logo

মঙ্গলবার, ১১ ডিসেম্বর ২০১৮ | ২৭ অগ্রহায়ণ, ১৪২৫

header-ad

ডানা ভাঙা বেসরকারি বিমান!

মাহতাব শফি | আপডেট: ১৩ মার্চ ২০১৮

দেশের বেসরকারি বিমান যাত্রীসেবা যখন বিশ্বের আকাশে স্বগর্বে ডানা মেলে উড়ছে, ঠিক তখনই গত সোমবার ঘটলো ভয়াবহ দুর্ঘটনা। এ দুর্ঘটনায় বিধ্বস্ত হয়েছে অনেক স্বপ্ন, হাসি এবং আনন্দ! নেপালের ত্রিভুবন এয়ারপোর্টে আগুনের লেলিহান শিখায় নিভে গেছে অনেক প্রাণ কিন্তু স্বজনহারাদের মনের আগুন নিভবে না কোনোদিনও, শেষ হবে না তাদের আর্তনাদ! বিধ্বস্ত বিমানে ছিলেন দম্পতি, সদ্য ফাইনাল শেষ করা মেডিকেল শিক্ষার্থী, ছিলেন ডাক্তার, ব্যবসায়ী কিংবা চাকরিজীবী।

গত সোমবার নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিমানবন্দরে ইউএস-বাংলা এয়ারের একটি বিমান বিধ্বস্ত হয়ে এ পর্যন্ত নিহত হয়েছেন অন্তত ৫০ জন। স্থানীয় সময় দুপুর সোয়া দুইটায় অবতরণের সময় বিধ্বস্ত হয় ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের একটি বিএস ২১১ নম্বর ফ্লাইটটি।

বিমানে থাকা ৬৭ যাত্রী ও ৪ ক্রু'র মধ্যে ৩৩ জন নেপালের নাগরিক। ধারণা করা হচ্ছে- যান্ত্রিক ক্রুটির কারণেই এ দুর্ঘটনা। ঘটনার পর প্রায় দুই ঘণ্টা বন্ধ ছিল ত্রিভুবন বিমানবন্দর। বাতিল করা হয় সব ফ্লাইট। ১৯৭২ থেকে এখন পর্যন্ত এই বিমানবন্দরে অন্তত ১৫টি ছোট-বড় বিমান দুর্ঘটনা হয়েছে।

ফ্লাইট রাডার২৪ বলছে, বিধ্বস্ত হওয়া বিমানটি ১৭ বছরের পুরনো। বিমানটি চার হাত ঘুরে ইউএস বাংলার বহরে যোগ হয়েছিল। আগে স্ক্যান্ডেনেভিয়ান এয়ারলাইন্স, রয়্যাল জর্দানিয়ান ও অগসবার্গ এয়ারওয়েজ বিমানটি ব্যবহার করেছে।

এর আগে ২০১৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর সৈয়দপুরে বিমানটি দুর্ঘটনায় পড়েছিল। বিমানটি ঝুঁকিপূর্ণ বলে ইউএস বাংলা কর্তৃপক্ষের কাছে জানা ছিল। এরপরও বিমানটির ফ্লাইট অব্যাহত রাখে ইউএস বাংলা ইয়ারলাইন্স। এমন দুর্ঘটনার পর বাংলাদেশে বিমান সংস্থাগুলোর দিকে আরেকবার ফিরে তাকানোর সময় হয়েছে। যাত্রী পরিবহনের নামে বিমানের মতো এতটা ঝুঁকিপূর্ণ পরিবহন সেবাখাতে কী করে চলছে বাংলাদেশে।

বাংলাদেশের প্রাইভেট বিমানগুলো জন্মের পর থেকে সোজা হয়ে কখনো দাঁড়াতে পারেনি৷ অনিয়ম-দুর্নীতি-চুরির খনি হিসেবে পরিচয় পেয়েছে, সুনামের সঙ্গে কখনো যাত্রী বহন করতে পারেনি, বহন করেছে দুর্নাম৷ বিভিন্ন সময়ে উড়োজাহাজ লিজ নেয়াকে কেন্দ্র করে নজিরবিহীন অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে৷

বিমান পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের অনেক বেসরকারি বিমান সংস্থার যথেষ্ট অর্থ না থাকায় ব্যাংক লোন নিয়েও ক্যাপিটাল মার্কেন থেকে অর্থ নিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। পুরনো লক্করঝক্কর বিমান নিয়ে চলছে চরম ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রী পরিবহন। বিমান বহরে লক্করঝক্কর বিমানই ভরসা। একটিরও কোনো মানসম্পন্ন বিমান নেই। কিছু টাকা যোগাড় করে মান নিয়ে কোনো চিন্তা না করেই বিমানে যাত্রী পরিবহন শুরু করেছে।

বিমান সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুরনো বিমান দিয়ে কোনো মতে যাত্রী বহন করছিল ইউএস-বাংলা কর্তৃপক্ষ। প্রথমবার দুর্ঘটনার পর তারা নামমাত্র এক সংবাদ সম্মেলন করে দায় সারে। কিন্তু বাংলাদেশ বিমান কর্তৃপক্ষ বা বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় ওই ঘটনার সঠিক কোনো তদন্ত করেনি।

উল্টো গত চার বছরে এই বেসরকারি বিমান কর্তৃপক্ষ অভ্যন্তরীণ রুটের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট পরিচালনার অনুমতি পেয়েছে। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, যশোর, সৈয়দপুর, কক্সবাজার, বরিশাল এই সাতটি রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করছে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স।

জানা গেছে, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স ২০১৪ সালের ১৭ জুলাই প্রথমে যশোর-ঢাকা-যশোর রুটে ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করে। বর্তমানে অভ্যন্তরীণ এসব রুটে দৈনিক ৩২টি ফ্লাইট চলাচল করছে। এ ছাড়া সাতটি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রুটেও ফ্লাইট চালু করেছে এই এয়ারলাইন্স।

উড়োজাহাজের তুলনায় রুটের সংখ্যা বেশি হওয়ায় ফ্লাইট শিডিউল প্রায়ই বিপর্যয় ঘটছে। বিশেষ করে বেশিরভাগ বিমানগুলোই পুরনো হওয়ায় কারিগরি ত্রুটি বেড়েছে। যাত্রীবোঝাই করে নির্ধারিত গন্তব্যের উদ্দেশ্যে উড়াল দেয়ার পর আকাশেও উড়োজাহাজে মাঝে মাঝে কারিগরি ত্রুটি দেখা দেয়ার ঘটনা ঘটেছে।

দেশের বিমান খাতে চরম বিশৃঙ্খলা চলছে বহু বছর ধরে। বিশেষ করে বেসরকারি বিমান খাত দেখার কেউ নেই। বেসরকারি বিমান খাতে হেলিকপ্টারের চাহিদা ও ব্যবহার যতটা বেড়েছে এর সংশ্লিষ্ট লোকবল সেভাবে বাড়েনি। হেলিকপ্টার চালনায় পাইলট ও প্রকৌশলী হিসেবে মূলত বিমানবাহিনী থেকে অবসরপ্রাপ্তরাই নিয়োগ পেয়ে থাকেন।

আর তাই প্রয়োজনের তুলনায় পাইলট ও প্রকৌশলীর সংখ্যা প্রায় অর্ধেক। মূলত বিশেষজ্ঞরা ছয়টি সমস্যাকে বড় করে দেখছেন। এগুলো হলো- রানওয়ে, হ্যাঙ্গার, ট্যাক্সিওয়ে, নেভিগেশন, ট্রাফিক সিস্টেম ও পুরনো বিমান।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বাংলাদেশ এয়ারলানইন্স বিশেষজ্ঞ ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক এয়ার কমোডর (অব.) ইশফাক ইলাহী চৌধুরী বলেন, একটি বিমান চলাচলের সঙ্গে অভ্যন্তরীণ ও বাইরের অনেকগুলো ফ্যাক্টর যুক্ত থাকে। এর একটিতে ঝামেলা হলে বিধ্বস্ত হতে পারে। একটি বিমান চালনার সঙ্গে বিমানের কারিগরি দিক, পাইলটের দক্ষতা ও বাইরের আবহাওয়া ঠিক থাকতে হয়। এর যেকোনো একটি ব্যত্যয় হলে দুর্ঘটনা ঘটে। বিমান দুর্ঘটনার জন্য বেশকিছু কারণ থাকে। দেখতে হয় বিমানটির কারিগরি দিক ঠিকমতো রক্ষণাবেক্ষণ হয়েছে কিনা। ইঞ্জিনিয়ারিং দিক ঠিক আছে কিনা। পাইলট কতটা দক্ষ ও মনোযোগী। ফ্লাইং পরিবেশ খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

এ বিশেষজ্ঞ বলেন, এয়ারলাইন্সগুলো বিমান রক্ষণাবেক্ষণে খরচ করতে চায় না। পুরনো বিমান দিয়ে কোনো মতে যাত্রী বহন করে। এসব বেসরকারি বিমান কর্তৃপক্ষের বিমান মেরামত বা সংস্কারের জন্য বিমানবন্দরে কোনো হ্যাঙ্গার নেই। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিদেশে বিমান মেরামত করতে হয়। এমনকি উড্ডয়নের আগে ছোটখাটো সমস্যা দেখা দিলেও বিমানবন্দরে সেগুলো মেরামত করতে পারেন না।

উড়োজাহাজ আমদানি নিয়েও সমস্যা রয়েছে- জানিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলেন, বাংলাদেশ সিভিল অ্যাভিয়েশনের ক্ষেত্রে ২০ বছর পুরনো যাত্রীবাহী, ৩০ বছর পর্যন্ত পণ্যবাহী ও ৩৫ বছর পর্যন্ত প্রশিক্ষণ বিমান আমদানির অনুমতি দিয়ে একটি আদেশ জারি আছে। কিন্তু আমদানি নীতিতে বা কোনো এসআরও দ্বারা পুরনো উড়োজাহাজ আনার ব্যাপারে কোনো দিকনির্দেশনা বা প্রজ্ঞাপন নেই। ফলে জটিলতা এড়াতে বেসরকারি বিমান কর্তৃপক্ষ পুরনো বিমান দিয়েই ফ্লাইট পরিচালনা করে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বাংলাদেশে বেসরকারি খাতে যাত্রীবাহী এয়ারলাইন্স ব্যবসা পরিচালনার অনুমতি দেয়া হয় সর্বপ্রথম ১৯৯৬ সালে। বেসরকারি খাতে যাত্রীবাহী অ্যাভিয়েশন ব্যবসার ২০ বছরের যাত্রায় এ পর্যন্ত মোট ৯টি এয়ারলাইন্স কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি পায়।

তবে অপেশাদারি মনোভাব, পুরনো উড়োজাহাজ দিয়ে ব্যবসা পরিচালনার পরিকল্পনা, অ্যাভিয়েশন ব্যবসায় অনভিজ্ঞতা, দুর্বল পরিচালনা, প্রতিকূল সরকারি নীতিসহ নানা প্রতিকূলতায় কৈশোর পেরুনোর আগেই বন্ধ হয়ে গেছে ছয়টি এয়ারলাইন্স। চালু থাকা রিজেন্ট, নভোএয়ার ও ইউএস-বাংলা অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করলেও এদের বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে।

এমনকি দক্ষ পাইলট ও বিমান সংশ্লিষ্টদের প্রশিক্ষণের সুযোগ কম বলেও জানান বিশেষজ্ঞরা। তাদের তথ্য অনুযায়ী, দেশে কমার্শিয়াল পাইলট ৬০০ জন। লাইসেন্সড ইঞ্জিনিয়ার আরো কম। একাডেমিক দুর্বলতা আছে। আমাদের অ্যাভিয়েশন সেক্টরে বিশ্ববিদ্যালয় নেই। প্রশিক্ষণের জন্য কোনো প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো নেই। বিমানের একটি ট্রেনিং ফ্যাসিলিটি আছে, কিন্তু সেটি না থাকার মতোই।

ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের মুখপাত্র ও জনসংযোগ শাখার মহাব্যবস্থাপক কামরুল ইসলাম জানান, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স যাত্রা শুরু করেছিল ২০১৪ সালের ১৭ জুলাই। সে সময় ৭৬ আসনবিশিষ্ট দুটি ড্যাশ৮-কিউ৪০০ এয়ারক্রাফট দিয়ে ঢাকা-যশোর ফ্লাইট পরিচালনার মাধ্যমে। শুরু থেকেই নিজস্ব ক্যাটারিং, নিজস্ব টেইলারিংসহ ইন-হাউজ ট্রেনিং সুবিধা, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ইন-ফ্লাইট সার্ভিস।
ফেমাসনিউজ২৪/এফএম/এমএম