logo

রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ৫ আশ্বিন, ১৪২৭

header-ad

ধোঁয়া

আাজাদ আবুল কালাম | আপডেট: ০৮ জানুয়ারি ২০১৭

মেয়েটির কন্ঠে "ভাই আগুন হবে" কথাটা শুনে অনেকটা চমকে গেছে অয়ন। একজন সুন্দরী ষোড়শীর মুখে আগুন চাওয়াটা অনেকেটাই বেমানান। আগুন দিয়ে কি করবেন জিজ্ঞেস করতেই উত্তর দিল সিগারেট খাবে। অয়ন কয়েকটা কাশি দিয়ে গলাটা পরিষ্কার করে নিল। সে পুরুষ হয়ে সিগারেটকে এড়িয়ে চলে অথচ এক মেয়ে তার কাছে আগুন চাচ্ছে এটা বড়ই লজ্জার বিষয়।

-- দেখুন আমি সিগারেট খাই না তাই আগুন নেই, কিন্তু আপনি মেয়ে হয়ে সিগারেট খান এটা বড়ই আশ্চর্যের বিষয়
-- মেয়েরা কি সিগারেট খেতে পারে না।
-- পারবেনা কেন, ইচ্ছে করলে পারে কিন্তু সেটা ভালো দেখায় না। সিগারেট পুরুষের ঠোঁটেই ভাল মানায়।
-- আচ্ছা পুরুষেরা সিগারেট কেন খায় বলতে পারেন?
-- যদিও আমি সিগারেট খাই না, তবে যতটুকু জানি, সিগারেট খেলে নাকি টেনশন কমে। দুঃখ ভুলে থাকা যায়। অনেকের আবার নাকি মস্তিষ্ক ভালো কাজ করে সিগারেটের ধোঁয়ায়।
-- আপনি ঠিকই শুনেছেন আমি ঠিক একই কারনে সিগারেটের ধোঁয়ায় নিজেকে জড়িয়ে নিয়েছি।

আপনার কিসের এতো দুঃখ ? প্রশ্নটা করতে গিয়েও নিজেকে সংযত রাখে অয়ন। কারন একজন অপরিচিত মেয়েকে সরাসরি প্রশ্নটা করা যায় না।

হঠাৎ করেই মেয়েটা কয়েকটা কাশি দেয়। কাশি গুলো এতোটাই বিশ্রী মনে হচ্ছিলো যে তার কলিজা সহ বেড়িয়ে আসবে। কাশি থামতেই মেয়েটি অয়ন কে আবার জিজ্ঞেস করে

--আচ্ছা ভাই ট্রেন কখন আসবে বলতে পারেন।
-- এখনই তো এসে পড়ার কথা, কিন্তু আপনি তো মনে হয় অসুস্থ।
-- আমি ঠিক আছি আর ট্রেন আসলে ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিব তাই দাঁড়িয়ে আছি।

অয়ন আনেকটা চমকে উঠলো ! মেয়েটি কি বলে আবল তাবল। মেয়েটি আসলেই রহস্য ময়।
....
মেয়েটি তার পাশে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল তারপর হঠাৎ করে কোথায় যেন হাওয়া হয়ে গেল। কিন্তু অয়নের মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে আসলেই কি মেয়েটি ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিবে!

খুব সুন্দর একটি সিট পেয়েছে অয়ন। একেবারে জানালার পাশে, ফুরফুরে বাতাস তাকে বিমহিত করে তুলছে। চোখ বুঝে ভালোলাগাটা উপলব্ধি করার চেষ্টা করছিল।

-- আমি কি এখানে একটু বসতে পারি?

হঠাৎ করে আসা প্রশ্নটায় অয়ন চমকে গেছে।

-- কি ব্যাপার, আপনি এখানে? আপনার না ট্রেনের নিচে থাকার কথা। উপরে আসলেন কিভাবে?
-- না একটা কাজ আছে পূবাইল নামতে হবে। কাজটা সেরেই চিন্তা ভাবনা করব ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দেওয়া যায় কিনা।
-- ট্রেন তো অনেক আগেই ছেড়েছে। এতক্ষণ আপনি কোথায় ছিলেন ?
-- পাশের কেবিনে ছিলাম। কিন্তু পাশের কেবিনের মানুষ গুলোকে আমার তেমন সুবিধার মনে হলো না। আমি আগেই লক্ষ্য করেছি আপনি এই কেবিনে আছেন তাই এখানেই চলে আসলাম।
-- ঐ কেবিনের লোক গুলো কে ভালো মনে হলো না কিন্তু আমাকে ভালো মনে হওয়ার কারন?
-- আপনাকে আমার ভালো মনে হয়েছে। আর যারা সিগারেট খায় না তারা আরো বেশি ভালো হয়।

অয়নের সাথে মেয়েটির আরো কিছু টুকটাক কথা হয়েছে। মেয়েটি এখন একটি ডাইরি বের করেছে। সেখানে কি যেন লেখার চেষ্টা করছে তবে ট্রেনের ঝাকিতে লিখতে হয়তো কিছুটা কষ্ট হচ্ছে।

ট্রেন কতদূর চলে এসেছে অয়ন ঠিক জানে না। কারন সে ঘুমিয়ে পরেছিল। এখন আর পাশের মেয়েটি নেই হয়তো নেমে গেছে। কিন্তু হঠাৎ করে অয়নের চোখ পড়লো পাশের সিটের নিচের পাটাতনে। সেখানে একটি ডাইরি পরে আছে।

ডাইরিটি তার পরিচিত। হয়তো তাড়াতাড়ি নামতে গিয়ে মেয়েটি ডাইরিটা ফেলে রেখে গেছে। কৌতূহল বসত ডাইরিটি হাতে তুলে নেয় অয়ন। অন্যের ডাইরি পড়া হয়তো অন্যায় তারপরও একটু চোখ বুলিয়ে দেখার চেষ্টা করে ডাইরিতে কি লেখা আছে।

পাতা উল্টাতেই চোখে পরে বিভিন্ন ধরনের কথাবার্তা, আবেগ, ভালোবাসা, অনুভুতি আরো অনেক কিছু । যতটুকু বুঝা গেল মেয়েটি কোন এক ছেলেকে অনেক ভালোবাসে কিন্তু হঠাৎ শেষ পাতায় এসে তার চোখ আটকে গেল। লেখা গুলো অনেকটা আঁকা বাঁকা, যে লেখা গুলো সে ট্রেনে বসে লেখে ছিল।

--পলাশ আজ তোমার প্রথম মৃত্যু বার্ষিকি। আমি আসছি তোমাকে দেখার জন্য। হয়তো তোমাকে দেখতে পাব না কিন্তু তোমার কবরের মাটি ছুঁয়ে তোমাকে অনুভব করার চেষ্টা করব। জানো পালাশ আমি না তোমার কাছে আসার চেষ্টা করছি কিন্তু পারছি না। আত্মহত্যা যদি মহা পাপ না হতো তবে এতদিন আমি তোমার কাছে চলে আসতাম।

অতিরিক্ত ধুমপানে তোমার ফুসফুসে ক্যান্সার হয়েছিলো। পৃথিবীর কোন ডাক্তার তোমাকে বাঁচাতে পারেনি। তোমার কিসের এতো কষ্ট ছিল সেটা কখনই আমাকে বলনি। এতো বারণ করার পরেও সিগারেট ছাড়তে পারনি কিন্তু আমাকে ছেড়ে ঠিকই পরপার চলে গেছ। জানো পলাশ আমিও না তোমার মত সিগারেট ধরেছি। প্রতি মিনিটে মিনিটে সিগারেট না হলে এখন আমার চলে না।

আমি যে ঠিক তোমার মতোই ফুসফুসটাকে পঁচাতে চাই তারপর চলে আসতে চাই তোমার কাছে। আমি ঠিক জানিনা আমার মৃত দেহটা কবে তোমার কবরের পাশে শোয়ানো হবে। আজকাল বড্ড কাশি আসে। কাশির সাথে রক্তও বের হয় মাঝে মাঝে। আমি সবাই কে বলে রেখেছি আমার মৃত্যু হলে তোমার পাশে যেন শুইয়ে দেয় আমায়। কিন্তু কেউ আমায় মরতে দিতে চায় না, জানো পলাশ........

তারপর আর কিছু লেখা নেই। ডাইরিটা পড়ে অয়নের হৃদয়টা বিষণ্নতায় ভরে গেছে। ভেতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। কেন মানুষ কে সিগারেট খেতে হবে ? কেন একজনের ভালোবাসার জন্য আরেকজন ঠিক একই ভাবে মরতে চাইবে।কই আমি তো সিগারেট খাই না।

আমার টেনসন গুলোকে আমি কি প্রতিহত করতে পারি না ? আমার সুস্থ মস্তিষ্ক কি সিগারেট না খেলে উজ্জিবিত হয় না ?? আসলে সিগারেট একটা খারাপ নেশা ছাড়া আর কিছুই নয়।

অনেক দিন চলে গেছে। তার ছয় বছর পর অয়ন দাঁড়িয়ে আছে ঠিক সেই আগের জায়গাটায়। একটি পরিচিত কন্ঠস্বর শুনে অয়ন চমকে উঠলো।

-- এক্সকিউজ মি, আপনার কাছে লাইটার হবে?
-- আরে আপনি ! এখনো সিগারেট খান বুঝি?
-- না এখন আর সিগারেট খাই না। তবে আপনাকে চিনতে পেরেছি তাই কথা বলার জন্যে এগিয়ে আসলাম। আসলে আমার প্রিয় মানুষ গুলো আমাকে মরতে দিতে চায়নি। এক ভালোবাসা কে আলিঙ্গন করতে গিয়ে আমি তো হাজার ভালোবাসা কে অপমান করতে পারি না।
জীবনটা আসলেই সুন্দর, কিছু সময়ের জন্য হয়তো জীবনটা অসুন্দর লাগে কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সেই অসুন্দরও একসময় সুন্দর হয়ে উঠে।

-- আম্মু আম্মু আব্বু না তোমাকে ডাকছে?

অয়ন তাকিয়ে আছে ছোট্ট মেয়েটির দিকে। কি হাস্যজ্জল এবং মায়াবী।

-- আমার মেয়ে, পেছনের বেঞ্চিতে আমার স্বামী বসে আছে। ভালো থাকবেন।
-- শুনুন আপনার হারিয়ে যাওয়া ডাইরিটা কিন্তু আমার কাছে।
-- আপনার কাছেই থাক কিছু কিছু স্মৃতি মুছে ফেলতে হয়।

মেয়েটি চলে গেছে, মেয়েটির মুখে রহস্যময় হাসি অথচ এই মুখেই এক সময় সিগারেটের আগুনে ধোঁয়া উড়তো।