logo

সোমবার, ২৫ মে ২০২০ | ১১ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৭

header-ad

স্বপ্নময় এক দীপনপুরের মিতা আলী

মাহতাব শফি | আপডেট: ১৮ জানুয়ারি ২০১৮

জঙ্গি হামলায় নির্মমভাবে খুন হওয়া জাগৃতি প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী ফয়সল আরেফিন দীপন একজন আলোকিত মানুষ। ভালোবাসতেন দেশকে, ভালোবাসতেন বই। দীপনের সেই ভালোবাসার স্বপ্নটা বাঁচিয়ে রাখতে রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডে প্রতিষ্ঠা করা হয় অত্যাধুনিক বুক শপ ক্যাফে ‘দীপনপুর’। দীপন আজ নেই, রয়েছে তার স্বপ্ন। দীপনের সেই স্বপ্নটাকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছেন বন্ধু ও স্বজনরা। তাদেরই একজন মিতা আলী।

পেশাজীবনে মিতা আলী একজন শিক্ষক। তিনি বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজ’-এ সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। বইপ্রেমিক এই মানুষটির জন্ম দিনাজপুরে। বাবা মোহাম্মদ আলী। মিতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ থেকে এমফিল ডিগ্রি অর্জন করে বর্তমানে একই বিভাগের অধীনে পিএইচডি গবেষণারত।

সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও রয়েছে তার সরব পদচারণা। বিশ্ববিদ্যালয়ের হল ও বিভাগের সাহিত্য ও সংস্কৃতি প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হওয়াসহ রয়েছে তার অনেক পুরস্কার। ছেলে সামিন, মেয়ে শেহরিন এবং স্বামী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খানকে নিয়ে মিতা আলীর একান্ত ভুবন।

মিতা লেখালেখি শুরু করেন সেই ছাত্রজীবন থেকেই। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রবেশ নিষেধ’। মিতা আলীর বিচরণক্ষেত্র শুধু কবিতার জগতেই নয়, লিখেন ছোটগল্পও। ইতিহাস-ঐতিহ্য বিষয়ে একাধিক গবেষণাপত্র জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। এতকিছু ছাপিয়ে তিনি একজন বইপ্রেমিক।

নৃশংসভাবে খুব হওয়া দীপনের স্মৃতি রক্ষার্থে তেমন কোনো উদ্যোগ নেই। কিন্তু দীপনপুরের মধ্য দিয়ে দীপনের স্বপ্নটা বাঁচিয়ে রাখতে চেষ্টা করে যাচ্ছেন তিনি ও বন্ধু-স্বজনরা। আগামী প্রজন্ম যেন জানতে পারে তার কথা, তার আত্মত্যাগের কথা। সেই লক্ষ্যেই প্রতিষ্ঠা করেছেন নান্দনিক বুক শপ দীপনপুর।

মিতা আলী বলেন, ‘আমরা চাই দীপনের স্মৃতিটুকু আমাদের মাঝে অমলিন থাকুক। দীপনপুরে আড্ডায় দীপনকে নিয়ে গল্প হোক, দীপনপুরে আলো ছড়াক। দীপনপুরে এসে শত ব্যস্ততা আর শত জটিলতা থেকে বেরিয়ে কিছুটা আনন্দময় সময় কাটুক শহরবাসীর। মাঝে মাঝে তরুণরা পথ হারিয়ে ফেলে, তাদের আলো দেখাতে, একত্রিত রাখতেই এই আয়োজন।’

মিতা বলেন, ‘বাবার চাকরিসূত্রে দেশের প্রায় সব জায়গায় আমার শৈশব-কৈশোর কেটেছে। তবে আমার স্কুলজীবন নারায়ণগঞ্জ হাইস্কুল। কমরেড হেনা দাশ তখন প্রধান শিক্ষক ছিলেন। ওই স্কুলে বিশাল লাইব্রেরি ছিল, যা আমার খুব প্রিয় ছিল। সেই প্রিয়টা আজকের জায়গায় নিয়ে এসেছে। দীপনপুরে আমাদের তিনটা ভালোবাসা-দীপন, জলি আর বই। আমরা সুন্দর আলোকোজ্জ্বল একটা পৃথিবী চাই।’

কীভাবে এই বুক শপের চিন্তা এলো জানতে চাইলে মিতা বলেন, ‘দীপন মারা যাওয়ার পর আমরা দেখলাম আজিজ সুপার মার্কেটের নিচে ৪টা গোডাউনে বইয়ের স্তূপ। অনেক বই। বইয়ের ভারে সেলফও ভেঙে পড়েছে। এত বই কোথায় রাখবো-তা নিয়ে ভাবতে শুরু করলাম। জলিকে বললাম, চলো আমরা একটা কিছু করি। পরে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, দীপনের নামে একটা বুক শপ দেয়ার। জলি, আর্কিটেক্ট তারেক ও আমি সেদিনই সিদ্ধান্তটা ফাইনাল করে ফেললাম। কিন্তু টাকা নিয়ে একটু কষ্ট করতে হয়েছে। পরে জাহিদুর রহমান মিলনের সহযোগিতা অফিসটা পেয়ে যাই। তারপর আমরা প্ল্যান করে এই বুক শপটি প্রতিষ্ঠা করি।’

দীপনপুরকে নিয়ে পরিকল্পনার কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘দীপনপুরকে আমি অনেক দূরে নিয়ে যেতে চাই। নিউইয়র্কে আমাদের শাখা খোলার পরিকল্পনা আছে। দীপনপুর শুরু করেছি বেশিদিন হচ্ছে না। এতে অনেক সাড়া পেয়েছি। আমরা একটা আবেগের জায়গা থেকে এটা শুরু করি। আবেগটাকে বাস্তবে নিয়ে আসা এবং এটাকে দাঁড় করাতে একটু তো সময় লাগবেই। এখন পর্যন্ত আমাদের ২৪শ’ আইটেমের বই আছে।’

মিতা বলেন, ‘দীপন হত্যার বিচারটা এখনও হয়নি। বিচার হলে হয়তো কারণটা বেরিয়ে আসতো। যে গোষ্ঠিটা এ ধরনের নৃশংস কাজটা করেছে তাদের সম্পর্কে ভিডিতে দেখে একটা ধারণা পাওয়া যায় যে, পথভ্রান্ত কেউ। একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে, আমরা যদি তার কথা বলি, ওই তরুণ প্রজন্মটা কেন ওদিকে গেল। যে লোকটা দীপনকে মেরেছে তার বয়স কিন্তু বেশি না। কীভাবে সে পারলো দীপনের মতো একটা মানুষকে খুন করতে। আমরা চাই এমন ঘটনা যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে। ছোটরা যারা এখানে আসবে, তারা এখানে খেলবে, ছবি আঁকবে, গান গাইবে, কিছুক্ষণ ঘুরবে, তারা অন্য একটা দ্বীপে চলে যাবে, তাই দীপান্তর নাম দিয়েছি। যে দ্বীপটার মধ্যে কোনো অন্ধকার থাকবে না। আলোকময় দ্বীপ হবে। দীপনপুরে পুরো পরিবার আসতে পারবে।

অসংখ্য বই, প্রিয় মানুষের সাথে আড্ডা আর ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ দীপনপুরে এক ধরনের অভিজ্ঞতা দেবে। দীপনপুর নিছক একটি গতানুগতিক বইয়ের দোকান নয়। বইপড়া, ক্যাফে, বিশ্রাম, আড্ডা, অনুষ্ঠান সব মিলিয়ে ‘দীপনপুর’। বিশাল দীপনতলা, দীপান্তর, ক্যাফে দীপাঞ্জলি সবকিছুতেই দীপনের স্মৃতি মাখানো আছে। দীপনের টেবিল, ঘড়ি, চশমা, দীপনের দেখা প্রুফ, ব্যবহারের জিনিসপত্র ইত্যাদি। নেই শুধু দীপন। দীপনপুরের সর্বত্রই দীপনমাখা। সব মিলিয়ে এটি স্বপ্নময় এক বুক শপ।’

মিতা আলী বলেন, ‘বহুদিনের স্বপ্ন ছিল সুন্দর পরিবেশে একটি বইয়ের রাজ্য। যেখানে রাজ্যের সব বই থাকবে। থাকবে বসে বসে পড়ার সুযোগ। দীপনপুর হচ্ছে সে রকমই একটি বুক শপ। বইয়ের দোকানে গিয়েছেন বই কিনতে, সেখানে পেয়ে গেলেন বই পড়ার একটু নিরিবিলি জায়গাও। সাথে চা বা কফির কাপে চুমুক দেবার সুযোগ। এমন সব সুবিধা নিয়ে দীপনপুর।

দীপনপুর বইয়ের রাজ্য। বাংলাদেশের সব স্বনামধন্য প্রকাশনীর উল্লেখযোগ্য বইয়ের সমাহার এখানে। সব মানুষের পছন্দের বইটি কিনতে পারবেন এখান থেকে। এমনকি চা বা কফির সাথে বইটি বসে পড়তেও পারবেন। প্রয়োজনীয় বইটি খুঁজে না পেলে অর্ডার দিয়ে যাবেন, যথাসময়ে আপনার ঠিকানায় পৌঁছে দেবে দীপনপুরের কর্মীরা।’

মিতা বলেন, ‘অনলাইনেও অর্ডারের সুবিধা আছে। নতুন বইয়ের পাশাপাশি পুরনো বইয়ের মজুদও আছে দীপনপুরে। পাবেন নতুন চিত্রশিল্পীদের আঁকা ক্যানভাস। সব মিলিয়ে স্বপ্নময় এক বুক শপ দীপনপুর।’
‘দীপনপুর’ নামটা শুনলেই মনে হয় জায়গাটা এই ইট-কাঠের নগরী থেকে ঢের দূরে, হয়তো বা কোনো একটা নদীর ধারে নিরিবিলি একটা গ্রাম। সত্যি কথাটা হলো, দীপনপুর একদম ঢাকার পেটের ভেতরেই একটা জায়গা। বইয়ের পোকা যেসব মানুষ, তারাই দীপনপুরের প্রাণ।

সব ধরনের বই-ই পাওয়া যায় দীপনপুরে। এখানে আগত বইপড়ুয়াদের সুপারিশ, পছন্দ আর অপছন্দের ভিত্তিতে তাদের বইয়ের কালেকশন সবসময় পাল্টানো হয়। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত দীপনপুর প্রায় ২,৮০০ স্কয়ার ফিট জায়গা নিয়ে তৈরি।

দীপনপুর বইয়ের রাজ্য। ঢুকতে ডান কর্নারজুড়ে আছে শিশুতোষ বই। তেপান্তরের মাঠের মতো সবুজ ঘাসে ছাওয়া এই কর্নারে শিশুরা বসে বই পড়ছে, ইচ্ছে হলে বইয়ের পাতায় রঙ করছে। হৈ-হুল্লোড় করে বই পড়ার আনন্দ নিচ্ছে। দীপনপুরের এ কর্নারের নাম ‘দীপান্তর’। অন্তরে দীপনপুরের সুখস্মৃতি নিয়ে শিশুরা বড় হবে, আলোকিত মানুষ হবে- এ ভাবনা থেকেই এ উদ্যোগ।

তৈরি করা হয়েছে ছোট একটি মঞ্চ। যার নাম দেয়া হয়েছে ‘দীপনতলা’। ছোট পরিসরে প্রায় ৪০ জন মানুষ এখানে সাহিত্য আড্ডা দিতে পারবেন। যে কেউ চাইলে ভাড়া নিতে পারবে দীপনতলা। সাহিত্য আড্ডা, প্রকাশনা উৎসব, আলোচনা সভা, কবিতা পাঠের আসরের জন্য এ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সপ্তাহে শুক্র, শনিবার দু’দিন এখানে বসছে শিশুদের জন্য ছবি আঁকার স্কুল। আয়োজন হচ্ছে শিশুদের জন্য গল্প বলার আসর এবং বরেণ্য ব্যক্তিদের সঙ্গে শিশুদের মতবিনিময় সভা।

বই পড়ার আনন্দের সঙ্গে রসনাবিলাসজুড়ে দিতে দীপনপুরের অন্যতম অংশ ক্যাফে দীপাঞ্জলি। বই পড়া, গল্প-আড্ডার সঙ্গে আছে চা-কফি, জুস কিংবা হালকা খাবার। থাকবে ছোটদের জন্য বিশেষ খাবারের ব্যবস্থা। এছাড়া এতে আপনি পাবেন গ্রাম থেকে আসা খাটি গাভীর দুধ-ঘি। রয়েছে মধুসহ আরো বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী। বয়স্ক ব্যক্তিদের নিরিবিলি বেই পড়ার জন্য আছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সিনিয়র সিটিজেন কর্নার। সঙ্গে রয়েছে প্রার্থনা কক্ষ।

মিতা বলেন, ‘আমরা চাই গ্রাহকের প্রয়োজন মতো আরো সুযোগ সুবিধা যোগ করতে। সে জন্যেই রাখা হয়েছে একটি মন্তব্য খাতা। গ্রাহক তার মন্তব্য কিংবা পরামর্শ লিখে দিতে পারবেন সেখানে। চাইলে দীপনপুরকে আপন ভেবে, তার সাজানো ভাবনার কথা জানাতে পারবেন। দীপনের প্রতি তাদের ভালোবাসা ও মমত্ববোধের কথাও লিখতে পারবেন, যা আমরা সংরক্ষণ করে স্মারকগ্রন্থ’ লিপিবদ্ধ করে সবাইকে জানাতে পারবো। আমি চাই নতুন প্রজন্ম বই পড়ুক। তাদের বই পড়াতে শেখাতে পারলে আমরা মনে করব যে, এগিয়ে যাচ্ছি। এরকম আরো প্লাটফর্ম দরকার আছে।

দীপনপুরে কোনোরকমের এন্ট্রি ফি বা মেম্বারশিপের হ্যাপা পোহাতে হবে না। অন্যদের বিরক্ত না করে নিজে বসে বই পড়া যায় সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত। সপ্তাহের প্রতিটি দিন, এমনকি সব ছুটির দিনও। সকাল ১০টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত।’
ফেমাসনিউজ২৪/এফএম/এমএম