logo

বুধবার, ২৭ মে ২০২০ | ১৩ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৭

header-ad
করোনাভাইরাস

গণমৃত্যুর নতুন আতঙ্কে উইঘুর মুসলিমরা!

ফেমাসনিউজ ডেস্ক | আপডেট: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০

করোনাভাইরাসের নতুন আতঙ্কে উইঘুর মুসলিমরা
করোনাভাইরাসের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ব্যাপক অবহেলার মধ্যে রয়েছে। সেটি হচ্ছে– চীনের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল পূর্ব তুর্কিস্তান বা জিনজিয়াং উইঘুর। বছরের পর বছর ধরে চরম নির্যাতনের শিকার অসহায় মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলটিতে এখন পর্যন্ত করোনাভাইরাসে ৩২ জন শনাক্ত হওয়ার বিষয়টি চীন সরকার নিশ্চিত করেছে। কিন্তু সত্যিকার আক্রান্ত এবং মৃতের সংখ্যা অনেক বেশি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

যোগাযোগ অচলাবস্থার কারণে সঠিক সংখ্যা জানা সম্ভব হচ্ছে না। পূর্ব তুর্কিস্তানে ব্যাপক আটক ও নজরদারি ক্যাম্পগুলো রয়েছে। যাতে অসংখ্য মুসলিম উইঘুরদের বন্দি করে রাখা হয়েছে।

চীনকে বর্তমানে অচল করে রেখেছে করোনাভাইরাস। বিশেষ করে মধ্য হুবেইপ্রদেশকে। উট, গবাদিপশু, বিড়াল ও বাদুড়সহ বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীর দেহে পাওয়া ভাইরাসের একটি বড় পরিবারের অংশ এই ভাইরাস।

সংক্রমণের নির্দিষ্ট সূত্র বের করে নিয়ে আসতে এটির জিনগত শাখার বিশ্লেষণ করছেন বিজ্ঞানীরা। এর আগে সিভিট ক্যাট ও উট থেকে সার্স এবং মার্সের মতো আলাদা দুটি করোনাভাইরাস মানুষকে আক্রান্ত করেছে। নতুন এই করোনাভাইরাস মানুষের হাঁচি, কাশি ও শ্বাসপ্রশ্বাসে নির্গত বস্তু থেকে অন্যদের শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।

করোনাভাইরাস মহামারী ছড়িয়েপড়ায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে গত ৩০ জানুয়ারি। প্রথম দিকে এ প্রাদুর্ভাবের তীব্রতা আড়াল করতে মারাত্মক কঠোর ছিল চীনা সরকার।

কাজেই এ ভাইরাস যাতে বিশ্বের অন্য প্রান্তগুলোতে ছড়িয়ে না পড়ে; তা রোধে প্রাথমিকভাবে তাদের পর্যাপ্ত উদ্যোগ ছিল না। উহান থেকে ছড়িয়েপড়া এই মহামারী এখন বৈশ্বিক উদ্বেগের বিষয়।

এতে এখন পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছেন ৩০ হাজারে বেশি। মারা গেছেন ৬৩৬ জন। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এই ভাইরাস মহাদেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। যদিও বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এ ভাইরাস প্রতিরোধের বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে।

প্রাদুর্ভাবটির বিস্তার রোধে বিভিন্ন দেশ তাদের নাগরিকদের চীন থেকে সরিয়ে নিচ্ছে, বিমানবন্দরে কঠোর পরীক্ষা-নিরীক্ষা, চীন থেকে পণ্য আমদানি ও লোকজনের ভ্রমণে ব্যাপক বিধিনিষেধ আরোপ করে দিয়েছে।

কীভাবে নিরাপদ থাকতে হবে, নাগরিকদের সেই শিক্ষা দেয়ার পাশাপাশি টিকা উৎপাদন ও নিয়ন্ত্রণ চেষ্টায় চীনে বিশেষজ্ঞ দল পাঠিয়েছে বিভিন্ন দেশ। এসবের মধ্যেও করোনাভাইরাসের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ একটি এলাকা ব্যাপক অবহেলার মধ্যে রয়েছে। সেটি হচ্ছে– চীনা অধিকৃত পূর্ব তুর্কেস্তান। চীনের এই স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলটি জিনজিয়াং উইঘুর নামেও পরিচিত।

জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্রের হিসাব বলছে, এসব আটক কেন্দ্র, বলপূর্বক শ্রম কারখানা ও অন্যান্য স্থাপনায় ১০ লাখ এবং ৩০ লাখের মতো উইঘুর ও অন্যান্য নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর লোকজন রয়েছেন। কিন্তু এই সংখ্যাটা আরও বেশি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পরিবার থেকে উইঘুর শিশুদের বিচ্ছিন্ন করে রাষ্ট্রীয় এতিমখানা ও কিন্ডারগার্টেনে রাখা হয়েছে।

ক্যাম্পগুলোতে অতিরিক্ত ঠাসাঠাসি করে অবস্থান, অপুষ্টি, শারীরিক-যৌন নির্যাতন, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কেটে বিক্রি করাসহ বিভিন্ন মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটছে। কাজেই সেখানে করোনাভাইরাসও মারাত্মক বিপর্যয় নিয়ে পৌঁছে যেতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা আভাস দিচ্ছেন।

কিন্তু পূর্ব তুর্কিস্তানে রোগের পরীক্ষা, নির্ণয় ও সম্ভাব্য আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসায় পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করেনি চীন সরকার।

মূলত উহানে ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করতেই সব ধরনের সম্পদ ও দক্ষতাকে ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু উইঘুরদের এভাবে উপেক্ষিত রাখায় অঞ্চলটিতে করোনাভাইরাসের ব্যাপক প্রাদুর্ভাব ঘটতে পারে এবং অন্যত্র যা হচ্ছে তার চেয়ে সেখানে মৃত্যুহার সর্বাধিক হতে পারে।

কিন্তু এই ভাইরাসের চিকিৎসায় নির্দিষ্টভাবে কোনো সুপারিশ নেই। কেউ আক্রান্ত হলে তাকে কোয়ারেন্টাইন করে রেখে শ্বাসকষ্ট, কাঁশি ও জ্বরের মতো ফ্লুধর্মী উপসর্গের চিকিৎসা দিতে হবে। আর পরিস্থিতি মারাত্মক হয়ে গেলে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো সক্রিয় রাখতে চিকিৎসা দেয়া হয়।

এ ক্ষেত্রে মাস্ক পরা, বারবার হাত ধোয়াসহ নিবৃত্তিমূলক পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শও এড়িয়ে চলতে হবে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বাড়াতে হবে।

কিন্তু উইঘুরসহ যারা চীনের ক্যাম্পগুলোতে আটক রয়েছেন, তাদের হাসপাতাল সুবিধা, কোয়ারেন্টাইন এলাকা, পুষ্টি-স্বাস্থ্যকর পণ্য ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত অন্যান্য বিষয়ে মারাত্মক বিধিনিষেধ রয়েছে। মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো এমন দাবিই করে আসছে।

ক্যাম্পের কক্ষগুলোতে ঠাসাঠাসি করে লোকজনকে রাখা হয়েছে। এতে পরস্পরের সংস্পর্শ ছাড়া তাদের পক্ষে নড়াচড়া করা অসম্ভব।

ক্যাম্প থেকে বেঁচে আসা লোকজন বলছেন, সেখানে মারাত্মক পুষ্টির ঘাটতি ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ রয়েছে। আটকদের শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে। কাজেই করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন তারা।

উহান থেকে পূর্ব তুর্কিস্তানের রাজধানী উরুমকিতে বিমান ও অন্যান্য যোগাযোগের কারণে ইতিমধ্যে সেখানে করোনাভাইরাস বিস্তার করেছে। আক্রান্ত হওয়ার খবর বের হয়ে আসতে শুরু করেছে। সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে থাকা সত্ত্বেও চীন ও বিশ্বের সরকারগুলো উইঘুর অঞ্চলে করোনাভাইরাস বিস্তারের বিষয়টি ব্যাপকভাবে উপেক্ষা করছে।

এতে অঞ্চলটিতে উহানের চেয়েও তীব্র সম্ভাব্য মহামারী ও মৃত্যুর আশঙ্কা করা হচ্ছে। একেকটি ক্যাম্পে কয়েক হাজার উইঘুরকে আটকে রাখা হয়েছে। তাদের এই আটকের সংখ্যা ক্রমে বাড়ছে। কাজেই কয়েক লাখ উইঘুরসহ আটক সংখ্যালঘুরা করোনাভাইরাসের বিপর্যয়কর শিকারে পরিণত হতে পারেন।

বাইরের দেশের চাপ ছাড়া পূর্ব তুর্কিস্তানে করোনাভাইরাস রোধে চীন পর্যাপ্ত পদক্ষেপ শিগগিরই নিচ্ছে না বলেই ধরে নেয়া হচ্ছে। সেখানের ক্যাম্পগুলোতে চীনের গণআটক ও নজরদারির বিস্তৃত তথ্য বেরিয়ে আসার পরেও মানবতাবিরোধী অপরাধের কথা অস্বীকার করে আসছে বেইজিং।

বিভিন্ন দেশে বাস করা উইঘুররা জানতেও পারছেন না যে ক্যাম্পের ভেতর তাদের পরিবার সদস্যরা বেঁচে আছেন কিনা। তাদের আশঙ্কা, ক্যাম্পগুলোতে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ইচ্ছা করে উপেক্ষা করে যেতে পারে চীন কিংবা ভিন্ন কারণে মৃত্যুর দায়গুলো এই প্রাণঘাতী ভাইরাসের ওপর চাপিয়ে দেয়ার সুযোগ নিতে পারে।