logo

শনিবার, ২০ অক্টোবর ২০১৮ | ৪ কার্তিক, ১৪২৫

header-ad

‌‘উচ্চ শিক্ষিতদের পকেটে ট্রাম কার্ড’

মো. আখতারুজ্জামান | আপডেট: ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

সাজিদুর রহমানের বাড়ি খুলনা জেলার প্রত্যন্ত গ্রামে। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটার সায়েন্সে ২০০৩ সালে বিএসসি শেষ করেন। রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলে ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠা করেন কাজী পেপার কাপ (কেপিসি ইন্ডাস্ট্রি)।

এসএমই ফাউন্ডেশন তাকে দিয়েছে ‘জাতীয় এসএমই উদ্যোক্তা পুরস্কার ২০১৬। বর্তমানে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে কেপিসি’র গ্রাহক সংখ্যা ১৯০টিরও বেশি। বিদেশে অল্প কিছু কাপ রপ্তানিও করেছেন সাজিদ। ব্যবসার বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলেছেন ফেমাসনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সাথে।

ফেমাসনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম : নতুন উদ্যোক্তদের জন্য ব্যবসার পরিবেশ কেমন হওয়া দরকার?

সাজিদুর রহমান : সরকারের যে সমস্ত বডি আছে তারা নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য পরিবেশ তৈরি করে দেবে। যেমন যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ, গ্যাস পর্যাপ্ত দিতে হবে। এই কথাগুলো আমরা শুনে আসছি। এসবের কোনো কাজ হচ্ছে না। নতুন উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্রে যদি বহির্বিশ্বের সাথে তুলনা করা যায় তাহলে দেখা যাবে বাংলাদেশ মাইলের পর মাইল পিছিয়ে আছে।

‘সরকারের ইনকাম টেক্স যে খাত থেকে সবচেয়ে বেশি আসে, সেটা হলো ব্যবসা। সরকার যদি ব্যবসায়ী তৈরি করে তাহলে রাজস্ব আয় বাড়বে। সরকারের যে পদ্ধতিতে উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে তা বাস্তবসম্মত নয়। কথা কাজে কোনো মিল নেই। বরং সেখাতে অমলাতান্ত্রিক জটিলতা। প্রতিটি জায়গায় ব্যাপক হারে ঘুষের ছড়াছড়ি। টাকা ছাড়া একটা ফাইলও নড়ে না।’

‘যেহেতু সরকারের ইচ্ছা হচ্ছে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করা; সেহেতু সরকার উদ্যোক্তার কাছে যাবে উদ্যোক্তা নয়। কারণ এখানে উদ্যোক্তা সরকারের ক্লাইন্ড, সুতারং সরকারের উচিত যেভাবে সেবা দিলে উদ্যোক্তা খুশি হবে সেভাবেই সেবা দেয়া। কিন্তু আমরা দেখি উল্টোটা। সরকারের অফিসে উদ্যোক্তারা যাচ্ছে আর নানাভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছে।’

‘সরকারের উচিত একটা সংস্থা গঠন করা; যারা উদ্যোক্তাদের খুঁজে বের করবে। আর সেই সংস্থায় যেসব লোককে নিয়োগ দেয়া হবে তাদের কোনো সম্মানি থাকবে না। তাদের আয়টা তারা নিজেরাই করে নেবে। তারা উদ্যোক্তা খুঁজে বের করে তাকে সব ধরনের ডকুমেন্টেশন সার্ভিস দিয়ে আসবে। উদ্যোক্তাদের দেয়া ফিস থেকে ডকুমেন্টেশন সার্ভিসকারীর জন্য একটা কমিশন নির্ধারণ করা থাবে। সেই কমিশনের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা আয় করবে।’

‘এই নিয়মে উদ্যোক্তার কিছু কাজ আছে। সেটা হলো একটা অনলাইনিং ফম পূরণের পদ্ধতি থাকবে। যেখানে উদ্যোক্তারা তার সব তথ্য দেবে। পরে সরকারি অফিসে নিয়োজিত লোকেরা সেই উদ্যোক্তার সাথে যোগাযোগ করবে এবং তার দেয়া তথ্যের আলোকে তাদের তথ্যগতসহ সব সহযোগিতা করবে। যদি উদ্যোক্তাদের ঘরে গিয়ে সেবা দিতে হয় তাই করতে হবে। তারা উদ্যোক্তাদের খুঁজে বের রে তাদের সমস্ত ডকুমেন্টারি সার্ভিস দিয়ে আসবে। তখন দেখবেন যে, খুব দ্রুত উদ্যোক্তা তৈরি হবে।’

‘আর আমি যে এই তথ্য নতুন দিলাম তা নয়, আমাদের পাশের দেশ ইন্ডিয়াতে এটা তাদের ব্যবসায়ী সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। চীনে প্রতিটি উদ্যোক্তাকে দাঁড় করিয়ে দেয়া সরকারের দায়িত্ব। দেশের যারা নতুন উদ্যোক্তা হিসেবে আসছে তারা নানা ধরনের হয়রানির শিকার হচ্ছে। তাই তারা শুরুতেই ব্যবসা থেকে দূরে চলে যাচ্ছে। যেদিন সরকারি অফিসগুলোতে হয়রানি দূর হবে সেদিন বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে একটা দেশ হবে, যে দেশকে নিয়ে মানুষ কথা বলতে বাধ্য হবে। অন্তত উদ্যোক্তা তৈরির জায়গায়। এত সম্ভাবনাময় বাংলাদেশের আছে।’

ফেমাসনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম : উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য কি শিক্ষাগত যোগ্যতা খুব জরুরি?

সাজিদুর রহমান : বহির্বিশ্বে শিক্ষিত জনগোষ্ঠী ব্যবসায়ী হলেও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিষয়টা ভিন্ন। এদেশে শিক্ষিত লোক ব্যবসায়ী হওয়া অনেকটা রেয়ার কেস। তাহলে প্রশ্ন জাগে কেন হয় না? যে ছেলেটা বেশি শিক্ষিত তার মধ্যে কোয়ালিটি লেভেল বেশি থাকবে এটাই সাভাবিক। কিন্তু সে কেন হচ্ছে না এবং সে বিষয়ে কেউ জানারও চেষ্টা করছে না।

‘‌না হওয়ার ক্ষেত্রে কারণ দুটা। প্রথমত যে বেশি শিক্ষিত বিশেষ করে যারা বুয়েট বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করেছে সেই ছেলের কাছে ট্রাম কার্ড আছে, যে জীবন চালানোর জন্য তিনটা বড় বড় সার্টিফিকেট আছে। তার মনের বাসনা উদ্যোক্তা হব। কিন্তু তারা যখন উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য রাস্তায় যায়, সেই শিক্ষিত হওয়ার কারণে অশিক্ষিত উদ্যোক্তার চেয়ে বেশি কোয়ালিটি রাখে; তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সে প্রপারলি আগায় কিন্তু আগায়ে সে যখন আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় পড়ে এবং যখন দেখে যে, অফিসের একজন সহকারী একজন অফিসার তাকে অপমানজনক কথা বলছে- তখন সে মানসিকভাবে আহত হয়। আহত হয়ে তার পকেটে যে ট্রাম কার্ড তা সে ব্যবহার করার জন্য সে বিভিন্ন অফিসে সিভি দেয়া শুরু করে। চাকরি পেয়ে যায়। আর উদ্যোক্তা হওয়া তার পক্ষে সম্ভব হয় না।

‘এখন আসেন অশিক্ষিত জনগোষ্ঠি কোয়ালিটি না থাকা সত্ত্বেও কেন উদ্যোক্তা হয়। কারণ হলো তার পকেটে কোন ট্রাম কার্ড নেই। তার সামনে যে কয়েকটা পথ খোলা তার মধ্যে হয় তাকে রিকশা চালাতে হয় নয়তো তাকে মেশিন চালাতে হবে। তাই সে যতই অপমানিত হোক, সে যতই ধাক্কা খাক তার উপায় নেই। যত কষ্টই হোক তাকে সফল হতেই হবে। সে ধৈর্য্য ধারণ করে। সে জ্ঞানী না হওয়ার পরেও সে জ্ঞানী লোকদের হায়ার করে। অর্থাৎ যারা বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বা উচ্চশিক্ষিত তাদের তার ব্যবসায় নিয়োগ দেয়।’

মূল কথাটা হলো আমলাতান্ত্রিক জটিলতা যতদিন সমাধান করা না যাবে ততদিন পর্যন্ত শিক্ষিত জনগোষ্ঠী আমাদের উদ্যোক্তা হবে না। কিছু শিক্ষিত তরুণ আইটি সেক্টরে আসছে। কমপক্ষে ২০ শতাংশ শিক্ষিত লোক তো উদ্যোক্তা হওয়া দরকার ছিল। হ্যাঁ, বাবা বা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ব্যবসায় শিক্ষিত লোক যাচ্ছে। কিন্তু নতুনভাবে তৈরি করা দরকার।

ফেমাসনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম : যারা ব্যবসা শুরু করতে চায় তাদের কোন বিষয়গুলোর উপর গুরুত্ব দেয়া দরকার?

সাজিদুর রহমান : প্রথমত হচ্ছে, বাংলাদেশের পেক্ষাপটে ব্যবসার আসল তথ্য হচ্ছে ধৈর্য্য, যার মধ্যে ধৈর্য্য নেই তার মধ্যে একশ’টা কোয়ালিটি থাকলেও কিছু যায় আসে না। দ্বিতীয়ত কঠোর পরিশ্রম এবং যদি সে দীর্ঘ সময় ব্যবসায় করার চিন্তা করে তাহলে তাকে গ্রিন ব্যবসা করতে হবে। কারণ এই ব্যবসা দীর্ঘ সময় অবস্থান করবে। এইটা এখন সময়ের দাবি। অর্থাৎ এমন ব্যবসা করা যাবে না যা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। যারা ব্যবসা শুরু করতে চায় তাদের পণ্য নির্বাচনটা খুব গুরুত্বের সাথে করতে হবে। সেই সাথে বাজার যাচাই বাচাই করতে হবে। আমি একটা বই লেখেছি যেখানে বিষয়টা বিস্তারিত তুলে ধরা চেষ্টা করেছি। বইটি নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য অনেকটা সহায়ক হবে।

ফেমাসনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম : ব্যবসা সফল হওয়ার কোনো গোপন তথ্য আছে কি?

সাজিদুর রহমান : ব্যবসা সফল হওয়ার গোপন তথ্য আমার আব্বা আমাকে শিখিয়েছেন যে, দিনে তুমি পরিশ্রম করবে আর রাতে তুমি আল্লাহর কাছে চেয়ে নিও। এইটা আমার গোপন তথ্য। আল্লাহর কাছে পাইতে গেলে সত্য থাকতে হবে।

ফেমাসনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম : নতুন প্রজন্মের ব্যবসায়ীরা কোন ব্যবসায় বেশি ঝুঁকছে?

সাজিদুর রহমান : নতুন প্রজন্মের ব্যবসায়ীরা খুব দুঃখজনকভাবে ফলোয়ার্স হচ্ছে। আইটিতে কিছু ভালো করছে। ফলোয়ার্স বলতে রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় দেখবে যে খুব বেশি ঝোক। এটা নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য ভুল সিদ্ধান্ত। রেস্টুরেন্ট যে খারাপ তা নয়, তোমাকে ফলোয়ার্স হওয়া যাবে না। তুমি এমন কিছু করো যা অন্যরা করেনি।

ফেমাসনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম : ব্যাংক ঋণ পাওয়া নিয়ে নতুন উদ্যোক্তারা বেশি চিন্তিত থাকে। বিষয়টাকে কীভাবে দেখছেন?

সাজিদুর রহমান : বর্তমান সময়ে এসে ব্যাংকারদের অদূরদর্শিতা সততার অভাব এবং ব্যাংকরা নিজেই বড়লোক হয়ে যাবে এই চিন্তা। এসব অবস্থা থেকে যে ঘটনা ঘটছে তাদের একটা ফর্মুলা ভুল হচ্ছে। তারা বড় বড় লোক ছাড়া আগ্রহ দেখাচ্ছে না। ৫০০ কোটি টাকার লোনের নিচে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। খুব নিচে হলে ২০০ কোটি টাকার লোক। তারা কেন এমটা করছে? ২০০ কোটি টাকার ফাইল তৈরি করতে একজন কর্মকর্তার যে সময় বা পরিশ্রম হয় এক কোটি টাকা বা ৫০ হাজার টাকার ফাইল তৈরি করতে একই সময় বা পরিশ্রম হয়। আর ছোট লোনের ক্ষেত্রে বছর শেষে যে পারফর্মেস সিট আসে সেই পারফর্মেস সিটে ছোট ছোট অ্যামাউন্ট। অন্যদিকে বড় লোনের ক্ষেত্রে সিটে বড় বড় অ্যামাউন্ট। তখন সে স্বাছন্দভাবে কাজ করে।

‘বড় লোনগুলোতে ব্যাংকাররা কি করে? দেখা যায় যে, প্রজেক্ট-ভেলু বাড়াই দেয়। যে বাড়াই দেয়, কোনো কাগজে কোনো ভুল থাকলে তা ধরা হয় না। পরে দেখা যায় যে, প্রজেক্টে ঋণ দেয়া হয়। পরে দেখা যায় যে, প্রজেক্টটা ফল্ট করেছে। আর এসএমইতে যে উদ্যোক্তারা যে দেশের অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখছে্ এখন পর্যন্ত তারা একটি ব্যক্তিও টাকা পাচ্ছে না। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) উদ্যোক্তাদের ঋণ চাহিদা বেশি থাকলে তাকে দেয়া হচ্ছে ১০ লাখ ২০ লাখ টাকা। খুব বেশি হলে ৫ কোটি টাকা দেয়া হচ্ছে। এর পরেও তাদের চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে নানা কঠিন শর্ত।

‘ব্যাংক যে ঋণ দেবে তার থেকে মর্গেজ ভেলুয়েশন বেশি হতে হবে। এভাবেই দেশের ৬০ শতাংশ বা তার বেশি এসএমই উদ্যোক্তারা ঋণ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়। ব্যাংকের টাকা সব তসরুপ হয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে বড় ব্যবসায়ীরা সরকারকে কর ও ভ্যাট ফাঁকি দেয়। তারা হাজার হাজার কোটি টাকা ফাঁকি দিচ্ছে। আর ছোট ব্যবসায়ীরা তা করে না। সরকার এখন এসএমই ব্যবসায়ীদের ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে। কিন্তু সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ও ব্যাংকগুলো দুর্নীতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে তা পাচ্ছে না। বর্তমান দেশের অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে আগামী দুই এক বছরের মধ্যে ব্যাংকে এই অরাজকরা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা নিয়ে আমি ভীত।
ফেমাসনিউজ২৪/এফএম/এমএম