logo

বুধবার, ১৫ আগস্ট ২০১৮ | ৩০ শ্রাবণ, ১৪২৫

header-ad

ফাগুন হাওয়ায় আপনহারা-বাঁধনছেড়া প্রাণ

মাহতাব শফি | আপডেট: ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

‘ফাগুন হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান, আমার আপনহারা প্রাণ, আমার বাঁধনছেড়া প্রাণ’ বসন্তের এই উথাল-পাথাল উদাসি হাওয়ায় আজ ভেসে যায় বাঁধনছেড়া প্রাণ। আজ পহেলা ফাল্গুন। ফাগুনের রঙ হৃদয়ে এঁকে দেয় নিসর্গের অন্য এক অনুভূতি। একঝলক মিঠেল হাওয়া ভালো লাগার পরশ বুলিয়ে দেয় হৃদয়ের অলিগলিতে। পাতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা বসন্তের কোকিলের প্রথম গান মন ছুঁয়ে যায়, পাজর ভরে যায় শেষ বসন্তের ঘ্রাণে। জীবনের সব দুঃখ বেদনা, ক্লান্তি-শ্রান্তি ভুলিয়ে দেয় বাসন্তির দখিনা হাওয়া। ফুল ফুটবার এই পুলকিত দিনে কাননে কাননে পারিজাতের রঙের কোলাহলে চারদিক পরিপূর্ণ। কচিপাতায় আলোর নাচনের মতোই আজ বাঙালির মনে লেগেছে দোলা।

শীতের খোলসে ঢুকে থাকা প্রকৃতির স্পর্শে জেগে উঠেছে আজ পলাশ, শিমুল। গাছে ফাগুনের আগুন রঙের খেলা। ঝরা পাতার শুকনো নুপূরের নিক্কন, প্রকৃতির মিলনে প্রকৃতি সেজেছে মধুর বসন্তে। বসন্ত নিয়ে আসে পূর্ণতা। বসন্ত মানেই নতুন প্রাণের কলরব। বসন্ত মানেই একে অপরের হাত ধরে হেঁটে চলা। প্রকৃতির এই নান্দনিক মোহনায় নিসর্গে ভেসে যাওয়া।

‘ফুল ফুটুক, আর না-ই ফুটুুক আজ বসন্ত’। যান্ত্রিকতার এ শহরে বাস্তবতার পাথর চাপা হৃদয়ে সবুজ বিবর্ণ হওয়া চোখে প্রকৃতি দেখার সুযোগ পান না নগরবাসী। তবুও বসন্ত তারুণ্যেরই ঋতু। কোকিলের ডাক, রঙিন কৃষ্ণচূড়া, আর আমের মুকুলের কথা বইয়ের পাতায় পড়ে থাকলেও এ সময়ের তরুণ-তরুণীরা কিন্তু বসে থাকতে রাজি নন। তাই তো গায়ে হলুদ আর বাসন্তি রঙের শাড়ি পরে হাতে হাত রেখে তারা বেড়িয়ে পড়েন। পাঞ্জাবি পরে তরুণরাও আজ নিজেদের সাজায় রঙিন সাজে।

গাছের শুকনো ঝরাপাতা আজ জানান দিচ্ছে শীত শেষ। এখন প্রকৃতিতে নেই তেমন শীতের দাপটও। আর শীতের শেষ মানেই বসন্তের আগমন; পহেলা ফাল্গুন। পহেলা ফাল্গুনের হাত ধরেই ঋতুরাজ বসন্তের যাত্রা শুরু।

‘সে কি আমায় নেবে চিনে/ এই নব ফাল্গুনের দিনে-জানিনে...?’ এ বসন্তে প্রেমের সঙ্গেও জড়িয়ে থাকে নানা রকম শঙ্কা আর সন্দেহ। তাই এমনও মধুর দিনে এমন শঙ্কাও কি জাগে না অধীর প্রতীক্ষায় থাকা কোন মনে।

এ বসন্তেই ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙালির স্বাধীনতার বীজ রোপন হয়। বসন্তেই শুরু হয় বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ। শহরের নাগরিক জীবনে বসন্তের আগমন বার্তা নিয়ে আসে আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি ও একুশের বইমেলা। আজ নারীরা বাসন্তি রঙে রাঙিয়ে তুলেছে রাজধানীর রাজপথ, পার্ক, বইমেলা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুশোভিত সবুজ চত্বরসহ পুরো নগরী।

শীতের জীর্ণতা সরিয়ে ফুলে ফুলে সেজেছে প্রকৃতি। গাছে গাছে নতুন পাতা, স্নিগ্ধ সবুজ কচি পাতার ধীর গতিতে বাতাসে সঙ্গে বয়ে চলা জানান দেয় নতুন কিছুর।

দক্ষিণা হাওয়ায় দোল জাগিয়ে বসন্ত আসে আমাদের প্রকৃতি ও জীবনে। সাগর, নদী, ভূভাগ গ্রীষ্মের তাপ বাষ্পে নিঃশ্বাস নেওয়ার আগে এ বসন্তের ফাল্গুনে পায় শেষ পরিতৃপ্তি। বাক্সময় হয়ে ওঠে নৈসর্গিক প্রকৃতি বর্ণচ্ছটায়।

বাঙালি সংস্কৃতিতে বসন্ত আসে সবার মধ্যে। কেউ চেতনে কেউ অবচেতনে তা অনুভব করে। বাঙালি ললনারা এই দিনে যে বাসন্তি রঙের শাড়ি ও খোঁপায় হলুদ ফুল এঁটে দেয় তাও এসেছে রঙ খেলার উৎসবের বিবর্তনের পালায় রঙ ছিটিয়ে।

বঙ্গাব্দ ১৪০১ সাল থেকে প্রথম ‘বসন্ত উৎসব’ উদযাপন করার রীতি চালু হয়। সেই থেকে জাতীয় বসন্ত উৎসব উদযাপন পরিষদ বসন্ত উৎসব আয়োজন করে আসছে। এ দেশে ছায়ানট বসন্ত উৎসব শুরু করে ১৯৬২ সালে। দিনে দিনে তা ছড়িয়ে পড়েছে সারাদেশে।

গ্রামেও এখন ফাগুনের ছোঁয়া। গাঁয়ের বধূরা আঙিনা লেপে বরণ করে নিয়েছে ফাগুনকে। তুলে রাখা হলদে শাড়িও বের করেছে আজ। শুরু হয়েছে বোরো চারা রোপণের পালা। মাঘের তীব্র শীতে আবাদের মাঠে যেতে পারেননি কৃষক। ফাগুনের দিনে তারা স্বাচ্ছন্দ্যেই যেতে পারছে। বসন্ত সবার হৃদয়ে এনে দেয় ফাগুনের দোলা।

ফেমাসনিউজ২৪/আরইউ