logo

সোমবার, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৮ | ৩ পৌষ, ১৪২৫

header-ad

এ আতঙ্কের শেষ কোথায়?

মাহতাব শফি | আপডেট: ০৫ মার্চ ২০১৮

দেশে একের পর এক জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটলেও মামলাগুলোর বিচার বা তদন্তের অগ্রগতি অনেকাংশেই হতাশাজনক। বিশ্লেষকরা বলছেন, হামলাকারীদের বিচার না করা পর্যন্ত জঙ্গিদের চাপে ফেলা যাবে না। গুলশান হামলার পর নানা চাপে চুপচাপ থাকলেও সুযোগ বুঝে আবারও তারা সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তাই এবার সেই গোষ্ঠীর হামলার শিকার হয়েছেন জনপ্রিয় লেখক জাফর ইকবাল!

২০১৩ সাল থেকে বাংলাদেশে এ পর্যন্ত সাতজন লেখক, প্রকাশক এবং ব্লগার হত্যার ঘটনা ঘটেছে। আর হত্যাসহ হামলার ঘটনা ঘটেছে ১০টি। এর বাইরে ধর্মীয় ভিন্নমত, ভিন্ন ধর্ম, বিদেশি এবং এলজিবিটি হত্যার ঘটনা ঘটেছে আরো ৬টি। এসবের মধ্যে মাত্র একটির বিচারের রায় হয়েছে। বাকি ঘটনার তদন্ত বা চার্জশিট পর্যন্তই শেষ। এতে ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছে ইসলামি চরমপন্থিদের সহিংসতা। ধর্মের নামে মানুষ হত্যা চেষ্টা করা হচ্ছে, আর এর লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছেন মুক্তমনা মানুষ।

২০১৬ সালের এপ্রিলে জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলাম একটি তালিকা প্রকাশ করে ‘কে হবে পরবর্তী টার্গেট?’ শিরোনামে। হত্যার হুমকিতে থাকা এই তালিকায় দ্বিতীয় নম্বরে ছিলেন অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল। ২০১৬ সালের ১২ অক্টোবর স্ত্রীসহ জাফর ইকবালকে মোবাইল ফোনে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। এ ঘটনায় সিলেটের জালালবাদ থানায় ১৫ অক্টোবর সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন তিনি।

হত্যা করার ঘোষণা দেয়ার প্রায় দুই বছর পর ৩ মার্চ শনিবার বিকাল ৫টা ৪০ মিনিটে সিলেট শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবিপ্রবি) ক্যাম্পাসে উন্মুক্ত অনুষ্ঠানে হামলার শিকার হন জনপ্রিয় লেখক জাফর ইকবাল। পুলিশের উপস্থিতিতে ছুরি নিয়ে জনপ্রিয় এই লেখকের ওপর হামলা করা হয়। মাথায় চার জায়গায় আঘাতের পাশাপাশি বাঁ হাত ও পিঠে ছুরির জখম করা হয়।

তার ওপর হামলার আশঙ্কা অনেক আগে থেকেই ছিল। বেশ কয়েকবার হত্যার হুমকিও দেয়া হয়েছে। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যেও এ আশঙ্কা ছিল। তাই জাফর ইকবালের নিরাপত্তায় পুলিশ পাহারার ব্যবস্থা করা হয়। হামলার সময়ও ৪ জন পুলিশ পাহারায় ছিলেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, জাফর ইকবালের ঠিক পেছনে পুলিশের পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল হামলাকারী ফয়জুর রহমান ফয়জুল। অবস্থা দেখে এমনটা প্রশ্ন জাগে মনে, যে পুলিশের উপস্থিতিকেও তোয়াক্কা করছে না এসব ঘটনায় জড়িতরা। তাদের সাহস, সামর্থ্য কি এতই বেশি!

প্রসঙ্গত, রোববার রাত ১০টার দিকে জাফর ইকবালকে হামলাকারী যুবক ফয়জুলের বাবা হাফেজ আতিকুর রহমান ওরফে কুরশ এবং মা মিনারা বেগমকে সিলেট মহানগরের মদিনা মার্কেট এলাকা থেকে আটক করেছে পুলিশ।

এদিকে গত কয়েকবছরে মুক্তচিন্তার, অসাম্প্রদায়িক মনোভাবের মানুষদের ওপর ঘটেছে একের পর এক হামলা। শিক্ষক, লেখক, বুদ্ধিজীবী, প্রকাশক কেউই বাদ যাননি হামলার তালিকা থেকে। কিন্তু এসবের কয়টার বিচার কিংবা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়েছে এমন প্রশ্ন সাধারণ মানুষের।

হামলার শুরুটা হয় প্রথাবিরোধী লেখক অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদকে দিয়ে। ২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি, একুশের বইমেলা থেকে ফেরার সময় বাংলা একাডেমির সামনে হামলার শিকার হন তিনি। সেসময় প্রাণে বেঁচে গেলেও দেশে কিছুদিন চিকিৎসা পর, উন্নত চিকিৎসার জন্য হুমায়ুন আজাদকে জার্মানিতে নেওয়া হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় সেখানেই একই বছরের ১১ আগস্ট মৃত্যু হয় তার। ২০১৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ব্লগার রাজীব হায়দারকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ঘটনাটি ঘটে মিরপুরে। এরপর হামলার শিকার হন বিজ্ঞান লেখক অভিজিৎ রায়। ২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি বইমেলা থেকে বের হওয়ার পর তাকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এসময় অভিজিৎতের স্ত্রী রাফিদা আহমেদ গুরুতর আহত হন। একই বছরে অভিজিৎ রায়ের বই প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপনকেও কুপিয়ে হত্যা করা হয় আজিজ সুপার মার্কেটে তার নিজ অফিসের ভেতর। ৩১ অক্টোবর হামলার শিকার হন প্রকাশনা সংস্থা শুদ্ধস্বরের মালিক আহমেদুর রশিদ টুটুল। ২০১৫ ও ১৬ সালে জঙ্গি হামলায় আরো নিহত হন অনন্ত বিজয়, ওয়াশিকুর, নামিজুদ্দিন সামাদসহ কয়েকজন ব্লগার, প্রকাশক ও লেখক।

এসব ঘটনায় মামলাগুলোর তদন্তে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে বার বার উঠে এসেছে আনসার আল ইসলামের নাম। এর মধ্যে ব্লগার রাজীব হত্যার বিচার হয়েছে। এ ছাড়া বেশিরভাগ হামলা মামলার তদন্তই এখনো শেষ হয়নি। নীরবে দেশ ছেড়ে গিয়েছেন নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা অনেক ব্লগার ও লেখক।

নিহতদের পরিবার বার বার বিচার ব্যবস্থার উদাসীনতাকে দায়ী করে আসছেন। এর মাঝে আবার বইমেলায় আইন শৃঙ্খলা বাহিনী ও বাংলা একাডেমির পক্ষ থেকে ধর্মীয় মতবাদ ও মুক্তচিন্তার লেখা নিয়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতেও দেখা গেছে। আর এসবের মধ্য দিয়েই উগ্রবাদীরা তাদের হামলা চালিয়ে যাচ্ছে অনায়াসে। এ যাত্রায় অধ্যাপক জাফর ইকবাল প্রাণে বেঁচে গেছেন। কিন্তু তিনি কি আদৌ নিরাপদ?

র‌্যাবের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ড. জাফর ইকবালের ওপর হামলাকারীর আদর্শিক পরিচয় নিশ্চিত হতে না পারলেও হামলার ধরণ দেখে তদন্ত চলছে। র‌্যাব বলছে, হত্যার উদ্দেশ্যেই জাফর ইকবালের ওপর হামলা হয়েছে। আর প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, যারা ঘটনাগুলো ঘটায়, তারা ‘ধর্মান্ধ’।

হামলাকারী যুবক ফয়জুল রহমান ওরফে ফয়জুল ওরফে শফিকুরকে আটকের পর পুলিশ সিলেট র‌্যাব-এর কাছে হস্তান্তর করেছে। এরপর র‌্যাব তাকে ঢাকা থেকে যাওয়া পুলিশের অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটের কাছে হস্তান্তর করেছে।

এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ জানান, হামলার ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আব্দুল গণিকে প্রধান করে গঠিত ওই কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন, রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম ও কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক শহিদুর রহমান।

মানবাধিকার কর্মী এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক নির্বাহী পরিচালক নূর খান বলেন, জাফর ইকবালের ওপর হামলার এ পর্যন্ত যে তথ্য পাওয়া গেছে তাতে আমরা মনে হয় এটা সারাবিশ্বে জঙ্গিদের একাকি হামলার যে নতুন ট্রেন্ড সেরকমই। তারা সাধারণত নিজেরাই উদ্বুদ্ধ হয়। তাদের কোনো লিংক থাকতেও পারে, নাও থাকতে পারে। সে যে উগ্রবাদী তাতে কেনো সন্দেহ নেই। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, সে আইএস না আল-কায়েদার ভাবধারার অনুসারী। সেটা আসলে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলেই জানা যাবে।

তিনি বলেন, এই ধরনের ছোট ধারালো অস্ত্র দিয়ে হামলার কারণ হলো, তারা মনে করে এতে হামলা সহজ হয় এবং সফল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। আর প্রকাশ্যে হামলার কারণ হল, তারা হামলা করে জানান দিতে চায় এবং ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করতে চায়। তারা যে কোনো পরিবেশে যেকোনো অবস্থায় হামলা করতে পারে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান জানান, ঢাকায় যে ঘটনাগুলো ঘটেছে তার তদন্তে বেশ অগ্রগতি আছে। এরইমধ্যে অভিজিৎ রায় ও প্রকাশক দীপন হত্যা মামলায় কয়েকজন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দু'জন এলজিবিটি কর্মী হত্যার ঘটনায়ও আসামি আটক আছে। আমরা জড়িতদের চিহ্নিত করতে পেরেছি। সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে।

সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের এডিসি (মিডিয়া) মোহাম্মদ আবদুল ওয়াহাব জানিয়েছেন, হামলার সময় সেখানে দায়িত্বে থাকা দুই কনস্টেবলকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। তদন্তে তাদের দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের গাফিলতি পাওয়া গেলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর সাবেক নির্বাহী পরিচালক সুলতানা কামাল বলেন, ব্লগাররা মুক্তমনা, তারা মুক্তচিন্তা করেন। তাই তাদের লেখায় অনেক ক্ষমতাবান স্বার্থান্বেষী মহলের আঘাত লেগেছে। তাই তারাই বিচার প্রক্রিয়া এবং তদন্তকে বাধাগ্রস্ত করছেন। তারা হতে পারেন প্রশাসনের, পুলিশের অথবা ক্ষমতা কেন্দ্রের। কিন্তু এটা মেনে নেয়া যায় না। তাদের ওপর ধর্মহীনতার নামে একটি লেবেল চাপিয়ে দিয়ে বিচার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। এটা সংবিধান এবং ন্যায়বিচার বিরোধী।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরর আইন ও অপরাধ বিজ্ঞানের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান বলেন, এসব ঘটনায় তদন্তের দীর্ঘসূত্রতা এবং বিচারহীনতা লক্ষ্যণীয়। আর এসব কারণে শেষ পর্যন্ত জঙ্গি বা অপরাধীরা অনেক ক্ষেত্রেই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। তদন্তের ক্ষেত্রে এক ধরণের অদক্ষতা এবং অনীহা আমরা দেখতে পাই। আর বিচারের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতার কারণ প্রচলিত আইনে বিচার হওয়া। এই ধরণের মামলার জন্য আলাদা ট্রাইবুন্যাল গঠন করে দ্রুত বিচার করা দরকার।

ফেমাসনিউজ২৪/আরএ/আরইউ