logo

বুধবার, ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮ | ৪ পৌষ, ১৪২৫

header-ad

শম্ভুর হাতে নৌকার হাল, বিএনপিতে জট

বরগুনা প্রতিনিধি | আপডেট: ০২ নভেম্বর ২০১৮

বরগুনা সদর-আমতলী-তালতলী নিয়ে গঠিত জাতীয় সংসদের ১০৯ নম্বরের আসনটি। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে প্রার্থী নির্বাচনে মোটামুটি নির্ভার আওয়ামী লীগ। একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশী থাকলেও বরগুনা-০১ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী একজনই বলা চলে। মতবিরোধ থাকলেও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এ আসনে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ অনেক আগে থেকেই শক্তভাবে মাঠে রয়েছে।

এ আসনে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থী, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি, চারবারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু। ধারাবাহিকভাবে চারবার নির্বাচিত হওয়ার পাশাপাশি অবহেলিত জনপদ বরগুনাকে আধুনিক বরগুনায় রূপান্তরে মুখ্য ভূমিকা পালন করার কারণে দলের নেতাকর্মী থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত প্রায় সবাই তাকেই এখানে নৌকার প্রার্থী মনে করছেন। নেতাকর্মীদের সাথে কথা বলে এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত দুই যুগের বেশি সময় ধরে তিনিই এখানকার রাজনীতির শেষ কথা।

তিনি তার নির্বাচনী এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা, চিকিৎসাসেবা, শিক্ষাব্যবস্থা এবং বিদ্যুৎ পরিস্থিতির অভূতপূর্ব উন্নয়ন ঘটানোসহ, গত দশ বছরে অসংখ্য উন্নয়নকাজ করেছেন। তালতলীতে জাহাজ নির্মাণ শিল্প, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, আমতলী-পুরাকাটা পয়েন্টে পায়রা সেতুর নির্মাণকাজ সহ বেশ কিছু অকল্পনীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তাঁর তত্ত্বাবধানে শুরু হয়েছে।

এ আসনে বিএনপির বলার মতো অবস্থান না থাকলেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুককে কেন্দ্র করে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। তবে এ আসনে মনোনয়নের আশায় জোর প্রচারণায় নেমেছেন বর্তমান সাংসদসহ জেলা আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা। মনোনয়ন নিয়ে বিএনপিতেও আলোচনায় রয়েছেন একাধিক নেতা।

বরগুনা আমতলী এবং তালতলীর ২৪টি ইউনিয়ন ও ২টি পৌরসভা নিয়ে গঠিত বরগুনা-০১ আসন। বর্তমানে এখানে মোট ভোটার ৪ লাখ ১৪ হাজার ২৩৮ জন। ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে এই আসনে সাংসদ নির্বাচিত হন জেলা আওয়ামী লীগ এর সভাপতি ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু।

২০০১ এর নির্বাচনে এখান থেকে নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগ এর বিদ্রোহী প্রার্থী, বর্তমান জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. দেলোয়ার হোসেন। নবগঠিত বরগুনা-০১ আসনে ২০০৮ এবং ২০১৪ এর নির্বাচনে এখান থেকে পুনরায় পরপর দুইবার সাংসদ নির্বাচিত হন জেলা আওয়ামী লীগ এর সভাপতি ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু। তিনি আওয়ামী লীগ এর বিদ্রোহী প্রার্থী মো. দেলোয়ার হোসেনকে বিপুল ভোটে পরাজিত করেন টানা দুই মেয়াদে।

জেলা আওয়ামী লীগ এর নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এই আসনে আওয়ামী লীগের সম্ভব্য প্রার্থী ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু। তবে তিনি ছাড়াও আওয়ামী লীগ থেকে এই আসনে মনোনয়নের আলোচনায় রয়েছেন গত তিনটি জাতীয় নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়া মো. দেলোয়ার হোসেন, জেলা আওয়ামী লীগ এর সাধারণ সম্পাদক মো. জাহাঙ্গীর কবির, সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম সরোয়ার টুকু, জেলা আওয়ামী লীগ এর সদস্য গোলাম সরোয়ার ফোরকান, সাবেক পৌর মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগ এর সদস্য অ্যাড. মো. শাহজাহান মিয়া এবং জেলা আওয়ামী লীগ এর সদস্য এস এম মশিউর রহমান শিহাব। তবে দলের নেতাকর্মীরা মনে করেন, সাংসদ শম্ভুর বাইরে দল থেকে এখানে যারা মনোনয়ন চাইবেন, তাঁরা নিজেরাই ততটা আশাবাদী নন মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে।

এ প্রসঙ্গে সাংসদ শম্ভু বলেন, বরগুনার জনগণকে সাথে নিয়ে এখানে আওয়ামী লীগকে গোপালগঞ্জ এর মতো শক্তিশালী করেছি। বরাবরের মতো এবারেও নৌকাই এখানে জিতবে ইনশাআল্লাহ্ এবং বরগুনার জনগন আমাকে আবারও তাদের এমপি হিসেবে দেখতে চায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ সদিচ্ছায় গত দশ বছরে এখানে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে, গত ২৭ অক্টোবর তালতলী সফরে তিনি বেশ কিছু উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন করেছেন। আরো বেশ কিছু মেগা উন্নয়নমূলক কার্যক্রম চলমান আছে, যা বাস্তবায়ন হলে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই বরগুনার চিত্র আমূল বদলে যাবে। এখানে পায়রা এবং বিষখালী নদীর উপরে দুটি বৃহৎ সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে, বিদ্যুৎকেন্দ্র হচ্ছে, জাহাজ নির্মাণ শিল্প হচ্ছে, নৌবাহিনীর সুবিশাল ঘাঁটি হচ্ছে।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার ঐকান্তিক ইচ্ছায় বরগুনা পটুয়াখালীকে ঘিরে সিঙ্গাপুরের আদলে একটি বিশাল পর্যটন অঞ্চল গড়ে তোলা হচ্ছে, একাধিক ইকোনেমিক জোন তৈরির প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

মনোনয়ন নিয়ে কথা বলতে চাইলে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর কবির বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর বরগুনায় ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। দীর্ঘদিন সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করে দলকে সংগঠিত করে গেছি। দল মনোনয়ন দিলে আমি বিপুল ভোটে নির্বাচিত হব।

এ প্রসঙ্গে, জেলা আওয়ামী লীগ এর সহ-সভাপতি প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা মোসলেম আলী শরীফ বলেন, সাংসদ ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুর বিকল্প এখানে আওয়ামী লীগে কেউ নেই। আগামী নির্বাচনে সাংসদ শম্ভু বিপুল ভোটে বিজয়ী হবেন— এটাই প্রত্যাশা করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীসহ সাধারণ ভোটাররা। বরগুনা পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও পৌর মেয়র শাহাদাত হোসেন বলেন, ভোটের রাজনীতিতে বর্তমান এমপি শম্ভুই সবার চেয়ে এগিয়ে। তাছাড়া বরগুনার উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন তার হাত ধরেই হয়েছে। তাই বরগুনার উন্নয়নের চাকা সচল রাখতে শম্ভুর বিকল্প নেই।

আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুর পর এখানে আলোচনায় রয়েছেন সাবেক সাংসদ, বর্তমানে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, মো. দেলোয়ার হোসেন। এর বাইরে এ আসনে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় আছেন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সহ সাংগঠনিক সম্পাদক এবং জেলা আওয়ামী লীগ এর সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম সরোয়ার টুকু। পাশাপাশি আলোচনায় আছেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপকমিটির সাবেক সহ-সম্পাদক ও জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য এস এম মশিউর রহমান শিহাব। তবে জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতৃবৃন্দের অভিযোগ, শিহাব এক সময় বিএনপি ঘরানার রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। এ ছাড়া সার্টিফিকেট জালিয়াতির মাধ্যমে তিনি উচ্চতর শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জন করেছেন, এমন অভিযোগ নেতাকর্মীদের অনেকের। এর বাইরে এখানে প্রার্থী হিসেবে যাদের নাম উচ্চারিত হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে নির্বাচনে জিতে আসার মতো তাদের কারোরই জনসমর্থন কিংবা ব্যক্তি ইমেজ নেই।

এ প্রসঙ্গে জেলা আওয়ামী লীগ এর সাংগঠনিক সম্পাদক মনিরুজ্জামান নসা বলেন, উচ্চাকাঙ্ক্ষী কেউ কেউ দলের ভেতর বিভক্তি ঘটিয়ে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করলেও তাদের সেই অপচেষ্টা বর্তমানে স্তিমিত হয়ে পড়েছে। বর্তমানে এখানে আওয়ামী লীগ পূর্বের যে কোনো সময়ের তুলনায় সংগঠিত। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী নির্বাচনেও বর্তমান সাংসদ ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুই আওয়ামী লীগের প্রার্থী হবেন এবং এখানকার মানুষ তাঁকে আরও একবার নির্বাচিত করে জননেত্রী শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করবে।

বরগুনা- ১ আসনে আওয়ামী লীগের তুলনায় বিএনপির অবস্থান ততটা সবল নয়। তবে এ আসনে জিতে আসতে এবার তারা মরিয়া। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচন ছাড়া এ আসনে বিএনপির প্রার্থী কখনো জয়ী হতে পারেন নি। নেতাকর্মীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, আগামী সংসদ নির্বাচনে এখান থেকে বিএনপির মনোনয়ন চাইবেন, কেন্দ্রীয় বিএনপির সদস্য, সাবেক সাংসদ মো. মতিউর রহমান তালুকদার। তিনি দাবি করেন, স্থানীয় নেতাকর্মীদের কাছে তিনি জনপ্রিয়। তাই দল তাঁকেই মনোনয়ন দেবে। জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি, মাহাবুবুল আলম ফারুক মোল্লাও আগামী সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন চাইবেন। তিনিও নিজেকে বিএনপির যোগ্য প্রার্থী হিসেবে দাবি করেন।

তিনি বলেন, কিছু লোক বিএনপিতে ঢুকে দলের ক্ষতি করছে। বিএনপিতে এসে কখনো তারা কোনো আন্দোলন সংগ্রামে মাঠে নামেননি। দুর্দিনে তাদের পাওয়া যায় না। ঢাকায় বসে তারা রাজনীতি করেন আর ভোট এলে মনোনয়ন চান। এছাড়া বিএনপি থেকে এখানে মনোনয়ন চাইতে পারেন, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও কৃষক দলের আহবায়ক, লে. কর্নেল (অব.) আবদুল খালেক। তবে তরুণ প্রজন্মের ভোটারদের মধ্যে, কেন্দ্রীয় কমিটির সহশ্রম বিষয়ক সম্পাদক মো. ফিরোজ উজ্জামান মামুন মোল্লাকে নিয়ে বিশেষ আগ্রহ দেখা গেছে।

তিনি মনে করেন বিগত দিনে এ আসনে বিএনপি সফলতা পায়নি তাই নতুন প্রজন্মকে সুযোগ দেওয়া উচিত। তাছাড়া জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক শাহজাহান মানসুর আগামী নির্বাচনে এখানে লাঙ্গল মার্কার প্রার্থী হবেন বলেও জানা গেছে। এর বাইরে জোট মহাজোটের অন্য কোনো প্রার্থীর নাম এখানে শোনা যাচ্ছে না।

ফেমাসনিউজ২৪.কম/আরআই/আরবি