logo

শুক্রবার, ২৪ নভেম্বর ২০১৭ | ৯ অগ্রহায়ণ, ১৪২৪

header-ad

সেই দিনের কথা ভুলে যাবেন না সু চি

ফেমাস নিউজ ডেস্ক | আপডেট: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৭

Suu Kyi
সেই দিনের কথা ভুলে যাবেন না সু চি, যে সময়টায় শত আবেদনেও মৃত্যুযাত্রী স্বামীকে দেখতে যেতে পারেননি। মুমূর্ষু স্বামীকে শেষ বিদায়টিও জানাতে পারেননি সামরিক জান্তার কঠোরতায়। আজ ক্ষমতার স্বাদে সেই সামরিক জান্তা দিয়েই সংখ্যালঘু নিরীহ মুসলমানদের ওপর চালাচ্ছেন ইতিহাসের বর্বরোচিত নির্যাতন, যা দেখে বিশ্ববাসী নড়েচড়ে বসেছে। ধিক্কার জানাচ্ছে আপসহীন সেই নেতৃত্বকে। ভুলে যাবেন না- সেই সু চি এখন ইতিহাসের কলঙ্কের পাতায়। ডাইনি রূপে রূপান্তরিত সু চিকে নিয়ে আজ কত ব্যঙ্গাত্মক চিত্র।

ফেসবুক খুললেই চোখে পড়ে বিভৎস চেহারার সু চিকে। এটি বিশ্ববাসীর প্রতিবাদ। সু চি আর ডাইনির মধ্যে যে কোনো পার্থক্য নেই সেটাই তুলে ধরা হয়েছে ফেসবুকের অগণিত আইডি। কেন সু চি'র প্রতি এমন প্রতিবাদ? মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলছে সরকারি মদদে খুন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ। স্যাটেলাইটের মাধ্যমে পাওয়া চিত্রে দেখা গেছে শিশুর টুকরো টুকরো দেহ।


জীবন্ত মানুষকে ধরে ধরে আগুনে পুড়িয়ে মারার চিত্র। নারীর সম্ভ্রমহানী চলছে প্রকাশ্যে। গ্রামের পর গ্রাম জ্বলছে আগুনে। সেনাবাহিনীর সাথে উগ্র বৌদ্ধরাও হাতে অস্ত্র নিয়ে নেমেছে মাঠে। রোহিঙ্গা নারীদের ধরে প্রকাশ্যে উলঙ্গ করে ধর্ষণ করা হচ্ছে। যৌনাঙ্গে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে জীবন্ত নারীকে করা হচ্ছে হত্যা। তিনি নাকি মিয়ানমারের পুনর্জাগরণের নেতা! শুনলে লজ্জা লাগে।


সেই সু চি'র ঘনিষ্ঠরাই এখন রোহিঙ্গা ইস্যুতে তার অবস্থানে অবাক, হতবাক। ফিঁকে হয়ে এসেছে তাদের স্বপ্নও৷
সু চি'র এই বিস্ময়কর পরিবর্তনের একটি ব্যাখ্যা দিয়েছে বার্মা থা দিন নেটওয়ার্ক নামে মিয়ানমারের একটি ব্যাঙ্গাত্মক ম্যাগাজিন৷ তারা বলছে, মিয়ানমার সেনাবাহিনীর জেনারেলরা ভাড়া করা রুশ জেনেটিক ইঞ্জিনিয়াররা অং সান সু চি'র শরীর থেকে গণতন্ত্রের জিন সরিয়ে একটা ক্লোন তৈরি করেছে। সত্যিকারের সু চি এখনো সেনাবাহিনীর কারাগারে বন্দি বলেই উল্লেখ করেছে থা দিন নেটওয়ার্ক৷

অথচ কয়েক বছর আগেও যে সু চি ধর্ম, সম্প্রদায়ের উর্ধ্বে ওঠে একটি অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কথা বলতেন, সেই সু চি কীভাবে এতটা বদলে গেলেন?
 
সু চি যখন কয়েক দশকের সেনা শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করছিলেন, এক মেডিকেল ছাত্রী সব বাধা উপেক্ষা করে তার সার্বক্ষণিক সঙ্গী হয়েছিলেন। সু চি'র প্রতি আনুগত্যের কারণে তাকে ছ'বছর কারাগারে কাটাতে হয়। অসুস্থ হয়ে একবার বন্দি অবস্থাতেই মরতে বসেছিলেন তিনি। সেই ছাত্রী মা থিডাও এখন সু চি'র কর্মকাণ্ডে অবাক। মা থিডার মতো যারা সু চি'র প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন, এখন তাদের অনেকেই নিন্দা জানানোর ভাষাও খুঁজে পান না।

 

বছরের পর বছর ধরে সেনাবাহিনীর সাথে লড়াই করে গেছেন সু চি। ১৫ বছর ধরে গৃহবন্দি ছিলেন, দেখা করতে পারেননি তার ব্রিটিশ স্বামী ও সন্তানদের সঙ্গেও। এই অনমনীয় মনোভাব তাকে এনে দেয় বিশ্বজুড়ে খ্যাতি। ২০১৫ সালের নির্বাচনে বিপুল ব্যবধানে জয় পায় তার দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসি।

সু চিকে সেনাশাসন থেকে মুক্তির প্রতীক হিসেবেই দেখতো সাধারণ জনগণ। কিন্তু ২০১৬ সালের এপ্রিলে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর থেকে বিভিন্ন বিষয়ে ‘নির্লিপ্ত' এবং ‘তথ্য নিয়ন্ত্রণের' অভিযোগ আসছে তার বিরুদ্ধে। তবে এর কারণ বুঝতে পারছেন না বিশ্লেষকরাও। সু চি'র বাবা জেনারেল অং সানকে ব্রিটিশ শাসন থেকে মিয়ানমারের স্বাধীনতার লড়াইয়ে একজন নায়ক হিসেবেই দেখা হয়। সেদিকে ইঙ্গিত করে কেউ কেউ বলছেন, সেনাবাহিনীর সাথেই সখ্য গড়ে তোলার চেষ্টা করছে সু চি।

আবার কেউ ধারণা করছেন, কষ্টে পাওয়া এই ক্ষমতা হারানোর ভয়ই তাকে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে বাধা দিচ্ছে। তবে এই যুক্তি মানতে নারাজ তাম্পাডিপা ইনস্টিটিউটের প্রধান খিন সাও উইন। সেনা শাসনের বিরোধিতা করে ১১ বছর জেল খেটেছেন খিন সাও।

তিনি মনে করেন, এগুলো অযৌক্তিক কথাবার্তা৷ সু চি এখন আর সেনাবাহিনীর হাতে বন্দি না। তিনি মনে করেন, মূল কারণ হল সু চি'র নৈতিক সাহসের বড় অভাব।

১৯৪৫ সালের ১৯ জুন তখনকার ব্রিটিশ উপনিবেশের অংশ বার্মার রেঙ্গুনে জন্ম অং সান সু চি'র। বাবা জেনারেল অং সানকে যখন হত্যা করা হয় সু চি'র বয়স তখন মাত্র ৩ বছর। সু চি'র শৈশব কেটেছে ভারতে। উচ্চ শিক্ষার্থে ইংল্যান্ডে যাওয়ার পর সেখানে মাইকেল অ্যারিসের সঙ্গে পরিচয় হয়। পরবর্তীতে অ্যারিসকেই বিয়ে করেছিলেন সু চি। দুটি ছেলে আছে এই দম্পতির। ১৯৮৮ সালে নিজের দেশ মিয়ানমারে ফেরেন সু চি। দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণাও দেন প্রথম জনসভাতেই।

১৯৯০ সালে নির্বাচন হয়। নির্বাচনে শতকরা ৮০ ভাগ ভোট পায় সু চি'র দল এনএলডি। কিন্তু তখনকার সামরিক শাসক নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে ক্ষমতায় পরিবর্তনের গণতান্ত্রিক দাবিকে পাত্তাই দেয়নি।

নির্বাচনের কিছুদিন আগেই সু চি-কে গৃহবন্দি করা হয়। ২০১০ সালে পুরোপুরি মুক্তি প্রাপ্তির আগে বার কয়েক বাইরে আসার সুযোপ পেয়েছিলেন ‘মিয়ানমারের গণতন্ত্রের মানসকন্যা’ হিসেবে পরিচিত এই রাজনীতিবিদ।
নোবেল পেলেন সু চি।

গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য অহিংস আন্দোলন করায় ১৯৯১ সালে সু চি-কে শান্তি পুরস্কার বিজয়ীর স্বীকৃতি দেয় নোবেল কমিটি। গৃহবন্দি ছিলেন বলে সু চি নিজে যেতে পারেননি। তার পক্ষ থেকে পুরস্কার গ্রহণ করেছিলেন তার ব্রিটেনে নির্বাসিত পুত্র কিম।

সু চি-কে মুক্তি দেয়ার দাবি উঠছিল বিশ্বের প্রায় সব প্রান্ত থেকে। কিন্তু তখনকার সামরিক বাহিনী তাতে কর্ণপাত করেনি। অবশেষে ২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর মুক্তি পান অং সান সু চি। ২০১২ সালে আবার নির্বাচন হয় মিয়ানমারে। ১৯৯০ সালে সু চি-কে গৃহবন্দি করার পর থেকে কোনো নির্বাচনে অংশ নেয়নি সু চি-র দল এনএলডি। ২২ বছর পর আবার নির্বাচনে অংশ নিয়ে ঠিকই নির্বাচিত হন সু চি। সেই সুবাদে এখন তিনি বিরোধী দলের নেত্রী।

২০১২ সালে মুক্ত সু চি-র হাতেই তার পুরস্কারটা তুলে দেয় নোবেল কমিটি। সু চি জানান, এই পুরস্কার তাকে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে অনেক প্রেরণা জুগিয়েছে। ২০১৪ সালে সু চি জার্মানির রাজধানী বার্লিনেও এসেছিলেন। তখন মানবাধিকার রক্ষা এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবিতে দীর্ঘদিন লড়াই করার স্বীকৃতি হিসেবে তার হাতে ভিলি ব্রান্ড পুরস্কার তুলে দেন জার্মান প্রেসিডেন্ট গাউক। কিন্তু বিশ্ববাসী সু চি'র হাতে এখন কি তুলে দেবে?

রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর ব্যাপক নির্যাতন সত্ত্বেও এর প্রতিবাদ করেননি অং সান সু চি। অনেক রোহিঙ্গা দেশছাড়া হয়ে সাগরে ডুবে মরলেও নীরব ভূমিকা পালন করছেন সু চি। শান্তিতে নোবেল জয়ী হয়েও একটি সম্প্রদায়ের ওপর অত্যাচার নির্যাতনের বিষয়ে তার নিষ্ক্রিয়তার সমালোচনা করেছেন বিশ্ববাসী।

সু চি'র রয়েছে আরেক ইতিহাস। সেটা তার ব্যক্তি জীবনের। যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনেক সুখ-দুঃখ। সেই সময়েও তিনি ভেবেছেন দেশের কথা, মানুষের কথা। সু চি-এরিসের সংগ্রামী জীবন নিয়ে 'দ্য লেডি' নামে চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু তার ব্যক্তিগত জীবনের একটি আকর্ষণীয় এবং একইসঙ্গে বেদনাবিধুর অধ্যায় অনেকেরই অজানা।

অক্সফোর্ড পড়ুয়া একজন আদর্শ গৃহিণী থেকে মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অগ্নিকন্যায় পরিণত হওয়া সু চি'র জীবনও চলচ্চিত্রের চেয়ে কম রোমাঞ্চকর নয়। যখন তার জীবনকে প্রথম সেলুলয়েডের ফিতায় বাঁধার পরিকল্পনা করা হয়, তখন উদ্যোক্তারা কল্পনাও করেননি, সু চি'র সংগ্রামী জীবন কাহিনীর আড়ালে লুকিয়ে আছে এক প্রেম-কাহিনী। সেই কাহিনীর ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকা অসামান্য আত্মত্যাগ আর ভালোবাসা হলিউডের সেরা রোমান্টিক সিনেমার কাহিনীকেও যেন হার মানায়।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পৃথিবীর পূর্ব প্রান্তর একটি অখ্যাত অনগ্রসর দেশের এক সুন্দরী, কিন্তু লাজুক মেয়ের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল পশ্চিমের এক আবেগপ্রবণ টগবগে যুবকের। মাইকেল এরিসের জন্য ব্যাপারটি ছিল এক কথায় প্রথম দর্শনে প্রেম। সু চিকে তিনি প্রথম ভালোবাসার কথা জানান তুষার ঢাকা হিমালয় পর্বতবেষ্টিত ছোট্ট দেশ ভুটানে।


হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত রহস্যময়, ছোট্ট কিন্তু অপরূপ দেশটি ছিল তখন মূল পৃথিবী থেকে অনেক দূরে, যেন এক রূপকথার দেশ। তিনি তখন ভুটানের রাজ-পরিবারের গৃহশিক্ষক হিসেবে চাকরি করেন। এ দেশটির প্রতি অন্য রকম একটা মোহ ছিল তার। সেই মোহ থেকেই সু চিতে স্থিতু হন এরিস।

এই প্রিয় ভূমিতেই সু চিকে মনের কথা জানালেন তিনি। এরিসের প্রস্তাবে রাজিও হন সু চি। তবে এক শর্তে_ যদি মাতৃভূমি তাকে কখনো প্রয়োজন মনে করে, তাহলে স্থায়ীভাবে তিনি ফিরে যাবেন দেশে। এরিস তো সঙ্গে সঙ্গে রাজি। এরপর প্রেমিকা থেকে সু চি হয়ে গেলেন ঘরণী। পরের ১৬ বছর সু চি ছিলেন পতি-অন্তপ্রাণ এক গৃহবধূ। এর মধ্যে এ দম্পতির ঘরে আসে দুটি পুত্র সন্তান। তারপর সু চি সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য পিতৃভূমি মিয়ানমারে আসেন। এরপর আর স্বামীর ঘরে ফেরা হয়নি তার।


সু চি মিয়ানমারে ফেরার পরের ১০ বছর এরিসের দিন কেটেছে সামরিক শাসকদের হাত থেকে স্ত্রীকে নিরাপদ রাখতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালানোর মধ্য দিয়ে। কিন্তু স্ত্রী-বিচ্ছেদের পর বেশি দিন বাঁচেননি এরিস। এরই মধ্যে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তিনি। কিন্তু সামরিক সরকার শত আবেদনেও সু চিকে একবারের জন্য স্বামীকে দেখতে যেতে দেয়নি। এমনকি মৃত্যুর পরও না। মুমূর্ষু স্বামীকে শেষ বিদায়টিও জানাতে পারেননি সু চি।

মিয়ানমারের স্বাধীনতা আন্দোলনের নায়ক জেনারেল অং সান যখন গুপ্তহত্যার শিকার হন, তখন সু চির বয়স মাত্র দুই বছর। সু চি বড় হয়ে উঠেছেন বাবার মহান আদর্শ অনুসরণে। ১৯৬৪ সালে কূটনীতিক মায়ের সঙ্গে পড়াশোনার জন্য ভারত যান। শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে রাজনীতিকের রক্ত, তাই সু চি পড়াশোনার বিষয়বস্তু হিসেবে বেছে নেন অর্থনীতি, রাজনীতি আর দর্শন। মেধাবী সু চি পড়াশোনা করেন অক্সফোর্ডে। বর্বরদের কারণে পিতৃহারা সেই সু চি আজ রাজ্যহারা করছেন অসহায় রোহিঙ্গাদের।
ফেমাসনিউজ২৪/এফএম/এমএম