logo

সোমবার, ২১ অক্টোবর ২০১৯ | ৬ কার্তিক, ১৪২৬

header-ad

নীরব জামায়াতে ভাঙনে হতাশা

বিশেষ প্রতিবেদক | আপডেট: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত দল- বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীতে। মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাওয়া এবং নতুন নামে দল গঠন নিয়েই মূলত জামায়াতে মতভেদ দেখা দিয়েছে।

এর মধ্যে গত শুক্রবার দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে এ অস্থিরতা প্রকাশ্যে আসে। আর গতকাল শনিবার জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিশে শূরার সদস্য মজিবুর রহমান মঞ্জুকে বহিষ্কার করার ঘটনায় দলের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ফুটে ওঠে।

একইদিন জামায়াতের দিনাজপুরের খানসামা উপজেলার এক নেতা মো. বখতিয়ার উদ্দিন স্বেচ্ছায় দল থেকে পদত্যাগ করেন। সংস্কার ইস্যুতে শিগগিরই দলের অনেকেই পদত্যাগ করতে পারেন- এমন গুঞ্জনও শোনা যাচ্ছে।

দলীয় সূত্র জানায়, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, খোদ দলটির আমির মকবুল আহমদই আর স্বপদে থাকতে চাইছেন না। একাত্তরের ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাওয়া ও দল বিলুপ্তি ইস্যুতে সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গে তারও মতবিরোধ চলছে।

ওই সূত্র জানায়, পরিস্থিতি মোকাবেলায় দলের অবস্থান জানিয়ে গত শুক্রবার তৃণমূলকে চিঠি দিয়েছে কেন্দ্রীয় জামায়াত নেতারা।

চিঠিতে বলা হয়- সংগঠনের সব সিদ্ধান্ত দলের আমির, সেক্রেটারি, অঞ্চল দায়িত্বশীল, জেলা ও মহানগর আমিরের মাধ্যমে যথাসময়ে সরাসরি জানানো হবে। এর বাইরে কারও আবেদন-নিবেদন ও অনুরোধে নেতাকর্মীরা যাতে সাড়া না দেন, সে ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক থাকতে বলা হয়।

দল থেকে বহিষ্কার হওয়ার পর জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিশে শূরা সদস্য মজিবুর রহমান মঞ্জু গতকাল শনিবার তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে বলেন, ‘জামায়াতে রাজনৈতিক সংস্কারের যৌক্তিকতা, ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে ভূমিকা প্রসঙ্গে আমার সুস্পষ্ট মত ছিল- জামায়াতে প্রয়োজনীয় সংস্কার না হলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভবিষ্যৎ অন্ধকার। আমার এরূপ খোলামেলা মত নিয়ে জামায়াতের সম্মানীত নেতাদের মধ্যে বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হয়।

সংস্কার ইস্যুতে দলে বিভক্তি প্রকাশ্য হওয়ায় বিব্রত জামায়াতে ইসলামীর আমির মকবুল আহমদও। নাম প্রকাশে অনুইচ্ছুক তার এক ঘনিষ্ঠজন জানান, বিব্রত হওয়ার বিষয়টি দলের আমির আমাদের কয়েকজনকে জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তার বয়স হয়েছে। এই বয়সে এসে দলের মধ্যে এমন পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে হবে- তা তিনি আশা করেননি। তাই আমির পদে তিনি আর থাকতে চাইছেন না। তিনি জামায়াতের সদস্য পদে থাকতেই স্বস্তিবোধ করছেন।

গত শুক্রবার ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক তার পদত্যাগপত্রে দাবি করেছেন, স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাইতে তিনি জামায়াতকে একাধিকবার পরামর্শ দেন। তবে তার সেই পরামর্শ উপেক্ষা করা হয়েছে। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া জামায়াতের নেতা মুহাম্মদ কামারুজ্জামানও প্রায় ৯ বছর আগে কারাগার থেকে লেখা এক চিঠিতে দলে সংস্কারের পরামর্শ দিয়েছিলেন।

দীর্ঘ ওই চিঠিতে বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে কামারুজ্জামান লিখেছিলেন, প্রশ্ন হচ্ছে আমাদের ভবিষ্যৎ কী? এ ব্যাপারে কয়েক দফা পরামর্শও দেন তিনি। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- ১. যা হবার হবে। আমরা যেমন আছি তেমনি থাকব (বতমানে এমন কৌশলই অবলম্বন করা হয়েছে)।

২. পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে জামায়াত সিদ্ধান্ত নিয়ে পেছন থেকে একটি নতুন সংগঠন গড়ে তুলবে। এ সংগঠন প্রজ্ঞা ও দৃঢ়তার সঙ্গে ধর্মহীন শক্তির মোকাবেলা করবে। ৩. আমাদের যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের মিথ্যা অভিযোগ আনা হচ্ছে তারা জামায়াতের নেতৃত্ব থেকে সরে দাঁড়াব এবং সম্পূর্ণ নতুন নেতাদের হাতে জামায়াতকে ছেড়ে দেব।

পরবর্তী সময়ে মতিউর রহমান নিজামীর স্ত্রী শামসুন্নাহার নিজামী ‘বিবেচনায় আনতে হবে সবকিছু’ শিরোনামে একটি লেখায় কামারুজ্জামানের পরামর্শগুলোর বিরোধিতা করেন। সংস্কার ইস্যু নিয়ে জামায়াতে তখন বিতর্ক শুরু হলে ‘ইসলামী আন্দোলনে হীনম্মন্যতাবোধের সুযোগ নেই’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় জামায়াত সমর্থিত একটি জাতীয় দৈনিকে।

ধারণা করা হয়, আবু নকীব ছদ্মনামে কারাগার থেকে লেখাটি লিখেছিলেন মতিউর রহমান নিজামী। প্রবন্ধটি প্রকাশের পর এ ইস্যুতে প্রকাশ্যে আর কথা বলার সাহস দেখায়নি কোনো নেতা।

জামায়াতের একাধিক সূত্র জানায়, মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাওয়া ও নতুন দল গঠনসহ আরও কয়েকটি ইস্যুতে দীর্ঘদিন ধরেই সোচ্চার শিবির থেকে আসা জামায়াতের তরুণ নেতারা।

তাদের বেশির ভাগই আবার সদ্য পদত্যাগকারী ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের অনুসারী বলে পরিচিত। তাদের সঙ্গে একমত পোষণ করে জামায়াতে সংস্কার ইস্যুতে বুদ্ধি পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করছেন একজন বুদ্ধিজীবীও (তিনি দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্য কর্মকাণ্ড থেকে নিষ্ক্রিয় আছেন)।

সম্প্রতি ওই বুদ্ধিজীবী মালয়েশিয়ায় জামায়াত নেতাদের (যারা সংস্কার চান) নিয়ে বৈঠকও করেছেন। সেখানে মালয়েশিয়া ও ইউরোপে থাকা বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতাও উপস্থিত ছিলেন।

ওই বৈঠকে একটি মাত্র ইস্যুই ছিল নতুন দল গঠন। তবে এ নিয়ে জামায়াতের আমির ও সেক্রেটারি জেনারেল- এ দুজনের মধ্যেও মতবিরোধ দেখা দেয়। দলের আমির মকবুল আহমদ সদ্য পদত্যাগ করা আবদুর রাজ্জাকের যুক্তির সঙ্গে একমত ছিলেন। তবে সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমান এর বিপক্ষে।

দলের কর্মপরিষদের এক সদস্য বলেন, সেক্রেটারি জেনারেলের যুক্তি হচ্ছে- একাত্তরে ভূমিকার জন্য জামায়াত যদি আজ ক্ষমা চায়, পরদিন ক্ষমতাসীন দলের নেতারা বলবেন কেন ক্ষমা চেয়েছে? এর পেছনে উদ্দেশ্য আছে কিনা খোঁজা শুরু করবেন। আর নতুন নামে দল গঠন নিয়ে তার মত- এটি করা করা হলেও দলীয় নেতাকর্মীরা মামলা-হামলা-নির্যাতন থেকে মুক্তি পাবে না। তবে সেক্রেটারি জেনারেল এ-ও মনে করেন, দলের সব নেতা এসব বিষয়ে একমত পোষণ করলে তাতে তার কোনো আপত্তি নেই।

সর্বশেষ দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের জরুরি সভায় তরুণ নেতৃত্বের দাবির মুখে একাত্তরের ভুল রাজনৈতিক ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাওয়া এবং জামায়াত নামক দল বিলুপ্ত করে সমাজসেবামূলক কার্যক্রমে দলকে নিয়োজিত করার নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়। যা পরে দলের কেন্দ্রীয় মজলিশে শূরায় অনুমোদন পায়নি।

জামায়াতের একটি সূত্র জানায়, নতুন নামে দল গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। নতুন নামে দল গঠনের প্রস্তাব আসে জামায়াতের মজলিশে শূরা থেকেই। প্রস্তাব বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে দলের নির্বাহী পরিষদকে।

চলতি বছরেই নতুন দল গঠিত হতে পারে। তবে দলের নাম চূড়ান্ত হয়নি। সিদ্ধান্ত হয়- নতুন দল ধর্মভিত্তিক হবে না। নতুন দল গঠিত হলেও বিলুপ্ত হবে না নিবন্ধন হারানো জামায়াত। যেটি থাকবে ‘আদর্শিক সংগঠন’ হিসেবে। কিন্তু ভোটে থাকবে না। ভোটের রাজনীতিতে থাকবে নতুন দল।

এ প্রসঙ্গে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী বলেন, ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক যদি পদত্যাগ করে মুখ না খুলতেন, তাহলে আমরা বুঝতে পারতাম না- জামায়াতে সংস্কার প্রক্রিয়া কতদিন ধরে চলছে।

ব্যারিস্টার রাজ্জাক জানিয়েছেন, তিনি ৩০ বছর ধরে চেষ্টা করছেন জামায়াতের ভেতরে একটা সংস্কার প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করার জন্য। ধরেন এখন যাদের বয়স ৬০ থেকে ৬৫ বছর, মুক্তিযুদ্ধের সময় তাদের বয়স ছিল ১২-১৩ বছর। জামায়াতে যারা তরুণ জেনারেশন তাদের কারোরই বয়স ৫০-এর ওপরে নয়। তারা মুক্তিযুদ্ধ দেখেইনি। কিন্তু তারা কেন দায়ভার বহন করবে?

জামায়াতের বেশির ভাগ নেতাই মনে করেন- মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকা নিয়ে আজও তাড়া করছে দলটিকে। এটিসহ আরও কয়েকটি ইস্যুতে জামায়াতে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের অস্থিরতা।

এর সর্বশেষ সংযোজন হিসেবেই দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক পদত্যাগ করেছেন। এই ইস্যুগুলো শিগগিরই সুরাহা করতে না পারলে অনেকেই পদত্যাগ করতে পারেন।

ফেমাসনিউজ২৪.কম/আরআই/আরবি