logo

সোমবার, ১৬ জুলাই ২০১৮ | ১ শ্রাবণ, ১৪২৫

header-ad

কাঁদছে নগর, কাঁদছে নগরবাসী

এক্সক্লুসিভ ডেস্ক | আপডেট: ০২ ডিসেম্বর ২০১৭

ছেলের কবরে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আনিসুল হক। ভালোবাসার অশ্রুভেজা মাটিতেই দাফন করা হল তাকে। তার মৃত্যুতে কাঁদছে নগর, কাঁদছে নগরবাসী। প্রিয় মানুষটিকে হারিয়ে কাঁদছেন মিডিয়াপাড়ার লোকজনও। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতেও কান্নার রোল। কফিনে শুয়ে থাকা আদরের মেঝো ছেলেকে শেষবারের মতো আদর করতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন ৯৫ বছর বয়সী বাবা শরিফুল হক। কফিনের পাশে মাথা গুঁজে তখন বসেছিলেন স্ত্রী রুবানা হক। রুবানার পাশেই হুইল চেয়ারে বসেছিলেন শরিফুল হক। কফিন ঘিরে তখন নিস্তব্দ নীরবতা।

হুইল চেয়ারে বসতেও তার যে কষ্ট হচ্ছিল। শরীরের মৃদু কম্পনে স্পষ্ট হচ্ছিল যখন শরিফুল হককে তার ছেলের সামনে নিয়ে আসা হয়। শরিফুল হক দরজা পেরিয়ে কয়েক গজ সামনে গেলেন। সেখানেই কফিনে শুয়েছিলেন আনিসুল হক। যার কাঁধে চড়ে শেষযাত্রায় যাওয়ার কথা বাবার, তাকেই শেষশ্রদ্ধা জানালেন শরিফুল হক। যেন বাবার কাঁধে সন্তানের মরদেহ- পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজটিই তাকে করতে হল।

শরিফুল হক তার ছোট ছেলে সেনাপ্রধান জেনারেল আবু বেলাল মোহাম্মদ শফিউল হকের বাসায় থাকেন। আনিসুল হক তার জীবদ্দশায় বরাবরই নিজের এগিয়ে যাওয়ার পেছনে বাবা শরিফুল হকের উৎসাহ আর মায়ের অনুপ্রেরণার কথা বলতেন। অথচ শুক্রবার রাত পর্যন্ত শরিফুল হককে ছেলের মৃত্যুর খবর জানানোই হয়নি। শনিবার লন্ডন থেকে মরদেহ আনার পর বাবা শরিফুল হককে মেয়র আনিসুল হকের বনানীর ২৩ নম্বর রোডের বাসায় শনিবার বিকেল ৩টার দিকে আইসিও অ্যাম্বুলেন্সে করে আনা হয়।

এর আগে গতকাল শুক্রবার বাদ জুমা আনিসুল হকের প্রথম নামাজে জানাজা লন্ডনের রিজেন্ট পার্ক সেন্ট্রাল মসজিদে অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় কমিউনিটি নেতারা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীরা অংশ নেন। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, শিল্পপতি সালমান এফ রহমান, ব্রিটেনে বাংলাদেশের হাইকমিশনার নাজমুল কাওনাইন, প্রয়াত মেয়রের ছেলে নাভিদুল হক ও ব্রেন্ট কাউন্সিলের সাবেক মেয়র বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত পারভেজ আহমেদসহ বিপুল সংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশি অংশ নেন। জানাজায় ইমামতি করেন রিজেন্ট পার্ক মসজিদের ইমাম। জানাজা শেষে অশ্রুসিক্ত নয়নে তারা আনিসুল হককে বিদায় জানান।

আজ শনিবার বেলা ১২টা ৪৫ মিনিটে রাজধানীর হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মেয়র আনিসুল হকের মরদেহ বহনকারী বিমানটি অবতরণ করে। বিমানবন্দরে ডিএনসিসির পক্ষ থেকে মেয়রের লাশ গ্রহণ করেন সংস্থাটির প্যানেল মেয়র ওসমান গণি, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মেসবাহুল ইসলাম, সচিব দুলাল কৃষ্ণ সাহা, প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা কমোডোর এম এ রাজ্জাক, প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. সাঈদ আনোয়ার, প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মো. জাকির হোসেন, প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম, প্রধান ভাণ্ডার কর্মকর্তা মো. মনোয়ার উজ জামান, প্রধান হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা মো. আমিরুল ইসলাম, প্রধান সমাজ কল্যাণ ও বস্তি উন্নয়ন কর্মকর্তা মো. আমিরুল ইসলাম, মহাব্যবস্থাপক (পরিবহন) লে. কর্নেল এস এম সাবের সুলতানসহ সংস্থার ওয়ার্ড কাউন্সিলররা।

এ সময় বিমানবন্দরে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরসহ বেশ কয়েকজন মন্ত্রী উপস্থিত ছিলেন। আনিসুল হকের ছোট ভাই সেনাপ্রধান জেনারেল আবু বেলাল মো. শফিউল হকও উপস্থিত ছিলেন বলেন জানান মেয়রের একান্ত সচিব আবরাউল হাসান। এরপর কফিনটি অ্যাম্বুলেন্সে করে তার বনানীর বাসভবনে নিয়ে আসা হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাসায় গিয়ে শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দেন। এ সময় আনিসুল হকের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করে মোনাজাতও করেন তিনি। পরে বাসভবন থেকে মরদেহ নেয়া হয় আর্মি স্টেডিয়ামে।

রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের পক্ষে সামরিক সচিব মেজর জেনারেল সরোয়ার হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে সামরিক সচিব মেজর জেনারেল মিয়া মোহাম্মদ জয়নুল আবেদিন, স্পিকার শিরীন শারমিনের পক্ষে ক্যাপ্টেন মোশতাক আহমেদ, আওয়ামী লীগের পক্ষে সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, ঢাকা দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকন, সংসদ উপনেতা সাজেদা চৌধুরীর পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানানো হয়। এ ছাড়া বিজিএমইএ, এফবিসিসিআই, বিকেএমইএসহ সর্বস্তরের মানুষ তার প্রতি শ্রদ্ধা জানায়।

বিকেল ৪টা ১৯ মিনিটে বনানীর আর্মি স্টেডিয়ামে মরহুমের নামাজে জানাজা সম্পন্ন হয়। জানাজায় সর্বস্তরের মানুষের ঢল নামে। মন্ত্রী, এমপিসহ রাজনৈতিক, ব্যবসায়িক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের ব্যক্তিবর্গ ছাড়াও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এতে অংশ নেন। শনিবার বিকেল সোয়া ৫টার দিকে বনানী কবরস্থানে মা, শাশুড়ি ও ছোট ছেলের মো. শারাফুল হকের কবরের পাশেই চিরনিদ্রায় শায়িত হন তিনি।

আবরাউল হাসান বলেন, মেয়রের মরদেহের সঙ্গে দেশে আসেন তার স্ত্রী রুবানা হক, ছেলে নাভিদুল হক, দুই মেয়ে ওয়ামিক উমায়রা ও তানিশা ফারিয়াম্যান হক। বিমানবন্দর থেকে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় বনানীর বাসভবনে। সেখানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গিয়ে মেয়রের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান। এ ছাড়া বিভিন্ন দলের নেতারা যান প্রিয় মানুষটিকে শেষবারের মতো শ্রদ্ধা জানাতে। এরপর প্রয়াত মেয়রের মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় আর্মি স্টেডিয়ামে। সেখানকার চারটি ফটক দিয়ে হাজারো মানুষ সারিবদ্ধভাবে স্টেডিয়ামে ঢোকেন। একে একে সবাই মেয়রকে শেষবারের মতো শ্রদ্ধা জানান।

গত ২৯ জুলাই ব্যক্তিগত সফরে সপরিবার যুক্তরাজ্যে যান মেয়র আনিসুল হক। অসুস্থ হয়ে পড়লে গত ১৩ আগস্ট তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তার শরীরে মস্তিষ্কের প্রদাহজনিত রোগ ‘সেরিব্রাল ভাস্কুলাইটিস’ শনাক্ত করেন চিকিৎসকরা। এরপর তাকে দীর্ঘদিন আইসিইউতে রেখে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছিল। একপর্যায়ে মেয়রের শারীরিক পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হওয়ায় তার কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্র খুলে নেয়া হয়। কিন্তু মঙ্গলবার মেয়রের পরিবারের একজন সদস্য বলেন, রক্তে সংক্রমণ ধরা পড়ায় তাকে আবার আইসিইউতে নেয়া হয়। এরপর ফুসফুস আক্রান্ত হয়ে মারা যান তিনি।

আনিসুল হকের জন্ম ১৯৫২ সালের ২৭ অক্টোবর ফেনীর সোনাগাজীর আমিরাবাদ ইউনিয়নের সোনাপুর গ্রামের মাতুলালয়ে। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক সম্পন্ন করেন। আশি-নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশ টেলিভিশনে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের উপস্থাপনা করে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান। ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে বিটিভিতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে নিয়ে মুখোমুখি অনুষ্ঠানও করেন। সেই অনুষ্ঠানের উপস্থাপক ছিলেন আনিসুল হক।

আশির দশকেই তিনি সাবেক সচিব নুরুল হকের দেশ গার্মেন্টে চাকরিজীবন শুরু করেন। পরে যোগ দেন মোহাম্মদী গ্রুপে। একপর্যায়ে গার্মেন্ট ব্যবসায় যুক্ত হন। ২০০৫ সালে তিনি বিজিএমইএর সভাপতি নির্বাচিত হন। এছাড়া মেয়র হওয়ার আগে ২০০৮ সালে তিনি ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর সভাপতিও নির্বাচিত হন। ইতিমধ্যে তিনি মোহাম্মদী গ্রুপের দায়িত্ব নেন।

মেয়র হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি মোহাম্মদী গ্রুপের চেয়ারম্যানের পদে আসীন ছিলেন। তার স্ত্রী রুবানা হক বর্তমানে মোহাম্মদী গ্রুপের দায়িত্বে আছেন। তাদের তিন সন্তান রয়েছে। তাদের ছেলে নাভিদুল হক যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনের বেন্টলি ইউনিভার্সিটি থেকে ব্যবস্থাপনায় উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করে বর্তমানে মোহাম্মদী গ্রুপের পরিচালক ও দেশ এনার্জি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে কাজ করছেন।

২০১৫ সালে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) নির্বাচনে আনিসুল হক আওয়ামী লীগ থেকে মেয়র পদের মনোনয়ন পান। নির্বাচনে বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিএনপি দলীয় প্রার্থী তাবিথ আউয়ালকে পরাজিত করেন। তিনি মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগেরও সদস্য ছিলেন।

মেয়র আনিসুল হকের অবদান স্মরণ করে শনিবার দুপুরে বনানীর বাড়িতে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, তার মতো মানুষ একজনই। আরেকজন আনিসুল হক খুঁজে পাওয়া যাবে না। ঢাকা শহরকে গ্রিন অ্যান্ড ক্লিন করা আনিসুল হকের স্বপ্ন ছিল। তার সেই স্বপ্ন বৃথা যেতে দেব না। তবে তার শূন্যতা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। এ রকম পরিশ্রমী মানুষ আমি কমই দেখেছি।

আনিসুল হকের পৈত্রিক বাড়ি ও ওবায়দুল কাদেরের বাড়ি নোয়াখালীর কবিরহাটে। সে কথা স্মরণ করেন সেতুমন্ত্রী বলেন, আমরা একই এলাকার বাসিন্দা। মেয়র হওয়ার পর এলাকাবাসী তাকে একটি সংবর্ধনা দিয়েছিল। সেই সংবর্ধনায় লাখ লাখ লোক হয়েছিল। এখনও সেই সংবর্ধনার ব্যানার-পোস্টার স্মৃতি হয়ে আছে।

বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী শেষশ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে বলেন, সদ্য প্রয়াত ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আনিসুল হক নেতৃত্বের ক্ষেত্রে সফল ছিলেন। সব সময় দৃঢ় এবং বলিষ্ঠ ছিলেন। লক্ষ্য অর্জনে কখনো কারও কাছে মাথানত করেননি। সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে স্থানীয় সরকার প্রশাসন কীভাবে চালাতে হয়, তার দৃষ্টান্ত দেখিয়ে গেছেন আনিসুল হক। সাহসিকতার সঙ্গে কাজ কীভাবে করতে হয় তা ঢাকাবাসী দেখতে পেয়েছেন।

আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য এবং বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, আমরা একজন যোগ্য ও সৎ ব্যক্তিকে হারালাম। তার শূন্যতা কোনোভাবে পূরণ হওয়ার নয়। আনিসুল হক সততার সঙ্গে মহানগর উত্তর সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব পালন করেছেন। সততা থেকে কখনো পিছপা হতেন না তিনি। মানুষের বিপদে সব সময় এগিয়ে যেতেন। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের আগে তিনি টেলিভিশনে ‘সবিনয় জানতে চাই’ নামের অনুষ্ঠানে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আমিসহ তিনজন ছিলাম। সেখানে তিনি আমাদের একের পর এক প্রশ্ন করেছিলেন। তিনি একজন দক্ষ সংগঠক, ব্যবসায়ী। বিপদে আপদে তার কাছে গেলে সবাইকে সাধ্যমত সহযোগিতা করতেন তিনি। তার ব্যবহার ছিল অমায়িক। সবাইকে আপন করে নিতেন।

তিনি বলেন, তার মানবিক গুণ, সততা ও যোগ্যতা ছিল। তার শূন্যতা পূরণ হবার নয়। যতদিন ঢাকা মহানগর থাকবে ততদিন তিনি সবার মনে বেঁচে থাকবেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে তার কাছে ঋণী। আমি যখন বিভিন্ন সময় জেলে ছিলাম, তিনি তখন আমার পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন।

আশির দশকের বাংলাদেশ টেলিভিশনের জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানের উপস্থাপক হিসেবে তুমুল জনপ্রিয় হন আনিসুল হক। পরবর্তীতে তৈরি পোশাক খাতের সফল ব্যবসায়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন তিনি। এরপর বিজিএমইএ, এফবিসিসিআই ও সার্ক চেম্বারের মতো ব্যবসায় সংগঠনগুলোর সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন তিনি।
ফেমাসনিউজ২৪/এফএম/এমএম