logo

সোমবার, ২৫ মে ২০২০ | ১১ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৭

header-ad

লোক কবি শাহেনশাহ্ ও তাঁর গান

বঙ্গ রাখাল | আপডেট: ৩০ ডিসেম্বর ২০১৭

লোকসংগীত শিল্পীরা তাদের অভিজ্ঞতা আর চিন্তা ভাবনায় সামাজিক দৃশ্যমান কিংবা অদৃশ্যমান চিত্রকেও সংগীতের অনুষঙ্গ বানিয়ে তাদের সৃষ্টি সম্ভারকে আরো শাণিত করেন। সংগীত সৃজন হয় একজন শিল্পীর বাহ্যিক জগতের কোলাহল, অন্ধকার বা স্তব্ধ জীবনকে ভেঙে নতুনভাবে সৃজন করার প্রত্যাশায়। ‘স্বচিনপুরে অচিন পাখি’ সংগীত গ্রন্থটির রচয়িতা গীতি কবি শাহেন শাহের এই গ্রন্থটি পাঠান্তে আমার মনে হয়েছে- তিনি গভীর তত্ত্বকথা অতি সহজ সরল আর ইন্দ্রিয় কিংবা অতীন্দ্রিয় বিষয়কে নানামুখী ব্যাখ্যায়িত উপমা প্রয়োগে, নিজস্ব এক সত্যানুসন্ধানী হয়ে বোধের জাগরণ কিংবা সমন্বয়ের এক অনুঘটক হয়ে বহুরূপ ধারণ করেছেন। যার চাক্ষুষ প্রমাণ মেলে তার প্রতিটি সংগীতের পরতে পরতে।

১.

নূর নবীর মাদ্রাসায় দাখিল হলে সরলে-
মেরাজের পুঁথি খানা দেয় অন্তরে।
আওলাদে-রাসুল আমার মুর্শিদ চাঁদ্রে।।

মেরাজের বয়ানে, পাক্জাতের শানে-
রণে বনে ধ্যানে জ্ঞানে করে মাস্তানা।
পাকেতে পাক্পাঞ্জাতন,
যে তনে সাঁই নিরাঞ্জন-
এ ছাড়া অন্য পড়া পড়ায় না অন্তরে।।

ইশারায় লেখা পড়া, নিশানাই দৃষ্টি করা-
আদমের দমের পথে করাই পাহারা।
চোর ছেড়ে ধর সাধু,
তার ভিতরে দীনু বন্ধু-
এ ভব সিন্ধু বন্ধু নিবে ত্বরা-তরে।।

দয়াল তাকালে বদনে, পলক রয় পিছনে-
আঁকা বাঁকা পথে রথে করে রওয়ানা।
কিছুতেই না যায় ধরা,
ভক্তিতে পাগল পারা।
শাহেনশাহর ভক্তি যোগ আর হলো না কপালে।।

২.

কবে হবে আমার-
মনের মত মন।।
যে মনেতে বসত করে-
সাঁই নিরাঞ্জন।

মন জ্যোতি মন গতি
মন বুদ্ধি বল,
এ ধনাতে জমা থাকে রে-
রম সম্বল।
ষোল আনা তবিল খানায়-
মুনা মহাজন।।

ষোল আনা, তবিল হলে
ভরির হিসাব হয়-
আশি ভরি দীন মুজুরী
তবিলে জমা রয়।
চারি দশে দিন সমীপে-
মনে মন ওজন।।

ওজন শেষে, ভিশন বাঁশে
হয় রে শোভাময়-
শাহেনশাহ্ কয় সে লগন বুঝি
এ কপালে নাই।
আমি কবে হবো সু-মনের ‘মা’-
জনমের মতন।।

৩.

এ কি করিলি এক কলস দুগ্ধে-
গো-চোনা মিশেলি।।
সাঁই এর দীল দরিয়া-
বিষে বিষেলি।

আসমান জমিন পাহাড় পর্বত-
নারাজ হয় বিধির শর্ত,
উড়ে এসে জুড়ে নিলি-
বে-খেয়ালী।।

সামনে পেয়ে মানের চাঁপান-
মাথায় নিলি সমানে-সমান,
খাবিনে তা মাখালি কেন-
বে-সামালী।।

মান হারালি কালিদায়,
হুশ হারালি বে-হুশের ন্যায়,
শাহেনশাহ্ কয় নিক্তির কাঁটায়-
মন তুই জুয়াড়ী।।

৪.

যার মন যেমন সে হয় তেমন।।
(ওরে) করণে কারণ খতিলে-
খেতাবধারী মহাজন।

হয়ে স্রষ্টার সেরা সৃষ্টি-
স্বভাব রভাব তোমার কৃষ্টি,
(ওরে) নিথর-পনা, ইতর-পনা-
মূলের ঘরেই আয়োজন।।

রহিম রহমান পতিত পবন-
মন তোমাতেই পাই নিদর্শন,
(ওরে) গুণ বিচারে, পাই তোমারে-
ক্বাহারু রূপেই বিরাজন।।

মন হয়েছে মনের মত-
তুমি হও তার অনুগত,
(ওরে) শাহেনশাহ্ কয়, নিত্য সত-
কর যোজন বিয়োজন।।

৫.

মা’তনে বা’তন খবর।।
জ্বলে রূপের বহর,
বহে নূরের নহর,
মন করে দেখ বারেক নজর।

দেখা যায় দেখানো যায় না-
শোনা যায় শোনানো হয় না,
মন নিকেতনে, প্রেম নিবেদনে-
চমক প্রমদে নাজুক অহর।।

বামে ঈড়া, ডানে পিঙ্গল-
শুষম্মায় লও নাওয়ের খৈয়াল,
সুফলা ফলে সোজা পথ হলে-
অধরা চাঁন্দের নিশীর প্রহর।।

উলু বনে মুক্তা বুনলে-
ফল হবে না কোন কালে,
শাহেনশাহ্ কয় বে-জাতি হলে-
কাল্ জ্বরায় জ্বরবে গতর।।

৬.

এ প্রেম সবাই জানে।।
যে প্রেমের প্রেমিক যারা,
নয়ন দেখলে যায় রে চেনা।
সদায় থাকে রূপনগরে-
স্বরূপ সাধনে।

প্রেমে বিভোর প্রেয়শীর মন,
প্রিয় রূপে আত্মগোপন-
কামিনী কানন।
যার প্রেমে সে দিশেহারা-
ভরা মৌবনে।।

আমি থাকলে আছো তুমি,
তুমি নাই কিসে গো আমি-
প্রেমো বৃন্দাবনে।
যার বনে সে বনমালী-
থাকে আনমনে।।

কার প্রেমে কে বা পড়ে,
কাকের বাসায় রয় কোকিলে-
পিউ-কাহা টানে।
শাহেনশাহ্ কয় বাইশ ফেরা-
ভারী যৌবনে।।

৭.

পিও কাহা স্বভাব তোমার
ওগো পরোয়ার।।
পরোবাসে পর উদাসে-
জনমে-জনম সমাহার।

স্বভাবের অভাব তোমার
হয় নি কোন কালেও.
চিত্ত অঙ্গনে নিত্যানন্দে
প্রেমো রঞ্জন ফলাও।
সুসময়ে সুপরিচয় হয় অবতার।।

শৈলি কুঞ্জে সুখ বসন্তে
প্রেমো গুঞ্জনে-
কুহু কুহু মহু মহু
ভরা ফাল্গুনে।
মুখ’বাণী সুধা’খানি ঝরে অনিবার 

৮.

স্বচিনপুরে অচিন পাখি,
অচিন্ত্য তাঁর প্রকৃতি।
বল (মন) পাখির আকৃতি।।

নিত্য পাখির দয়াল স্বভাব,
পাখিটির হয় কিসের অভাব?
চরে দিবা-রাতি?
ভূ-মণ্ডল কি নভঃমণ্ডল,
সবই পাখির কারু-কীর্তি।।

তরু-লতা কী বৃন্দাবন,
কোন বনে নাই নিদর্শন!
এমন কোন স্মৃতি!
কত ফান্দুয়ালা ফন্দিয়া হায়!
শূন্যতে ফাঁদ ভর্তি।।

বানাইয়া দোদুল্য দোলনা,
বসে সদায় খেলছে খেলনা,
আকার প্রকার নি-সুরতি।
আজো বুঝি নাই তার মতি-গতি।
শাহেনশাহ্ তাই ক্ষুৎ-নিপতি।।

৯.

কি সাধনে এলিরে মন,
এমন দেশে ভেসে ভেসে।।
নীরে ক্ষীরে সরোবরে-
আকার সাকার হলো শেষে।

একদিন মন তুই ঘুম গভীরে,
কাঁটালি দিন আরশি পরে।
ঠেকিল দায় স্বভাবের তোড়ে-
রাখি নিয়ে অপ্রকাশে।।

লোহিত কার অন্তপ্রদেশ,
প্রাণবন্ত সবারই রেশ।
রণাঙণে সংঘাত অবশেষ-
আসে কি সাঁই সাধু বেসে।।

মরুয় ধারা পাতাল গামী,
না হয় মন সে উর্ধ্ব গামী।
সিদ্ধিলে পাই অন্তর যামী-
শাহেনশাহ্ রয় নিকাশে।।

১০.

হিসাব না জানিলে মন কী?
অংক কষা হয়।
যোজন ধারায় ওজন করে,
জেনে নিতে হয়।

১লা’তে অক্ষর চেনা,
২য়’তে বানান করা।
দেখ ৩য়’তে গড়ন-গড়া,
মন জান কী অতিশয়।।

চতুর্থে হয় ভিন্ন বিষয়,
পঞ্চমে সারাংশ গর্ভাশয়।
ষষ্টের ষষ্টি হয় মধুময়,
সাতের রঙ আলপনায়।।

অষ্টমে আটি বান্দা,
নবমে দেখ নব গঙ্গা।
এক শূন্যে এক-দশে,
পদ ধারী হতে হয়।।

শূন্যতে অপূর্ণতা ভরা,
সেঁথায় দেখি দারুণ খরা।
শাহেনশাহ্ কয় গুরুর করুণায়,
শূন্যতা যদি পূর্ণতা পায়।।

১১.

গগণ গামী পবন সখা,
করিয়া যাও মোরে নিথর।।
তুমি অতি আপনের আপন,
ভুলেও করিনি যতন।
ওগো অভিমানি, ও প্রাণ সজনী
খুঁজে নিলে কি ইথর।

স্বভাবের অভাব তোমার
হয় নি কোন কালে,
আন্মনে দিয়ে গেলে,
সদায় সমান তালে।
ওগো নিরুদ্দেশি পর-উদাসী-
পরের তরে কর বিতর।।

যে বিধাতা সঁপিয়াছে মোর
এমন নীতি মালা,
ঐ বিধাতাই গড়িয়াছেন,
এই সাধের পান্থশালা।
শখা, তোর’ই কার্য হবে উজ্জ
আমার হবে ফিতর।।

১২.

সঙ্গ র্সা পাগল মন।।
না র্সালে, ওরে ন্যাড়ে-
পার পাবি না আ-জীবন।

পহেলা লও নয়া-চাঁদের খবর-
তার পরে আর পড়ে না নজর,
পূর্ণমাসে পূর্ণিমাতে, ওরে-গেড়ে,
কর পূরণ চাঁদের ঐ-কিরণ।।

ছয় লগ্নে ছয় রাগ্ প্রবাহ
পঞ্চ গুণে রাগিনীর সমাহ,
পূরণ কর অহরহ, ওরে ধ্যাড়ে,
আগে কাল পিছে ঐ-সমন।।

ক্ষীত অব তেজ মরুৎ ব্যোম-
পঞ্চদানে হয় মা-আযম,
শাহেনশাহ্ কয় মা’আবাদে,
যম পুষিছো মন, আ-জীবন।।

১৩.

পরম-বন্ধু আমার পরোয়ার।।
নিরবধি, নিবাসী হয়ে-
(তুমি) মোরে কর ভবপার।

দেহ মন এক পূর্ণ ঘটি,
-এতে জগৎ পরিপাটি।
র্সা স্বরূপে সারাবেলা-
অনিত্যের মাঝে চরাচর।।

ভবে অফুরন্ত ভোগ্য পণ্য,
তাতেও হয় না অভাব পূর্ণ।
চাতকীনির মত প্রায়-
চেয়ে থাকি অনিবার।।

পরম প্রেমে প্রেমাস্পদ,
পর ভাবনায় অভিসম্পাত।
শাহেনশার্হ ভাবের প্রপাত-
তব চরণে বারে বার।।

১৪.

কি বলি তাঁর রূপের কথা।।
যে রূপে সাঁইর সখা সখী-
রাঙা চরণে নত মাথা।

দেখিলে রূপ স্বরূপ হারায়,
অতি বাসনা জড়িত রয়।
অরূপে রূপ ভুরি ভুরি-
রংমহলে আছে গাঁথা।।

আলে-আলম আলমপনা,
সহজে কি যায় তা জানা।
স্বরূপে তাঁর আনাগোনা-
গুণলো কতক গুণী মাথা।।

ওরূপ স্মরণে সতের সতী হই,
স্মরণ বিনে পতি মারা যায়।
শাহেনশাহ্ কয় বিষম বিষয়-
ভাবিতেই মোর ঘোরে মাথা।।

১৫.

ধারণ কর রহম মনে-
তবে ধর্মের ধার বুঝিবে।
অধরা হলে জনমে-
তাতে ফল না ধরিবে।।

ধরণীকে ধার করিয়ে-
ব্যাপার কর সকল দিয়ে।
লেনা-দেনা না চুকিয়ে-
পড়বি বিপদে।।

ধ’তে ধ্বনি র’তে রহিম-
ম’তে আছে সেই তো মুবিন।
ধর্ম কথাটি সে দিন-
বুঝতে পাবে।।

ধর্ম ধর্ম করে মরি-
আপন ঘরেই ভরি-ভরি।
শাহেনশাহ্ কয় তার তদারি-
কর সু-মনের পদে।।

১৬.

কেউ সাজিয়া রূপের পাগল,
আবার কেউবা ভবের পাগল হয়।
প্রেমের জন্য যে জন পাগল-পাগল তারে কয়।।

ভবে পিতা-মাতা পাগল হয়ে জন্ম দিল ভাই,
আদি পিতা-আদি মাতা তাঁরাও কম নয়।
বিধি পাগলের বদ্ধ পাগল-
পাগল বেশে ঘোরে সাঁই।।

পাগল হয়ে এই জগতে যত আউলিয়া,
দয়াল প্রেমে পাগল হয়ে ভব দেউলিয়া।
ওরে পাগলের পাগল পূঁজিয়া-
মূল পাগলের দেখা পাই।

নিজ সাধু সাজরে মন অন্যকে পাগল বলে,
চিন্তা করে দেখলে না মন পাগল বল কারে।
আমার জনম গেল পাগলামিতে-
আর এক পাগল ভেবে কয়।।

১৭.

তোমার রত্ন ভরা মালগাড়িটা
চলছে ধিকি-ধিকি।
জগৎ বেড়ে বারে-বারে-
ঘুরছে জাগায় ঠিকি,
চলছে ধিকি ধিকি।।

মাইল মিটার যায় না দেখা-
যায় না দেখা তেল,
মতির উপর গতি বাড়ে-
হায় রে মজার খেল,
ব্রেক করলে মন মহাজন-
থামবে গাড়ি আপনি আপন
এ জনমের লাগি।।

গাড়ি খানার এমন রীতি-
পরের করে এন্তেজার,
ভি আই পি তে বসে আছে-
অচেনা এক পেছেঞ্জার,
শাহেনশাহ কয় জনম ভরি-
বাঞ্ছা করি চিনবো তারই-
বেলা গেল বইকি।।

১৮.

মন রে তোর মন মন্দিরে-
মনের মানুষ বসত করে।
মনে মনে খোঁজ তাঁরে-
সে তোমার, যদি হও তাঁরে।।

খুলে দেখ না মনের কপাট,
সে আর তোমার নাইকো তফাত।
তোমার রূপে রূপ ধরে সে-
বসে আছে রূপনগরে।।

বাঁধ অবাঁধ প্রশান্ত মিলে,
বসত করে হৃদয় নীড়ে।
বুঝবি যখন তাদের লীলে-
কে আপন আর কে বা পরে।।

যাবি যখন শান্ত নীড়ে,
পরম শান্তি পাবি দীলে।
শাহেনশাহ্ কয় মানব কুলে-
বর্তমানেই ফল যে ধরে।।

ফেমাসনিউজ২৪/আরইউ