংলাদেশে আমদানি হয় তার সবগুলোতেই ইথোফেনের প্রলেপ দেওয়া আছে। ইথোফেন চেম্বারে না রাখলে বরং ফলগুলো রপ্তানিযোগ্যতা হারাবে।

আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত রাসায়নিক ইথোফেন যখন বাংলাদেশের ফল ব্যবসায়ীরা ব্যবহার করছেন, সে ক্ষেত্রে তাদের ওপর নেমে আসছে আইনের খড়গ। ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়ে নষ্ট করে দিচ্ছে হাজার হাজার মণ ফলমূল। জেল-জরিমানা করা হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া ম্যাজিস্ট্রেটসহ দায়িত্বশীল সরকারি কর্মকর্তা বলছেন, ফলে ইথোফেন, কার্বাইড, ফরমালিনসহ ক্ষতিকারক রাসায়নিক মেশানোর কারণে জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়ছে। তাই তারা হাজার হাজার মণ ফল ধ্বংস করছেন আর এর সঙ্গে জড়িতদের জেল-জরিমানা করছেন।

গত কয়েকদিন রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে কয়েক হাজার টন আম বুলডোজার চালিয়ে নষ্ট করা হয়েছে। সর্বত্রই প্রচারণা চালানো হচ্ছে- ক্ষতিকারক রাসায়নিক মিশ্রিত ফল খাওয়া থেকে যেন সাধারণ মানুষ নিজেদের বিরত রাখেন। মানুষের মধ্যে এ নিয়ে বেশ কয়েক বছর ধরে প্রচণ্ড ভীতিও শুরু হয়েছে। বাজার থেকে কিনে মৌসুমি ফল খাওয়াই ছেড়ে দিয়েছেন অনেকে।

সম্প্রতি দেশের পুষ্টি গবেষক, কৃষিবিদ এবং রসায়নবিদরা বলছেন, ফলমূলে মেশানো রাসায়নিক পদার্থ ইথোফেন, কার্বাইড এমনকি ফরমালিনও দীর্ঘসময় ধরে ফলমূলে থাকে না। ফলে ফরমালিন দিয়ে ফলমূল-শাকসবজি তাজা রাখা হয় বলে যে প্রচারণা চালু আছে তার কোনো ভিত্তি নেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন ফলমূল ও শাকসবজিতে ফরমালিন কাজই করে না। এ ছাড়া আমসহ অন্যান্য ফলমূলে প্রাকৃতিকভাবেই ফরমালিন রয়েছে যা মানুষের জন্য ক্ষতিকর নয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন আতঙ্ক সৃষ্টি করে আসলে দেশি ফলের বাজার নষ্ট করা এবং বিদেশে আমাদের ফল সম্পর্কে বিরূপ ধারণা দেওয়ার জন্যই স্বার্থান্বেষী মহল এ ষড়যন্ত্র করছে। তবে কতটুকু মাত্রার রাসায়নিক ইথোফেন, কোন পদ্ধতিতে কার্বাইড বা অন্যান্য রাসায়নিক পদার্থ ফলমূলে মেশানো উচিত এ ব্যাপারে যথাযথ ধারণা বা প্রশিক্ষণ দেওয়া উচিত সংশ্লিষ্ট চাষি, খামারি ও ব্যবসায়ীদের-এমনই মত বিশেষজ্ঞদের।

বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, ইথোফেন হলো ২ ক্লোরোইথেন ফসফরিক এসিড, যা একটি প্লান্টগ্রোথ হরমোন। পরিপক্ব ফল পাকাতে এবং সংরক্ষণে এর ব্যবহার সারা পৃথিবীতে স্বীকৃত। বিভিন্ন মাত্রায় (২৫০-১০০০০ পিপিএম) ইথোফেন পরিপক্ব কাঁচা আমে স্প্রে করার ২৪ ঘণ্টা পর এর উপস্থিতির মাত্রা নির্ণয় করতে গিয়ে গবেষকরা দেখতে পান, ইথোফেনের অধিকাংশই দ্রুত ফলের উপরিভাগ থেকে উড়ে যায়। যেটুকু অবশিষ্ট থাকে তা নির্ধারিত গ্রহণযোগ্যতা মাত্রার (এমআরএল-২পিপিএম) অনেক নিচে নেমে যায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের পরিচালক নাজমা শাহীন বলেন, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করে নির্দিষ্ট পরিমাণের রাসায়নিক ব্যবহারের মাধ্যমে ফল পাকানো বিশ্বস্বীকৃত। পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই এভাবে ফল পাকানো হয় এবং বাজারজাত করা হয়।

তিনি বলেন, বিশ্বস্বীকৃত রাসায়নিকের মধ্যে ইথোফেন সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। কারণ ইথোফেন ব্যবহার করে ফল পাকালে ভোক্তার কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকে না। সাধারণত ইথোফেন ব্যবহার করার মাত্রা ও সময়সীমা নির্ধারণ করা থাকে। ইথোফেন এমন এক ধরনের গ্যাস যা ফলের ভেতরের এনজাইমকে প্রভাবিত করে যার ফলে দ্রুতবেগে ফল পাকে। বিশেষ করে আম ও কলার ক্ষেত্রে ইথোফেন ব্যবহারে কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকে না।

অধ্যাপক শাহীন বলেন, ইথোফেনের বৈশিষ্ট্যই এমন যে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ফল ক্রেতার হাতে যাওয়ার আগেই এই রাসায়নিক গ্যাস উড়ে যায়। যদি ফলে ইথোফেন থেকেও যায় তাতেও ক্ষতির কোনো সম্ভাবনা নেই কারণ ফলের খোসা ছাড়িয়ে ভেতরে রাসায়নিকের প্রভাব পৌঁছে না। আমরা নিশ্চয়ই আম ও কলার খোসা খাই না।

সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) সম্প্রতি এক কর্মশালায় উপস্থিত বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, জানা-বোঝার ঘাটতির কারণেই দেশে মণকে মণ আম নষ্ট করা হচ্ছে। তারাও বলেছেন- ফলমূলে ইথোফেন ব্যবহার কোনোভাবেই অনিরাপদ বা ক্ষতিকর নয়। অপরিপক্ব আম ইথোফেনের মাধ্যমে পাকানো হচ্ছে এটা ঠিক, তাই বলে গুদাম থেকে বের করে হাজার হাজার মণ আম নষ্ট করে ফেলার কোনো অর্থ হয় না। এসব অপরিপক্ব আমে স্বাদ গন্ধ ও পুষ্টির পরিমাণ স্বাভাবিক পাকা আমের চেয়ে কম থাকে তবে সেগুলো খাওয়া যাবে না এমন তো নয়। উপরন্তু অভিযান চালিয়ে এরকম আম-কলা ধ্বংস করার ফলে দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং জনমনে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে।

বিএফএসএ-এর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মাহফুজুল হক বলেন, আইনে ফল পাকাতে নির্দিষ্ট মাত্রায় ইথোফেন ব্যবহার বৈধ। তবে কার্বাইড ব্যবহার বৈধ নয়। অপরিপক্ব আম পাকানোর দায়ে ব্যবসায়ীদের জরিমানা করা যায়, সাজা দেওয়া যায় কিন্তু ফল ধ্বংস করা উচিত নয়। তিনি বলেন, কার্বাইড (ক্যালসিয়াম কার্বাইড) দিয়ে পাকালেও ফলে এর অবশিষ্টাংশ বা রেসিডিউ থাকে না। তাই কার্বাইডও ক্ষতিকর নয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ইকবাল রউফ মামুন বলেন, আম পাকার সময় প্রাকৃতিকভাবেও ইথোফেন তৈরি হয়। এদেশে ফলমূলে কার্বাইড ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে, আমরাও কার্বাইড ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করি কারণ যিনি কার্বাইড প্রয়োগ করেন, তার স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা থাকে। কিন্তু ফলে কার্বাইড ব্যবহার ক্ষতিকর নয়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ড. শাহ মনির বলেন, স্বার্থান্বেষী মহল জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টির জন্য এসব বলে। মনে রাখতে হবে, ফলমূল ও শাকসবজিতে ফরমালিন কাজ করে না। এ ছাড়া আমসহ ফলমূলে প্রাকৃতিকভাবেই ফরমালিন রয়েছে যা মানুষের জন্য ক্ষতিকর নয়।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের পরিচালক (পুষ্টি) ড. মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, ইথোফেন ও ফরমালিন দুটিই ফল পাকানোর জন্য ব্যবহৃত হয়। দুই রাসায়নিকই ফলমূল ও শাকসবজিতে নির্দিষ্ট পরিমাণে ব্যবহার ক্ষতিকারক নয়। তবে আম বা অন্য ফল চাষিরা যেন নির্ধারিত মাত্রায় ইথোফেন ব্যবহার করতে পারেন এবং পুষ্ট কাঁচা ফল বিশেষ করে আমে ব্যবহার করতে পারেন সে বিষয়ে প্রশিক্ষণ দান ও ব্যাপক প্রচারের ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন কৃষি বিজ্ঞানীরা।

ফেমাসনিউজ২৪/আরআর/আরইউ