logo

রবিবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৭ | ৪ অগ্রহায়ণ, ১৪২৪

header-ad

স্বগৌরবে ফিরতে চায় বিএনপি

মো. রিয়াল উদ্দিন | আপডেট: ২১ অক্টোবর ২০১৭

দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ক্ষমতায় নেই দীর্ঘ প্রায় ৯ বছর। ক্ষমতা হারানোর পাশাপাশি হারিয়েছে তার নিজস্ব জৌলশও। অনেকটা আন্দোলন বিমুখ হয়ে পড়েছে দলটি। একসময়ের দাবি আদায়ে অনড় দলটি এখন অনেকটাই ঘরের মধ্যে আলোচনা সভা, প্রেস বিজ্ঞপ্তি নির্ভর হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতারা।

তবে সব বাধা, আলোচনা, সমালোচনা কাটিয়ে নিজেদের দলকে স্বগৌরবে ফেরাতে চান বিএনপির নেতাকর্মীরা। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে গণতান্ত্রিক পন্থায় আন্দোলন সংগ্রামের মাধ্যমে দলকে ফেরাতে চায় রাষ্ট্র পরিচালনায়।

দাবি আদায়ে আন্দোলন বিমুখতার জন্য দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যেও রয়েছে ক্ষোভ। ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে নানাভাবে রাজপথে আন্দোলন গড়ে তুলতে চেয়েছে বিএনপি। বিশেষ করে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচন সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ করতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে কয়েক দফা আন্দোলন করেছে বিএনপি।

নির্বাচনের পর সরকারকে অবৈধ দাবি করে টানা তিন মাস আন্দোলন করেও সুনির্দিষ্ট সফলতা পায়নি দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা খালেদা জিয়ার দল। এরপর থেকেই অনেকটা আন্দোলন বিমুখ হলেও মাঝে মাঝে বিভিন্ন ইস্যুকে সামনে এনে আন্দোলন করতে চেয়েছে দলটি। তবে সরকারের কৌশলের কাছে আন্দোলনের হালে পানি পায়নি বিএনপি।

আন্দোলন সফল না হওয়ার কারণে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা-সমালোচনার মুখে পড়েছে বিএনপি। এমনকি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও বিএনপির মূল্যহীন আন্দোলন নিয়ে সমালোচনা করেছে।

আন্দোলনে ব্যর্থ বিএনপি সমালোচনার তুঙ্গে রয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। দলটির নেতারা মনে করেন, বিএনপি একটি বাংলাদেশ নালিশ পার্টি। দলটি এখন জনগণ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। বিএনপি জনগণের মন না বুঝে জনবিরোধী আন্দোলনের কর্মসূচি দেয়, যার ফলে তাদের আন্দোলন বারবার ব্যর্থ হয়। যদিও কোনো ইস্যুতে আন্দোলনের ডাক দিলেও নিজেরা মাঠে না এসে ঘরে বসে হিন্দি সিরিয়াল দেখেন। বিএনপি আন্দোলন ও নির্বাচন দুটোতেই ব্যর্থ। নির্বাচনের মাঠে নেমে মাঝপথে তারা যেভাবে পালিয়ে যায় আবার আন্দোলনে নামার পরও মাঝপথ থেকে তারা পালিয়ে যায়। অবশ্য পালিয়ে যাওয়া বিএনপির স্বভাব।

তবে বিএনপি দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বিএনপি গণতান্ত্রিক দল। গণতান্ত্রিক উপায়ে আলোচনা-সংলাপের মাধ্যমে দাবি আদায় করতে চায়। আলোচনা বা সংলাপের কোনো ব্যবস্থা না হলে আন্দোলনের কোনো বিকল্প থাকবে না। তবে বিএনপি ক্ষমতা হারানোর পর থেকেই নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণের জন্য বিভিন্ন ইস্যুতে আন্দোলন করতে রাজপথে নামলেও সরকারের বাধার মুখে তা কুলিয়ে উঠতে পারেনি। সরকার অগণতান্ত্রিক উপায়ে বিরোধী মতামতকে সহ্য না করে তাদের দমন করতে দেশের প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবহার করে। রাজপথে বিএনপি নেতারা নামতে চাইলেই গণ গ্রেফতার শুরু করে সরকার। অনেক নেতা গুমও হয়েছে। একইসঙ্গে জাতীয় এবং দলীয় গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলোতে সভা-সমাবেশের অনুমতি চাইলেও সরকার এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ দেয়া হয় না। অনেক ক্ষেত্রেই বিএনপি এখন সরকারের অনুমতির ওপর নির্ভর হয়ে পড়েছে বলেও মনে করছেন নেতারা।

তবে বিএনপির এমন আন্দোলন বিমুখতার পেছনে দলীয় হাইকমান্ডের দুর্বলতা মনে করছেন তৃণমূল বিএনপি। তাদের মতে, আন্দোলন-সংগ্রাম না করলে কখনই কোনো দলই রাজনৈতিক অধিকার আদায় করতে পারেনি। ঘরে বসে সভা-সমাবেশ করলে আওয়ামী লীগের নির্যাতন থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব নয়। রাজপথে সংগ্রামের মাধ্যমে নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য সহায়ক সরকারসহ সব রকম দাবি আদায় করতে হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তৃণমূল বিএনপির এক সিনিয়র নেতা ফেমাসনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, আমরা সব সময় আন্দোলন করতে প্রস্তুত। বিএনপির হাইকমান্ডের সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করি। কিন্তু দলীয় সিদ্ধান্ত ছাড়া আমরা কিছুই করতে পারি না। রাজপথে আন্দোলন সংগ্রাম করলে আওয়ামী লীগ সরকারকে পরাজিত করা কোনো ব্যাপার না। এভাবে ঘরে বসে থাকলে সরকার আমাদের দাবি কখনই মানবে না। আন্দোলন ছাড়া দাবি আদায় করাও সম্ভব না।

তবে বিএনপির ঘুরে দাঁড়ানো প্রধান বাধা হিসেবে বেশকিছু ভুলকে চিহ্নিত করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, রাজনৈতিক দলের পুনর্গঠন একটি গুরুত্বপূর্ণ চলমান প্রক্রিয়া। নতুন নেতৃত্ব তৈরির জন্য রাজনৈতিক দলের পুনর্গঠনের কোনো বিকল্প নেই। তার কারণ শরীরে যেমন নতুন রক্ত না হলে মানুষ বাঁচে না, তেমনি রাজনৈতিক দলে নতুন নেতৃত্ব তৈরি না হলে তার বিকাশ ঘটে না। বিএনপি অতীতে দল পুনর্গঠনে হাত দিয়েছে, বর্তমানেও পুনর্গঠন প্রক্রিয়া চলছে। কিন্তু অতীতে পুনর্গঠনের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী বিএনপির আত্মপ্রকাশ কার্যে পরিলক্ষিত হয়নি। যার ফলে এশিয়ার অন্যতম একটি বৃহত্তম রাজনৈতিক দল হওয়া সত্ত্বেও রাজপথ থেকে ফিরে আসতে হয়েছে দলটিকে।

আবার দল পূনর্গঠনের সুযোগে জনবিচ্ছিন্ন, রাজনীতি বিমুখ, ব্যবসায়ী ও কিছু সুবিধাবাদী লোকেরা দলের গুরুত্বপূর্ণ পদ-পদবিতে অধিষ্ঠ। দল যখন অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে রাজপথে নেমে পড়েছে ঠিক তখনই এসব লোকেরা নিজেদের ব্যবসা ও নিরাপদে থাকার জন্য সরকারের সাথে আঁতাত করেছে বা গা-ঢাকা দিয়েছে। ফলে অভিভাবকহীন কর্মীরা মাঝপথে গিয়ে দিক শূন্য হয়ে পড়েছে। যার ফলে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের অদম্য সাহস, নিষ্ঠা ও একাগ্রতা থাকা সত্ত্বেও আন্দোলনে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি।

খালেদা জিয়াকে বাড়ি থেকে বের করা, গায়ের জোরে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন করাসহ বিভিন্ন কাজে ক্ষমতাসীন ও আওয়ামী লীগের সাহস বেড়ে গেছে। আর এখন অনেকটা সুবিধাজনক পর্যায়ে আছে। তারা বর্তমানে যা ইচ্ছা তাই করছে। এই সময়টা আওয়ামী লীগের রাজনীতির জন্য অত্যন্ত ভালো সময়। যার ফলে বিএনপি একটা বড় দল হয়েও তাদের প্রটেক করতে পারছে না। তাই আগামীতে বিএনপিকে আন্দোলনে সফলতার মুখ দেখতে হলে অতীতে সাংগঠনিক ক্ষেত্রে কী কী ভুল ছিল তা বিচার-বিশ্লেষণ করে সামনের দিকে আগাতে হবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

বিএনপিকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি ফেমাসনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, সব বাধা বিপত্তি কাটিয়ে যে লক্ষে বিএনপি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সেই লক্ষে আবারো ফিরবে। জনগণকে পাশে নিয়ে প্রতিষ্ঠাতা জিয়ার রহমানের আদর্শে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে বিএনপি।

সরকারের দাবি আদায়ে বাধ্য করা নিয়ে বিএনপির ভাইস চেয়াম্যান শামসুজ্জামান দুদু ফেমাসনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, বিএনপি একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল। সব দাবি-দাওয়া এবং প্রস্তাবনা আলোচনা বা সংলাপের মাধ্যমে সমাধান করতে চায়। আগামী নির্বাচন নিয়ে সরকারের সাথে সংলাপের জন্য বিএনপি সর্বদা প্রস্তুত। তবে সরকার যদি শেষ পর্যন্ত বিএনপির সাথে সংলাপে না বসতে চায় তবে তো আন্দোলনের বিকল্প থাকবে না। আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ করতে বিএনপি সব রকমের রাস্তা খোলা রেখেছে। হয় সংলাপ না হয় আন্দোলন।

বিএনপির আন্দোলনের ব্যর্থতা নিয়ে দলটির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আতাউর রহমান ঢালী ফেমাসনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, বিএনপি ক্ষমতা হারানোর পর থেকে ৮ বছরে দলটির ওপর যে নির্যাতন করা হয়েছে তা অবর্ণনীয়। বিএনপি মহাসচিবের নামে ১৬৩টি মামলা। দেশের ৩ বারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিচার বিভাগকে সম্মান দেখিয়ে মামলার সাতদিন পর পর কোর্টে হাজির হন। হাজিরা না দিলে তার নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়।

তিনি বলেন, আজকে বিএনপি কোথায় আছে? আমরা একটা মিছিল করতে পারি না। দলের ১৬৩ জন কর্মীকে গুম করা হয়েছে। এমন কোনো নেতা নেই যার নামে দশটি মামলা নেই। এই যে স্টিম রোলার, এই যে স্বৈরশাসন বাংলাদেশে আমরা আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া খানের শাসনও দেখেছি কিন্তু এই রকম শাসন কখনো দেখিনি। এত হামলা মামলার পরও সাধ্যমত জনগণকে সচেতন করার চেষ্টা করা হচ্ছে এবং আগামীদিনে আমরা অবশ্যই আন্দোলনে যাব। এই আন্দোলনের ভীত মজবুত করতে আমরা এখন থেকেই প্রস্তুতি নিচ্ছি।

নাম প্রকাশে ছাত্রদলের এক সিনিয়র নেতা ফেমাসনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, বিএনপির এখনো যে সাহসী নেতারা আছেন তার একভাগও আওয়ামী লীগে নেই। আওয়ামী লীগ সরকার তো প্রশাসন এবং পুলিশ বাহিনীর ওপর নির্ভর করে আছে। পুলিশ বাহিনী ছাড়া মাঠে নামলে দেখা যাবে আন্দোলন কাকে বলে। বিএনপি একবার সুযোগ পেলে দেখিয়ে দেবে বিএনপি কী পারে আর পারে না। তবে বিএনপি চেয়ারপারসনের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছে নেতাকর্মীরা।
ফেমাসনিউজ২৪/এফএম/এমএম