logo

সোমবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৮ | ৫ অগ্রহায়ণ, ১৪২৫

header-ad

মোনাজাত উদ্দিনের পাঁচ পয়সার নিউজে আলোড়ন

মো. আখতারুজ্জামান | আপডেট: ২৯ অক্টোবর ২০১৮

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মচারীরা মাস শেষে যে পাঁচ পয়সা বেতন পেতেন সেই নিউজ করে পুরো দেশের ব্যাংকিং খাতে আলোড়ন সৃষ্টি করছিলেন সাংবাদিক মোনাজাত উদ্দিন। সেই সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের জনসংযোগ বিভাগে কর্মরত ছিলেন এএফএম আসাদুজ্জামান। তিনিই ছিলেন মোনাজাত উদ্দিনের সেই নিউজের তথ্য প্রদানকারী। ফেমাসনিউজের এ প্রতিবেদকের সাথে সেই নিউজের পেছনের তথ্য নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন আসাদুজ্জামান।

সাংবাদিক মোনাজাত উদ্দিনকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করে আসাদুজ্জামান বলেন, মোনাজাত উদ্দিন ভাইয়ের স্মৃতি বলে শেষ করা যাবে না। তিনি ছিলেন একজন আদর্শবান সাংবাদিক। তার সাথে আমার গভীর সম্পর্ক ছিল। একটা সময় তিনি আমার পরিবারের সদস্যের মত ছিলেন। আমরা তখন ভাড়া বাসায় থাকতাম। তিনি প্রতিদিন আমাদের বাসায় আসতেন। আমরা প্রায় দিনই একসাথে দুপুরের খাবার খেতাম। তিনি আমাকে ফোন দিয়ে বলতেন- আজ দুপুরে তোমাদের ওখানে খাব। আমি বলতাম কি খাবেন ভাই? মোনাজাত ভাই বলতেন- তোমরা যা খাও তাই খাব। আমি বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্যান্টিন থেকে দুপুরের খাবার আনাতাম। এ খাবার খেয়ে তিনি মজা করতেন। তার সাথে অনেক গল্প করতাম। তিনি কোনোদিন আমার কাছে কোনো তথ্য চাননি। তবে গল্পের ফাঁকে তিনি তার তথ্য নিয়ে নিতেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক এ কর্মকর্তা বলেন, এমন অনেক ঘটনাই আছে, তিনি নিউজ করার পর জানতে পেরেছি- এ তথ্য গল্পের সময় তিনি সংগ্রহ করেছেন। তিনি এক-দুদিন পর পর এসেই বলতেন যে, আসাদ দৈনিক সংবাদ দেখেছেন? আমি বলতাম কি হয়েছে ভাই? পত্রিকাটি সংগ্রহ করে দেখি, বাংলাদেশ ব্যাংকের একটা সুন্দর রিপোর্ট হয়েছে। তেমন একটি রিপোর্ট হলো- বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মচারীরা মাস শেষে পাঁচ পয়সা বেতন পায়। এ খবর দৈনিক সংবাদের প্রথম পাতায় স্বচিত্র প্রতিবেদন ছাপানো হয়। আমি নিজেও জানতে পারিনি যে, তিনি আমার কাছে এ তথ্য নিয়েছেন।

'তবে তাকে আমি এমন এটা গল্প বলেছিলাম সেটা থেকে বুঝেছি। আমিই যে এ খবরের তথ্যদাতা। যদিও পরবর্তীতে তিনি কোনোদিন আমাকে বলেননি যে, এ সংবাদের তথ্য প্রদানকারী আমিই ছিলাম। আমার সাথে গল্প করতে করতে জেনেছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মচারীরা পাঁচ পয়সা বেতন পান। কর্মকর্তারা ব্যাংক থেকে বিভিন্ন ঋণ নিতেন। সেই ঋণের টাকা মাস শেষে তার বেতন থেকে কেটে নেয়া হত। যার ফলে সব টাকা কেটে নেয়ার পর তাদের কাছে থাকতো মাত্র পাঁচ পয়সা। সেই সময় শত শত কর্মচারী ছিলেন যারা মাস শেষে লোন পরিশোধের পর পাঁচ পয়সা বেতন পেতেন। শুধু তাই নয়, তারা পরিবারের খরচ যোগাতে রাজধানীর জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের সামনে হকারি করতেন'।

আসাদুজ্জামান বলেন, মোনাজাত উদ্দিন ভাই আমার কাছে গল্পের ফাঁকে পাওয়া তথ্যের ওপর অনুসন্ধান করতেন। যেসব কর্মচারী এমন সমস্যায় ছিলেন তাদের নাম, পদবী ও ঠিকানা সংগ্রহ করেন। ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করেন। কর্মচারীদের সাথেও কথা বলেন। তারা যেখানে হকারি করতেন সেখানেও গিয়েছেন। গভর্নরের মন্তব্য নিয়ে দৈনিক সংবাদের প্রথম পাতায় ছবিসহ খবর ছাপা হল। সেই খবরে সব ব্যাংকে আলোড়ন সৃষ্টি হল যে, বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মচারীরা মাত্র পাঁচ পয়সা বেতন পান। মোনাজাত উদ্দিন ভাই যে একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিক সেদিন হাড়ে হাড়ে টের পেলাম। এ খবরের তথ্য প্রদানকারী হিসেবে আমার কিন্তু কোনো ক্ষতি হয়নি। এমনকি বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো কর্মচারী বা কর্মকর্তার ক্ষতি হয়নি।

উল্লেখ্য, প্রথিতযশা সাংবাদিক মোনাজাত উদ্দিন আশির দশকে মফস্বলে সাংবাদিকতা শুরু করেন। পরবর্তীতে চারণ সাংবাদিক হিসেবে জনপ্রিয়তা লাভ করেন তিনি। সাংবাদিকতায় বিশেষ অবদানের জন্য ১৯৯৭ সালে মরণোত্তর একুশে পদক লাভ করেন। ১৯৪৫ সালের ১৮ জানুয়ারি রংপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন মোনাজাত উদ্দিন। ১৯৯৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন তিনি।
ফেমাসনিউজ২৪/এফএম/এমএম