logo

বৃহস্পতিবার, ২৬ এপ্রিল ২০১৮ | ১৩ বৈশাখ, ১৪২৫

header-ad
উচ্ছ্বসিত প্রবাসীরা

আলোয় ভরা মিশর দূতাবাস, আমূল উন্নতি

কায়রো, মিশর থেকে ইউ. এইচ. খান | আপডেট: ১০ এপ্রিল ২০১৮

প্রাচীন সভ্যতা ও আফ্রিকার দরজা হিসেবে মিশর সমাদৃত। মিশর বললেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠে পিরামিড আর নীলনদ।

মিশর বাংলাদেশের বিশেষ বন্ধুরাষ্ট্র। স্বাধীনতার পর থেকেই মিশর বাংলাদেশকে বিভিন্ন ভাবে সহোযগিতা করে আসছে। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিমণ্ডলেও মিশর ও বাংলাদেশ একে অপরকে সমর্থন করে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর তুলনায় মিশরে প্রবাসী বাংলাদেশীর সংখ্যা খুবই নগন্য। আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয়, কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়সহ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নের জন্য বাংলাদেশ থেকে গড়ে ৫০ থেকে ১০০ জন ছাত্রছাত্রী প্রতিবছর মিশর আসেন।

অতীতে মিশরের বিভিন্ন সেক্টরে বাংলাদেশ থেকে নিয়মিত শ্রমিক আসতেন। কিন্তু আরব বসন্তের পর মিশরের অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ হওয়ায় শ্রমিকের স্রোত কমে যায় । আর সর্বশেষ মিশর সরকার বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশের নাগরিকদের ওয়ার্ক পারমিট দেয়া একে বারে বন্ধ করে দেয়। ইতোমধ্যেই মিশরের বিভিন্ন সেক্টরে বাংলাদেশি অনেক ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছেন। অনেকে টুরিস্ট ভিসায় এসে বিভিন্নভাবে থেকে যাওয়ার চেষ্টা করেন।

অতীতে মিশর দূতাবাসের বেশ কিছু সফল কর্মকাণ্ড রয়েছে। বিশেষ করে আরব বসন্তের সময় মিশর প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ, লিবিয়ার বিপুল সংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিরাপদে লিবিয়া থেকে বের করে প্রথমে মিশর ও পরে বাংলাদেশে পাঠানোর ব্যাবস্থা মিশর দূতাবাসই করে। অনেক ভালো কর্মময় অতীত ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও বিগত কয়েক বছর দূতাবাসে শনির দশা ভর করে। লাগামহীন দুর্নীতি , প্রবাসীদের সঙ্গে খারাপ আচরণ, সময়মত কনসুলেট সার্ভিস প্রদান না করাসহ বিভিন্ন অভিযোগে দূতাবাসের বিরুদ্ধে প্রবাসীরা বেশ অসন্তুষ্ট হয়ে উঠেছিল। একেবারে নেহায়েত প্রয়োজন না হলে কেউ দূতাবাসে যেতে চাইত না। এ ছাড়া দালাল ও সিন্ডিকেটের ছিল চরম রাজত্ব।

দূতাবাসের অল্প কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর মদদে বাংলাদেশের কয়েকজন সন্ত্রাসী মিশরে অপরাধের এক স্বর্গরাজ্য গড়ে তুলেছিল। মুক্তিপণের জন্য অপহরণ, চাঁদাবাজি ও মানবপাচার হয়ে উঠেছিল নিত্যদিনের ঘটনা। তবে দিন বদলেছে। এতক্ষণ যা পড়লেন সবই এখন অন্ধকার অতীত। মিশর দূতাবাস এখন নতুন আলোয় উদ্ভাসিত। দীর্ঘদিন রাষ্ট্রদূতবিহীন থাকার পর বাংলাদেশের একজন স্বনামধন্য বরেণ্য কূটনীতিক মোহাম্মদ আলী সরকার মিশরের রাষ্ট্রদূত হিসেবে গত বছর ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তারপর থেকেই বদলে যেতে থাকে মিশর দূতাবাসের চিত্র। তিনি লাগাম টেনে ধরেন সব ধরনের দুর্নীতির।

পরিস্থিতি সম্পর্কে জানার জন্য তিনি গোপনে প্রবাসীদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেন এবং তাদের পরামর্শ চান। শুধু জনগণের সেবা নিশ্চিত করার জন্য তিনি চাকরির শেষ বয়সেও সর্বোচ্য অবস্থানে থেকে মধ্যরাত অবধি প্রবাসীদের কাছে ছুটে বেড়িয়েছেন। কথা বলেছেন মানুষের সঙ্গে। শুনেছেন তাদের অভিযোগ ও পরামর্শ। কোনো দূতবাসে রাষ্ট্রদূতের এ ধরনের কর্মপরিকল্পনা বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসে খুবই বিরল।

রাষ্ট্রদূত একটি যুদ্ধ শুরু করেছিলেন। দূতাবাসের সব সিস্টেমের আমূল পরিবর্তন শুরু করেন। সর্বশেষ নতুন কাউন্সেলর (রাজনৈতিক) এ.টি.এম আব্দুর রউফ মণ্ডল যোগদান করার পর দূতাবাসের স্বচ্ছতার একটি নতুনমাত্রা সৃষ্টি হয়। এখন আর কাউকে কোনো কিছুর জন্য তদবির করতে হয় না। নেই কোনো অযথা লাইন। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়ে যে কেউ তার সেবা নিতে পারে এখন সহজেই। ঘুষবাণিজ্য একেবারেই বিলুপ্ত। শুরু হয়েছে ডিজিটাল সেবা ব্যাবস্থা। নতুন ইস্যুকৃত পাসপোর্ট আসার খবর এখন ওয়েব সাইটেই পাওয়া যায়। তাছাড়া ফোন সার্ভিস এবং তথ্য সেবার আমূল উন্নতি হয়েছে।

মিশরের কায়রো মিশন মূলত একটি ছোট দূতাবাস। সাধারণত এ ধরনের দূতাবাসগুলোকে তিন কর্মকর্তার (থ্রি ম্যান শো) দূতাবাস বলা হয়। একজন রাষ্ট্রদূত, একজন কাউন্সেলর ও একজন শ্রম সচিব। মিশর দূতাবাসে শ্রম সচিব হিসেবে কর্মরত আছেন জোবাইদা মান্নান। অতি স্বল্প লোকবল নিয়ে মেহেনতি প্রবাসী শ্রমিকদের তিনি যথাসাধ্য সেবা দিচ্ছেন। গত বছর মিশরে অবৈধ প্রবাসীদের ব্যাপক হারে গ্রেপ্তার শুরু করে মিরের পুলিশ। এতে বিপুলসংখ্যক অবৈধ বাংলাদেশি প্রবাসী গ্রেপ্তার হন। ছোট একটি দল নিয়ে সকল গ্রেপ্তার প্রবাসী কর্মীদের দ্রুততম সময়ে ট্রাভেল ডকুমেন্টসহ আইনি জটিলতা শেষে তাদের বাংলাদেশে পাঠানোর বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। এতে দীর্ঘদিন জেলে থাকার বদলে গড়ে ১৫ দিনের মধ্যেই গ্রেপ্তারকৃত বাংলাদেশিরা দেশে ফেরত যেতে স্বক্ষম হন। মিশরের বেশীরভাগ শ্রমিকই বর্তমানে অবৈধ। তাদের সমস্যা সমাধানে আইনের ভেতর থেকে জোবাইদা মান্নানের নেতৃত্বে সর্বোচ্চ সেবা দিয়ে যাচ্ছে মিশরস্থ শ্রম বিভাগ।

মিশর প্রবাসীদের সেবা পাওয়ার জন্য করণীয়
অনেক প্রবাসীই দূতাবাসে গিয়ে কোনো ধরনের প্রমাণ দলিল দাখিল না করেই বিভিন্ন ডকুমেন্টের জন্য অনুরোধ করেন। প্রথমত মনে রাখা দরকার আইনগতভাবে আপনি দূতাবাস থেকে যে কোনো ধরনের সেবা গ্রহণ করার জন্য আপনি যে বাংলাদেশের নাগরিক, তার প্রমাণ দাখিল করতে হবে। সাধারণত পাসপোর্টের কপি দাখিল করতে হয়।

যদি পাসপোর্ট হারিয়ে যায়, তা হলে ডিজিটাল জন্মনিবন্ধন ও ভোটার আইডি (যদি থাকে) তার ফটোকপি দাখিল করতে হবে। আপনি বাংলা বলতে পারেন বলেই যে আপনাকে সব সেবা দিবে তা কিন্তু নয়। সব কিছুরই একটি আইন আছে। এবার ধরুন আপনার ছাত্র স্বংক্রান্ত একটি প্রশংসাপত্র দরকার মিশরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার জন্য। আপনি গিয়ে পাসপোর্টের কপি দিয়েই দূতাবাসের চিঠি চাইলেন। কিন্তু আপনি যে ছাত্র, তার প্রমাণ দিলেন না । তাহলে দূতাবাস কি করে আপনার চিঠি ইস্যু করবে। অনেকে শুধু সার্টিফিকেটের কপি দিয়ে চিঠি চান। কিন্তু মনে রাখা দরকার দূতাবাস শুধু্ একটি মিডিয়া মাত্র, যা বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ হয়ে মিশরের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করে। দূতাবাসের কোনো কিছু তদন্ত করার জন্য গোয়েন্দা টিম নেই যে, আপনার দেয়া তথ্য দেশে গিয়ে মিলিয়ে দেখবে। আপনাকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সত্যায়িত করা সার্টিফিকেট দাখিল করতে হবে। এটাই আইন। অথবা আপনি বিয়ের অনুমতিপত্র চাইলে আপনি যে অবিবাহিত, তার সার্টিফিকেট লাগবে যা দেশের নিজ জেলার ডিসি অফিস প্রদান করে থাকে। বিয়ের জন্য অভিভাবকের নোটারিকৃত অনুমতিপত্র আবশ্যক। যা দেশ থেকে করিয়ে আনতে হয়। সবার মনে রাখা দরকার এগুলো দূতাবাসের কোনো কর্মকর্তার মস্তিস্কপ্রসূত আইডিয়া নয় । এগুলো পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দূতাবাসের সেবা সংক্রান্ত আইন। অনেকে পাসপোর্ট করতে আসেন খালি হাতে। প্রত্যেকটি সেবার জন্য আলাদা আলাদা বাংলা বা ইংরেজি আবেদনপত্র ও প্রয়োজনীয়তার স্বাপেক্ষে প্রমাণাদি দাখিল করলে আপনি স্বয়ংক্রিয়ভাবেই আপনার কাঙ্খিত সেবা পাবেন।

শ্রম বিভাগে অনেকে প্রবাসে সংগঠিত ঘটনার বিচার নিয়ে আসে। প্রথমেই মনে রাখা দরকার শ্রম বিভাগ আইন প্রয়োগকারী সংস্থা নয়। মিশরে সংগঠিত যে কোনো ধরনের অপরাধের তদন্ত ও বিচার মিশরের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ওপর বর্তায়। অনেকে হুন্ডির টাকা, আদম ব্যবসার জটিলতা নিয়ে দূতাবাসের কাছে বিচার চান। দূতাবাসের এ বিষয়ে কোনো সার্ভিস দেয়ার কথা না। তারপরও সব সময় দূতাবাস ক্ষতিগ্রস্তদের কথা চিন্তা করে যথা সম্ভব ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। অনেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে দূতাবাসকে সমাধান করে দেয়ার জন্য চাপ দেয়। যা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। তারপরও দূতাবাস বিভিন্ন সময় প্রবাসীদের মাঝে শান্তির লক্ষ্যে বিভিন্ন ধরনের মধ্যস্থতা করে থাকে। দূতাবাসের সাহায্যে বিশেষ করে শ্রম বিভাগের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের আইন আনুগ ব্যাবস্থা নিয়মিত নেয়া হয় । কাউকে বাংলাদেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে তুলে দেয়া হয়, কাউকে মিশরীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে তুলে দেয়া হয়। গত কয়েক বছরের অপরাধের রাজত্ব অনেকটাই কমেছে এই ধরনের পদক্ষেপের ফলে।

মিশর প্রবাসীদের মাঝে দূতাবাস নিয়ে এখন খুশির ভাব বিরাজ করছে। সবাই আশা করছে কর্মকর্তারা বদলি হলেও এই সুন্দর ব্যবস্থা বহাল থাকবে। প্রবাসীরা এখন স্বাচ্ছন্দে দূতাবাসে আসতে পারেন। প্রবাসে একখণ্ড বাংলাদেশের ছোয়া পাবেন দূতাবাসে গেলে। দূতাবাসের নিচতলায় একটি মন্তব্য বই আছে। কোনো অভিযোগ বা অনুরোধ থাকলে লিখে আসতে পারেন। নিশ্চিত থাকতে পারেন এই মন্তব্য বই নিয়মিত চেক করা হয় এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়।

দূতাবাসে যাওয়ার পূর্বেই আবেদন লিখে প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট সঙ্গে করে নিয়ে নিন। এরপর সাধারণত পাঁচ মিনিটেই আপনার আবেদন জমা দিয়ে দিতে পারবেন। বাইরে নোটিশ বোর্ডে কোনন সেবার জন্য কেমন সময় লাগবে এবং কখন ডেলিভারি নিতে হবে, তা সুন্দর করে লেখা আছে। নির্দিষ্ট সময় পরে গেলে আপনার কাগজপত্র ঠিক থাকলে আপনার কাঙ্খিত সেবাটি প্রস্তুত অবস্থায় পাবেন। কোন মাধ্যম বা দালালের প্রয়োজন একেবারেই নেই। সব সময় পরিষ্কার করে আবেদন, দেশের বিস্তারিত ঠিকানা ও বর্তমান ঠিকানা , ফোন নম্বর লিখে দিন। আর হ্যাঁ, বেলা ১১টার আগে জমা দিতে পারলে ওই দিনই আপনার আবেদনটি প্রয়োজনীয় বিভাগে পাঠানো হবে।

প্রবসীদের মনে রাখা দরকার, সেবা পাওয়ার জন্য আমাদেরও কিছু দায়িত্বও আছে। প্রথমত আপনার একটু ভালো ব্যবহার ও আন্তরিকতা দূতাবাসের কর্মকর্তা কর্মচারীদের আনন্দ দেয়।

(লেখক : মিশরের তথ্য মন্ত্রণালয়ে কর্মরত বাংলাদেশি সাংবাদিক ও গবেষক)

ফেমাসনিউজ২৪.কম/আরআই/আরবি