logo

শুক্রবার, ১৭ আগস্ট ২০১৮ | ২ ভাদ্র, ১৪২৫

header-ad

‘রিও ইন্টারন্যাশনাল’-এর ২০ বছর পূর্তি উদযাপন

মো. হাবিবুর রহমান, জাপান থেকে | আপডেট: ২৫ জুলাই ২০১৮

জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হলো জাপানের অন্যতম ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ‘রিও ইন্টারন্যাশনাল’-এর ২০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে গত ২০ জুলাই শুক্রবার টোকিও’র একটি হোটেলে জাঁকজমক এক অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

জাপান প্রবাসীদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত যে ক’টি প্রতিষ্ঠান জাপানে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম ‘রিও ইন্টারন্যাশনাল’। ‘রিও ইন্টারন্যাশনালে’-এর বিশেষত্ব হলো- প্রবাসীদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত অন্য প্রতিষ্ঠান থেকে এটি আলাদা। প্রবাসীদের গতানুগতিক ব্যবসা থেকেও এ প্রতিষ্ঠানটি ভিন্ন।

‘কলিং কার্ড’ ব্যবসা দিয়ে শুরু হলেও বর্তমানে ‘রিও ইন্টারন্যাশনাল’ প্রসাধনী ব্যবসা সাফল্যের সঙ্গে করে যাচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি সন্তান স্নেহতুল্যে যিনি তিল তিল করে আজকের এ অবস্থানে নিয়ে এসেছেন তিনি হলেন জাপানি প্রবাসী হিমু উদ্দিন। জাপান প্রবাসীদের অতিপরিচিত মুখ হিমু উদ্দিন।

এদিকে প্রতিষ্ঠানটিকে আজকের এ অবস্থানে নিয়ে আসার পেছনে যার অবদানের কথা না বললেই নয়, তিনি হচ্ছেন হিরোকো কোবায়াশি। তিনি হিমু উদ্দিনের সহধর্মিণী। ১৯৯৫ সালে যার হাত ধরে হিমু উদ্দিনের জাপান আগমন, তিনি ‘রিও ইন্টারন্যাশনাল’-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট হিরোকো কোবায়াশি।

জাপানে আগমনের প্রথম দিকটা চাকরি দিয়ে শুরু হলেও স্বাধীনচেতা হিমু উদ্দিন ১৯৯৭ সালে হালাল ফুডের ব্যবসা শুরু করেন। এর মাধ্যমেই নিজের নামটি জড়িয়ে নেন ব্যবসায়ীর খাতায়। ব্যবসা শুরুর এক বছরের মাথায়ই প্রতিষ্ঠা করেন ‘রিও ইন্টারন্যাশনাল’ নামের এক কলিং কার্ড-এর ব্যবসা কোম্পানি। ‘রিও’ নামটি হিমু এবং হিরোকো দম্পতির প্রথম সন্তানের নাম থেকে নেয়া।

১৯৯৮ সালের ১৭ জুলাই ‘রিও ইন্টারন্যাশনাল’ প্রতিষ্ঠিত হয়। সেই হিসেবে গত ১৭ জুলাই ছিল ‘রিও ইন্টারন্যাশনাল’-এর ২০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ২০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে স্মরণীয় করে রাখতে ‘রিও ইন্টারন্যাশনাল’ জাঁকজমকপূর্ণ এক অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। গত ২০ জুলাই শুক্রবার টোকিওর অভিজাত এলাকা চিয়োদা সিটির ইইডাবাশি ‘হোটেল মেট্রোপলিটান এডমনট টোকিও’র ইয়াকিউ হলে জমকালো এ অভ্যর্থনা অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। বিগত দিনগুলোতে পথচলায় যাদের সান্নিধ্য এবং সঙ্গী হিসেবে পেয়েছে, তাদের প্রতি ভালোবাসা এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এবং একইসঙ্গে আশাবাদ ব্যক্ত করার প্রয়াস এ অনুষ্ঠানটি।

অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানে জাপানের বিভিন্ন করপোরেট কোম্পানির বিজনেস মার্চেন্ট, সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান ছাড়াও বিভিন্ন সুহৃদ উপস্থিত থেকে ‘রিও ইন্টারন্যাশনাল’-এর আতিথেয়তা গ্রহণ করেন। সহকর্মীদের নিয়ে অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানের নেতৃত্ব দেন রিও ইন্টারন্যাশনালের কর্ণধার (সিইও) হিমু উদ্দিন।

অনুষ্ঠান শুরু ঘোষণার প্রাক্কালে রিও ইন্টারন্যাশনাল-এর দীর্ঘ ২০ বছরের পথচলার ওপর একটি প্রামাণ্যচিত্র (স্লাইড শো) প্রদর্শন করা হয়। প্রামান্যচিত্র প্রদর্শন শেষে সিইও হিমু উদ্দিন আমন্ত্রিত অতিথিদের স্বাগত জানিয়ে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন। শুভেচ্ছা বক্তব্যে তিনি ‘রিও ইন্টারন্যাশনাল’-এর প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে বর্তমানের আদ্যোপান্ত সংক্ষিপ্ত আকারে তুলে ধরেন।

এরপর অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি জাপানে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত রাবাব ফাতিমাকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানান ‘ বক্তব্য রাখছেন রিও ইন্টারন্যাশনালের সিইও হিমু উদ্দিন। এ ছাড়াও ফুলেল শুভেচ্ছা জানানো হয় লাওক্স কোম্পানি লিমিটেড-এর প্রেসিডেন্ট ও সিইও লুও ইয়িওয়েন (Luo Yiwen, President & CEO, Laox Co., Ltd) এবং কসমোব্রিজ জাপান কোম্পানি লিমিটেড-এর প্রেসিডেন্ট জন এইচ সেও (John H, Seo, President Cosmobridge Japan Co., Ltd.) ও ‘রিও ইন্টারন্যাশনাল’-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট হিরোকো কোবায়াশিকে।

উল্লেখ্য, লাওক্স জাপানের করমুক্ত ( Duty Free Shop) বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নেতৃত্ব দিয়ে থাকে। জাপানব্যাপী প্রতিষ্ঠানটির ৭০টি শাখা রয়েছে। কসমোব্রিজ জাপান, জাপানে ভিওআপি ( VOIP) কোম্পানির মধ্যে অন্যতম সেরা একটি। তারা উভয়ে হিমু উদ্দিনের ব্যাসায়িক পার্টনার এবং ব্যক্তিগত জীবনে ঘনিষ্ঠ বন্ধুও। তাদের শুভেচ্ছা বক্তব্যেও তা ওঠে আসে।

শুভেচ্ছা বক্তব্যে রাষ্ট্রদূত রাবাব ফাতিমা ‘রিও ইন্টারন্যাশনাল’-সংশ্লিষ্ট সবাইকে শুভেচ্ছা ও ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ‘আজকের এ আয়োজনে জাপান-বাংলাদেশ ছাড়াও বিভিন্ন দেশের বহুজাতিক কোম্পানির প্রতিনিধিত্ব দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। আপনারা জানেন, বাংলাদেশ সরকার বিদেশি বিনিয়োগে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ইপিজেডসহ প্রবাসীদের বিনিয়োগেও বিভিন্ন সুবিধা রয়েছে। আপনারা সেই সুযোগ গ্রহণ করে জাপান-বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আরও উঁচুমাত্রায় নিয়ে যাবেন বলে আমি আশা প্রকাশ করি। আজকে আমি সেই আহবানই জানাতে চাই।’

শুভেচ্ছা বক্তব্যে লাওক্স কোম্পানি লিমিটেড-এর প্রেসিডেন্ট ও সিইও লুও ইয়িওয়েন ( Luo Yiwen, President & CEO, Laox Co.,Ltd)এবং কসমোব্রিজ জাপান কোম্পানি লিমিটেড-এর প্রেসিডেন্ট জন এইচ সেও ( John H,Seo, President Cosmobridge Japan Co., Ltd.) বলেন, ‘হিমু সাচোউ-এর সঙ্গে (জাপানে প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা বা কর্তা ব্যক্তিকে সাচোউ বলা হয়ে থাকে) আমাদের সম্পর্ক কেবল ব্যবসায়িক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ্ব নয়, আত্মার সম্পর্ক এবং পারিবারিকভাবেও বন্ধুত্ব রয়েছে। আশা করি, আমাদের এ সম্পর্ক ভবিৎষ্যতেও অটুট থাকবে। ‘রিও ইন্টারন্যাশনাল’-এর উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করি।’

অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানে লাওক্স কোম্পানি লিমিটেড-এর প্রেসিডেন্ট ও সিইও লুও ইয়িওয়েন ( Luo Yiwen, President & CEO, Laox Co., Ltd) এবং কসমোব্রিজ জাপান কোম্পানি লিমিটেড-এর প্রেসিডেন্ট জন এইচ সেও’কেও ( John H, Seo, President Cosmobridge Japan Co., Ltd.) ‘রিও ইন্টারন্যাশনাল’ পদকে (স্বর্ণপদক) ঘোষণা করা হয়। প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সিইও হিমু উদ্দিন তাদের উভয়ের হাতে এ পদক তুলে দেন।

সমাপনী বক্তব্যে হিমু উদ্দিন ‘রিও ইন্টারন্যাশনাল’-এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান ‘আইশোডো’র (AISHODO) বিস্তারিত তুলে ধরে বলেন, ‘আমার স্বপ্ন ছিল একজন সফল ব্যবসায়ী হওয়ার। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে কাজ করে যাচ্ছি। স্বপ্ন ছিল প্রসাধনী সামগ্রীর ব্যবসা করব। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে ‘রিও ইন্টারন্যাশনাল’-এর ( Ryo International) পাশাপাশি ‘আইশোডো’ (AISHODO) প্রসাধনী সামগ্রী উৎপাদনের একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলি।’

তিনি বলেন, ‘আইশোডো’ (AISHODO) আসলে আমার শখের স্বপ্নের বাস্তবায়ন বলতে পারেন। ছোটবেলা থেকেই ছিমছাম থাকতে পছন্দ করতাম। প্রসাধনী সামগ্রীর প্রতি ছিল প্রবল আকর্ষণ। স্বপ্ন দেখতাম আমিও যদি কোনো ব্রান্ডের প্রসাধনী-সামগ্রী কোম্পানির মালিক হতে পারতাম, তাহলে কতই না ভালো হতো। নিজেও ব্যবহার করতে পারতাম ইচ্ছেমতো।’

হিমু উদ্দিন বলেন, ‘রিও ইন্টারন্যাশনাল কো. লিমিটেড প্রতিষ্ঠা করার পর আমার ব্যবসায়িক চোখ খুলে গেছে। সেইসঙ্গে ছোটবেলার স্বপ্নটাও মনের কঠোরে বিশালভাবে নাড়া দিয়ে ওঠে। মনের ভেতর আরেক মন যে বলতে থাকে- আরে হিমু উদ্দিন, তুমি না প্রসাধনী সামগ্রীর প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে চেয়েছিলে? এই তো তোমার সুযোগ এসেছে। একটু চেষ্টা করে দেখ। তুমি পারবে। তোমাকে দিয়েই হবে। তবে শুরুটা করছো না কেন?’

সফল ব্যবসায়ী হিমু উদ্দিন বলেন, ‘আজ আমার বলতে দ্বিধা নেই ‘আইশোডো’ (AISHODO) প্রতিষ্ঠার সাফল্যের পেছনে আপনাদের সবার অবদান রয়েছে। বিশেষ করে আমি কৃতজ্ঞতা জানাতে চাই...(কয়েকটি নাম আসবে)।

তিনি বলেন, ‘আইশোডো’র (AISHODO) প্রসাধনী সামগ্রী বর্তমানে জাপানের বাজার জয় করে এশিয়ার অন্য দেশের বাজারগুলোতেও ব্যাপক চাহিদা পূরণ করে চলেছে। ‘আইশোডো’ (AISHODO) সামগ্রী এখন নিজস্ব ব্রান্ড আইটেম হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। আগামীতে ‘আইশোডো’ (AISHODO) বিশ্ব বাজারে বাজারজাত করার জন্য কাজ করে যাচ্ছি। আপনাদের সহযোগিতা ও সমর্থন আমাদের একান্ত প্রয়োজন। আশা করি, বিগত দিনগুলোর মতো আপনাদের সহযোগিতার হাত অব্যাহত থাকবে।’

‘আইশোডো’ (AISHODO) সামগ্রীর সফলতার পেছনের কারণ সম্পর্কে হিমু উদ্দিন বলেন, ‘আইশোডো’ (AISHODO) সামগ্রী জাপানি প্রযুক্তি ব্যবহার করে। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জাপান সরকারের ছাড়পত্র নিয়ে বাজারজাত করা হয়ে থাকে। এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে এক থেকে দেড় বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায়।’

তিনি বলেন, ‘১৩ বছর আগে ‘আইশোডো’ (AISHODO) প্রতিষ্ঠা পেলেও বিভিন্ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সময় লেগে যায়। এর মধ্যে বিভিন্ন ল্যাবে পণ্য পরীক্ষার গুণগত মান, মানবদেহের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, ভোক্তাদের ক্রয়-ক্ষমতা মোটকথা সব কিছুরই সার্বিক বিবেচনায় অনুকূলে এলে তবেই জাপান সরকার থেকে বাজারজাত করার অনুমতি মেলে। ২০০৮ সাল থেকে ‘আইশোডো’ (AISHODO) পণ্য প্রথম জাপানের সীমিত আকারে কেবল বড় বড় ডিপার্টমেন্টাল স্টোরগুলোতে বিক্রি শুরু হয়। এরপর ডিউটি ফ্রি শপগুলোতে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বিক্রির উদ্যোগ নেয়া হয়। বর্তমানে জাপানের বাজার ছাড়িয়ে এশিয়ার অন্য দেশগুলোর বাজারেও ব্রান্ড আইটেম হিসেবে ব্যাপক সমাদৃত। বিশেষ করে চীন, ভিয়েতনাম, ফিলিপিন্সসহ কয়েকটি দেশের নাম আসবে।

‘আইশোডো’র (AISHODO) উৎপন্ন পণ্যের বর্ণনা দিয়ে হিমু উদ্দিন বলেন, ‘আইশোডো’ (AISHODO) মেইনলি হেলথ প্রোডাক্ট এবং প্রসাধনী সামগ্রী উৎপন্ন করে থাকে। কেবল হেলথ প্রোডাক্ট সামগ্রীর ১০০টিরও বেশি পণ্য বর্তমানে বাজারজাত করা হচ্ছে। প্রসাধনী সামগ্রী রয়েছে তারও বেশি। এর সবই জাপানে উৎপন্ন হচ্ছে। এ ছাড়াও রয়েছে নিত্য ব্যবহার্য যেমন- হাত ব্যাগ, ভ্যানিটি ব্যাগ, হাতঘড়ি, পোশাক-সামগ্রীসহ বিভিন্ন পণ্য। এসব নিজস্ব প্রযুক্তিতে উৎপাদন করা হয়।’

আপ্যায়ন চলাকালীন একপর্যায়ে মারুযেন ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি লিমিটেড-এর প্রেসিডেন্ট ইয়াশিহিরো হিগুরাশি (Yasahiro Higurashi,President Maruzen Pharmaceuticals Co.,Ltd) ‘রিও ইন্টারন্যাশনাল’-এর অগ্রযাত্রার সাফল্য কামনা করে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন।

‘রিও ইন্টারন্যাশনাল’-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট হিরোকো কোবায়াশি ২০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথিদের ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।

বিভিন্ন কোম্পানির দুই শতাধিক অতিথি ২০ বছর পূর্তি আয়োজনে আপ্যায়িত হন। সবাইকে ‘রিও ইন্টারন্যাশনাল’-এর পক্ষ থেকে উপহার সামগ্রীর একটি করে প্যাকেট দেয়া হয়।
ফেমাসনিউজ২৪.কম/আরআই/আরবি