logo

রবিবার, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৭ | ৩ পৌষ, ১৪২৪

header-ad

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সাক্ষী চট্টগ্রাম ওয়ার সিমেট্রি

এএইচএম কাউছার ,চট্টগ্রাম | আপডেট: ০৭ ডিসেম্বর ২০১৭

পৃথিবীতে যুদ্ধ কারও কাম্য নয়, কিন্তু তারপরও দেশে দেশে যুদ্ধ হয়েছে যুদ্ধ হয়েছে পৃথিবী জুরে। যুদ্ধের বিভিষীকাময় স্মৃতি আর যুদ্ধে নিহত শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে তাই গড়ে উঠেছে ইমারত, ভাস্কর্য। চট্টগ্রামের ওয়ার সিমেট্রি তেমনই এক স্মৃতিকথার গল্প বলে। 

১৯৩৯ সাল। চারদিকে শুরু হয়েছে বিশ্বযুদ্ধের দামামা। বিশ্বজুড়ে দেখা দিয়েছে অশান্তির ছায়া। বোমার গুরুম গুরুম আওয়াজে শান্তিকামী মানুষের মনে আতঙ্ক। চারদিকে অস্ত্রের গর্জন আর ছোপ ছোপ রক্ত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এ রকম সর্বগ্রাসী মরণছোবল ভারতীয় উপমহাদেশের যেসব জায়গায় লেগেছিল, তার মধ্যে অন্যতম চট্টগ্রাম। ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আজও টিকে আছে বিংশ শতাব্দীর  সেই যুদ্ধের আগুনে দগ্ধ স্মৃতিময় স্থান চট্টগ্রাম রণসমাধিক্ষেত্র, যা চট্টগ্রাম ওয়ার সিমেট্রি নামেই পরিচিত।  নগরের জিইসি মোড় থেকে পূর্ব দিকে গোল পাহাড়ের মোড় হয়ে ডান দিকে বাদশা মিয়া চৌধুরী সড়ক। এই সড়কে আনুমানিক ১০০ মিটার এগোলে হাতের ডানে সরকারি চারুকলা ইনস্টিটিউট। আর বাঁ পাশে পাহাড়ের কোল ঘেঁষে ওয়ার সিমেট্রি।

চট্টগ্রামের ওয়ার সিমেট্রি তৈরি করা হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত সৈন্যদের সম্মানে। ব্রিটিশ সেনাবাহিনী এটি প্রতিষ্ঠা করে। এই সিমেট্রিতে আছে ৪০০ সমাধি যার মধ্যে বেশীরভাগই ব্রিটিশ সৈন্যদের। এছাড়াও আছে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, অবিভক্ত ভারত এবং আফ্রিকার অনেক যোদ্ধার সমাধি। 

জানা যায়, ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫ সালের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় গভীর জলের পোতাশ্রয় চট্টগ্রাম এলাকা ছিল আরাকান সামরিক তৎপরতার অন্যতম ঘাঁটি ও উল্লেযোগ্য চিকিৎসাকেন্দ্র বা হাসপাতাল। মূলত এই হাসপাতালে মৃত ব্যক্তিদের জন্য এ সমাধিস্থলটি সৃষ্ট করা হয়। প্রথমে দিকে এই সিমেট্রিতে ছিল ৪০০ সেনার সমাধিস্থল। বর্তমানে ৭৫১টি  সমাধিতে রয়েছেন যার- ১৪ জন নাবিক, ৫৪৩ জন সৈনিক এবং ১৯৪ জন বৈমানিক। যুদ্ধকালীন সমাধি ছাড়াও ৪টি সমাধি এ কবরস্থানে রয়েছে। নাগরিকদের মধ্যে যুক্তরাজ্যের ৩৭৮ জন, কানাডার ২৫ জন, অস্ট্রেলিয়ার ৯ জন, নিউজিল্যান্ডের ২ জন, অবিভক্ত ভারতের (বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান) ২১৪ জন, পূর্ব আফ্রিকার ১১ জন, পশ্চিম আফ্রিকার ৯০ জন, বার্মার ২ জন, নেদারল্যান্ডসের ১ জন ও জাপানের ১৯ জন।

ঐতিহাসিক গুরুত্ব ছাড়াও সমাধিস্থলের আশেপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও যে কারও নজর কাড়বে। প্রায় ৪ একর জমির ওপর নির্মিত এই ওয়ার সিমেট্রির পরিবেশ অত্যন্ত আকর্ষণীয়। ওয়ার সিমেট্রির প্রবেশপথের মূল ফটক থেকে সামান্য পথ হেঁটে গেলেই চোখে পড়ে দুটি ছোট গির্জা ও ফটক। ওই ফটক দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলেই পাওয়া যায় পবিত্রতা ও নিস্তব্ধতার পরশ। হাতের ডান পাশে গির্জার একটি নিবন্ধন বইতে লেখা আছে ভারতীয় বাণিজ্য তরীর প্রায় ছয় হাজার নাবিক ও লস্করের নাম, যাঁরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সাগরে প্রাণ হারান। মৃতদেহ পাওয়া যায়নি বলে তাঁদের নাম স্মরণ করে সম্মান দেখানো হয়। হাতের বাঁ পাশের গির্জায় রয়েছে সিমেট্রি রেজিস্ট্রার, যাতে লেখা রয়েছে সমাহিত সেনা সদস্যদের নাম। বিভিন্ন ফুল ও ফলগাছে সুশোভিত বিশাল জায়গা নিয়ে গড়া এই সমাধিস্থলে চোখে পড়বে অতি যত্নে সংরক্ষিত কবরের সারি। প্রতিটি কবরের গায়ে লেখা আছে শহীদদের নাম-পরিচয়। সমাধিস্থলের মাঝামাঝি রয়েছে একটি ক্রুশ চিহ্ন এবং শেষ প্রান্তে প্রার্থনাকক্ষ। প্রতিদিনই প্রচুর দর্শনার্থীর পাশাপাশি এই সমাধিভূমিতে পর্যটকদের আনাগোনাও চোখে পড়ার মতো। এই স্তম্ভের একেবারে পেছনের দিকে রয়েছে সৈন্যদের কবর। এর সামনে রয়েছে সৈন্যদের স্মৃতিফলক। 

প্রত্যেক স্মৃতিফলকে মৃত সৈন্যের নাম, বয়স, জাতীয়তা ও র‌্যাংক পিতলের প্লেটে খোদাই করে লেখা আছে। এখানে সেনা ও বিমান বাহিনীর মোট ৭৫৫ সৈন্যের স্মৃতিফলক রয়েছে। প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে বেলা ১২ এবং ২টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত এই সিমেট্রি দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকে। নিরিবিলি আর মনোরম পরিবেশ থাকায় প্রতিদিন অসংখ্য দর্শনার্থী এই ওয়ার সিমেট্রি দেখতে আসেন। 

ইতিহাস থেকে জানা য়ায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইন্দো-বার্মা রণাঙ্গনে আজাদ হিন্দ ফৌজের আক্রমণে মিত্রবাহিনীর যেসব সৈন্য নিহত হন তাদের বেশির ভাগকে এদেশে সমাহিত করা হয়। পরবর্তীকালে এসব সৈন্যের কবরস্থানকে ঘিরে গড়ে ওঠে আকর্ষণীয় ওয়ার সিমেট্রি। এরকম দুটি ওয়ার সিমেট্রির একটি রয়েছে চট্টগ্রাম মহানগরীর বাদশা মিয়া চৌধুরী সড়কে, অপরটি কুমিল্লার ময়নামতি। ১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর জার্মানি প্রতিবেশী পোল্যান্ড আক্রমণ করলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূত্রপাত হয়।

 জার্মানির পক্ষে ছিল ইতালি, যুগোশ্লাভিয়া, রোমানিয়া, বুলগেরিয়া ও জাপান (অক্ষশক্তি)। অপরদিকে পোল্যান্ড, ব্রিটেন, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, রাশিয়া, আমেরিকা প্রভৃতি দেশ নিয়ে গড়ে ওঠে মিত্রবাহিনী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন তীব্রতর হয়। তখন ব্রিটিশরা ভারতবর্ষ শাসন করত। নেতাজী সুবাস বোস সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে ভারতবর্ষকে স্বাধীন করার উদ্দেশ্যে ব্রিটেনের ঘোর শত্রু জামানি গিয়ে হিটলারের সাহায্য চেয়ে ব্যর্থ হয়ে জাপান চলে আসেন। রাসবিহারী বসু থেকে তিনি আজাদ হিন্দ ফৌজের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। জাপান এবং প্রবাসী ভারতীয়দের সহযোগিতায় পুনর্গঠন করেন আজাদ হিন্দ ফৌজ। 

আধুনিক যুদ্ধাস্ত্র, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও অর্থের অভাব থাকলেও সুবাস বোসের অসাধারণ নেতৃত্বের ফলে অল্প সময়ের মধ্যে প্রায় ৬০ হাজার সৈন্যের একটি সুশৃঙ্খল দেশপ্রেমিক সৈন্যদল গড়ে ওঠে। আজাদ হিন্দ ফৌজের সৈন্যরা ১৯৪৫ সালের গোড়ার দিকে সর্বপ্রথম বার্মা দিয়ে ভারতের উত্তরপূর্ব রাজ্যসমূহ আক্রমণ করে ভারতের ব্রিটিশ শাসকদের ব্যতিব্যস্ত করে তোলে। সুবাস বোসের সরাসরি নেতৃত্বে আজাদ হিন্দ ফৌজ ভারতের আরাকান, ইম্ফল, ময়রাং, বিষেণপুর প্রভৃতি স্থান দখল করে নেয়। 

ব্রিটেনের নেতৃত্বে মিত্রবাহিনী দখলকৃত জায়গা পুনরুদ্ধারের জন্য বিমানের সাহায্য নিয়ে পাল্টা আক্রমণ করে। ফলে আজাদ হিন্দ ফৌজ ছত্রভঙ্গ হয়ে রেঙ্গুগুনে এসে পুনর্গঠিত হওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু আমেরিকা কর্তৃক জাপানে পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ এবং এ কারণে জাপানের আত্মসমর্পণ ও নেতাজীর রহস্যজনক নিখোঁজ হওয়ায় আজাদ হিন্দ ফৌজ দুর্বল হয়ে পড়ে। কয়েক মাস স্থায়ী এ যুদ্ধে আজাদ হিন্দ ফৌজের পক্ষে ২৭ হাজার সৈন্যের মৃত্যু হয়।

মিত্রবাহিনীরও প্রায় চার হাজার সৈন্যের মৃত্যু হয়। মিত্রবাহিনীর এসব সৈন্যকে নিজ নিজ দেশে পাঠানো হয়। যাদের পাঠানো সম্ভব হয়নি তাদের চট্টগ্রামে এবং কুমিল্লায় সমাহিত করা হয়। পরে কমনওয়েলথ গ্রেভস কমিশন এ দুটি স্থানে আকর্ষণীয় ওয়ার সিমেট্রি গড়ে তোলে। তবে দেশমাতৃকার স্বাধীনতার জন্য আজাদ হিন্দ ফৌজের যেসব সৈন্য শহীদ হন তাদের জন্য গড়ে ওঠেনি কোনো ওয়ার সিমেট্রি কিংবা স্মৃতিস্তম্ভ।

 ফেমাস নিউজ২৪ডটকম/এফ/এন