logo

বুধবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৮ | ২৮ অগ্রহায়ণ, ১৪২৫

header-ad

শেষরক্ষা হলো না অধ্যক্ষ নাজনীন ফেরসৌসের

শিক্ষাঙ্গন ডেস্ক | আপডেট: ০৫ ডিসেম্বর ২০১৮

ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী অরিত্রী অধিকারীর (১৫) আত্মহত্যার ঘটনায় করজোড়ে ক্ষমা চেয়েও শেষরক্ষা হলো না অধ্যক্ষ নাজনীন ফেরসৌসের। এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ নাজনীন ফেরদৌস, বেইলি রোড শাখার সহকারী প্রধান শিক্ষক জিনাত আরা এবং ক্লাস টিচার হাসনা হেনাকে বরখাস্ত করা হয়েছে।

পাশাপাশি ওই তিন শিক্ষকের এমপিও বাতিল করে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করার নির্দেশ দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। বুধবার বেলা ১২টার দিকে সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী এ তথ্য জানান।

সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ জানান, ভিকারুননিসা শিক্ষার্থী অরিত্রি অধিকারীকে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগের প্রমাণ পেয়েছে মন্ত্রণালয়ের গঠিত তিন সদস্যের কমিটি।

তিনি বলেন, ভিকারুননেসা স্কুলের দোষী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, প্রতিষ্ঠানটির সব ধরনের অনিয়ম ওঠে আসছে। অভিভাবকরাও নানা অনিয়মের কথা বলেছেন। অরিত্রীর আত্মহত্যার ঘটনায় দায়ী ৩ জনের নাম এসেছে।

শিক্ষামন্ত্রী জানান, প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নাজনীন ফেরদৌস, প্রভাতী শাখার প্রধান জিনাত আক্তার ও শ্রেণি শিক্ষিকা হাসনা হেনাকে বরখাস্ত করার সুপারিশ করেছে কমিটি। প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে তাদের বরখাস্ত করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

অরিত্রী অধিকারীর আত্মহত্যার ঘটনায় এর আগে করজোড়ে ক্ষমা চান ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নাজনীন ফেরদৌস। ৪ ডিসেম্বর মঙ্গলবার সকালে নিজ কার্যালায়ে গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে ক্ষমা চান তিনি।

নাজনীন ফেরদৌস বলেন, ঘটনাটি এতদূর গড়াবে তা অনুধাবন করতে পারিনি। আত্মহত্যার ঘটনায় আমি সবার কাছে ক্ষমা চাচ্ছি। এ ঘটনায় এরই মধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর কী ব্যবস্থা নেয়া হবে তা মন্ত্রণালয় নির্ধারণ করে দেবে। যে শিক্ষক তাকে ভর্ৎসনা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে, তদন্তে যদি এর প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে স্কুলের নিয়ম অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে স্কুল কর্তৃপক্ষ।

অরিত্রি অধিকারীর আত্মহত্যার ঘটনায় ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে স্কুল কর্তৃপক্ষ। কমিটিতে আছেন- প্রতিষ্ঠানটির গভর্নিং বডির সদস্য আতাউর রহমান, খুরশিদ জাহান ও ফেরদৌসী জাহান। কমিটিকে আগামী তিন কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

এর আগে মঙ্গলবার সকাল থেকে বেইলী রোডে স্কুলগেটের সামনে বিক্ষোভ করেন অভিভাবকরা। এ ঘটনায় মঙ্গলবার পরীক্ষা বর্জন স্কুলের শিক্ষার্থীরা। অভিভাবকরা দোষী শিক্ষক ও স্কুলটির অধ্যক্ষের অপসারণ দাবি করেন।

অভিভাবকদের অভিযোগ, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সঙ্গে এ ধরনের বাজে আচরণ করে যাচ্ছে স্কুল কর্তৃপক্ষ। অরিত্রির মৃত্যুর ঘটনায় যা সামনে এসেছে। এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের গভর্নিং বডির কাছে অভিযোগ করেও কোনো সমাধান মেলেনি। অরিত্রি অধিকারীর আত্মহত্যার ঘটনায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রি‌ন্সিপাল ও ভাইস প্রি‌ন্সিপা‌লের পদত্যাগের দা‌বি জানান বিক্ষুব্ধ অ‌ভিভাবক ও শিক্ষার্থী‌রা। একইসঙ্গে তাদের ভুল স্বীকারের দাবিও জানান তারা।

শিক্ষার্থী অরিত্রী অধিকারীর আত্মহত্যার ঘটনা হৃদয়বিদারক ও বাজে রকমের দৃষ্টান্ত বলে মন্তব্য করেছেন হাইকোর্ট। মঙ্গলবার সুপ্রিমকোর্টের এক আইনজীবী পত্রিকায় প্রকাশিত খবর আদালতের নজরে আনলে বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এমন মন্তব্য করেন। পরে তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন।

আইনজীবী ব্যারিস্টার সাইয়েদুল হক সুমন বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত অরিত্রী অধিকারীর (১৫) আত্মহত্যার প্রতিবেদন আদালতে উপস্থাপন করেন। তিনি আদালতকে বলেন, আমরা এ বিষয়ে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা প্রার্থনা করছি।

আদালত বলেন, অরিত্রী অধিকারীর আত্মহত্যার ঘটনা খুবই হৃদয়বিদারক। শিক্ষার্থীর সামনে মা-বাবাকে অপমানের ঘটনাকে বাজে রকমের দৃষ্টান্ত বলেও মন্তব্য করেন আদালত।

চোখের সামনে বাবা-মায়ের অপমান সহ্য করতে না পেরে রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুলের ছাত্রী অরিত্রী অধিকারী আত্মহত্যা করেন। আত্মহত্যার কিছুক্ষণ আগে তিনি তার মাকে জানান, মা এ লজ্জা নিয়ে বাঁচতে চাই না।

অরিত্রির ছোট বোনও একই স্কুলে পড়ে। গত সোমবার বেলা সাড়ে ১২টায় রাজধানীর শান্তিনগরে সপ্তম তলায় নিজ ফ্ল্যাটে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় অরিত্রীকে পাওয়া যায়।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেয়া হলে বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে চিকিৎসকরা অরিত্রীকে মৃত ঘোষণা করেন। ওই ছাত্রীর গ্রামের বাড়ি বরগুনা সদরে। অরিত্রির বাবা দিলীপ কুমার একজন সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসায়ী।

অরিত্রির মা-বাবা জানান, অরিত্রির স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা চলছিল। গত রোববার সমাজবিজ্ঞান পরীক্ষা চলার সময় তার কাছে একটি মোবাইল ফোন পাওয়া যায়। এজন্য স্কুল কর্তৃপক্ষ আমাদের ডেকে পাঠায়। স্কুলে গেলে কর্তৃপক্ষ আমাদের জানান, অরিত্রি মোবাইল ফোনে নকল করছিল, তাই তাকে বহিষ্কারের (টিসি) সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

সোমবার পরীক্ষার সময় অরিত্রির সঙ্গে তারা স্কুলে যান। পরে তাদের ভাইস প্রিন্সিপালের কাছে নিয়ে গেলে তারা মেয়ের নকল করার ব্যাপারে ভাইস প্রিন্সিপালের কাছে ক্ষমা চান। কিন্তু ভাইস প্রিন্সিপাল কিছু করার নেই বলে তাদের প্রিন্সিপালের রুমে যেতে বলেন। সেখানে গিয়েও তারা ক্ষমা চান। কিন্তু প্রিন্সিপালও তাতে সদয় হননি। পরে অরিত্রি প্রিন্সিপালের পায়ে ধরে ক্ষমা চাইলেও তাদের বেরিয়ে যেতে বলেন এবং পরদিন টিসি নিয়ে আসতে বলেন।

অরিত্রীর মা ও বাবার অভিযোগ, প্রিন্সিপাল তাদের অপমান করায় তার মেয়ে দ্রুত বাসায় চলে যায়। পরে তারা গিয়ে দেখে অরিত্রী নিজ রুমে ফ্যানের সঙ্গে ওড়না পেঁচানো অবস্থায় আছে। তাকে দ্রুত উদ্ধার করে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখান থেকে তাকে ঢামেক হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

এ বিষয়ে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ নাজনীন ফেরদৌস বলেন, ওই ছাত্রী পরীক্ষার হলে মোবাইল ফোনে নকল করে পরীক্ষা দিচ্ছিল। বিষয়টি পরিদর্শক শিক্ষক বুঝতে পেরে খাতা নিয়ে নেন। মোবাইল ফোনে পুরো বই কপি করা ছিল।

এদিকে অরিত্রির মৃত্যুর সংবাদ শুনে সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে ঢামেক হাসপাতালে যান ভিকারুননিসার প্রিন্সিপাল নাসরিন ফেরদৌস। সেখানে তিনি অরিত্রীর স্বজনদের তোপের মুখে পড়েন। এ সময় তারা প্রিন্সিপালের গাড়ি ঘিরে রাখেন। কিছুক্ষণ পর দ্রুত হাসপাতাল ত্যাগ করেন তিনি।
ফেমাসনিউজ২৪/এফএম/এমএম