logo

শনিবার, ২৩ জানুয়ারি ২০২১ | ১০ মাঘ, ১৪২৭

header-ad

বড় দুর্ঘটনা ঘটলেই টনক নড়ে

ফেমাসনিউজ ডেস্ক | আপডেট: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার আগে টনক নড়ে না কর্তৃপক্ষের। তবে রাজধানীর নিমতলীর ভয়াবহ ঘটনার পরও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি কর্তৃপক্ষ। নিমতলীর ভয়াবহ ঘটনার ৮ বছর পর আবার চকবাজারে ঘটলো নির্মম ঘটনা। এতটি বছর কেটে গেল শুধু পরিকল্পনা করতেই। নিমতলীর ঘটনার যথাযথ ব্যবস্থা নিলে চকবাজারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতো না।

রাজধানীর পুরান ঢাকার অবৈধ রাসায়নিকের গুদাম ও দোকান জনজীবনের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আবাসিক ভবনে এসব কারখানা গড়ে তোলায় প্রায়ই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছে মানুষ। এ জন্য পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো এসব কারখানা বন্ধে বারবার আহবান জানিয়ে আসছে।

অপরিকল্পিত নগরায়ন ও ঘিঞ্জি পরিবেশে ভবনের ফাঁক গলে চলাফেরায় স্বাচ্ছন্দ্যভাব নেই। সর্বস্তরে বৈধ-অবৈধ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের আধিক্যে আবাসিক মান বজায় রাখতে পারেনি পুরান ঢাকা। তাই মৃত্যু এসে হানা দেয় বারবার। ছোট-বড় দুর্ঘটনা সেখানকার নিয়তি যেন। কোনো একটি দুর্ঘটনা ঘটলেই টনক নড়ে সংশ্লিষ্টদের, জনসচেতনতা কিছুদিন, তারপর সব ভুলে বিপন্ন মানবতা।

পুরান ঢাকার অলিগলিসহ প্রধান প্রধান সড়কে যুগ যুগ ধরেই গড়ে উঠেছে রাসায়নিক পণ্যের বৈধ-অবৈধ গুদাম। সেসব গুদাম নিয়ে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর এক হিসাব, আর নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোর অন্য হিসাব। বাস্তবিক অর্থে কারো সাথে কারো হিসাবের মিল নেই। হিসাবের দুস্তর ফারাকের মধ্যেই বৈধ-অবৈধ রাসায়নিকের গুদাম নিয়ে বছরের পর বছর বাণিজ্য করছে সুবিধাবাদীরা।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) এক গবেষণায় দেখা গেছে, পুরান ঢাকায় রয়েছে ২৫ হাজার কেমিক্যাল গোডাউন বা রাসায়নিক পণ্যের গুদাম। এসবের মধ্যে ১৫ হাজার আছে খোদ বাসাবাড়িতেই। মাত্র আড়াই হাজার গুদামকে ট্রেড লাইসেন্স দিয়েছে সিটি করপোরেশন। বাকি ২২ হাজারের বেশি গুদামই অবৈধ। ২০০ ধরনের ক্ষতিকর ও ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিকের ব্যবসায় চলে সেসব গুদামজুড়ে।

জানা গেছে, পুরান ঢাকার বিভিন্ন আবাসিক ভবনের নিচতলার পার্কিং স্পেস ব্যবহৃত হচ্ছে রাসায়নিক গুদাম হিসেবে। কিছু বাড়িতে রাসায়নিক পণ্যের কারখানাও আছে। ২০১০ সালের ৩ জুন পুরান ঢাকার নিমতলিতে রাসায়নিক গুদামের অগ্নিকাণ্ডেনের প্রাণহানি ঘটেছিল। দগ্ধ হয়েছে আরো শতাধিক মানুষ। এ ঘটনার পর নিমতলি থেকে কিছু গুদাম ও কারখানা সরানো হলেও পুরান ঢাকার অন্য এলাকা থেকে খুব বেশি সরেনি।

পুরান ঢাকার এসব গুদামে রয়েছে গ্লিসারিন, সোডিয়াম অ্যানহাইড্রোস, সোডিয়াম থায়োসালফেট, হাইড্রোজেন পার অক্সাইড, মিথাইল ইথাইল কাইটন, থিনার, আইসোপ্রোইলসহ ভয়ঙ্কর রাসায়নিক দাহ্য পদার্থ। এসব রাসায়নিক সামান্য আগুনের স্পর্শ পেলেই ঘটতে পারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা। ফলে পুরান ঢাকার মানুষ মৃত্যুঝুঁকি নিয়েই বসবাস করছেন।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমকে বলেছেন, ২০১০ সালে পুরান ঢাকার নিমতলীতে অগ্নিকাণ্ডে ১২৪ জন নিহতের ঘটনা থেকে আমরা কোনো শিক্ষা নিইনি। এ কারণেই চকবাজারের ঘটনাটি ঘটলো।

বুধবার রাতে চকবাজারের অগুনে এখন পর্যন্ত ৮১টি জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে, যার মধ্যে নারী ও চার শিশু রয়েছে।

উল্লেখ্য, ২০১০ সালের ৩ জুন পুরানো ঢাকার নিমতলীর একটি মহল্লায় বড় ধরনের আগুনের ঘটনা ঘটে। সেই আগুনে প্রাণ হারান ১২৪ জন।

এদিকে রাজধানীর পুরান ঢাকায় কোনও ধরনের দাহ্য পদার্থ ও কেমিক্যালের গোডাউন থাকতে দেয়া হবে না বলে জানিয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র সাঈদ খোকন। তিনি বলেছেন, এসব গোডাউন উচ্ছেদের জন্য কঠোর থেকে কঠোরতর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

বৃহস্পতিবার পুরান ঢাকার চকবাজারে আগুন লাগার ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তিনি।

সাঈদ খোকন বলেন, বেলা সাড়ে ১২টার দিকে উদ্ধার কার্যক্রম সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। তবে ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট ঘটনাস্থলে থাকবে। তারা ঘটনাস্থল দেখভাল করবে। আগুনে এখন পর্যন্ত ৭০ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৪১ জন। এর মধ্যে ৩২ জনকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের তালিকা করে প্রয়োজনীয় সাহায্য-সহযোগিতার ব্যবস্থা করা হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে এ উদ্ধার কাজ পরিচালনা করা হয়েছে।

তিনি বলেন, আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে যোগাযোগ করার জন্য একটি ফোন নাম্বার দেয়া হয়েছে (০২৯৫৫৬০১৪)। এছাড়া ঘটনাস্থলে পাশে যে চকবাজার থানা সেখানেও ক্ষতিগ্রস্তরা যোগাযোগ করতে পারবেন। স্থানীয় সিটি করপোরেশনের অফিস আছে, সেখানেও যোগাযোগ করা যাবে।

সাঈদ থোকন বলেন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে পুরান ঢাকার কেমিক্যাল গোডাউন উচ্ছেদের জন্য গত সোমবার থেকেই মোবাইল কোর্ট পরিচালনা শুরু করা হয়েছে। আগুন লাগার ঘটনার সাত-আট দিন আগে এফবিসিসিআইয়ের মাধ্যমে কেমিক্যাল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে একটি বৈঠকও করা হয়েছিল। তারপর থেকে আমরা উচ্ছেদ অভিযান শুরু করি। আমাদের আগে থেকেই উচ্ছেদ অভিযান চলছিল। কিন্তু অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলো। কেরানীগঞ্জে একটি জায়গায় শনাক্ত করা হয়েছে, সেখানে গোডাউনগুলো স্থানান্তর করা হবে।
ফেমাসনিউজ২৪/এফএম/এমএম