logo

রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ১২ আশ্বিন, ১৪২৭

header-ad

অন্য ভাষাতে বলা মানে ভাঙা দেয়ালে চুনকাম

অপূর্ব চৌধুরী | আপডেট: ০৪ মার্চ ২০১৭

ক'দিন আগে প্যারিস গিয়েছিলাম৷ কাজে এবং অকাজে৷ প্যারিসের পথ-ঘাট ভালো চেনা৷ অনেকবার যাওয়াতে অনেক আপন মনে হয় তাকে৷ নতুন পরিবেশে পথ হারালে ভয় লাগে, চেনা পথে হারাতে ভালো লাগে৷

বান্ধবীর কথা বলেছিলাম৷ অনেকবছর পর দেখা৷ প্যারিস-ফ্লোরিডা-সিডনি দৌড়ায় কাজে কাজে৷ একটুকরো সময় বের করে নিলো৷ প্যারিসে বড় হয়েছে, অলিগলি চেনা৷ বললো, তুমিতো প্যারিস চেনো, এবার অন্য এক প্যারিস দেখাবো৷ এগুলো বইতে পাবে কম, লোকে জানে তারচেয়ে আরো কম৷

খুব ভোরে বের হলাম৷ সর্দি নিয়েছিল তার৷ ব্যাগ ফোলা, বললাম এমন টেমা কেন থলে! বলে : সারাদিনের টিস্যুর প্যাকেট নিয়ে বেরিয়েছি !

অনেক হাঁটলাম৷ সেইন নদীর ধারে, ট্যুর ইফেলের কাছে, নটরড্যাম ছাড়িয়ে, পূর্ব প্যারিসের কিছু নিরালা পথে৷ হঠাৎ ঝিরঝিরে বৃষ্টি শুরু হলো, একটা ক্যাফেতে বসলাম! খাবার খেতে খেতে অনেক কথা, অনেক কথা ৷ শেষের কফিতে চুমুক দিয়ে বললাম,
- তোমাকে নিয়ে একটি গল্প লিখবো ৷ তোমার জীবনের অর্ধেক সুখের, অর্ধেক দুঃখের, হেসে বললো,
- শেষ করবে কোথায়!
- জানি না! যে গল্পের শুরুটাই শেষটুকু জানতে, তার শেষটা জানা থাকে না!
- বাই দা ওয়ে, তুমি তো ভালো বক্তা, তোমার সাথে কথায় ঝাঁনু প্রফেসরও চুবানি খায়, কবে থেকে লেখা ধরলে, একাডেমীক ছাড়া তো কিছু লিখতে না!
- আচ্ছা ওসব থাক, আরে এমনি আমার দেশের ভাষা বাংলায় গত ক'বছর টুকটাক ছাইপাশ লিখছি৷ বলতে পারো নিছক মজা করা৷
- সৃষ্টির প্রথম শর্ত আনন্দ পাওয়া, তুমি নিজেই একদিন বলেছিলে৷
- হ্যাঁ ! তা ঠিক, নিজের জালে নিজেই এখন আটকা৷
- তো কি লিখছো কিছুই জানি না, তুমি সিরিয়াস রিডার, তুমি তো ফিকশন পড়ো না জানতাম, গল্প লিখবে কি করে! তার উপর তোমার দেশের ভাষায়, বাংলায় তো তুমি কিছু পড়ো কিনা জানি না!
- না, পড়া নেই তেমন, ভাষাটার উপর ছোটবেলায় একটা দখল ছিল, সব রবীন্দ্রনাথের অবদান, টেগোর, টেগোর, বুঝলে ওই বৃদ্ধটি সেই রস ছোটবেলাতেই ধরিয়ে দিয়েছিলেন, সেটাই সম্বল৷ ভালোবাসাকে জানতে অনেককে ভালোবাসতে হয় না, একজনই যথেষ্ট ৷ বাকিটা পথে পথে কুড়িয়ে পাওয়া৷
- ইংরেজিতে তো তোমার দখল ভালো, অনেক বেশি লোকের কাছেও যেতে পারো একটা ইন্টারন্যাশনাল ভাষায় লিখে, প্রবাসে থেকে নিজের ভাষাকে বেছে নিলে কেন৷
- তুমি ডাইরি লিখতে মাঝে মাঝে, আমি জানতাম আগে, তখন তুমি লন্ডন ছিলে, ইংরাজীর দখল ইংরাজের চেয়েও ভালো তোমার, কিন্তু তোমাকে দেখেছি ডাইরি লিখতে ফ্রেঞ্চ ভাষায়, কেন!!
- উফফ, তুমি জায়গামতো গলা টিপে ধরেছো, কিছুই ভুলোনি দেখি৷
- ভুলে ঠিকই যাই, যে দেখা মনে ধরে তা ভুলে গেলেও জায়গা মতো মনে আসে!
- হুম, তাইতো দেখছি ! আমার উত্তরটি পরে দেব, তোমারটা শুনি!
- সত্যি কথা কি, পরের ভাষায় লিখে আনন্দ পাই নি, আনন্দ পাই না, কোথায় যেন আটকে যাই, শুকনো খাবার গেলার মতো, বুঝতে পারি খাবার খাচ্ছি, চাবাচ্ছি, গিলতে হবে, তাই গাল নাড়ছি৷ নিজের ভাষায় সেটা নেই৷ লিখতে গেলে টের পাই হৃদয় যেন আনন্দে পাখা মেলে, মন বিহঙ্গ হয়ে যায়, কলিজায় ধরে, বোধকে বানাতে হয় না জোর করে৷ লেখার শর্ত ভেতরের ভালো লাগা, এটাই সবচেয়ে বড় পুরস্কার, বাকিটা অন্যদের পাওয়া৷ এমনকি তোমার একই লেখা তোমাকে একটি জিনিস দেবে, কিন্তু একই কথাটি কার যে কোথায় কাজে লেগে যায় তুমিও জানবে না ! কিন্তু শর্ত হলো, যেটুকু বলার ক্ষমতা সেটুকু তোমাকে বলতে হবে৷ অন্যভাষায় সেটা আসে না, জীবনেও আসবে না৷ ধার করে অন্য ভাষাতে বলা মানে ভাঙা একটি দেয়ালে চুনকাম করে কোনোমতে পথ চলা৷

(ফেসবুক পোস্ট থেকে)

ফেমাসনিউজ২৪/আরইউ