logo

মঙ্গলবার, ১৬ অক্টোবর ২০১৮ | ১ কার্তিক, ১৪২৫

header-ad

ঘাড়ে চড়ে বর, ঝুড়িতে বসে এল কনের দল!

অন্যরকম খবর ডেস্ক | আপডেট: ১১ জুন ২০১৮

জোয়ান ছেলেদের ঘাড়ে চেপে লাইন করে বিয়ের আসরে ঢুকলো বরের দল। এরপরই ঝুড়ির ভেতর বসে একে একে এল কনের দল। নববধূরদের পরণে ছিল গরদরঙা শাড়ি।

বরদের পরেনে ছিল ধুতি-পাঞ্জাবী। মাথায় টোপর। ভারতের দক্ষিণ দিনাজপুরের ধারাইল গ্রামে বসল অভিনব এই গণবিবাহর আসর। নবদম্পতিরা প্রত্যেকেই আদিবাসী সম্প্রদায়ভূক্ত। তাই বিবাহবাসরে বাজল ধামসা, মাদলের বোল। তালে তালে পা মেলালেন গাঁয়ের মেয়ে-মহিলারা। ছেলে-বুড়োদের সে কী আনন্দ!

বালুরঘাটের জলঘর গ্রাম পঞ্চায়েত। তারই ধারাইল গ্রাম। বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ মিলেমিশে দিব্যি থাকেন এ গায়ে৷ তবু আর্থিক অনটন এখানকার বহু ঘরে নিত্যসঙ্গী।

অভাব এতটাই যে, বাড়ির ছেলেমেয়ের বিয়েটা পর্যন্ত সামাজিক রীতি মেনে দিতে পারেন না। কেউ কেউ নিজেদের মত করেই সংসার পেতে ফেলেন। কেউ বা প্রণয়ের টান দূরে সরিয়ে রাখতে না পেরে ঘর থেকে দূরে পালায়।

এরকমই সাত জোড়া যুগলকে চিহ্নিত করে গণবিয়ে দেয়ার পরিকল্পনা নেয় আদিবাসী জনতা সঙ্ঘ নামে স্থানীয় একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। জেলায় এই প্রথমবার এরকম উদ্যোগ নেয়া হল। শামিল হয়েছিলেন উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন দফতরের রাষ্ট্রমন্ত্রী বাচ্চু হাঁসদা। আয়োজন দেখে তিনি উচ্ছ্বসিত৷

আদিবাসী সম্প্রদায়ে যে যে রীতি আচার মেনে বিয়ে হয় সবকিছুরই আয়োজন ছিল এদিন। বর-কনে একে অপরকে মঙ্গলঘাটের জলের ছিটে দেয়া, সিঁদুর দান বাদ পড়েনি কিছুই। লজ্জাবস্ত্রে ঢাকা নতুন বউয়ের লাজুক মুখটা দেখে নতুন বরের সে হাসি দেখার মতো।

সুন্দরভাবে বিয়ের জায়গাও সাজিয়েছিলেন এলাকার লোকজনই৷রঙিন কাগজ, বেলুন, নানা আকারের পাতায় সেজে উঠেছিল গোটা গ্রাম। ধারাইলে এই বিবাহ অনুষ্ঠান ঘিরে সব সম্প্রদায়ের মানুষই মেতে ওঠেন আনন্দে। আদিবাসীদের গণবিবাহকে ঘিরে নাচগান তো ছিলই, সঙ্গে কবজি ডুবিয়ে খাওয়ার ব্যবস্থাও।

প্রত্যন্ত এলাকাগুলি যেখানে শিক্ষার আলো এখনও সেভাবে পৌঁছতে পারেনি সেখানে কিন্তু আজও অন্ধ বিশ্বাস, কুসংস্কার মাথাচাড়া দেয়। বহুবার সে খবর শিরোনামেও এসেছে। ডাইন প্রথার মতো বর্বর প্রথাকে জায়গা দিতে যেমন বহু নিরপরাধকে কাঠগড়ায় তোলা হয়। তেমনই বিয়ে না করে সম্পর্কে যাওয়া কিংবা একসঙ্গে থাকাকেও সমাজ মেনে নেয় না। একঘরে হয়ে থাকতে হয় তাদের।

এমনও বহু ছেলেমেয়ে রয়েছেন যারা সামাজিক মতে বিয়ে না করেও একসঙ্গে সংসার বেঁধেছেন। বিবাহিত জীবন কাটাচ্ছেন। অথচ সমাজ তাদের মেনে নেয়নি। আবার এমনও অনেকে আছেন টাকা পয়সার অভাবে সামাজিক রীতি মেনে বিয়ে করতে পারেননি। তাদের সামাজিক রীতি মেনে বিয়ে দিয়ে সামাজিক স্বীকৃতি দিতেই এ গণবিবাহের আয়োজন।

আয়োজক সংস্থার সম্পাদক রবি মার্ডি জানান, ভালোবেসে একসঙ্গে থাকতে চাওয়ায় সমাজ দূরে সরিয়ে দিয়েছে এমন যুগল অনেক রয়েছেন। তাদের চিহ্নিত করে সামাজিক স্বীকৃতি দেয়াই এই গণবিবাহ অনুষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য। জেলাতে এবারই প্রথম এ ধরনের উদ্যোগ। তবে আগামীদিনে প্রত্যেক বছরই ধারাইলে এ অনুষ্ঠান করতে চান তারা।

এদিনের অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রিত ছিলেন প্রায় ৭০০ জন। ছিলেন উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন দফতরের রাষ্ট্রমন্ত্রী বাচ্চু হাঁসদা। তিনি বলেন, আদিবাসী সমাজে এমন অনেক দম্পতি রয়েছেন যারা কোনোরকম বিবাহ অনুষ্ঠান ছাড়াই ঘর সংসার করছেন।

তাদের অনেকেরই হয়তো আর্থিক সঙ্গতি নেই। কেউ কেউ আবার সামাজিক সম্মতি না পাওয়ায় বিনাবিবাহেই সংসার পেতেছেন। অসহায় এসব ছেলেমেয়ের বিবাহকে সামাজিক স্বীকৃতি দিতে ধারাইলের এ গণবিবাহের আসর সত্যিই অভিনব প্রয়াস।
ফেমাসনিউজ২৪/এফএম/এমএম