logo

সোমবার, ২৫ মে ২০২০ | ১১ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৭

header-ad

রবীন্দ্রনাথ ও আমাদের সাংস্কৃতিক জটিলতা

হায়াৎ মামুদ | আপডেট: ০৭ জানুয়ারি ২০১৮

১.

জীবন যেন বহতা নদী। তো শুধু দু’কূলের শাসনে নিয়ন্ত্রিত জলধারা নয়। নদী মানে জলের স্বভাব, তার পটভূমি ও জলতলের মৃত্তিকা-চরিত্র, জলের গভীরতা, বর্ণ, চতুষ্পার্শের ভূসংস্থান এবং নিসর্গদৃশ্য সমস্ত কিছুই। জীবনও তেমনি জড়িয়ে থাকে কোনো না কোনো জনগোষ্ঠীর জন্ম, মৃত্যু ও তার মধ্যবর্তী কালপরিধিতে তার আচরিত জীবনধারা নিয়ে। সংস্কৃতি ওই জীবনপ্রবাহের ভেতওে ধীরে ধীরে তৈরি হতে হতে এগিয়ে চলে নদীর মতোই। জল ছাড়া যেমন নদী নেই, জীবন বাদ দিয়ে কোনো সংস্কৃতি নেই; কিন্তু ওই জীবন কার? মানুষেরই তো। আর মানুষ বাঁচে সময়ে ও ভূগোলে। নির্দিষ্ট সময়ে ও ভূমিচিহ্নিত সীমানায় তার অবস্থান তার জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে বলে সেটাই তার জীবনীশক্তি, যার বলে সে ক্রমেই বেড়ে ওঠে। যেন কোনো বৃক্ষের বেড়ে ওঠা- পরিণত হয়, ডালপালার উন্নীলন ও পুষ্পের প্রস্ফুটনে সে ধীরে ধীরে নিজের বৈশিষ্ট্য ও চারিত্র্য অর্জন করে। এই প্রক্রিয়া জটিল বলেই সংস্কৃতির চরিত্রও জটিল এবং প্রক্রিয়াটির মধ্যেই চলিষ্ণুতা আছে বলে কোনো জনগোষ্ঠীর যে বিশালায়তন ক্রিয়াকা-কে আমরা সংক্ষেপে ‘সংস্কৃতি’ নামে চিহ্নিত করি, তার ধমনিতে একটা গতিশীলতা থেকেই যায়। আর ওই অন্তর্নিহিত গতির আবেগ ও প্রবাহের কারণেই আমরা যে যা-ই মনে করি না কেন, ‘সংস্কৃতি’ কোনো অনড়, কালনিরপেক্ষ, ভূগোলনিরপেক্ষ, অপরিবর্তনক্ষম ঘটনা নয়; মনুষ্যজীবনের মতোই সে সর্বদা সপ্রাণ ও জঙ্গম। একক ব্যক্তি বা সম্মিলিত জনগোষ্ঠীর মতোই সংস্কৃতিরও চাওয়া-পাওয়া আছে, আশা-আকাক্সক্ষা আছে, ব্যর্থতা ও আশাভঙ্গও আছে। সেজন্যই পৃথিবীর সয জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতির ক্ষেত্রে যেমন, তেমনই বাঙালি সংস্কৃতির বেলায়ও সার্বিক বিচারে সংস্কৃতি প্রসঙ্গ নিরতিশয় জটিল; তাই এর সরলীকরণ সম্ভব নয়।

বাঙালির সংস্কৃতি কোনো সরল ও একরৈখিক ব্যাপার যে হতে পারে না, তা বোঝার জন্য বেশি দূর যেতে হয় না। নতুনভাবে কোনো প-িতি গবেষণারও প্রয়োজন নেই; কেবল দুটি মৌলিক বিষয় বিবেচনায় রাখলেই চলে- বাঙালির জন্মকাল ও স্বদেশভূমি। অর্থাৎ আমরা যারা বাঙালি তাদের প্রথম আবির্ভাব কখন এবং কোথায়? নিজের জন্মপরিচয় অনুসন্ধান যেমন ব্যক্তিমানুষের আদি জিজ্ঞাসা, তেমনি জনগোষ্ঠীর অপরিহার্য কৌতূহল নিঃসন্দেহে। দেখতে পাবো, প্রাগার্য একটি জাতি কয়েক হাজার বছর কত অজস্র রকমের বিচিত্র ঘটনাপ্রবাহের ভেতরে যেতে যেতে আজ এমন এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, যখন তার একটি অংশকে ভাবতে হচ্ছে- এতদিন পরেও সে কে বা তার পরিচয় কী? বাঙালি জাতির এই অংশটির নাম ‘বাঙালি মুসলমান’। বিগত শতাধিক বছরের ওপরে বাঙালি মুসলিম এই একটি অত্যন্ত মৌলিক প্রশ্ন নিয়ে বিড়ম্বিত হয়েছে- বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয় কী? প্রশ্নটি নিশ্চয়ই হাস্যকর; কেননা এর উত্তর তার নিজেরও জানা যে, সে বাঙালি এবং সে মুসলমান। তথাপি হাসির উদ্রেক না করে এই প্রশ্ন আমাদের যে ভাবায়, তার কারণ হলো- কোনো জনগোষ্ঠীর মনে বিনা কার্যকারণে এমন প্রশ্ন দেখা দিতেই পারে না। সেই কার্যকারণের সম্বন্ধসূত্রগুলো আমরা জানি, বহু গবেষক ও প-িত তা নিয়ে আলোচনা করেছেন। আত্মপরিচয়ের প্রশ্নে কোনো জনগোষ্ঠীর এহেন সংশয় ও হীনমন্যতাবোধ আছে কিনা জানি না, যেমন বাঙালি মুসলমানের আছে। বাঙালি মুসলিমের আত্মপরিচয়-জিজ্ঞাসা সর্বৈবভাবে সংস্কৃতিজিজ্ঞাসা। (অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে আমাকে বারবার ‘বাঙালি মুসলমান’ কথাটি ব্যবহার করতে হচ্ছে বলে আমি লজ্জিত। কারণ আমি জানি, বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে মুসলমান ছাড়াও হিন্দু, খ্রিস্টান ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা আছেন। তবু একমাত্র মুসলমান সমাজকেই প্রসঙ্গের কেন্দ্রবিন্দু করার কারণ, না বললেও চলে। তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও সেই প্রাবল্যের কারণে অন্য ধর্মাবলম্বী জনসংখ্যার ওপর তার আগ্রাসী শারীরিক ও মানসিক চাপ)। বাঙালি মুসলমানের সংস্কৃতি কী? এমন অদ্ভুত প্রশ্নের উত্তর খোঁজার দায় সব সময়েই থাকছে এজন্য যে, জনগোষ্ঠীর এক বিপুল অংশকে বহুকাল যাবত এ প্রশ্ন ভাবিয়ে তুলেছে এবং তারই উত্তর হিসেবে বাঙালি মুসলমান যেসব ক্রিয়াকা-কে নির্ভুল ও একমাত্র সত্য বলে বিভিন্ন সময়ে বিবেচনা করেছে, সময় ও ইতিহাস সেগুলো বারবার খারিজ করে দিয়েছে।

১৯৭১ সালের সংগ্রাম ও রক্তক্ষয়ের ভেতর দিয়ে যে নবীন দেশ আবির্ভূত হলো তার নাম যে ‘বাংলাদেশ’ হবে তা নিয়ে কারো মনে বিন্দুমাত্র সংশয় বা কোনো রকম ভাবনাচিন্তা কারো মাথায় আসেনি। তার কারণ আত্মরক্ষা ও স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার ওই প্রাণপণ সংগ্রামে বাঙালি হিসেবে একত্মবোধই যদি একমাত্র প্রাণশক্তি হয়ে থাকে, তা হলে অর্জিত বিজয়ের নাম ‘বাংলাদেশ’ ছাড়া আর কীই-বা হতে পারত? সঙ্গতভাবেই আমরা ভেবেছিলাম, রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের আবির্ভাবই বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয় অনুসন্ধানের শেষ ও চূড়ান্ত ঐতিহাসিক জবাব। আমাদের নাম বাঙালি, দেশের নাম বাংলা এবং বহুজাতিক (নৃতাত্ত্বিক অর্থে) ও বহুধর্মীয় এই জনগোষ্ঠীকে যে ঐক্যসূত্র ‘বাঙালি জাতি’তে রূপান্তরিত করেছে, তার নাম বঙ্গ সংস্কৃতি। দুর্ভাগ্য এই যে, ‘বাংলাদেশ’ হওয়ার পরও পুরনো প্রশ্ন বিভিন্নভাবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেখা দিচ্ছে এবং আমাদের জীবৎকালে মনুষ্যজন্মের যে সার্থকতা ‘বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠায় আমরা উপলব্ধি করেছিলাম, সে সুকৃতিকে ওই প্রশ্ন আজ উপহাস ও ধ্বংস করার জন্য উন্মুখ। এ ঘটনা বেদনার ও লজ্জার অবশ্যই; কিন্তু দুষ্টবুদ্ধিদের চক্রান্ত বলে ব্যাপারটিকে উড়িয়ে দিতে আমার হৃদয় ও যুক্তিবোধ সায় দেয় না। কারণ যা-ই হোক, এ কথা মানতেই হবে যে, আমাদের ন্যায় ও সত্য ওদের মনে আমরা প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি। যারা চক্রান্তপরায়ণ তারাও যে আমাদেরই লোক, অর্থাৎ বাঙালি, এ-ও ভুললে চলবে না। অনেক পরিশ্রমে যে অঙ্ক কষে ‘বাংলাদেশ’ নামে উত্তর পাওয়া গেছে ওরা আবার সেই অঙ্ক কষতে চায় কেন? অন্যতম কারণ নিশ্চয় এই যে, অঙ্কটি আমরা বোঝাতে পারিনি। বোঝানোর উপায় হচ্ছে- নিজের সংস্কৃতিকে অনুধাবন করা, ঠিক ঠিক শনাক্ত করা এবং সেভাবে অন্যকে চেনানো, বোঝানো।

আমি বাঙালি- এই পরিচয় যদি সত্য হয়, তাহলে আমার সংস্কৃতিও বাঙালি। অনেকের চিন্তায় যে বিভ্রান্তি আসে, তার কারণ সব সংস্কৃতির জটিলতার মতোই বঙ্গসংস্কৃতি জটিল বলে। সেজন্যই বঙ্গসংস্কৃতির বাহ্যিক চেহারা ও অন্তর্গত মৌলিক গড়ন সজ্ঞানে ও সচেতনভাবে অনুধাবন করা প্রয়োজন। বাঙালি মুসলমান যে দোলাচলচিত্ততার শিকার শতাধিক বছর ধরে হয়ে এসেছে, সেই বিভ্রান্তি ঘুচিয়ে তাকে স্থিরপ্রতিষ্ঠ হতে হলে জ্ঞান ও চিন্তার পথ ধরেই আজ অগ্রসর হতে হবে। এ ছাড়া বিকল্প কোনো পন্থা নেই; কারণ ভাবের পথ বেয়ে অতিসহজেই যেখানে যাওয়া যেত, আমরা স্ব-আরোপিত মূঢ়তায় সে দরজা বহু পূর্বেই বন্ধ করে দিয়েছি।

২.

বাঙালির বাস যে ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে (রাষ্ট্রিক সীমানা নয়) সেটাই তাদের আদি বাসভূমি- এই সত্য সর্বাগ্রে স্মরণ রাখা জরুরি। বাঙালি এ রকম কোনো জাতি নয়, যাকে বহিরাগত বলা যাবে। একটি প্রতিতুলনায় ব্যাপারটি স্পষ্ট করা যাক- মার্কিন জাতির আদি বাসভূমি আমেরিকা নয়; যে যে জনগোষ্ঠী আজ সম্মিলিতভাবে মার্কিন জাতিসত্তায় একীভূত হয়েছে, তারা সবাই বহিরাগত। বাঙালি ওই রকম কোনো জাতি নয়। আমাদের পিতৃপুরুষের দল এই ভূমিরই আদি বাসিন্দা ছিলেন, অর্থাৎ আমরা এই ভূমি থেকে উদ্ভূত। এমন নয় যে, এ মাটিকে আমাদের নিজের করে নিতে হয়েছে। আর্য-আগমনের পূর্বে এই ভূখ-ে আমরা বাঙালিরাই ছিলাম। তার পরের সময়ের প্রবাহে আর্য এসেছে তাদের জীবনধারা নিয়ে, এসেছে হিন্দু। ধর্মমত বোঝাচ্ছি না, বলতে চাইছি বাংলার বাইরে ভারতীয় আবার ধর্মকে বাদ দিয়েও নয়, বাঙালি সংস্কৃতির চেহারা হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান নির্বিশেষে সব বাঙালির চিত্তলোকে সদা প্রস্ফুটিত থাকা প্রয়োজন।

বাঙালির সংস্কৃতি মানে বাংলা ভাষা, বাঙালির সামাজিক আচরণ ও জীবনধারার পদ্ধতি, ধর্মাচার, আবহমানকালের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার এবং রবীন্দ্রনাথ।

৩.

যে কোনো জনগোষ্ঠীর নাড়ির বন্ধন যে একক সূত্রে গাঁথা হয়, তার নাম ভাষা। মনে রাখতে হবে, ভাষা কোনো নিরাশ্রয়ী শব্দপুঞ্জ নয়; ভাষা মানেই হচ্ছে দেশ ও কালের সীমানায় আবদ্ধ জনগোষ্ঠীর অস্তিত্বের বাক্সময় প্রকাশ। এর ফলে যে কোনো জাতির জন্ম ও বিকাশের লক্ষণাবলি ভাষা তার শরীরে ধারণ করে থাকে। বিভিন্ন নরগোষ্ঠীর বর্ণসাংকর্যে যে বাঙালি জাতি গড়ে উঠেছে, তার নিয়ন্ত্রক ধর্মবিশ্বাস এজন্যই নয়, কেননা ধর্মের ভিন্নতা বিভাজনরেখাই শুধু প্রতিষ্ঠা করে।

ধর্ম নয়, যা সবাইকে একতাবদ্ধ করে তা হলো দেশের ভূগোল। ভূগোল অর্থ দেশের সামগ্রিক ভূপ্রকৃতি ও নিসর্গবিন্যাস। মানুষকে বেঁচে থাকতে হয় জীবনধারণের জন্য পরিশ্রমে, অর্থাৎ মাটিকে নিয়ে; আমাদের ক্ষেত্রে, জলকে নিয়েও। তার মানে- জীবনধারণের সমপদ্ধতি এবং তৎসম্পৃক্ত যাবতীয় ক্রিয়াকা- ও কল্পনা-মেধা একটি জনগোষ্ঠীকে এক পঙ্ক্তিতে বসায়; এই বাস্তব অবস্থাই যে কোনো জাতির একমাত্র নিয়ামক শক্তি। বাঙালি সংস্কৃতির মূল কাঠামো তৈরি হয়েছে বাংলার কৃষিভিত্তিক ও নদীনির্ভর সমাজে এবং বাঙালির স্বভাব-চরিত্র তথা তার আবেগপ্রবণতা, কল্পনাবিলাস, অভিমান, সহিষ্ণুতা ও ক্ষমাপ্রবণতা- সবকিছুই তার আবাসভূমির ভৌগোলিক সংস্থানের দান। এ ক্ষেত্রে ধর্মের প্রভাব, অন্তত ইসলাম ধর্মের প্রভাব, নিতান্তই অল্প। এমন একটি ধর্ম, যার উৎপত্তিস্থল মরু অঞ্চলে, তাকে বর্ষাপ্লাবিত তৃণশ্যামল ভূমিতে রোপণ করে ফলবতী বৃক্ষের আশা করতে হলে নতুন জায়গার জলমাটিকে স্বীকার করে নিতেই হয়। আউলিয়া-দরবেশ যারা এ দেশে এসেছিলেন বা থেকে গেছেন তারা তা জানতেন। বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে ইসলামের কোনো সংঘাত তাই অতীতে কখনো ঘটেনি; বাঙালি মুসলমানকে কখনো ভাবতে হয়নি, তারা ‘বাঙালি’ না ‘মুসলমান’। তারা জেনে এসেছে তারা বাঙালিও বটে আবার মুসলমানও বটে। মুসলমান হতে গেলে বাঙালি থাকা যায় না- এই অযৌক্তিক চিন্তা অত্যন্ত সাম্প্রতিককালে বিগত শখানেক বছর ধরে, বাংলার মাটিতে সুকৌশলে ধীরে ধীরে ছড়ানো হয়েছে। এই আমদানি উত্তর ভারতের। মুসলমান হতে গেলে সত্যিই বাঙালি থাকা যায় না, যদি সে ‘মুসলমানের’ অর্থ হয় উত্তর ভারতের মুসলমান। একই সঙ্গে উত্তর ভারতীয় ও বাঙালি- উভয়ই তো হওয়া সম্ভব নয়। অর্থাৎ বাঙালিত্ব ও মুসলমানত্বের বিরোধের কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই; সবটুকুই কল্পনাপ্রসূত সমস্যা। ভারতবর্ষীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের আচরিত ধর্মানুষ্ঠান ও ধর্মচিন্তা আরবদের কাছ থেকে আসেনি, প্রধানত তা ইরানের দান এবং তারও দেহে বারবার কলি ফিরিয়েছে এ দেশের আদি হিন্দু-বৌদ্ধ সংস্কৃতি ও জীবনাচার- এ সত্য অস্বীকারে মিথ্যাকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়। গুরুবাদ ও পীরভক্তি, মিলাদ-মাহফিল ও কথকতা ইত্যাদির সম্পর্কসূত্র সবাইকে ভেবে দেখতে বলি। সমাধিকে কেন্দ্র করে ধর্মানুষ্ঠান কোন সংস্কৃতির দান? ইন্দোনেশীয় মুসলমানদের সংস্কৃতিতে রামায়ণের এত প্রবল প্রভাব কেন? হিন্দু নেপাল ভারতবর্ষের চেয়ে অন্য ধরনের হিন্দু কেন? ইত্যাকার সাংস্কৃতিক প্রশ্নাবলি বিবেচনা করা দরকার। বাঙালি মুসলমানদের বিবাহপদ্ধতির সঙ্গে বাঙালি হিন্দু বিবাহ অনুষ্ঠানের সাযুজ্য এবং ভারতবর্ষের অন্যান্য মুসলিম জনগোষ্ঠীর বিবাহাচারের সঙ্গে তার পার্থক্যও অনুধাবনযোগ্য বিষয়।

বাংলাদেশের অধিবাসী হিন্দু-মুসলিম-খ্রিস্টান-বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর দৈনন্দিন ও সামাজিক জীবনচর্চায় সাযুজ্যধর্মী সাধারণ উপাদানগুলোর একত্রিত রূপই বাঙালির সংস্কৃতি।

৪.

বাঙালি সংস্কৃতির বিবেচনায় রবীন্দ্রনাথ বাঙালির দেশ-সমাজ-ভাষা ইত্যাদির মতো বিশালায়তন প্রসঙ্গগুলোর সমকক্ষ একটি বিষয় বলে আমার ধারণা। তার কারণ শুধু এই নয় যে, কোনো জনগোষ্ঠীর মেধা ও যুগ-যুগান্তের মননশক্তি সংহত হয়ে যার মধ্যে প্রকাশিত হয়, বাণীনির্ভর সেই শিল্পকলার সর্বশ্রেষ্ঠ এক প্রতিভূ বাঙালি জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতিতে ‘রবীন্দ্রনাথ’ নামে আবির্ভূত হয়েছেন। বঙ্গসংস্কৃতির আলোচনায় রবীন্দ্রনাথ অপরিহার্য প্রসঙ্গ হওয়ার অন্যতম বা প্রধানতম কারণ এই যে, সাম্প্রতিককালের ‘বাঙালি’র তিনি নির্মাতা; বাঙালি সংস্কৃতির চেহারা তিনি নিয়ন্ত্রণ করেছেন এবং তার ভেতরে এসে বাঙালি সংস্কৃতি এক নির্দিষ্ট ও বিশিষ্ট মোড় নিয়েছে। বাঙালির সামাজিক আচরণে সুরুচির দীক্ষা রবীন্দ্রনাথের দান। বঙ্গরমণীর পোশাক-পরিচ্ছদের বিন্যাস তার এক ভ্রাতৃবধূ বাঙালিকে শিখিয়েছেন। সভা-সমিতি অনুষ্ঠান পরিচালন পদ্ধতি, জন্মোৎসব বা শোকসভা প্রভৃতি সামাজিক যৌথ কর্মের উপযোগিতা ও ব্যবহার আমরা রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকেই শিখেছি। ব্যক্তিগত ও সামাজিক আচরণে নান্দনিকতার সাধনা তিনি নিজে সারা জীবন যেভাবে করেছেন, সমগ্র বাঙালি জাতির সম্মুখে আজ তা উদাহরণ। বাঙালির জীবনধারা ও সমাজ-আচরণ, বৌদ্ধ, বহিরাগত মুসলমান ও খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী। আমরা গ্রহণ, বর্জন ও সংশ্লেষণ করতে করতে এগিয়েছি যেমন ইতিহাসের নিয়মে সব জনগোষ্ঠী পথ চলে। আমাদের সুদূর প্রাগার্য স্মৃতি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বাংলা ভাষার শব্দাবলিতে ও আমাদের জীবনাচরণের বহু কিছুতে। পরে সর্বাধিক দীর্ঘ সময় বাঙালি যে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিম-লে বাস করেছিল তা বৌদ্ধ। উত্তর বা দক্ষিণ ভারতীয় হিন্দু ধর্মাচার বঙ্গসমাজে কখনোই তেমন দৃঢ়মূল ও গভীরপ্রসারী হতে পারেনি। তারও পরে এসেছে ভারতের বাইরে থেকে এবং উত্তর ভারত থেকে মুসলমানের দল। ব্যাপক ধর্মান্তরীকরণ হয়েছে; কিন্তু ধর্মান্তরিতদের দৈনন্দিন ও সামাজিক ব্যবহার পূর্বাপর একই থেকে গেছে। তারপর এসেছে খ্রিস্টান ও ব্রাহ্ম ধর্ম ও জীবনাচার। বাঙালিত্ব এ সবকিছুর মিলনে নিজের মতো করে ক্রমে-ক্রমে গড়ে উঠেছে। মনুষ্যদেহের যেমন স্বধর্ম আছে, সেই ধর্ম অনুযায়ী দেহ-বহির্ভূত কোনো কিছুকে গ্রহণীয় মনে করলে সে গ্রহণ করে এবং আত্তীকরণ করে নেয়, আর বর্জনীয় যা তাকে কোনোক্রমেই গ্রহণ করে না, সংস্কৃতিও চলে এ জাতীয় স্বধর্মের আনুগত্য স্বীকার করে। বাঙালির কোনো ক্ষতি ইসলাম করেনি। গোলমাল বেধেছে তখনই, যখন বাঙালি মুসলমান ‘অন্যদের মতো’ মুসলমান হতে চেয়েছে। আমরা কখনোই ভেবে দেখি না, একজন বাঙালি হিন্দুর সঙ্গে উত্তর বা দক্ষিণ ভারতীয় হিন্দুর তফাত কতখানি, কিংবা বাঙালি বৌদ্ধের সঙ্গে বর্মি কি চীনা-জাপানি বা মঙ্গোলিয়ার বৌদ্ধের পার্থক্য। বাঙালি মুসলিম ও ইন্দোনেশীয় মুসলমানের প্রতিতুলনা অথবা ইরানি ও আরবীয় মুসলমানের পার্থক্য কি আমরা একবারও চিন্তা করে দেখি? কখনো কি ভেবেছি আফ্রিকার মুসলিম ও খ্রিস্টান জনগণ ইউরোপ ও এশিয়ার মুসলমান বা খ্রিস্টানদের থেকে কোথায় কতখানি আলাদা এবং তার কারণ কী? আমরা কজন জানি যে, বাঙালি হিন্দু রমণীরা শুভকর্মে যেভাবে উলুধ্বনি দেন, অমন উলুধ্বনি ছাড়া লিবীয় মুসলমানদের কোনো সামাজিক শুভ অনুষ্ঠান সম্পন্নই হয় না? সবাই কট্টর মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও আরব জগতের রাষ্ট্রগুলো সর্বদাই এ ওর বিরুদ্ধে ছুরি শানাচ্ছে কেন? এসবের পশ্চাৎপ্রেক্ষাপটে কারণটি যা-ই থাকুক, সমস্ত ঘটনাই মৌলিক একটি সত্য প্রতিষ্ঠা করে দিচ্ছে- ধর্ম কোনো জাতিসত্তার একমাত্র নিয়ামক কখনোই হতে পারে না। বাঙালির সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশটি যখন থেকে ভাবতে শুরু করেছে যে, একমাত্র ধর্মকে নিয়ে তারা বাঁচবে বা বাঁচা উচিত, তখন থেকেই তার বুদ্ধিভ্রংশতার শুরু। ধর্ম যে কোনো সংস্কৃতিরই প্রান্তিক উপাদান মাত্র, একমাত্র বা সর্বশ্রেষ্ঠ উপাদান কখনোই নয়- এই সরল সত্য তার স্মরণই হয় না। অংশ যখন সমগ্র অপেক্ষা অধিক আয়তন ও ভার দাবি করে তখন সমগ্রের ভারসাম্যহীনতায় যে বিপত্তি ও অনাসৃষ্টি অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে, বাঙালি মুসলিম দীর্ঘকাল তার মধ্যে আবর্তিত হচ্ছে। এসব কারণেই শুধু ধর্ম নয়, সংস্কৃতি যে কৃষিভিত্তিক তিনি তা অনুধাবন করেছিলেন বলে বিভিন্ন ঋতু-উৎসবের প্রবর্তনায় আমাদের সামাজিক উৎসবাদির ভেতরে সেগুলো গ্রথিত করতে পেরেছিলেন। এভাবে অজস্র সামাজিক কর্মসাধনায় তিনি স্বজাতির মনন ও কল্পনাকে উদ্দীপিত করে গেছেন।

রবীন্দ্রনাথ যে ব্রাহ্ম ছিলেন আমরা তা মনে রাখি না। ব্রাহ্মেরা নিরাকারবাদী। এ দেশে ধর্মের অপব্যাখ্যাকারীরা রবীন্দ্রনাথকে নস্যাৎ করতে গিয়ে এই তথ্য ভুলে যান। এমনিতে রবীন্দ্রনাথের ব্রাহ্মত্ব মনে রাখা জরুরি নয়; কিন্তু যারা ধর্মকেই ‘একমাত্র সংস্কৃতিচিহ্ন’ হিসেবে মনে করেন, তারা ভুলে যান কী করে?
বাংলাদেশে ১৯৮৯ সালেও আমাদের সংস্কৃতির স্বরূপ অন্বেষণ ও তার মধ্যে রবীন্দ্রনাথের আসন বিবেচনা করে যে দেখতে হচ্ছে, তার চেয়ে বিড়ম্বনাময় ও মূঢ় পরিস্থিতি পৃথিবীর কোনো সভ্য জাতির ক্ষেত্রে কখনো ঘটেছে বলে জানি না। আমাদের সামাজিক নানা কর্মের যিনি স্থপতি আমাদের জীবনে তার অবস্থান যে ভেবে দেখতে হচ্ছে, এ ঘটনার মধ্যেই লজ্জা আছে। এমনই দুর্ভাগা দেশ যে, আমরা লজ্জিত হতেও ভুলে গেছি।

ফেমাসনিউজ২৪/আরইউ