logo

রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ৫ আশ্বিন, ১৪২৭

header-ad

মাতৃভাষা শিখতে হবে শুদ্ধ রূপে

জাহিদ আল-হেলাল | আপডেট: ১০ মার্চ ২০১৭

ভাষা হলো সাহিত্য ও সংস্কৃতির মাধ্যম। ইতিহাস ও ঐতিহ্যের বাহন। শিল্পকর্ম ও সৃজনমূলক উদ্যোগের মাধ্যম। জাতীয় মেধার অনন্য লালনক্ষেত্র। জাতীয় মননের আকর্ষণীয় স্থাপত্য। দেশে প্রায় সব ক্ষেত্রে ভাষার ভূমিকা এরকমই হয়ে থাকে। অন্যদের থেকে আমাদের স্বাতন্ত্র্য একটি ক্ষেত্রে স্পষ্ট হয়েছে। তা হলো, বাংলা ভাষা আমাদের কাছে শুধু সৃষ্টিশীল জাতীয় প্রত্যয়ের স্থাপত্যই নয়, জাতি হিসেবে সবাইকে জাতীয় স্বার্থের বৃহত্তর মোহনায় সম্মিলিত করা এবং জাতি-ধর্ম-বিশ্বাস নির্বিশেষে সবাইকে জাতীয়তার স্বর্ণসূত্রে আবদ্ধ করে। ২১ ফেব্রুয়ারির তাত্পর্যও তাই। ভাষা আন্দোলনের দীর্ঘ ৬০ বছর পরেও জাতি ২১ ফেব্রুয়ারিকে স্মরণ করে গভীর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে। শ্রদ্ধাবনত তার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের রক্তভেজা অর্জনের জন্য। কারণ বাংলা ভাষার বহমান শক্তিমত্তা বাঙালির যেমন স্থায়ী অহংকার, তেমনি তা আমাদের সময়োপযোগী বিবর্তনেরও বাহন।

একুশ তথা জাতীয়তাবোধের ভিত্তিতে সৃষ্টি হয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। এ পরিচয় বাংলাদেশের জনগণ নিজেরাই নির্দিষ্ট করেছেন নিজেদের জন্য। এজন্য তাদের রক্তাক্ত পথ চলতে হয়েছে। রক্তের নদীতে সাঁতার কাটতে হয়েছে। থামেনি কিন্তু। দুর্গম পথ পাড়ি দিয়েছে, দিচ্ছে। বাংলা এখন আর জাতীয় ভাষা নয়। ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা’ দিবস হিসেবে রূপান্তরিত হয়েছে ২১ ফেব্রুয়ারি। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর প্যারিসে অনুষ্টিত ১৮৮ জাতি সমন্বয়ে সংগঠিত জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনিসকো ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে বাংলাদেশ ইতিহাসের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় বিশ্ব ইতিহাসের এক আলোকোজ্জ্বল অধ্যায় রূপান্তরিত করেছে। ২১ ফেব্রুয়ারির এ গৌরবময় জাতীয় সীমানা অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক মর্যাদা লাভ করেছে। বাংলাদেশের ইতিহাস বিশ্ব ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার হয়ে উঠেছে দেশ ও বিদেশের অসংখ্য মানুষের তীর্থ ক্ষেত্র।

তথ্যপ্রযুক্তির যুগে এসে আমাদের এ অর্জনকে আজীবন ধরে রাখতে পৃথিবীর ৭০০ কোটি মানুষের কাছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক তথ্য পৌঁছে দিতে হবে। এজন্য বাংলা একাডেমি, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট-এর গবেষণা কার্যক্রমগুলো আন্তর্জাতিক পাঠের উপযোগী করে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি দেশের প্রতিটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভাষা শহীদদের নামে ছাত্রাবাস, গ্যালারি কিংবা স্মৃতিফলক তৈরি করা যেতে পারে। ভাষা সংরক্ষণ ও সমৃদ্ধ করতে আর্কাইভে ভাষা বিশেষজ্ঞদের শুদ্ধ ভাষার উপর গ্রন্থ বা সিডি রাখা যেতে পারে। দেশের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রমিত বাংলা ভাষার বিস্তারে শিল্পকলা একাডেমি কেন্দ্রীক কর্মশালার আয়োজন করা যায়। প্রাথমিক স্কুলগুলোতে শুদ্ধভাবে বাংলা ভাষার উপর স্থায়ী পাঠদান করা যেতে পারে। তাছাড়া বাংলা ভাষার উপর কাজ করছে এমন অর্ধ শতাধিক আবৃত্তি সংগঠনগুলোকে কারিগরি সহায়তা দিলে তাদের কার্যক্রমগুলো আরো বেগবান হবে। বিশেষ করে বাংলা ভাষার প্রকৃত ইতিহাস ও চর্চাকেন্দ্রীক গ্রন্থ রচনায় সরকারি অনুমোদন থাকলে ভাষার প্রাণ বাঁচাতে তা অত্যন্ত ফলপ্রসূ হতো।

বর্তমানে ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে যে অসংগতিগুলো অহরহ চোখে পড়ছে, তা হলো সরকারি কাগজপত্রে বিশেষ করে রেডিও টেলিভিশনগুলোতে যে ধরনের ভাষার অপব্যবহার তাতে মূল অর্থটাই আড়ালে ঢেকে পড়ছে। বিদেশি ভাষার প্রতি আকৃষ্টতা, সাইনবোর্ডগুলোতে ইংরেজির সয়লাব, বাংলার ভিতরে ইংরেজি ঢুকিয়ে বলাকে এলিট শ্রেণির একটা স্টাইল হয়ে উঠছে। ইংরেজি মাধ্যমের প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রাথমিক থেকেই বাংলা ভাষাকে উপেক্ষা করে কোমলমতি শিশুদের মাতৃভাষা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। বর্তমানে একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সমপ্রচারিত টেলিভিশন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে আর একটি বিদেশি ভাষার নীরব আগ্রাসন শুরু হয়েছে।

বিগত এক হাজার বছর অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বাংলা ভাষা আজ আমাদের একমাত্র রাষ্ট্রীয় ভাষা। বিশ্বের প্রায় ৩০ কোটি মানুষ আজ বাংলা ভাষায় কথা বলে। কিন্তু বাংলা ভাষা বিকাশের ধীরগতির পাশাপাশি চলছে এর প্রতি বিভিন্ন ধরনের অবহেলা। তাই সরকারি উদ্যোগে বাংলা ভাষার বিকাশ ও তা সর্বস্তরে চালু করার পাশাপাশি দেশে অন্য যে কোনো বিদেশি ভাষা ও সংস্কৃতির আগ্রাসন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। অবশ্য সরকারি উদ্যোগের সঙ্গে সাধারণ জনগণকেও বাংলা ভাষা ও আমাদের সংস্কৃতির বিকাশের লক্ষ্যে যে কোনো বিদেশি ভাষা ও সংস্কৃতির আগ্রাসন মোকাবিলায় এগিয়ে আসতে হবে। আমাদের সংস্কৃতি সংরক্ষণ ও চর্চা করা-ভবিষ্যত্ প্রজন্মের জন্য এটি অনেক আবশ্যক। আমরা সংগ্রাম করে আমাদের যে অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছি, তা আমাদের নতুন প্রজন্মের কাছে রেখে যেতে হবে। এ ভাষার প্রতি অগাধ শ্রদ্ধাও রয়েছে আমাদের। তেমনি ক্ষুদ্র জাতিতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর প্রতিও আমাদের উচিত হবে শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা।

তবে বাংলাদেশের অর্ধেকের চেয়ে বেশি মানুষ বাংলা ভাষা পড়তে কিংবা লিখতে জানে না। উচ্চতর আদালতে বাংলার ব্যবহার নেই, উচ্চশিক্ষার মাধ্যম হিসেবে বাংলা আজও তার মর্যাদা পায়নি। নিজের মাতৃভাষার উপর দখল না থাকলে অন্য যে কোনো ভাষাই আমরা শিখি না কেন, তাতে আমাদের চিন্তা-সৃজনশীলতা বিকাশের পথ হবে রুদ্ধ। আমরা অন্য ভাষা অবশ্যই শিখব, কিন্তু বাংলা ভাষাটা আগে, তারপর অন্যসব। যেদিন বাংলাদেশের সমস্ত মানুষ বাংলা ভাষা লিখতে পারবে, পড়তে পারবে সেদিন একুশের মূল চেতনা বাস্তবায়িত হবে।

লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা কলেজ।

ফেমাসনিউজ২৪/আরইউ