logo

শনিবার, ১৮ আগস্ট ২০১৮ | ৩ ভাদ্র, ১৪২৫

header-ad

খেরো পাতার একটি সকাল

মিতা আলী | আপডেট: ১০ মে ২০১৮

সময়টা জানুয়ারি শেষ সপ্তাহ। ২০১৭ সালের ২১ শে জানুয়ারি। আর আজ পৃথিবীর পরাশক্তির অন্যতম কর্ণধার আমেরিকার প্রেসিডেন্ট আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ নেবে। পৃথিবী বদলে দেয়ার শপথ নেয়া মাত্র ৪৫ বছরের বারাক ওবামা পরপর দু’বার ক্ষমতাকাল শেষ করে বিদায় নিচ্ছে। সকালে সংবাদপত্রে হোয়াইট হাউজ ত্যাগ করার ছবিটা আমাকে বিষন্ন করেছে। সেই আমেরিকা প্রবাসী বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী যে মনে প্রাণে বাঙালি সে এখন লিখতে দ্বিধা করে না আমি মার্কিন।

সে আসবে লাইব্রেরীর সামনে। আমরা আরো ক’জন যোগ দেব সেই সমারোহ। তাই হিসেবের খাতাটা যেন পাতা খুলে দাঁড়িয়েছে। আমি কেমন আছি? হ্যাঁ, আমি ভালো আছি। আবার পছন্দের কাজটুকু করতে পারছি। বাচ্চা কাচ্চা আছে, সম্মানের সাথে বেঁচে থাকার মত পরিবেশ এবং আত্মমর্যাদা সাথে মাথা উচু করে দাঁড়ানোর মত চাকুরী আছে। সমস্যা আছে বৈকি। আমাদের প্রশাসন সমস্যা।

বাচ্চাদের ভবিষ্যৎ সমস্যা। প্রবাসী বন্ধুর সাথে এই নিয়ে একটু মতভেদ তবে তোমাদের তো ওবামার বদলে ট্রাম্প আসছে। আমাদের ও শাসক বদলাবে কিন্তু যথাযোগ্য শাসক কি পাবো আমরা এই বাংলায় এই প্রশ্ন থেকেই যায়। একটা ব্যাংকের উচ্চতর একটা পদের চাকুরীর পরীক্ষার জন্য প্রত্যবেক্ষক হিসেবে ডিউটি দিতে এসেছি। উত্তরী হওয়ার কাঁপন লাগা শীতে আমি তোমাকে খুঁজে পাচ্ছি। আমার শ্যাম্পু করা বাধা চুল প্রতিবাদ করছে। তুমি এসে দাঁড়িয়েছ সামনে। আমার খোলাচুল উড়ছে তোমার মুখবয়বে। আমার মানবজীবন এর সীমাবদ্ধতায় এ আমার অতল অপরিসীম সীমাবদ্ধতা। আমি হারিয়ে যাই গভীর দুঃখ খাদে। মাত্র চারদিন আগে দৈনিক প্রথম আলোতে একটি ফিচার পড়লাম বাংলাদেশে উচ্চ শিক্ষিত বেকার সংখ্যা অনেক। এই কক্ষে ৩৫ জনের ব্যবস্থা কিন্তু এসেছে মাত্র ৯ জন। অবশ্য এক বছর আগে করা দরখাস্ত।

আমি যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যাম্পাসে থাকি তাই তরুণ সবুজদের সাথেই আমার উঠা বসা বেশি। আমার অভিজ্ঞতায় যারা ভাল তারা একসাথে চার পাচটা চাকুরী পায়। কোনটায় জয়েন করবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। তাই মাত্র ৯ জনের উপস্থিতি আমাকে অবাক করে না আবারো উত্তরী হাওয়া আমাকে তাড়িত করে। আমি তোমাকে মগ্ন হয়ে পড়ি। তোমার বাহু বন্ধন আমাকে উষ্ণ করে হয়তোবা কয়েক মিনিটের জন্য, কেননা ঢং করে ঘন্টা বাজে। আমি বাস্তবে ফিরে আসি। মাত্র ৯ জন পরীক্ষার্থী আমি একজন ইনভিজিলেটর। শীতের সকাল সুনসান নীরবতা। তুমি এসে প্রচন্ডভাবে ঝাপিয়ে পর আমার উপর। আমি তোমার অধর ছুয়ে যাই। তোমার ঘন কেশ আমার কেশের সাথে মিত্রতা করে। আমরা হেসে উঠি জীবনের শ্রোতে। আমরা ভেসে যাই সুখের সীমানায়।

ফ্লোর ইনচার্জ এসে একথা, সেকথা বলে যায়। উত্তরী হাওয়া আমাকে তাড়িত করতে থাকে। আমি তোমার উষ্ণতায় ডুবতে ডুবতে হঠাৎ করেই সেই বাড়িতে চলে যাই। সেখানে ডাইনিং টেবিলে কিরণমালা নামক আমার এক আদরের পৃথিবীর অবস্থান। আমার নানু। কত কথা শুনতে হয়েছে তাকে। তার সারা পৃথিবী একদিকে আমি একদিকে। একচোখা নীতি শুধুমাত্র মিতার জন্য। আমি সেই মিতা। আমি শুনতে পাই নানু বলছে চলে যায় ওখান থেকে নানু। তোর ঠান্ডা লাগবে। আমি চমকে তাকাই। এত স্পষ্ট গলার স্বর। আমি কি কেঁদে ফেললাম! কত বছর হলো নানু নেই। কেউ খোঁজ নেয় না আমার। কেন নিবে? সবাই শুধু তার দায়িত্বটুকু আমার কাঁধে দিতে পারলেই খুশী। হয়তো এটাই পৃথিবীর নিয়ম। ইদানিং খুব কাঁদুনে হয়েছি আমি। তোমার সাথে কথা না হলে কান্না। তুমি জোড়ে কথা বলে কান্না। কোথায় ছিল এত কান্না? পিয়ন আসছে বাড়তি প্রশ্ন নিতে। নিজেকে সামলাও মিতা। সামলে নিলাম নিজেকে কিন্তু আমি চেয়ার টেবিলে না বসে দাড়ালাম দরজায়।

আবার উত্তরীয় হাওয়া আমায় শুনায় “নানুভাই ঠান্ডা লাগবে”। মনে হল উত্তর দিকের পুকুর হয়ে ঠান্ডা বাতাস তার দু’হাত ভরে কাঁপন নিয়ে এসেছে। কামরাঙ্গা বাগান কাটিয়ে, বড়–ইয়ের বড় গাছটায় গোত্তা খেয়ে তবে এসে ছুয়ে যাচ্ছে এ বাতাস। আমি অপলক তাকিয়ে থাকি। উত্তর পুকুরের এ রহস্যভেদ করা যায় না। ভীষন রকম জংলীগাছে ভরা। বড় বড় গাছের আড়ালে উত্তর পুকুরের পানি কখনো সূর্যের তাপ পায় না। শুধুমাত্র প্রচন্ড গ্রীষ্মের তাপদাহে যখন পুকুরের পানি কমে আসে দলবেধে বড় বড় কৈ, মাগুর, শিং, শোল বলা যায় জংলী মাছের চাষের জায়গা উত্তর পুকুর। উত্তর পুকুরে চিন্তায় ব্যতয় ঘটে। একজন পরীক্ষার্থী কাশছে। শীতের দিনে খোলা স্যান্ডেল পরে এসেছে। ও হয়তো জানে না বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এখনো তার স্বাভাবিক পরিবেশ ধরে রেখেছে। অবশ্য জানবে কেমন করে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার যে সীমারেখা অর্থাৎ কার্জন হলের গেট থেকে শুরু। পলাশী মোড়, শাহবাগ এর বাতাস বলে দেয় তুমি ক্যাম্পাস থেকে বের হলে তুমি ক্যাম্পাসে প্রবেশ করলে। আমরা যারা ক্যাম্পাসের বাসিন্দা, তারা নিউ মার্কেট গেলেও বুঝে শুনে কাপড় পরি। ঠান্ডা আক্রান্ত পরীক্ষার্থীকে দরজার সামনের নির্ধারিত সীট থেকে সরিয়ে নিয়ে ভিতরের দিকে সীট বসতে বলি। সাথে নিয়ে আসা পানির বোতলটা এগিয়ে দেই। মানুষ যদি মানুষের সৎ কাজে না লাগে তবে কিসের মানুষ!

হোক না পরীক্ষার হল। উত্তরীয় বাতাসটা কমে গেছে। রাস্তায় শব্দের উৎসব। বিডি সাইকেল বোধ হয় কোন আয়োজন করেছে। শত শত সাইকেল। বাংলাদেশের পতাকা মাথায় হেলমেট মুখে উদ্ভাসিত প্রত্যয় পরিবেশ বাঁচানোসহ নিজ ও ভবিষ্যৎ জীবন যেন অমনিল থাকে। সাইকেল র‌্যালী শেষ হতেই মালি এসে হাজির। তার মেয়ে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। বারো হাজার টাকা লেগেছে। মাসে সাত শত টাকা বেতন। এই শিক্ষার্থীকে নিয়ে আমরা শিক্ষকবৃন্দ চিন্তায় ছিলাম। সে একটা পুরো বাক্যের অর্থ প্রকাশ করে এমন বাক্য লিখতে পারতো না। একাদশ এর প্রথম থেকে তাকে বিশেষ যত্ন নিতে শুরু করি আমরা। এই মুহুর্তে এই প্রতিষ্ঠানে কাজ করি বলে নিজেকে ভাগ্যবান মনে হচ্ছে। নয়তো এই রকম একজন শিক্ষার্থীকে কিভাবে সাহায্য করতাম। আমাদের কত বড় বড় আয়োজন কিন্তু সত্যিকার অর্থে জায়গামত সাহায্য পৌছায় খুব কম মানুষের হাতে। অগনিত মানুষের স্রোত। কোথাও কোন পরিসংখ্যান নেই। সুষ্ঠ জীবন যাপনের ব্যবস্থা নেই। যেন শুধুমাত্র বেঁচে থাকা এখানকার মূল আবেদন। বিশ্বের অর্ধেক সম্পত্তি যেমন শুধুমাত্র আট ব্যক্তির হাতে, তেমনি বেঁচে থাকার সব উপকরণ যেন শুধুমাত্র ঢাকায়। ফলে অমানবিকতা ও কম মাথাচাড়া দেয় না এখানে। দামি কুকুর, দাড়োয়ান দিয়ে নিরাপত্তা প্রহরীর সাথে সাথে মানুষগুলো তার মানবিকতাকেও আবেষ্টন করে রাখে। অবশ্য তাছাড়া উপায় নেই। পৃথিবী চলছে বিশ্ব বাজার অর্থনীতিতে। যেন যা পার অর্জন কর। অথচ কি সুন্দর সেই সমবন্টিত ব্যবস্থা। যা উপার্জন করছি যার যা ক্ষমতা সবই মিলে তা ভোগ করছি। কোথায় সেই ভালোবাসা।

সমাজের ক্ষুদ্রতম ইউনিট পরিবার। হয়তো সদস্য সংখ্যা ছয়জন। উপার্জনক্ষম ব্যক্তি আয় করছে। হয়তো স্বামী-স্ত্রী চাকুরী করছে। ছোট বাচ্চা দুটো, বয়স্ক মুরব্বী দুজন, এই চারজনকে দেখছে দুজন। কেন আমাদের সমাজ কাঠামো এমন হচ্ছে না। মানুষের দুর্নিবার পাওয়ার আকাঙ্খা মানুষকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? উত্তরীয় হাওয়ার দাপট আরো কমছে। দিনের তাপমাত্রা বেড়েছে বোধ হয় কেননা শরীরে থাকা সোয়েটার খুলতে হলো। রাস্তায় জোরে হিন্দিগান বাজছে। এটা এখন মন খারাপের বিষয় তৈরি করেছে আমার। মনে হয় এত জীবন, এত কষ্টের বিনিময়ে অর্জন করা এ দেশটা যেন একটা প্রদেশ। টেলিভিশন ছাড়া যায় না এত চ্যানেল ভারতীয়। বাচ্চারাতো রীতিমত আসক্ত। বাড়ীতে সাহায্যকারী মেয়ে ছেলে, ড্রাইভার বুয়া, মালী সবাই যেন পণ করে বসেছে। তারা ভারতীয় অনুষ্ঠান ছাড়া আর কিছু দেখবে না। ভাল কী মন্দ সে বিচারে নাইবা গেলাম। একটা স্বাধীন দেশে কিভাবে এত সুলভ হয় অন্য দেশের অনুষ্ঠান। অবশ্য পুরো পৃথিবী যেখানে একটা গ্রাম সেখানে এ কথা বলাও ঠিক কি না তাও প্রশ্ন। উত্তরীয় হাওয়া একেবারেই থেমে গেছে। দুই ঘণ্টা শেষ আরো এক ঘণ্টা। এবার রচনামূলক অংশ।

এভাবে যোগ্যতা যাচাইয়ে ব্যাংক এ কি কাজে লাগে কে জানে? আশেপাশের অন্যান্য সহকর্মীরা টুকটাক গল্প করছে। একটা ছুটি ছুটি ভাব চারদিকে। চাকুরী প্রার্থীদের মধ্যে কেউ কেউ প্রশ্ন নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করলেও একজন ইনভিজিলেটর হিসাবে আমি কিছু করতে পারি না এটুকু বোঝাতে পেরে নিজেকে দায়মুক্তি নিয়ে নিচ্ছি। রাস্তা আবার ফাঁকা। ছুটির দিনের শান্ত এলাকা। বিকেলেই ভরে যাবে সব। ঢাকা শহরের অন্যতম এই মুক্তবায়ু এলাকা উন্মুক্ত সবার জন্য।

আর তাই জনস্রোত সব সময়ই ক্যাম্পাসমুখী। এবার বাতাসটা ঝিরঝিরে। বাতাসের সাথে ভেসে আসছে ফুলের গন্ধ। মৌসুমী ফুলে ভরে আছে সামনের বাগান। দোতালার একদিকটায় তেমন ক্লাস নেই আমার। তাই আসা হয় না। তাই জানা ছিল না। কামেনি ফুলের এমন সমারোহ। আমি মুহুর্তেই আমার আবাস্থলের বারান্দায় চলে যাই। হাসনাহেনা, গন্ধরাজ, সন্ধ্যামালতী সবার একটা একত্রিত গন্ধময় সুবাতাসে আমি আপ্লুত হই। মাটির সোঁদাগন্ধে হঠাৎ করেই কাশি আসতে থাকে। এটা আমার প্রায় চার বছর ধরে। ভালো খারাপ যে কোন গন্ধই প্রথমে কষ্ট দেয়। তারপর ধরণ বুঝে সময় নেয়। আমি ইনহেলারটা বের করি। ধাতস্থ হয়েই দেখি বাইরে ইলশেগুড়ি বৃষ্টি।

আমি বারান্দা আর পরীক্ষার হলের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে থাকি। মুখটা আদ্র হয় বৃষ্টি পানি ছিটায়। কিন্তু আদ্রতা আমাকে এক কষ্টে নিপতিত করে। এই কিছুদিন আগে প্রাইমারি সেকশনের শিক্ষকবৃন্দ তাদের বেতন ভাতা জাতীয়করণের দাবী নিয়ে শহীদ মিনারে একত্রিত হয়। কী যে কনকনে হাওয়া। আমি রাতে গিয়ে চুপি চুপি দেখে এসেছি। একেক জন মানুষ কেমন কুন্ডালি পাকিয়ে শুয়ে ছিল। অথচ তাদের উপর পিপার স্প্রে করা হল, আমিও এই শিক্ষকদের একটা অংশ। উন্নত দেশগুলোতে সবচেয়ে শিক্ষিত, সবচেয়ে বেশী বেতন দেয়া হয় প্রাথমিক শাখায়। কেননা কচি গাছের চারাগুলো যতটা যত্ন পায় ঠিক ততটাই ভালোভাবে বেড়ে উঠে। ঢং ঢং ঢং তিনটা ঘন্টা বাজলো মানে পরীক্ষা শেষ। আমি খাতা নিয়ে নির্ধারিত রুমে জমা দিই। আজ কোন ভীড় নেই। নিজের মত করে সবুজের সমারোহের সাথে হাটতে হাটতে পৌঁছে যাই গন্তব্যে।

ফেমাসনিউজ২৪/আরআর/আরইউ