logo

শুক্রবার, ২৪ নভেম্বর ২০১৭ | ৯ অগ্রহায়ণ, ১৪২৪

header-ad

বেদনবিধুর নাইন ইলেভেন

ফেমাসনিউজ ডেস্ক | আপডেট: ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৭

৯/১১ ইতিহাসের এক ভয়ংকর নাম। আজ থেকে ১৬ বছর আগে ২০০১ সালের সেপ্টেম্বরের ৯ তারিখ যুক্তরাষ্ট্রের টুইন টাওয়ার ও পেন্টাগনে ভয়াবহ বিমান হামলা হয়। নিউয়র্কের ১১০ তলা বিশিষ্ট টুইন টাওয়ার পরিণত হয় ধ্বংস স্তুপে। ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ এ হামলায় প্রায় তিন হাজার মানুষ নিহত হয়। সেপ্টেম্বরের ১১ তারিখে বিশ্বকে নাড়িয়ে দেওয়া এ ঘটনা ঘটেছিল বলে এটা ৯/১১ নামে পরিচিত।

মোট ৪টি বিমান ছিনতাই করে ঘটানো হয়েছিল এ হামলা। যার মধ্যে দুটি বিমান আঘাত করে টুইন টাওয়ারে, একটি পেন্টাগনে এবং অপরটি পেনিসিলভেনিয়ায় ভূপাতিত হয়। ৯/১১ এর পর বদলে যায় বিশ্ব রাজনীতি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই ঘটনার জের ধরেই আফগানিস্থান আক্রমণ করে। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে তথাকথিত যুদ্ধের অংশ হিসেবে ২০০৩ সালে ইরাকেও আক্রমণ করে দেশটি।

ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে হামলা

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের এক রৌদ্রজ্জ্বল সকাল। নিউয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার টুইন টাওয়ারের দিকে উড়ে আসে একটি বিমান। ২০,০০০ গ্যালন জ্বালানি নিয়ে উড়ে আসা মার্কিন যাত্রীবাহী বিমান বোয়িং-৭৬৭ সকাল পৌনে ৯টায় টুইন টাওয়ারের উত্তর টাওয়ারের ৮০তম তলা ভেদ করে ঢুঁকে পড়ে। ১৩০ তলা বিশিষ্ট ভবন পুরো ধোঁয়ায় ভরে যায়। মুহূর্তেই মারা যায় কয়েক শত মানুষ; হাজার সংখ্যক আটকা পড়ে। টেলিভিশন চ্যানেলগুলো সরাসরি সম্প্রচার শুরু করে। বহু মানুষ জড়ো হয় টুইন টাওয়ারের নিচে।

অনেকেই এ সময় ভাবছিলেন হয়তো কোন উন্মাদ-মাতাল এ কাজ করেছে। তাদের ধারণা পাল্টে দিয়ে উত্তর টাওয়ারে আঘাতের ১৮ মিনিট পরেই আরেকটি মার্কিন যাত্রীবাহী বিমান বোয়িং-৭৬৭ টুইন টাওয়ারের দক্ষিণ টাওয়ারের ৬০ তলায় আঘাত হানে। এরপর আর বুঝতে বাকি থাকে না আমেরিকা সন্ত্রাসী হামলার কবলে পড়েছে। হামলার পর আগুনে ভবন দুটি ধসে যায়। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে উত্তর টাওয়ার ধসে পড়ে। এ টাওয়ার থেকে মাত্র ছয়জন নিজেদের অক্ষত অবস্থায় রক্ষা করতে পেরেছিলেন। টুইন টাওয়ারের দুই অংশ মিলিয়ে মারা যায় ২ হাজার ৭৬৩ জন। এ ঘটনায় প্রায় ১০ হাজার মানুষ আহত হয়।

পেন্টাগনে হামলা

পেন্টাগন হল যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান সামরিক দপ্তর। মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সদর দপ্তর যে কঠোর নিরাপত্তা জালে মোড়ানো তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ৯/১১ এ এমন কড়া নিরাপত্তার অবকাঠামোও বাদ যায়নি হামলার হাত থেকে। ওয়াশিংটন ডিসি থেকে উড়ে আসা ৭৭ নম্বর ফ্লাইটের একটি বিমান টুইন টাওয়ার হামলার ঠিক এক ঘণ্টা পর পৌনে ৯টায় পেন্টাগন আক্রমণ করে। যাত্রীবাহী এ বিমান পেন্টাগনের পশ্চিম পাশে আঁছড়ে পড়লে তা ধসে যায়। এ বিমানের আঘাতে মার্কিন সামরিক সদস্য ও বেসামরিক লোক মিলিয়ে ১২৫ জন নিহত হয়। আর বয়ে আনা ৬৪ জন যাত্রীদের তো বাঁচার প্রশ্নই আসে না।

ফ্লাইট-৯৩

ফ্লাইট-৯৩ হল ছিনতাই হওয়া চারটি বিমানের মধ্যে হামলা করতে ব্যর্থ হওয়া একমাত্র বিমান। এ বিমানটি ছিনতাই করা হয় নিউ জার্সির নিউআর্ক লিভারটি ইন্টারন্যাশনাল বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়নের ৪০ মিনিটের মাথায়। বিমানটিতে থাকা অনেক যাত্রীই ইতিমধ্যে টুইন টাওয়ারে হামলার কথা জেনে যান। তারা দ্রুতই বুঝতে পারেন যে বিমানটি ছিনতাই হয়েছে। কিছু সংখ্যক যাত্রী প্রতিরোধ গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেন। তারা ছিনতাইকারী চার জনের সাথে লড়াই শুরু করেন। অগ্নি-নির্বাপক যন্ত্র দিয়ে ককপিটে আক্রমণ চালান। ফলাফল হিসেবে বিমানটি ১০টা ১০ মিনিটে পেনিসিলভেনিয়ার একটি কৃষি জমিতে ভূ-পাতিত হয়। ফ্লাইটে থাকা ৪৪ জনই মারা যান। এসব যাত্রীর অনেকেই ফোনে তাদের অন্তিম যাত্রার কথা স্বজনদের জানিয়েছিলেন। থমাস বার্নেট জুনিয়র নামে এক যাত্রী তার স্ত্রীকে ফোনে বলেছিলেন, আমি জানি আমরা সবাই মারা যাচ্ছি। আমাদের মধ্য থেকে তিনজন কিছু একটা করতে যাচ্ছে। এই বলে তিনি লাইন কেটে দেন।

এ বিমানটি কোথায় হামলা করতে চেয়েছিল তা সঠিক জানা যায়নি। অনেকেই ধারণা করেন হোয়াইট হাউজে হামলার লক্ষ্য ছিল এ গ্রুপটির। কেউ কেউ ধারণা করেন, পূর্ব সমুদ্রতীরে অবস্থিত পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে হামলার জন্যই বিমানটি ছিনতাই করা হয়েছিল।

হতাহতের সংখ্যা

ভয়াবহ এ সন্ত্রাসী হামলায় মোট ২ হাজার ৯৯৬ জন মানুষ মারা যায়। এর মধ্যে ১৯ জন হামলাকারীও রয়েছে। টুইন টাওয়ারে সবচেয়ে বেশি ২ হাজার ৭৬৩ জন মারা যায়। টুইন টাওয়ারে অবস্থানরত মানুষ ছাড়াও এতে ৩৪৩ জন দমকল কর্মী ও চিকিৎসক ও ৬০ জন পুলিশ অফিসার মৃত্যুবরণ করেন। এরা সবাই আটকে পড়াদের উদ্ধার তৎপরতায় অংশ নিয়েছিলেন।

পেন্টাগনে হামলাকারী, বিমান যাত্রী এবং পেন্টাগনে অবস্থারত সামরিক, বেসামরিক মিলিয়ে মোট ১৮৯ জন মারা যায়। অন্যদিকে, ফ্লাইট-৪৩ ভূ-পাতিত হলে মারা যায় ৪৪ জন। সব মিলিয়ে ৩ হাজার ছুঁই ছুঁই এক বিশাল আকারের মানুষের প্রাণ যায় ইতিহাসের অন্যতম ন্যাক্কারজনক এ হামলায়।

হামলার উদ্দেশ্য

১৯ জন হামলাকারীর সবাই ছিলেন সৌদি আরব এবং অন্য কয়েকটি আরব দেশের নাগরিক। বলা হয় সে সময়ের পলাতক ওসামা বিন লাদেন এ হামলার জন্য অর্থায়ন করেছিলেন। ইসরাইলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন, পারস্য উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত সামরিক উপস্থিতিতে ক্ষুব্ধ হয়ে সংশ্লিষ্টরা এ হামলা চালিয়েছিলেন বলে ধারণা করা হয়।

হামলার পরিকল্পনা

হামলাকারীদের কয়েকজন এক বছরের বেশি সময় যুক্তরাষ্ট্রে কাটিয়েছেন। তারা কয়েকটি বাণিজ্যিক ফ্লাইং একাডেমি থেকে বিমান চালনার প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। বাকি কয়েকজন হামলার কয়েক মাস আগে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেন। তাদের কাজ ছিল হামলাকারীদের শক্তি বৃদ্ধি করা। তারা সহজেই নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিয়ে বক্স কাটার এবং ছুরি নিয়ে বিমানে উঠতে সক্ষম হন। যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলীয় তিনটি বিমানবন্দর থেকে ক্যালিফোর্নিয়াগামী চারটি বিমানে চেপে বসেন তারা। গন্তব্য হিসেবে ক্যালিফোর্নিয়াকে বেছে নেয়ার কারণ একটাই, দীর্ঘ যাত্রার জন্য জ্বালানিপূর্ণ থাকে এসব বিমান। উচ্চ জ্বালানিপূর্ণ যাত্রীবাহী এসব বিমানকেই তারা ক্ষেপণাস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে।

প্রেসিডেন্টের ভাষণ

এ হামলা যুক্তরাষ্ট্রে প্রচন্ড উদ্বেগ তৈরি করে। হামলার সময় তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ফ্লোরিডা রাজ্যে ছিলেন। নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনা করে প্রেসিডেন্ট জুনিয়র বুশকে সারাদিনই এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরিয়ে নেয়া হয়। সন্ধ্যা ৭টায় হোয়াইট হাউজে ফেরেন তিনি। রাত ৯টায় দেশবাসীর উদ্দেশ্যে একটি ভাষণ দেন। তিনি বলেন, সন্ত্রাসীরা আমাদের সর্বোচ্চ ভবনগুলোর ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছে, কিন্তু তারা যুক্তরাষ্ট্রের ভিত কাঁপাতে পারেনি। এসব কর্মকাণ্ড ইস্পাত গলিয়ে দিতে পারে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের দৃঢ়তার যে ইস্পাত রয়েছে তাকে নয়। সামরিক পদক্ষেপ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যারা সন্ত্রাসী কাজে লিপ্ত তারা এবং যারা সন্ত্রাসীদের প্রশ্রয় দেয় যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তাদের মধ্যে কোন তফাত নেই। যুক্তরাষ্ট্র তার ভাষায় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী এক যুদ্ধ শুরু করে।

আফগান যুদ্ধ

৯/১১ হামলার এক মাস পেরোতে না পেরোতেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্থান আক্রমণ করে। মার্কিনিরা দাবি করে ৯/১১ এর হামলার মূল হোতা আল কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেন আফগানিস্থানে পালিয়ে আছে। লাদেনকে তাদের হাতে তুলে দিতে তালেবান শাসিত আফগান সরকারকে চাপ দেয়। তালেবান সরকার ৯/১১ এ লাদেনের সম্পৃক্ততার কথা মার্কিনিদের প্রমাণ করতে বলে। এরই প্রেক্ষিতে অক্টোবরের ৭ তারিখে মার্কিনিরা আফগানিস্থান আক্রমণ করে। তারা দুই মাসের মাথায় তালেবানকে সরকার থেকে উৎখাত করে। আফগান যুদ্ধে দুই পক্ষের প্রায় ৭০ হাজারেরও বেশি সৈন্য নিহত হয়। ৩১ হাজারের বেশি বেসামরিক মানুষ নিহত হয়। ২০১২ সালে ন্যাটো প্রথম সৈন্য প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়। ২০১৪ সালের মে মাসে যুক্তরাষ্ট্র তাদের মূল অভিযান শেষ বলে ঘোষণা করে এবং সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়। একই বছরের অক্টোবরে ব্রিটিশ সেনাবাহিনী হেলমান্দে তাদের শেষ ঘাঁটি আফগান সেনাবাহিনীর হাতে বুঝিয়ে দিয়ে আফগানিস্থান ত্যাগ করে। ২০১৭ সালের মে মাস পর্যন্ত ১৩ হাজার বিদেশী সেনা এখনো আফগানিস্থানে অবস্থান করছে।

লাদেন হত্যা

পাকিস্থানের অ্যাবেটাবাদে মার্কিন নেভি সিলের এক অভিযানে ২০১১ সালের ২ মে ওসামা বিন লাদেন নিহত হয়। মার্কিন সৈন্যরা দাবি করে, ২০১০ সালের আগস্টে মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ অ্যাবেটাবাদের এই বাড়িতে লাদেনের অবস্থান নিশ্চিৎ করে। লাদেনকে হত্যার পর তার মরদেহ সাগরে সমাহিত করা হয়েছি বলে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়। লাদেন হত্যার পরের মাসেই তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ঘোষণা দেন যে, শীঘ্রই আফগানিস্থান থেকে বড় আকারের সেনা প্রত্যাহার করা হবে।

৯/১১ স্মৃতি জাদুঘর

দুঃসহ নাইন ইলেভেনের স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য যুক্তরাষ্ট্র জাদুঘর নির্মাণ করেছে। নিউইয়র্কের গ্রাউন্ড জিরোতে ২০১৪ সালের ২১ মে ৯/১১ মিউজিয়াম যাত্রা শুরু করে। ১ লাখ ১০ হাজার বর্গফুটের আয়তনের এ জাদুঘরে রয়েছে ২৩ হাজার ছবি, ১০ হাজার ৩০০ শিল্পকর্ম, ৫শ ঘন্টার ঘুর্ণায়মান ছবি এবং ১ হাজার ৯৭০টি সাক্ষাৎকারের ভিডিও চিত্র। জাদুঘরটিতে ঢুঁকে কেউ যদি অতি আবেগ-প্রবণ হয়ে যান তার জন্য রয়েছে টিস্যু পেপারের ব্যবস্থা!

ফেমাসনিউজ২৪/আরঅ্যা/আরইউ