logo

বুধবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৮ | ২৮ অগ্রহায়ণ, ১৪২৫

header-ad
আজ ভোরে আশুলিয়ায় সন্তানসহ দম্পতি দগ্ধ

ভয়াবহ আতঙ্কের নাম সিলিন্ডার বিস্ফোরণ

বিশেষ প্রতিবেদক | আপডেট: ০১ ডিসেম্বর ২০১৮

ভয়াবহ আতঙ্কে পরিণত হয়েছে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ। সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে হতাহত হচ্ছেন বহু মানুষ। সব শেষ আজ শনিবার (১ ডিসেম্বর) ভোরে ঢাকার অদূরে আশুলিয়ায় গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। সৃষ্ট অগ্নিকাণ্ডে শিশু সন্তানসহ এক দম্পতি দগ্ধ হয়েছেন। তাদের উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়েছে।

জানা যায়, আজ ভোর ৫টার দিকে আশুলিয়ার পশ্চিম বাইপাইলে মোস্তাফা দেওয়ানের মালিকাধীন একতলা বাড়ির একটি কক্ষে এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের একটি দল আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।

দগ্ধরা হলেন- আকরাম হোসেন, তার স্ত্রী লাবলী আক্তার ও তাদের ৮ বছরের ছেলে আশিকুর রহমান। তাদের গ্রামের বাড়ির ফরিদপুরের মধুখালী থানা এলাকায়। স্বামী-স্ত্রী দুজনই আশুলিয়ায় পোশাক কারখানার শ্রমিক।

এদিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের চিকিৎসকরা বলছেন, এমন দুর্ঘটনার শিকার বেশিরভাগ রোগীকে বাঁচানো সম্ভব হয় না। আর ভাগ্যক্রমে যারা বেঁচে যান, তাদের মারাত্মক ক্ষত বয়ে বেড়াতে হয় সারা জীবন।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী শাহিন ইসলাম। আগুন দুর্ঘটনায় শরীরের প্রায় ৩০ শতাংশ পুড়ে গেছে। ভাগ্যক্রমে তিনি বেঁচে ফিরলেও এমন সৌভাগ্য অনেকেরই হয় না।

তিনি জানান, সিলিন্ডারের রেগুলেটর খোলা ছিল, তখন আমি ম্যাচ মারার সঙ্গে সঙ্গে গায়ে আগুন ধরে যায়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের চিকিৎসক ডা. তানজির আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেন, শরীর পুড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যেটা হয়, শ্বাসনালী থেকে ফুসফুস পর্যন্ত ভেতরের ঝিল্লিটা পুড়ে যায়। এই পুড়ে যাওয়াটা সব থেকে বিপজ্জনক।

এক গবেষণা বলছে, গত দেড় মাসে সারা দেশে কমপক্ষে পাঁচশর বেশি গ্যাস সিলিন্ডার দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে হতাহত হয়েছেন বহুসংখ্যক মানুষ।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের প্রধান সমন্বয়ক অধ্যাপক ডা. সামন্ত লাল সেন জানান, দুর্ঘটনাগুলো ঘটার পর ডাক্তারদের তেমন কিছু করার থাকে না। কিন্তু যাতে না ঘটে সেজন্যই এখন কাজ করা উচিত।

তিনি জানান, সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। সবাইকে সচেতন হতে হবে। আমরা সবাই যদি এক সঙ্গে কাজ করি, তাহলে এ দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব। তা না হলে মৃত্যুর মিছিল বাড়তেই থাকবে। এলপিজি সিলিন্ডারের গ্যাস লিক হতে পারে বিভিন্ন কারণে। হোসপাইপ, রেগুলেটর, গ্যাসভাল্ব থেকে হতে পারে লিক। গ্যাস লিক হলেই বিপত্তি। বদ্ধ ঘরে আগুন জ্বালালেই ঘটে বিস্ফোরণ। অনেক গৃহিণীর মধ্যে এ বিষয়ে সচেতনতা থাকলেও বেশিরভাগের মধ্যে তা নেই।

এক গৃহিণী বলেন, অনেকে গ্যাসের চুলা ধরিয়ে কাপড় শুকাতে দেয়। যদি কাপড় চুলায় পড়ে যায়, তাহলে আগুন লেগে যাবে। আমাদের এই কাজগুলোর জন্য সচেতন হতে হবে। গ্যাস লিক হলে, উৎকট গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। তাই এমন গন্ধ পাওয়া গেলে আগুন না জ্বালিয়ে বাসার বিদ্যুৎ লাইন বন্ধ করে দিতে হবে।

তিতাস গ্যাসের পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার কামরুজ্জামান খান জানান, চুলা জ্বালানোর আগে রান্না ঘড়ে বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা রাখতে হবে। চুলাটা ভালোভাবে নিভল কি না, তা নিশ্চিত হয়ে চাবিটা বন্ধ রাখতে হবে। মূলত গ্রাহকরা এ সচেতনতা অবলম্বন করলে অনেক দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব।

সিলিন্ডার বিস্ফোরণ এড়াতে যা করবেন

এলপিজি সিলিন্ডারের গ্যাস লিক হতে পারে বিভিন্ন কারণে। হোস পাইপ, রেগুলেটর, গ্যাস ভাল্ব ইত্যাদি থেকে হতে পারে লিক। গ্যাস লিক হলেই বিপত্তি। এ গ্যাস নিশ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে প্রবেশ করে।

ফুসফুসে প্রবেশ করার পর তা অক্সিজেন ও কার্বন ডাইঅক্সাইড এক্সচেঞ্জে (অদলবদলে) বাধা দেয়। এতে দম বন্ধ হওয়ার সমস্যা হতে পারে। ফলে শরীরে অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দেয়। অক্সিজেনের ঘাটতিতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় মস্তিষ্ক। মাথা ঝিমঝিম করে, মাথা খালি খালি লাগে, অজ্ঞান হওয়ার সমস্যা হয়।

যেহেতু সিলিন্ডারের গ্যাস খুব বেশি চাপে তরল করে প্রবেশ করানো হয়, তাই এটির বিস্ফোরণও খুব মারাত্মক হয়। এর বিস্ফোরণ হলে শক ওয়েভ ছড়িয়ে পড়ে। এ শক ওয়েভ শরীরের যে অংশে লাগে, সে অংশের ব্যাপক ক্ষতি হয়। অনেক সময় প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ফুসফুস। ফুসফুসে রক্ত জমা হতে পারে; সম্পূর্ণ ফুসফুস ছিন্নভিন্ন হতে পারে। প্রাণহানির ঘটনা ঘটে মুহূর্তের মধ্যে।

এত বেশি শক্তি উৎপন্ন হয় যে ওই সময় আশপাশে থাকা লোকদের হওয়ায় ভাসিয়ে অনেকদূরে ছিটকে ফেলতে পারে। এতে ভেঙে যেতে পারে হাড়। মাথায়ও আঘাত লাগতে পারে।

সিলিন্ডারের গ্যাস খুব বাজে গন্ধযুক্ত। লিক হলে খুব উৎকট গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। তাই এমন উৎকট গন্ধ পেলে আগুন তো জ্বালাবেন না, উল্টো বাসার বিদ্যুৎ লাইন বন্ধ করে দিন।

প্রয়োজনে মেইন সুইচ বন্ধ করুন। দেশলাই, মোমবাতি বা আগুনের অন্য কিছু জ্বালানো যাবে না কোনোভাবেই। ঘরের দরজা-জানালা খুলে বাতাস যাতায়াতের ব্যবস্থা করুন। সিলিন্ডারের রেগুলেটর বন্ধ করুন। সেফটি ক্যাপ লাগান।

কী বলছেন চিকিৎসকরা

যদি সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে, তাহলে আক্রান্তদের খোলা জায়গায় নিতে হবে, যেখানে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা আছে। আক্রান্তদের দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। কারণ, অক্সিজেন দেওয়ার দরকার হতে পারে।

সিলিন্ডারের গ্যাস যদি শরীরের কোথাও লাগে, ২০ মিনিট ধরে পানি দিয়ে দ্রুত ধুয়ে ফেলুন। কাপড়ে লাগলে কাপড়গুলো খুলে ফেলুন।

যদি চোখে লাগে, তাহলে পানির ঝাপটা দিয়ে চোখ ধুয়ে ফেলুন। শরীরে আগুন লাগলে দ্রুত কাপড় খুলে ফেলুন। মাটিতে গড়াগড়ি দিন। পুড়ে গেলে দ্রুত হাসপাতালে নিন। যদি শরীরে ফোস্কা পড়ে, তা তুলে ফেলবেন না। হাসপাতালে নিয়ে যান দ্রুত।

সিলিন্ডারের গ্যাস লিক থেকেই কিন্তু মূল সমস্যা। তাই সিলিন্ডার লিক হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে। এটা করার জন্য পানিতে সাবানের গুঁড়া মিশিয়ে ফেনা তৈরি করুন। এবার ফেনা হস পাইপ, রেগুলেটর, ভাল্ব ইত্যাদিতে লাগান। যদি দেখেন সাবান-পানির ফোঁটা বড় হচ্ছে, তাহলে বুঝবেন লিক হচ্ছে গ্যাস। দ্রুত ব্যবস্থা নিন।

সিলিন্ডার উচ্চ চাপ ও তাপের এলাকায় রাখবেন না। রান্না তুলে দিয়ে অন্য কাজে যাবেন না। রান্না করার সময় কাপড় নিয়ে সাবধান হতে হবে। কাপড়ে আগুন লেগেও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটতে পারে।

ফেমাসনিউজ২৪.কম/আরআই/আরবি