logo

বুধবার, ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮ | ৪ পৌষ, ১৪২৫

header-ad

জনসংযোগে নির্ধারিত কোনো ছুটি নেই : আসাদুজ্জামান

মো. আখতারুজ্জামান | আপডেট: ২৩ অক্টোবর ২০১৮

এ এফ এম আসাদুজ্জামান। সাংবাদিকদের মাঝে আসাদ ভাই নামে পরিচিত তিনি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক মহাব্যবস্থাপক। ১৯৫৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর মুন্সিগঞ্জ জেলার লৌহজং থানার কলমা গ্রামে এক মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ (অনার্স), এমএ এবং এলএলবি সম্পন্ন করেন আসাদুজ্জামান।

১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকে যোগ দেন তিনি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জনসংযোগ ও প্রকাশনা বিভাগ এবং গভর্নর সচিবালয়ের প্রটোকলের দায়িত্ব পালন করেন এ এফ এম আসাদুজ্জামান। দীর্ঘদিন গভর্নর সচিবালয়ের দায়িত্ব পালনকারী অভিজ্ঞ এ জনসংযোগ কর্মকর্তা তার কার্মজীবনের নানাদিক নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন ফেমাসনিউজের এ প্রতিবেদকের সাথে।

জনসংযোগ পেশার চ্যালেঞ্জের বিষয়ে আসাদুজ্জামান বলেন, জনসংযোগ পেশার চ্যালেঞ্জ কি তা এককথায় প্রকাশ করা কঠিন। এ পেশায় নানাদিক থেকে চ্যালেঞ্জগুলো আসে- নিজের প্রতিষ্ঠানের ভেতর, বাইর, স্টেকহোল্ডার। তবে প্রতিষ্ঠান ভেদে চ্যালেঞ্জের ধরণ পরিবর্তন হয়ে থাকে। বেসরকবারি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ধরণটা একরকম আবার সরকারি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে আরেক রকম। আবার বিদেশি কোনো মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জের জায়গাটা আরেক ধরনের হবে এটাই সাভাবিক। একজন জনসংযোগকর্মীকে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে সফল হতে হয়।

কর্মজীবনে নিজের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমার কর্মজীবনে অনেক চ্যালেঞ্জ ছিল। তবে অনেক বললে তা কম বলা হবে। তার মধ্যে থেকে যদি একটি ঘটনার কথা বলি, তাহলে এভাবে বলতে হয়- সেদিন ছিল বৃহস্পতিবার। রাত ১১টা। আমি রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে ছিলাম। কাজের খাতিরে প্রায় সময় প্রেসক্লাবে গভীর রাত পর্যন্ত থাকতে হয়েছে।

'এরই মধ্যে ব্যাংকের গভর্নর ও ডিপুটি গভর্নর স্যার আমাদের জনসংযোগ বিভাগের প্রধানকে খুঁজছিলেন। তখন কোনো মোবাইল ফোন ছিল না। তার বাসায় গাড়ি পাঠানো হয়। পরিবারের লোকজনও তার বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে পারছিলেন না। এমনকি ব্যাংকের অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও তার বিষয়ে বলতে পারছিলেন না। এমন অবস্থায় আমার ড্রাইভার একজনকে বললেন, আসাদুজ্জামান স্যার প্রেসক্লাবে আছেন। আমি যে প্রেসক্লাবে আছি তা শুধু আমার ড্রাইভারই জানত। তখন গভর্নর স্যার বললেন, জনসংযোগ বিভাগের প্রধানকে লাগবে না, আসাদকে নিয়ে আস'।

আসাদুজ্জামান বলেন, আমার কাছে ব্যাংকের গাড়ি আসলো, আমাকে ব্যাংকে যেতে হবে। তখন রাত ১১টা। আমি ব্যাংকে চলে যাই। ব্যাংকের ডিউটি অফিসার বললেন- স্যার, আমরা তো আপনাদের সন্ধ্যার পর থেকে খুঁজছি। জানতে পারলাম, পরের দিন শুক্রবার সকালে গুরুত্বপূর্ণ একটি সেমিনার হবে। সেমিনার মানেই বিশাল কর্মযজ্ঞ। সেমিনার রুমের আয়োজন, কর্মসূচি তৈরি করা, অতিথি ও সংবাদিকদের আমন্ত্রণ প্রেরণ, প্রেস রিলিস তৈরিসহ অনেক কিছুই করতে হয়।

তিনি বলেন, পরে ডিউটি অফিসার আমাকে ফোনে গভর্নর স্যারকে ধরিয়ে দিল। তিনি যখন জানতে পারলেন যে, আমি একজন জুনিয়র কর্মকর্তা, তখন তিনি আমার বিভাগের মহাব্যবস্থাপকের বিষয় জানতে চাইলেন। আমি বললাম, তিনি আজ সন্ধ্যায় ঢাকার বাইরে গেছেন। এটা শোনার পর তিনি রাগ করলেন। কারণ বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কোথাও যাওয়ার ক্ষেত্রে একটা নিয়ম মানতে হয়। তা হলো কর্মস্থল থেকে একটা নির্দিষ্ট দূরত্ব অতিক্রম করলে তাকে ব্যাংক বা অফিসের অনুমতি নিতে হয়। কিন্তু তারা অনুমতি না নিয়েই যার যার মত ঢাকার বাইরে ঘুরতে চলে যান। গভর্নর স্যার আমাকে বললেন, আগামীকাল সকালে একটা অনুষ্ঠান আছে। এটা অর্থমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন। সেখানে সব ব্যাংকের এমডি, সিও এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সিওরা থাকবেন। আপনি কি পারবেন এটার আয়োজন করতে? আমি স্যারকে বললাম, আমাকে কি কি করতে হবে? বিস্তারিত শোনার পর আমি বললাম, পারবো স্যার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক এ মহাব্যবস্থাপক বলেন, পরে রাত সাড়ে এগারোটা থেকে সাংবাদিকদের ফোন ও ফ্যাক্স দেয়া শুরু করলাম। সাংবাদিকরা আমাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বললেন, আসাদ ভাই আপনি যে এত গুরুত্বপূর্ণ একটা প্রোগ্রামের সংবাদ দিলেন, ভালো কাজ করেছেন। সেদিন আমি প্রত্যেক সাংবাদিকের কাছ থেকে বাহবা পেয়েছিলাম।

আসাদুজ্জামান বলেন, রাত তিনটা পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের মূলভবনের তৃতীয় তলায় বসে কাজ করলাম। এখন যেরকম কনফারেন্স রুম তখন তো এমন ছিল না। ডেকোরেটর থেকে মাইক নিয়ে কনফারেন্স রুম সাজিয়ে সব কাজ শেষ করে ভোর রাতে বাসায় ফিরি। বাসায় গিয়ে গোসল ও নাস্তা সেরে আবার ব্যাংকে চলে আসি। দেখতে থাকি প্রোগ্রামের সবকিছু ঠিকঠাক আছে কিনা। পরে সকাল ৯টায় উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এসে অবাক হয়ে যান। এত কম সময়ের মধ্যে এতকিছু কীভাবে সম্ভব হল? তবে এ কাজটা আমি একা করিনি, আমার বিভাগ এবং ব্যাংকের অন্যান্য বিভাগ আমাকে সহযোগিতা করেছে। জনসংযোগ বিভাগে নির্দিষ্ট কোনো অফিস সময় নেই- এটা তার উদাহরণ।

অন্যান্য বিভাগে সরকারি ছুটি ও সাপ্তাহিক ছুটি থাকলেও জনসংযোগে নেই জানিয়ে তিনি বলেন, এটা বুঝাতে গেলে আরেকটা ঘটনার কথা বলতে হয়। সেই ঘটনাটাই বেশি মনে পড়ে। সেই সময় ডিপুটি গভর্নর ছিলেন এম আর খান। কোরবানির ঈদের নামাজ পড়ে বাড়িতে এসেছি। বাড়ির বড় ছেলে হওয়ায় কোরবানির পশু জবাইয়ের কাজটা বাবা আমাকে দিয়েই করাতেন। আধা ঘণ্টা পর কোরবানি হবে। এমন সময় ব্যাংক থেকে আমার মোবাইলে কল আসে, এখনি অফিসে যেতে হবে।

'বাংলাদেশ ব্যাংকের জনসংযোগ কর্মকর্তা হিসেবে আমি প্রথম মোবাইল ব্যবহার করি। ডেপুটি গভর্নর স্যার কল করে আমার জন্য ব্যাংক থেকে গাড়ি পাঠিয়ে দেন। পশু কোরবানির ভার বাবাকে দিয়ে ব্যাংকে চলে আসি। ব্যাংকে গিয়ে দেখি, কোরবানির পশুর চামড়া কেনার জন্য ব্যাংকগুলো ব্যবসায়ীদের যে বিশেষ ঋণ দিয়েছে তা ফলাও করে রেডিও ও টেলিভিশনে প্রচারের ব্যবস্থা করতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকে আমাদের ওপর এ প্রচারের নির্দেশনা আসে'।

আসাদুজ্জামান বলেন, সবাই যখন ঈদের আনন্দ-ফূর্তি করছে আমি তখন বাংলাদেশ ব্যাংকে বসে মিডিয়ায় ফ্যাক্সের মাধ্যমে নিউজ দিচ্ছি। সব টিভি এবং রেডিওতে সেই খবর প্রচার হচ্ছে কিনা তা পর্যবেক্ষণ করছি। এ হলো জনসংযোগের কাজ। তবে এ পেশায় যেমন চাপ আছে তেমনি আছে স্বাচ্ছন্দবোধ। এ পেশাকে নিজের মত করে নিতে পারলে ভালো করা সম্ভব।
ফেমাসনিউজ২৪/এফএম/এমএম