logo

রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ৫ আশ্বিন, ১৪২৭

header-ad

শিশুর প্রতি সদয় হোন

মো. আরিফ উল্লাহ | আপডেট: ০৭ মার্চ ২০১৭

একথা প্রায়ই বলা হয়ে থাকে যে, আজকের শিশু জাতির ভবিষ্যৎ। কথাটি সত্য এবং তা আমাদের সবারই জানা। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, কেন আমরা সকল শিশুর প্রতি সদয় হচ্ছি না, কেন তাদেরকে সঠিকভাবে যত্ন নিচ্ছি না, কেন সমাজে প্রতিনিয়তই শিশু শ্রম দেখা যায়, কেন শিশুদেরকে হত্যা-নির্যাতন ও ধর্ষণের শিকার হতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত?

শিশুদের ক্ষেত্রে এই যদি প্রকৃত অবস্থা হয়, তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ ও সংশয় রয়েছে। কারণ, আজকের শিশুরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। খোঁজ নিলে দেখা যাবে, অনেক পিতা-মাতাই তাদের শিশুদের সঠিকভাবে যত্ন নিচ্ছেন না, সময় দিচ্ছেন না কিংবা সময় দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এতে করে শিশুরা পারিবারিক স্নেহ-মায়া-মমতা আর ভালোবাসা থেকে প্রতিনিয়ত বঞ্চিত হচ্ছে এবং তাদের সামাজিকীকরণ সঠিকভাবে হচ্ছে না; যার নেতিবাচক প্রভাব পরবর্তীতে নানাভাবে সমাজে পড়ছে।

আমাদের দেশে শিশুর অপব্যবহার দিন দিন বেড়েই চলেছে এবং এ কথা আজ অস্বীকার করার কোনোই উপায় নেই। এ অবস্থা যদি চলতে থাকে তাহলে তা হবে এ জাতির জন্য এক বিরাট অশনি সংকেত। তখন সঠিকভাবে দেশ ও জাতি গঠন আদৌ সম্ভব হবে কি না তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে দাঁড়াবে।

সাধারণত শিশুর অপব্যবহার চার ধরনের হতে দেখা যায়। যথা: শারীরিক, মানসিক, অবহেলা এবং যৌন। আমরা যেমন একদিকে চার বছরের শিশুর কাঁধে ৬টি বইয়ের বড় ব্যাগ ঝুলিয়ে দিচ্ছি, তেমনি অপরদিকে অনেক শিশুকে ঠেলে দিচ্ছি শিশুশ্রমের দিকে।

এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দেশে বর্তমানে প্রায় ৪৩ শতাংশ শিশু শ্রম দিয়ে যাচ্ছে। সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের চায়ের দোকান থেকে শুরু করে আবাসিক হলের ডাইনিং-ক্যান্টিনেও শিশুশ্রমের স্বরূপ দেখা যায় এবং এসব শিশুরা সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের আঙ্গিনায় থেকেও বছরের পর নিরক্ষরই থেকে যায়। এ যেন ঠিক ‘বাতির নিচে অন্ধকার’।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শিশু শ্রম জরিপ অনুসারে, দেশে প্রায় ৪৩ লাখ ৫০ হাজার শিশু এখনো শিশু শ্রমের সঙ্গে জড়িত। আর এর পেছনে দারিদ্র্যতাই মুখ্য। যার ফলে পঞ্চম শ্রেণির গণ্ডি পার হওয়ার আগেই তাদের লেখা-পড়ার সমাপ্তি ঘটে থাকে। যদিও সরকার শিশুদের স্কুলমুখী করার লক্ষ্যে বিনামূল্যে বই বিতরণ, টিফিন-এর ব্যবস্থা ও বিনোদনের সরঞ্জামসহ নানারকম পদক্ষেপ নিয়েছেন। কিন্তু দারিদ্র্যতার কাছে যেন এ বিষয়গুলো হার মানে।

বাংলাদেশ শিশু আইন, ২০১৩-এর ৭০ নম্বর ধারায় উল্লেখ আছে, কোনো ব্যক্তি যদি তাহার হেফাজতে, দায়িত্বে বা পরিচর্যায় থাকা কোনো শিশুকে আঘাত, উত্পীড়ন, অবহেলা, অরক্ষিত অবস্থায় পরিত্যাগ করে এবং ব্যক্তিগত পরিচর্যার কাজে ব্যবহার বা অশালীনভাবে প্রদর্শন করে এবং এর ফলে উক্ত শিশুর অহেতুক দুর্ভোগ সৃষ্টি হয় বা স্বাস্থ্যের ক্ষতি হয় বা কোনো মানসিক বিকৃতি ঘটে, তাহলে তিনি উক্ত অপরাধের জন্য অনধিক ৫ বছরের কারাদণ্ড অথবা অনধিক ১ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

আবার বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৮৩ নম্বর ধারায় বলা আছে, ১২ বছরের নিচে কোনো শিশুকে কোনো শাস্তি দেওয়া যাবে না এবং ফৌজদারী কার্যবিধির ৩৯২ ধারায় বলা হয়েছে, ১৬ বছরের নিচে কোনো শিশুকে বেত্রাঘাত করা যাবে না। কিন্তু এসব আইন অনেক সময়ই কাগজে-কলমের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। এই অবস্থার মধ্যেও খোঁজ নিলে দেখা যাবে, দেশের অনেক শিশু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন প্রতিযোগিতাসহ নানা ক্ষেত্রে বড় বড় সাফল্য বয়ে নিয়ে আসছে। তাহলে দেশের সকল শিশুকে সঠিকভাবে যত্ন নিলে তারা দেশ-জাতির জন্য যে কি ধরনের ও কি পরিমাণ সফলতা আনতে পারবে তা সহজেই অনুমেয়। সর্বোপরি, দেশ থেকে শিশু নির্যাতন-হত্যা, শিশু শ্রম ও শিশুর নানান অপব্যবহার চিরতরে বন্ধ করতে না পারলে আগামিতে যেমন সঠিকভাবে দেশ-জাতি গঠন করা সম্ভব হবে না, তেমনি অপরদিকে বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলাও এদেশের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে—যা কারো কাম্য নয়।

লেখক: শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ, কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

ফেমাসনিউজ২৪/আরইউ