logo

বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২০ | ৩০ আষাঢ়, ১৪২৭

header-ad

স্থাপত্যের নান্দনিক আবেদন ইটে খোঁজা পণ্ডশ্রম

সেজুল হোসেন | আপডেট: ২৭ অক্টোবর ২০১৭

কবিতা কি এতই সহজ যে- হালকা কাচের চশমা দিয়ে পড়ে ফেলবেন? কবিতা কি কাগজে ছাপা খবর কোনও, পড়লেই খবর জানা হয়ে যাবে? কবিতা নিয়ে আজকাল সহজ-সরলীকরণের হাস্যকর চেষ্টা দেখি। ভালো-মন্দ, সহজ-কঠিন, শ্লীল-অশ্লীল, উচিৎ-অনুচিৎ, পুরুষবাদী-নারীবাদী বিচার-মাপকাটিতেও কবিতাকে হাজির করা হচ্ছে! জীবনানন্দ যখন বলেন, ‘কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে’। তখন নিশ্চয় কেউ কেউ বলবেন- হৃদয় কি মাটির ঢিবি বা কোনও পাথরখনি যে খোঁড়াখুড়ি করা যায়? যারা কবিতার অন্তর্নিহিত সত্যকে উপলব্ধি করতে পারেন না, তারাই কেবল এই জাতীয় প্রশ্ন তুলে নিজের বোধহীনতার পরিচয় দেন।

একটা কবিতা কতখানি কড়া নাড়ছে আপনার মনে, কতটুকু স্পর্শ করছে আপনার বোধ, সেটাইতো বিচারের মাপকাটি হওয়া উচিৎ।

কিন্নর রায় বলেন, ‘কোনও স্থাপত্যের নান্দনিক আবেদনকে যেমন ইটের মধ্যে খোঁজ করাটা এক ধরনের পণ্ডশ্রম, তেমনি কবিতার আবেদনকে শুদ্ধ শাব্দিক বিশ্লেষণে কিংবা বাক-প্রতিমার মাঝে খুঁজতে যাওয়াও এক ধরনের ব্যর্থ প্রয়াস।’

কোনও কবিও বাধ্য না কিংবা কমিটেড না যে, তিনি পাঠকের পছন্দ-অপছন্দ বিচার-বিবেচনাকে মাথায় রেখে আরামদায়ক কবিতা লিখে যাবেন। বলি- কবিতা যদি আপনাকে পড়তেই হয়, পড়ার ওই সময়টাতে হৃদয়টাকে সঙ্গে রাখুন আর ডিজিটে ভরা মাথাটা খুলে রাখুন অন্য কোনও খানে।

কবিতার অন্তর্গত হবার যোগ্যতা অর্জন করতে কবির মতোই কাঠখড় পুড়াতে হয় পাঠককেও। জীবনটাকে নানা ভঙ্গিতে নেড়ে চেড়ে দেখবার যোগ্যতা থাকা চাই। আরও চাই সত্যিকার কবির মতো, পাঠকেরও জীবন সম্পর্কে নিজস্ব কিছু জিজ্ঞাসা।

এক মার্কিন মহিলা কবি বলেছিলেন- কোনও বই পড়ে যদি মনে হয় তার শরীর এতো ঠান্ডা হয়ে গেছে যে আর কোনো আগুনেই তার শরীর তাপ ফিরে পাবেনা বা তার মাথাটি ছিঁড়ে উড়ে গেছে শরীর থেকে তখন তিনি বুঝেন জিনিসটি কবিতা।

বলছি না যে, আজকাল ‘প্রকাশসহজ’ এই ইন্টারনেট বাজারে কোনও কবিতা চেষ্টাকে আপনি কবিতা বলবেন। এত কবিতা-গল্প উৎপাদন হচ্ছে, ভালো শব্দ, ভালো পংক্তি যা আপনাকে বসা থেকে দাঁড় করিয়ে দেবে, ঝাঁকুনি দেবে, সেইসব কবিতা খুঁজে পাওয়াও মুশকিল।

শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় বলতেন, ‘কবিতা লিখতে আসা একটা ম্যারাথন দৌড়; এখানে স্পিন্টাররা কী করে ঠিকবে?’ এই ম্যারাথন দৌড়ে অক্লান্ত এক প্রতিভা মুহম্মদ ইমদাদ। সমকালে কোনও তরুণ কবিকে ঈর্ষা করতে ইচ্ছে হয় জানতে চাইলে, চোখ বন্ধ করে যার নাম আসে। তুখোড়, শক্তিমান এক কবিপ্রতিভা।
সম্প্রতি খেয়াল করলাম দুয়েকজন তার একটি কবিতার শাব্দিক ব্যখ্যা করে বেশ ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। তাদের জন্য করুণা।

মুহম্মদ ইমদাদ-এর একটি কবিতা:

‘আকাশে সার্চ লাইট ধরে আমি তারা দেখতে চেয়েছিলাম বলে বিশ্বব্যাংক আমারে নেয়নি। তারা ভেবেছে আমি ফাঁস করে দেব বিটন উডস ষড়যন্ত্র। পরিসংখ্যার পরিবর্তে পাখি পালনের অপরাধে বালিকারা ফর্সা পুরুষের হাত ধরে চলে গেছে উত্তর আমেরিকার দিকে। এক হাতে তুষার ঝড়, আরেক হাতে দাবানল নিয়ে তারা ছুটে গেছে হুনূলুলু, লাসভেগাস...! তারা বিশ্বাস করেনি, সার্চ লাইটের আলোতে আসা পাখিদের প্রতি গুলি করা লোকগুলোরে আমি ক্ষমা করতে পারি না। তাই পাখিদের কবরস্থানে আমি দারোয়ান। গাছ লাগাই যেন পাখিগুলো শিকড় বেয়ে পৌঁছতে পারে ডালে।

আমি মাটির ভেতর হাত ঢুকিয়ে একটা কমলালেবু, সো মিলের করতের গায় একটা পেয়ারাফুলের রক্ত এবং যেকোনো পানিতে মাছের বাড়ি খুঁজে পেয়েছিলাম বলে আমারে নেয়নি কোনো বিবাহ উৎসব। ডিমের ভেতর থেকে ডানাকে উদ্ধারের অভিযোগে আমারে ধরে নিয়েছে বাজার অর্থনীতি। আমি এখন কোথায় থাকি আমার আত্মা জানে না। চেনা কোনো গাছের কাছে যাবার ইচ্ছা নিয়ে আমি হয়তো চিরতরে পড়ে আছি ব্যবহৃত সভ্যতার স্তূপে, সূর্যালোক পৌঁছে না। আমার কপালে একটা কাক বসে রোজ আমি তারে চিনে বলে মনে করি, সে বিশ্বাস করে না।’

ফেমাসনিউজ২৪/আরইউ