logo

বৃহস্পতিবার, ২৬ এপ্রিল ২০১৮ | ১৩ বৈশাখ, ১৪২৫

header-ad

'যে খাবার সন্তানকে খাওয়াব না, সে খাবার আমি বানাবও না'

মো. আখতারুজ্জামান | আপডেট: ১১ মার্চ ২০১৮

হক গ্রুপ, দেশের বিস্কুট বাজারে একটি পরিচিত নাম। ১৯৪৭ সালে তমিজুল হক এই হক গ্রুপ সৃষ্টি করেন। এখন সেই এই গ্রুপের ম্যানেজিং ডিরেক্টরের (ব্যবস্থাপনা পরিচালক) দায়িত্ব পালন করছেন তারই একমাত্র ছেলে আদম তমিজি হক।

তমিজি হক তার শৈশব থেকে শুরু করে হক গ্রুপ ও দেশের বিস্কুট ব্যবসার নানা বিষয়ে ফেমাসনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের এ প্রতিবেদকের সাথে কথা বলেছেন।

ফেমাসনিউজ : আপনার শৈশব কোথায় কেটেছে?

আদম তমিজি হক : ছোটকাল থেকে ঢাকা ও কলকাতায় সময় কেটেছে। এটা ছিল যখন আমার বয়স পাঁচ বা তার নিচে। পাঁচ বছর বয়সের পর থেকে ঢাকা ও ইংল্যান্ড। এভাবে চলে ৯ বছর পর্যন্ত। ৯ বছর বয়সের পর একেবারেই চলে ইংল্যান্ড। সেটা ছিল স্কুল জীবনের শুরু। তবে এর মাঝে বেশির ভাগ সময় কেটেছে রাজধানীর মগবাজার এলাকায়। আমরা ভাইবোন মিলে বাবার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সব বিজ্ঞাপন করতাম। সেদিক দিয়ে বলবো ছোট থেকেই আমরা পুরো পরিবার ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলাম। কারণ, আগে আমাদের পরিবার এবং কোম্পানি একখানেই ছিল, যার কারণে কোম্পানি থেকে দূরে থাকার সুযোগ ছিল না।

ফেমাসনিউজ : সেই সময়ের কোনো স্মৃতি মনে আছে, যা এখনো নাড়া দেয়?

আদম তমিজি হক : মনে পড়ে, পরিবারের সবাই মিলে কক্সবাজরের সৈকতের বালুতে খেলছিলাম। বালু খুঁড়ে দেখি একটি সিন্দুক। তার ভেতর হকের বিস্কুট লুকানো। সবাইল মিলে মজা করে বিস্কুট খাচ্ছিলাম। এটা ছিল হক বিস্কুটের বিজ্ঞাপন। পরে সেই বিজ্ঞাপন অনেক জনপ্রিয় হয়েছিল।

ফেমাসনিউজ : দেশের অনেক কোম্পানি বিস্কুট রফতানি করছে। রফতানি করতে যে সক্ষমতা দরকার, আমরা কি তা করতে পেরেছি? 

আদম তমিজি হক : আমি সব সময় বিদেশি কোম্পানিকে আমাদের দেশে স্বাগত জানাই। কারণ যারা বিদেশ থেকে আমাদের এখানে আসবে, তারা আমাদের চেয়ে ভালো করার চেষ্টা করবে- এটাই সাভাবিক। তখন আমরাও তাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে ভালো করব। এতে দেশের পণ্যের মান ভালো হবে। সেই সঙ্গে বিস্কুটের বাজারেও পরিবর্তন আসবে। আমি বিদেশে বিস্কুট রফতানি করতে গিয়ে যে বিষয়টির সম্মুখীন হয়েছি, তা হচ্ছে আমরা দেশে যারা বিস্কুট তৈরি করছি, তারা আসলে ম্যাস মার্কেটের জন্য বিস্কুট তৈরি করছি। আমার ইচ্ছ, সব সময় হাইএন্ড প্রডাক্ট (গুণগত মানের পণ্য) নিয়ে খেলার। আমাদের দেশে গুণগত মানের পণ্যের ভালো মার্কেট পাওয়া যায় না। তবে এখন আমাদের সময় এসেছে দেশে  প্রোডাক্ট প্রডাক্ট তৈরি করার। কারণ এটা দেশের মার্কেটে ভালো না চললেও আমরা যারা বিদেশে রফতানি করছি, তাদের জন্য ভালো হবে। অনেকেই হাইএন্ড প্রোডাক্ট তৈরি করার জন্য হাইএন্ড মেশিন এরই মধ্যে নিয়ে এসেছে। 

ফেমাজনিউজ : আমাদের দেশের লোকজন এখনো বিদেশি বিস্কুটকেই গুরুত্ব দেয়- বিষয়টি কীভাবে দেখবেন?

আদম তমিজি হক : আমরা জাপানি মেশিনে বিস্কুট তৈরি করে থাকি। কিন্তু এই মেশিন দিয়েই জাপানি কোনো কোম্পানি বিস্কু্ট তৈরি করে যদি আমাদের দেশে নিয়ে আসে, তাহলে আমরা সেটাকে লুফে নেই। কারণ জাপানের বিস্কুটের প্যাকেটের গায়ে লেখা থাকে মেডইন জাপান; আর আমার বিস্কুটের গায়ে থাকে মেডইন বাংলাদেশ। এটা আমাদের একটা মানষিক সমস্যা। এখান থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। 

ফেমাসনিউজ : দেশে বিস্কুটের বাজার এখন প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। প্রতিনিয়ত বাজার বড় হচ্ছে। তৈরি হচ্ছে ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা, বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?

আদম তমিজি হক : এখানে আমার পর্যবেক্ষণ আছে। যখন মানসম্পন্ন কোম্পানিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা তৈরি হয়, তখন ক্রেতারা উপকৃত হয়। আমরা খেলবো মান, কোয়ালিটি, মেশিন ও মার্কেট নিয়ে। আর কিছু লোক শুধু প্রাইজ বা মূল্য নিয়ে খেলবে- এটা আমি পছন্দ করি না। এটা যে কোনো পণ্যের জন্য খারাপ। আমার মার্কেটিং টিম সব সময় আমাকে বলে পণ্যের দাম কমাতে। আমি বলি, না, দাম কমলে মান ঠিক রাখা যাবে না। কারণ আমার কাছে যে জিনিস মজা লাগে না, তা আমি বানাবো না। আমার বাসায় একজন আমাকে বলছে, আপনার সন্তানকে আপনার তৈরি বিস্কুট খাওয়ান। আমি তাকে বলি এটা কোন ধরনের কথা? আমি একটা জিনিস বানাবো আর সেই খাবার আমার সন্তানকে খাওয়াবো না, তা আমি বানাবো কেন? আমি এই ব্যবসায় রাজি নই।

আমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা রয়েছে, হাইজেনিক ফ্যাটমুক্ত বিস্কুট তৈরি করা। আমি যদি এককভাবে হাইজেনিক ফ্যাট থেকে বেরিয়ে আসি, তাহলে হবে না। কারণ এভাবে বিস্কুট তৈরি করলে ১০ থেকে ২০ শতাংশ মূল্য বৃদ্ধি পাবে। মূল্য বৃদ্ধির কারণ হচ্ছে উৎপাদন থেকে শুরু করে মার্কেটে পৌছে দেয়ার প্রক্রিয়াও পরিবর্তন করতে হবে। বিদেশে গত পাঁচ বছর থেকে হাইজনিক ভ্যাট থেকে বেরিয়ে আসার কথা শুনে আসছি।

অনেক দেশই এটা করে থাকে। অনেক দেশেই এখন বিস্কুটকে ফাস্ট ফুড হিসেবে ধরা হয়। আমাদের দেশে এখনো সেভাবে আসেনি। আমরা বিস্কুটকে বিলাসিতার মধ্যেই রেখেছি। বাংলাদেশ হিউজ পপুলেড কান্ট্রি। আমাদের দেশ এখন একজন লোক প্রতিবছরে গড়ে এক দশমিক আট কেজি বিস্কুট খাচ্ছেন। তবে এটাকে বাড়ানো দরকার। এটার জন্য আমরা যারা বিস্কুট তৈরি করি, তাদেরও কিছু দায়িত্ব আছে। আমরা এখন দেশের ১৫ লাখ দোকানে আমাদের বিস্কুট দিয়ে থাকি। আমাদের এই দোকান সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে।

ফেমাসনিউজ : অনেক বড় বড় কোম্পানি বিস্কুট ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। এই অবস্থায় ছোট কোম্পানিগুলোকে টিকে থাকার জন্য কী দরকার বলে আপনি মনে করেন?

আদম তমিজি হক : ছোট কোম্পানিগুলোর কোনো সমস্যা হবে না। ছোট কোম্পানিগুলোর পণ্য কিন্তু পুরো দেশের জন্য নয়। তারা এলাকা নিয়ে খেলবে। তারা নিজস্ব পণ্য নিয়ে খেলবে। তারা বড় কোম্পানিগুলো পণ্য এবং পুরো দেশ নিয়ে খেললে সমস্যায় পড়ে যাবে। তবে কোয়ালিটি ঠিক রেখে তারা লোকাল এরিয়াকে টার্গেট করে ব্যবসা করলে ভালো করতে পারবে। অন্যথায় তাদের মার্কেটে টিকে থাকতে কষ্ট হবে।

ফেমাসনিউজ : বিস্কুট নিয়ে হক গ্রুপের নতুন পরিকল্পনা আছে?

আদম তমিজি হক : এ বছরে কিছু নতুন পণ্য বাজারে আনছি। যা চমক সৃষ্টি করবে বলে আশা করছি। তবে এখন পণ্যের নাম বলছি। না এটা গোপনই থাক। আমাদের পরিকল্পনা আছে ভবিষ্যতে হাইজিনিক ভ্যাটমুক্ত পণ্য করার চিন্তা আছে। আমাদের হাই কোয়ালিটির কিছু ইউনিক পণ্য বানাবো, যার দাম কিছুটা বেশি হবে। যেটা আসতে আসতে মার্কেট উন্নতি করবে।

ফেমাসনিউজ : কোন বিষয়টি আপনাকে সামাজিক দায়বদ্ধতার কাজে উদ্বুদ্ধ করে?

আদম তমিজি হক : ছোটকাল থেকেই সামাজিক দায়বদ্ধতার কাজে জড়িত। এটা আমার নেশাও বলতে পারেন। সামাজিক দায়বদ্ধতার কাজটা আমি একমাত্র আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্যই করে থাকি।

ফেমাসনিউজ : সময় দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

আদম তমিজি হক : আপনাকে এবং ফেমাসনিউজকেও ধন্যবাদ।

ফেমাসনিউজ২৪/আরআই/আরবি