logo

শুক্রবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৭ | ৭ আশ্বিন, ১৪২৪

header-ad

নির্মাণ শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া জরুরি : নূর খাঁন বাবু

আদম মালেক | আপডেট: ৩১ আগস্ট ২০১৭

নির্মাণ শ্রমিকদের কল্যাণ ও সামাজিক নিরাপত্তা বিধানের জন্য আলাদা নির্মাণ শ্রমিক কল্যাণ বোর্ড ও কল্যাণ তহবিল গঠনের দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশ বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সাংগঠনিক সম্পাদক প্রকৌশলী নূর খাঁন বাবু। তিনি বলেন, নির্মাণ শ্রমিকরা অবহেলিত ও খুবই প্রান্তিক জীবন যাপন করছে। অধিকার প্রতিষ্ঠাতো দুরের কথা তারা তাদের অধিকার চেনেও না। তাই তাদের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ করা সময়ের দাবি। নির্মাণ শিল্পের সম্ভাবনা, শ্রমিক নিয়োগে মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম, এই অপ্রাতিষ্ঠানিক নিয়োগের কুফল, শ্রমিকদের ঝুঁকিপূর্ণ কর্মপরিবেশ,নিরাপত্তাহীনতা, মজুরী বৈষম্য,হতাহতের ঘটনায় ক্ষতিপূরণ. শ্রমিকের কল্যাণে সরকার ও ইমারত নির্মাতাদের করণীয় সম্পর্কে তিনি সুচিন্তিত মতামত তুলে ধরেন।

নিম্নে তার সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হল:
ফেমাসনিউজ : বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নির্মাণ শিল্পের ভবিষ্যৎ কি?
নূর খাঁন বাবু : অর্থনৈতিক অবদান ও কর্মসংস্থান বিবেচনায় বাংলাদেশের নির্মাণ খাত অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। মোট জাতীয় আয়ের একটি বড় অংশ আসে এ খাত থেকে। বর্তমানে ২০ লাখের বেশি লোক নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন। প্রতিনিয়ত এ খাতের শ্রমশক্তিতে যোগ হচ্ছে নতুন নতুন মানুষ। সাধারণ শ্রমিক হিসেবে জীবন শুরু করে দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে বিদেশে অভিবাসন কিংবা দেশে দক্ষ শ্রমিক বা ঠিকাদার হিসেবে পেশাগত উত্তরণের সুযোগ রয়েছে।

ফেমাসনিউজ : নির্মাণ শ্রমিকের নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পর্কে আপনার পর্যবেক্ষণ কি?
নূর খাঁন বাবু : নির্মাণ শ্রমিকরা কাজ পাওয়ার জন্য বিভিন্ন ধরনের মধ্যস্থতাকারীর সেবা গ্রহণ করে থাকেন। তাদের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় মধ্যস্থতাকারী তথা ব্যক্তি নিয়োগদাতার ভূমিকা সবচেয়ে প্রভাবশালী। ঢাকা শহরের ছোট-বড় কোনো রিয়েল এস্টেট কোম্পানিই তাদের প্রকল্পে সরাসরি নির্মাণ শ্রমিক নিয়োগ দেয় না। বিভিন্ন নির্মাণ প্রকল্পে শ্রমিক নিয়োগের ক্ষেত্রে তারা বিভিন্ন ব্যক্তি তথা মধ্যস্থতাকারীর ওপর নির্ভর করে থাকে। এসব ব্যক্তি মধ্যস্থতাকারীদের কেউ ঠিকাদার, কেউ সাব-কনট্রাক্টর, কেউ ফোরম্যান আবার কেউ মিস্ত্রি। মূলত গ্রাম থেকে নিজের পরিচিত শ্রমিক সংগ্রহ করে শহরের নির্মাণ প্রকল্পে সরবরাহ করাই এসব মধ্যস্থতাকারীর কাজ। নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানি শ্রমিক-সংক্রান্ত বিষয়াদিতে নিজেদের সরাসরি সম্পৃক্ততা রাখতে আগ্রহী নয়।

এর মূল কারণ হলো, ব্যক্তি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে শ্রমিক নিয়োগ করলে শ্রমিকের প্রতি কোম্পানির দায়বদ্ধতা কমে এবং মুনাফা অর্জনের অনেক সুযোগ থাকে। একজন নির্মাণ শ্রমিকের দক্ষতা নির্ণয় থেকে শুরু করে মজুরি প্রদানের সবক্ষেত্রে ব্যক্তি মধ্যস্থতাকারীদের একচ্ছত্র প্রভাব চোখে পড়ে। বাংলাদেশের সরকারি বিধিমালায় এ মধ্যস্থতাকারীদের কোনো স্বীকৃতি না থাকলেও নির্মাণ শ্রমিকের নিয়োগে তাদের ভূমিকা মুখ্য থাকায় রাষ্ট্র নির্মাণ শ্রমিকদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে উদ্যোগী হয় না। ফলে মধ্যস্থতাকারীরা থাকে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে এবং তাদের প্রতিদিনের কার্যাবলি ও সংশ্লিষ্ট অনিয়ম রাষ্ট্রের পরিবীক্ষণের বাইরে থেকে যায়।

ফেমাসনিউজ : নির্মাণ শ্রমিকের কাজ পর্যাপ্ত মনে করেন কি?
নূর খাঁন বাবু : নির্মাণ শ্রমিকদের প্রায় সবাই ভূমিহীন। নিজ পরিবারে নগদ অর্থ জোগান দেয়ার জন্য এরা বছরে একাধিকবার গ্রাম থেকে শহরে অভিবাসন করে মোট ছয় মাস বা তার বেশি সময় শহর এলাকায় অবস্থান করেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ শ্রমিকরা নির্মাণকাজের পাশাপাশি অন্যান্য কাজের সঙ্গেও সম্পৃক্ত থাকেন। এর মূল কারণ হিসেবে দেখা যায়, নির্মাণ খাতে পেশাগত অস্থিতিশীলতা অনেক বেশি। বছরের কয়েক মাস বিশেষ করে বর্ষাকালে নির্মাণকাজে শ্রমিকের চাহিদা কম থাকে বলে অনেক শ্রমিক গ্রাম ফিরে গিয়ে মৌসুমি ব্যবসা ও অন্যান্য কাজে সম্পৃক্ত হন। তাছাড়া বিভিন্ন রকমের অনিশ্চয়তার কারণে প্রায়ই নির্মাণ প্রকল্প আচমকা বন্ধ হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে এসব শ্রমিকরা জীবন ধারণের লক্ষ্যে গ্রাম ফিরে গিয়ে কৃষি শ্রমিক হিসেবেও কাজ করে থাকেন।


ফেমাসনিউজ : নির্মাণ শ্রমিকদের মজুরী কিভাবে নির্ধারিত হয়?
নূর খাঁন বাবু : সামাজিক যোগাযোগ শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা গেছে যে, শ্রমিকরা তাদের আত্মীয়, বন্ধুবান্ধব অথবা পরিচিতদের মাধ্যমে কাজের সুযোগ পেয়েছেন। এরূপ সামাজিক যোগাযোগ ও আত্মীয়তা নির্ভর নিয়োগ প্রক্রিয়ার কারণে তারা সচরাচর মজুরি নিয়ে তেমন দরকষাকষি করেন না। মজুরী প্রদানের ক্ষেত্রে নিয়োগদাত বিশ্বাস ভঙ্গ করলে শ্রমিকের পক্ষে কোনো অভিযোগ করা বা আইনগত ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হয় না। শ্রমিককে নির্ভর করতে হয় নিজ এলাকায় উভয় পক্ষের পরিচিতজনদের মাধ্যমে অথবা শহরে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দ্বারা সামাজিক চাপ প্রদানের ওপর।

ফেমাসনিউজ : নির্মাণ শ্রমিকদের অপ্রাতিষ্ঠানিক নিয়োগের কুফল সম্পকে বলুন।
নূর খাঁন বাবু : নির্মাণ শ্রমিকদের নিয়োগ প্রক্রিয়ার অপ্রাতিষ্ঠানিক চরিত্রের কারণে তাদের কোনো নিয়োগপত্র থাকে না, যাতে তাদের নিয়োগ-সংক্রান্ত প্র্রয়োজনীয় তথ্য যেমন বেতন-ভাতা, আর্থিক ও অন্য সুবিধাদি। মেলে না দক্ষতার স্বীকৃতি। কর্মস্থল ও বাসস্থানের অনিরাপদ পরিবেশ, স্বাস্থ্য ও পেশাগত নিরাপত্তা ঝুঁকি, সংগঠন করার অধিকার না থাকা, সামাজিক সুরক্ষা না পাওয়াও অপ্রাতিষ্ঠানিক নিয়োগের কুফল। শ্রমিক ব্যবস্থাপনায় মধ্যস্থতাকারীদের মুখ্য অথচ অস্বীকৃত ভূমিকার কারণে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও আইনগুলোর কার্যকারিতা ক্ষুণ হয়।

ফেমাসনিউজ : নির্মাণ শ্রমিকের কর্মপরিবেশ কতটুকু নিরাপদ?
নূর খাঁন বাবু : নির্মাণ শ্রমিকের কর্মপরিবেশ নিরাপদ নয়। সেই মান্ধাতা আমলের বাঁশের মাচা টানিয়ে তাদের বহুতল ভবনে কাজ করতে হয়। হরহামেশাই মাচা ভেঙ্গে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। শ্রমিকের জন্য নেই সেফটি বেল্ট, ওয়েল্ডিং কাজের সময় ঝুঁকি এড়াতে চোখে গ্লাস। হাতে গ্লাভ্স ও পায়ে গাম বুট ও তারা পাচ্ছে না। এজন্য প্রতিনিয়ত জীবনের ঝুঁকি নিয়েই তাদের কাজ করতে হয়। ফলস্বরুপ ঘটছে নানা দুর্ঘটনা। হতাহত নিত্যনৈমত্তিক বিয়য়। গেল বছর প্রায় ১২শ নির্মাণ শ্রমিকের প্রাণহানি হয়। চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত এই সংখ্যা ৮শ ছাড়িয়ে গেছে। যারা পঙ্গুত্ব বরণ করে তাদের সংখ্যাও অনেক।

ফেমাসনিউজ : হতাহতের ঘটনায় তারা ক্ষতিপূরণ পায় কি না?
নূর খাঁন বাবু : হতাহতের ঘটনা ঘটলে শ্রমিকরা ক্ষতিপূরণ তেমন পায় না। অনেক শ্রমিক তাদের অধিকার সম্পকেও জানে না। বিদ্যমান আইনে একজন শ্রমিক আহত হলে সরকারী তহবিল থেকে ৫০ হাজার ও নিহত হলে ২ লাখ টাকা পাওয়ার অধিকার সম্বলিত তথ্যটিও অনেক শ্রমিকের কাছে নেই। শ্রমিরা অসংগঠিত। তাদের কোন প্ল্যাটফরম নেই। কর্মস্থলে শ্রমিক মারা গেলে খুনের মামলা হওয়াই নিয়ম। কিন্তু মালিকের ভয়ে তটস্থ শ্রমিকের স্বজনরা মামলা করার সাহস পায় না। মালিক পক্ষ মোটা অংকের টাকা খরচ করে থানা-পুলিশ ম্যানেজ করায় বেশীরভাগ ক্ষেত্রে খুনের পরিবর্তে অপমৃত্যুর মামলা দায়ের হয়। নিহত শ্রমিকের অনক সময় স্বজনরা লাশ পরিবহনের ভাড়া ছাড়া আর কিছুই পায় না।

ফেমাসনিউজ : নির্মাণ শ্রমিকের কল্যাণে আপনার সুরারিশ কি?
নূর খাঁন বাবু : নির্মাণ শ্রমিকের কল্যাণে তাদের যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিয়োগপত্র ও পরিচয়পত্র প্রদান করতে হবে। তাদের জন্য নির্মাণ শ্রমিক কল্যাণ বোর্ড ও নির্মাণ শ্রমিক কল্যাণ তহবিল গঠন করতে হবে। যে কোন প্রকার নির্মাণের জন্য অনুমোদন বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি অনুমোদকারী কর্তৃপক্ষ যেমন রাজউক.কেডিএ,সিডিএ,আরডিএসহ জেলা পরিষদ,উপজেলা পরিষদ,পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষকে প্রাকল্লিত ব্যায়ের ১ শতাংশ সরকারসহ সকল নির্মাতা থেকে আদায় করে ঐ অর্থ নির্মাণ শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে জমা প্রদানের আইন বাস্তবায়ন জরুরী।

শ্রমিকদের জন্য ন্যায্যমূল্যে রেশন ও আবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিতের পাশাপাশি নিহত শ্রমিকের ক্ষতিপূরণ ৫ লাখ টাকা উন্নীতকরণের সুপারিশ রয়েছে। দুর্ঘটনার কারণে অক্ষম ও আহত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণের জন্য এককালীন ৩ লক্ষ টাকা ও আরোগ্য না হওয়া পর্যন্ত চিকিৎসা তহবিল গঠন প্রয়োজন। কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তা, ঝুঁকিমুক্ত পরিবেশ ও শ্রম আইন বাস্তবায়ন হ্েচ্ছ কিনা তা খতিয়ে দেখতে মনিটরিং সেল গঠন করতে হবে। শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে ট্রেনিং সেন্টার স্থাপন ও ট্রেড ইউনিয়নের তালিকাভুক্ত ব্যাতীত বিদেশ প্রেরণ নিষিদ্ধের আইন বাস্তবায়ন আশা করি। বিদ্যমান বাস্তবতায় শ্রম আইন সংশোধন করে শ্রমিকদের কল্যাণে নতুন আইন প্রণয়ন করতে হবে।

ফেমাসনিউজ২৪/এএম