logo

সোমবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ৯ আশ্বিন, ১৪২৫

header-ad

যে হাতে জুতা সেলাই, সে হাতেই আঁকাআঁকি

মাহতাব শফি | আপডেট: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

স্বাধীনতার ৪৬ বছরেও জীবনযুদ্ধে পরাধীন এক মুক্তিযোদ্ধা রঞ্জিত চন্দ্র দাশ সনি মিঞা। এই মুক্তিযোদ্ধাকে এখনও রাস্তায় জুতা সেলাই করে জীবিকা নির্বাহ করতে হয়। তার ভাগ্যে জোটেনি মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি, রাষ্ট্রীয় ভাতা। সরকারি কোনও সুযোগ-সুবিধা না পাওয়ায় অভাব, আর অনটনে পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন রঞ্জিত।

তার জন্ম ১৯৬১ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর পশ্চিম পাড়ার কামারগাঁওয়ে। তার বাবা নিশিকান্ত। তার পাঁচ মেয়ে-ছেলে। সবাই বিয়ে করে নিজ নিজ সংসার নিয়ে ব্যস্ত। তাই জুতা সেলাই করে জীবিকা নির্বাহ করেন তিনি। এখন স্ত্রীকে নিয়ে তার বেঁচে থাকার সংগ্রাম।

এতকিছুর মাঝেও রঞ্জিত চন্দ্র দাশ নিভৃতে অনুভবে জ্বালিয়ে রেখেছেন শিল্পীর রঙ। পেট চালাতে তিনি জুতা সেলাই করেন কিন্তু এরই মাঝে তিনি হয়ে উঠেছেন আশ্চর্য রঙের মানুষ। যে হাতে থাকে সুচ-সুতো, সেই হাতেই তিনি তুলে নেন রঙ পেন্সিল। আর জাদুকরের মতো তার হাতে খেলে যায় অলীক সব চিত্র।

৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনে শৈশবেই অংশ নেন মুক্তিযুদ্ধে। তখন মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন খবরা-খবর দিতেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী তেমন পড়াশোনা করতে পারেননি। কিন্তু কল্পনার পালক যার চোখের পাতা ছুঁয়ে যায়, তার আর প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার কী দরকার। পেটের দায়ে রুটি রুজির তাগিদে জুতা সেলাইয়ের মতো পেশাকেই বেছে নিতে হয় তাকে।

রঞ্জিত বলেন, ‘আমি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। সেই সময় ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে গিয়েছিলাম। সেখানে তাকে আমি প্রথম দেখি। তখন প্যান্ডেলের কাছে থাকার কারণে কাছ থেকে দেখেছি। বাঙালির জন্য শেখ মুজিব একটা উপহার। তার ভাষণ শুনেই আমি মুক্তি যুদ্ধে যাই। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর লাল আর সবুজ কাপড় দিয়ে পতাকা বানিয়ে দৌড়াদৌড়ি করেছি খুশিতে।

তিনি বলেন, '১৫ আগস্ট শেখ মুজিবকে যেদিন মারলো সেদিন সারা বাংলাদেশটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল। তারপরও সাহস করছিলাম ধানমন্ডি যাওয়ার জন্য। কিন্তু মানুষ বলছে ওখানে গেলে বিপদ হতে পারে। যেতে বাধা দিছে। তারপরও এক মাস পর ধানমন্ডির ৩২-এ যাই। গিয়ে দেখি দেয়ালে রক্ত ছিটে আছে। ওখানে একটা নোট বই ছিল; ওই বইয়ে সবাই স্মৃতি লিখতো। খুব খারাপ লাগলো।'

ছবি আঁকা নিয়ে রঞ্জিত বলেন, মানুষের যন্ত্রণা, মানবতার বেদনা বুঝতে না পারলে সত্যিকারের শিল্পী হওয়া যায় না। তিনি এঁকেছেন ইন্দিরা গান্ধী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মাওলানা ভাসানী, শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া, উত্তম কুমার, সুচিত্রাসহ অনেক নায়ক-নায়িকার ছবি। দৈনিক বাংলার ফকিরেরপুল এলাকায় তার আঁকার খোঁজ দেয় অন্য এক দুনিয়ার। জীবনের ঘাম-রক্ত মিশেই যা আলাদা এক সৌন্দর্যের সন্ধান দেয়।

তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকি। প্রাতিষ্ঠানিক কোনো প্রশিক্ষণ কখনো নেওয়া হয়নি। সঙ্গে সব সময়ই ছবি আঁকার জিনিসপত্র থাকে। জুতা সেলাইয়ের ফাঁকে সময় পেলেই ছবি আঁকতে বসে যাই। এই কাজের সঙ্গে আমি প্রেম করে ফেলেছি। এটা ছাড়া আমার ভালো লাগে না। জীবনের সঙ্গে মিশে গেছে। এটাও একটা সেবা।

রঞ্জিত দাশ কাছ থেকে দেখেছেন মাওলানা ভাসানীকে। তিনি বলেন, উনি মতিঝিলে ছিলেন। উনার ওখানে গিয়ে কাছ করতাম। উনি খুব ভালো লোক ছিলেন। উনি যখন কথা বলতেন তখন খুব ভালো লাগতো। ওখানে অনেক লোকজন আসতো। তখন আমরা উনাকে বুঝতে পারিনি, সাধারণ জীবন যাপন করছে। তখন তাকে তেমন গুরুত্ব দিইনি। পরে বুঝলাম উনি বিশাল মানুষ। তখনই বুঝলাম যখন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখলাম।

গতানুগতিক পড়াশোনা রঞ্জিতের মোটেই ভালো লাগতো না। ছোটবেলা থেকেই ছিল ছবি আঁকার নেশা। নিজে নিজেই পাখির ছবি, গাছ, লতাপাতা এবং নায়ক-নায়িকার ছবি আঁকতেন। এখন যখন যেটা ভালো লাগে সেটা আঁকি।

রঞ্জিতের এখন তেমন কোনো ইচ্ছা নেই। তিনি বলেন, আমার বয়স হয়ে গেছে। আগ্রহ করলেও পারবো। আমার আঁকা ছবি দেখে যদি মানুষ প্রশংসা করে সেটাই আমার ভালো লাগা। এখন আমার দৈনিক ইনকাম ৪-৫শ' টাকা। পবিরার গ্রামে থাকে। এ পেশায় এই এলাকায় আছি ৩৫ বছর।
ফেমাসনিউজ২৪/এফএম/এমএম