logo

রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ১২ আশ্বিন, ১৪২৭

header-ad

সপ্তর্ষীর জন্য

এম হাবিবুর রহমান | আপডেট: ২৫ মে ২০১৪

স্বপ্তর্র্ষীর শেষ লেখা পেয়েছিলাম ওর মৃত্যুর পাঁচদিন আগে। সাদা খামের মধ্যে গোটগোটা হাতের লেখা। সে লেখার মধ্যে দরদ ছিল। মনে হলো শেষ আকুতি গুলোও ঝরে পড়েছে তার লেখার মধ্যে। ও লিখেছিল প্রিয় অদ্রি, তোমার কাছে আমার শেষ লেখা মনে হচ্ছে। কারন আমার শরীরটা খুব বেশী ভাল নয়। মৃত্যুর আগে মনে হয় সব মানুষ তার মৃত্যুর কথা জেনে যায়।আমি মারা গেলে আমার জন্য দুঃখ করবে না পৃথিবীতে সবাই চিরদিন বাঁচেনা। শেষের দিকে লেখা গুলো এলোমেলো, লাইন বাঁকা, অনেক লেখা কাটা ছেড়া। আমার মৃত্যুর পরে একদিনের জন্য হলেও আমার কবরের পাশে  সে দাঁড়াবে। বাকী লেখা আর পড়তে ইচ্ছে হয়নি। প্রচন্ড যন্ত্রণা বুকের মধ্যে অনুভব হচ্ছে, কি এমন হলো ওকে এমন করে পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে।

প্রতিকি ছবি
সারা রাত ঘুমাতে পারেনি। রাত জাগা পাখিদের সাথে আমার রাতের প্রহর গুলো কেটে গেছে। স্বপ্তর্র্ষীর জন্য আমি প্রার্থনা করলাম ওর আত্মা যেন শান্তি পায়।
সপ্তর্ষীর সাথে প্রথম দেখা হয় এক বৈশাখী মেলায়। আমার ষ্টল থেকে ওরা কয়েকজন বান্ধবী মিলে কিছু জিনিস কিনে ছিল। যার মধ্যে উপহার কার্ড ও ছিল। মেলায় দেখা মেয়েটির মুখ আমার মনে ছিলনা,থাকারও কথা নয়। কত মেয়েইনা মেলায় এসেছে, কজনের মুখ মনে রাখা যায়? সেতো আমার কেউ ছিলনা। কিন্ত সপ্তর্ষীর কথা মনের গভীরে স্থান পায় মেলা শেষ হবার মাস দুয়েক পরে।

একদিন পড়ার টেবিলে দেখি একটি সাদা খাম। তাতে লেখা আমার নাম। খামের উপরে ডাক অফিসের ছিল আছে। খামটি খুলে দেখি সুন্দকরে লেখা অদ্রি, শুভেচ্ছা নিও। তোমার অনুমতি না নিয়েই তোমার কাছে লিখলাম। এটা ভুল কিনা জানিনা। তবে এতটুকু জানি তোমার বিরক্তির কারণ হবনা। “নববর্ষের শুরুতে সৃষ্টি কর এমন কোন কবিতা যা উজ্জল নক্ষত্র হয়ে থাকবে তোমার হৃদয়ে”।

তারপরের ঘটনা গুলি ভাল লাগার ভালবাসার। সপ্তর্ষীকে মনের মন্দিরে স্থান দিয়ে ছিলাম। জীবনের সঙ্গীরুপে কল্পনা করে কতরাত কাটিয়েছি। চিঠির পরে চিঠি লিখে দুজন মনের সব কথা শব্দের গাথুনিতে মালা তৈরী করেছ্। সপ্তর্সী উচ্চ শিক্ষার জন্য বিদেশে চলে গেল। তার সাথে শুধু চিঠিতে যোগাযোগ হয়।

এমনি করে কেটে গেল সাতটি বছর। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে মাষ্টার্স পাশ করলাম। সপ্তর্ষী লিখেছে তার পড়ালেখা শেষের দিকে। কয়েক মাসের মধ্যে সে দেশে ফিরে আসবে। শরীরটা ভাল যাচ্ছেনা। বিমান বন্দরে সে আমাকে প্রথম দেখতে যায়। আমি ওকে কথা দিয়েছি সে যেভাবে চায় তেমনটি হবে। সপ্তর্ষী দেশে ফিরে আসছে। আমি ওকে বরণ করে নেওয়ার জন্য বিমান বন্দরে যাবো। অসংখ্য গোলাপ ফুলের পাপড়ি দিয়ে ওকে স্বাগত জানাবো। সেই ভাবনা আমাকে দিন রাত আচ্ছন্ন করে রাখে।

অফিস থেকে পাঁচদিনের ছুটি নিলাম। টরেন্ট থেকে যখন সপ্তর্ষীর ফোন পেলাম তখন বাংলাদেশ সময় রাত চারটা। ফ্লাইট আধাঘন্টা পরে। ১৯৯৭ সালের ডিসেম্বরের সাত তারিখ। বাংলাদেশে প্রচন্ড সৈতপ্রবাহ চলছে। সব প্রতিবন্ধতা কে জয় করে বিমান বন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। হাতে অনেক গুলো গোলাপ ফুল। প্রথম দেখাতে সপ্তর্ষীকে কি বলে সম্বোধন করবো সেই ভাবনা আমাকে ঘিরে ধরেছে। বুকের মধ্যে একটা অস্থিরতা কাজ করছ্। তবুও ভাল লাগছে এই ভেবে যাকে এতদিন শুধ কথার মালা পরিয়ে স্বপ্নের জাল বুনেছি, আজ তাকে বাস্তবে কাছে পাবো। সপ্তর্ষীর মুখটা মনের পাতায় ভেসে আছে। আজ সে কোন পোশাক পরেছে? সাদা নাকি হাল্কা গোলাপী?

বিমানবন্দরে সারাদিন অপেক্ষা করে দিন কেটে গেল। রাত তখন দশটা বাজে। বাইরে প্রচণ্ডবাতাস, সাথে হাড় কাঁপানো শীত। ওয়েটিংরুমের টিভিতে দশটার খবর শুরু হয়েছে। টিভির পর্দায় ব্রেকিং নিউজে যা দেখলাম তাতে বুকের মধ্যে বরফ জমে গেল। গতকাল স্থানীয় সময় ভোর পাঁচটা দশ মিনিটে কানাডার টরেন্ট থেকে বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসা বিমানটির ইঞ্জিনে আগুন ধরে বিমানের সব আরোহী মৃত্যুবরণ করেছেন। বারবার দেখলাম বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। সপ্তর্র্ষী তো ঐ বিমানেই ছিল। তাহলে সেকি ............হায় বিধাতা খবরটা যেন সত্য না হয়।

অবশেষে খবর সত্য হয়েছিল। সপ্তর্ষীর দেওয়া ঠিকানা মোতাবেক ওদের ধানমন্ডির বাড়িতে যেয়ে শুনলাম লাশটি নাকি খুঁজেও পাওয়া যায়নি। দেশে ওর কেউ নেই। বাবা মা ভাই বোন সবাই কানাডাতে থাকে। দেশের বাড়িতে দূর সম্পর্কের একজন চাচা থাকেন। ওর দেশে আসার একমাত্র কারণ ছিলাম আমি। আমাকে নিয়ে কানাডাতে আবার ফিরে যাবে। কিন্ত সব স্বপ্ন মৃত্যুর কোলে বিলিন হয়ে গেছে। এক জনমে তার দেখা আর হলোনা। ওর জন্য লেখা কবিতাটি এখন আমার একমাত্র সাথী – “তোমাকে সাজাবো পলাশ ফুলে ফাগুন রাঙা দিনে, বুকের গভীরে লুকিয়ে যেও রেখে দেব স্ব যতনে........................।

এম হাবিবুর রহমান
প্রভাষক
নওয়াবেঁকী ডিগ্রি কলেজ
নওয়াবেঁকী, শ্যামনগর, সাতক্ষীরা।
ই-মেইল : hmis1972@gmail.com