logo

রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ৫ আশ্বিন, ১৪২৭

header-ad

শিশুশ্রম ও সচেতনতা

মুহম্মদ মূসা | আপডেট: ১৪ মার্চ ২০১৭

‘শিশুশ্রম’ শব্দটির সঙ্গে সবাই কম বেশি পরিচিত। এর অর্থ ‘শিশুদের জন্য শ্রম’। যেমন বিদ্যার জন্য আলয়—বিদ্যালয়; গুণ প্রচারের জন্য গান—গুনগান; অন্ন খাওয়া পাপ—অন্নপাপ; অন্যের জন্য উপকার—পরোপকার ইত্যাদি। কিন্তু ‘শিশুশ্রম’ হলো শিশুদের মাধ্যমে শ্রম। অর্থাত্ শিশুদের দ্বারা কাজ করানো।

সর্বজন স্বীকৃত মতে, আর্থিক লেনদেনসহ অথবা আর্থিক লেনদেন ছাড়াই শিশুদের কোনো কাজের জন্য নিয়োগ করা হলে তা শিশুশ্রমের আওতায় পড়ে। শোষণমূলক বিবেচনায় অনেক দেশই অবৈধ ঘোষণা করেছে একে। বর্তমান বিশ্বে ১৫ বছরের নিচে প্রায় এক-দশমাংশ শিশু বিভিন্নভাবে বিভিন্ন পেশায় নিযুক্ত, যা মোটের উপরে ১৫ কোটির কাছাকাছি। এদের বেড়ে ওঠা আর বেঁচে থাকা—দুইই হয় চরম দারিদ্র্য আর বঞ্চনার মধ্য দিয়ে। উন্নত জীবনের জন্য শিক্ষাগ্রহণ ও দক্ষতা উন্নয়নের কোনো সুযোগ পায় না তারা। তা হয়তো স্বপ্নেই থেকে যায় অনেকের।

১৮ শতকের শেষ ভাগে গ্রেট ব্রিটেনে শিল্প-কারখানা চালু হলে সর্বপ্রথম শিশুশ্রম একটি সামাজিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চল ও মধ্য পশ্চিমাঞ্চলে গৃহযুদ্ধের পর এবং দক্ষিণে ১৯১০ সালের পর শিশুশ্রম একটি স্বীকৃত সমস্যা হিসেবে দেখা দেয় । তখন শিশুরা কাজ করত কারখানায় শিক্ষানবিশ অথবা গৃহ পরিচারক হিসেবে। কিন্তু তা ক্রমেই শোষণের ভয়ানক রূপ ধারণ করে। শুরু হয় দাসপ্রথার ভিন্ন আরেক রূপ। ব্রিটেনে ১৮০২ সালে এবং পরবর্তী বছরগুলোতে সংসদে গৃহীত আইনে বন্ধ করা হয় এ শিশুশ্রম। ইউরোপের অন্যান্য দেশেও অনুসরণ করা হয় এমন আইন। ১৯৪০ সালে বেশিরভাগ ইউরোপীয় দেশে শিশুশ্রম বন্ধের আইন প্রণীত হলেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় উত্পাদন বৃদ্ধির আবশ্যকতা আবার পেছন ফেরায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৯১৮ এবং ১৯২২ সালে সুপ্রিম কোর্ট নিষিদ্ধ ঘোষণা করে মার্কিন কংগ্রেস কর্তৃক প্রণীত শিশুশ্রম আইন। ১৯২৪ সালে কংগ্রেসে একটি সংবিধান সংশোধনী পাস করা হলেও অনুমোদন পায়নি অনেক অঙ্গরাজ্যে। ১৯৩৮ সালে প্রণীত প্রথম লেবার স্ট্যান্ডার্ড অ্যাক্টস ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত পেশার জন্য বয়স ধার্য করে ন্যূনতম ১৮ বছর এবং সাধারণ নিয়োগের জন্য ১৬ বছর।

আইএলও’র সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমান বিশ্বের প্রায় ১৬ কোটি ৮০ লাখ শিশু নানাভাবে শ্রম বিক্রি করছে। এদের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় নিয়োজিত প্রায় সাড়ে আট কোটি শিশু। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো পরিচালিত ‘জাতীয় শিশু জরিপ ২০১৩’ অনুযায়ী, বাংলাদেশে বিভিন্ন শ্রমে নিয়োজিত আছে প্রায় ৩৪ লাখ ৫০ হাজার শিশু। এর মধ্যে বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত প্রায় ১২ লাখ ৮০ হাজার শিশু। শ্রম মন্ত্রণালয়ের হিসেব মতে, ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করে দেশের ১৩ লাখ শিশু। বর্তমানে এই সংখ্যাটা আরো অনেক বেশি। ২০০৬ সালের শিশু সনদে ১৪ বছরের কম বয়সী শিশুদের সার্বিক শ্রম এবং ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োগ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এতে কারখানায় ১৮ বছরের কম বয়সের শ্রমিক নিয়োগ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ‘সরকারি শিশু জরিপ ২০০৩’ অনুযায়ী বাংলাদেশে পাঁচ থেকে ১৪ বছর বয়সের ৩.২ মিলিয়ন শিশু কাজ করে, যারা প্রতিনিয়তই হচ্ছে অধিকার বঞ্চিত। বেতন বৈষম্য থেকে শুরু করে তারা হয় নানা রকম শারীরিক-মানসিক নির্যাতনের শিকার।

কয়েকটি আইন লক্ষ্য করলে বিষয়টি আমাদের কাছে আরেকটু স্পষ্ট হয়। ন্যূনতম মজুরি অধ্যাদেশ ১৯৬১ অনুযায়ী কিশোরসহ সকল শ্রমিকের জন্য ন্যূনতম মজুরি প্রদানের নির্দেশ এবং নিয়োগকারী কর্তৃক ১৮ বছরের কম বয়সী শ্রমিককেও বোর্ড কর্তৃক নির্ধারিত পরিমাণের কম মজুরি প্রদান বেআইনি বলে ঘোষণা করা হয়েছে। দোকান ও স্থাপনা আইন ১৯৬৫ অনুসারে দোকানে বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে ১২ বছরের কমবয়সী শিশু নিয়োগ নিষিদ্ধ। এই আইন ১৮ বছরের কম বয়সী ব্যক্তির জন্য নির্ধারণ করে দিয়েছে শ্রমঘণ্টা।

কারখানা আইন ১৯৬৫ ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োগদান নিষিদ্ধ করেছে ১৪ বছরের কম বয়সী কাউকে। কারখানার নারী শ্রমিকদের ছয় বছরের নীচে সন্তানদের লালন-পালনের সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টির নির্দেশ দিয়েছে এই আইন। ‘শিশু আইন ১৯৭৪’ এবং ‘শিশু বিধি ১৯৭৬’ এ সকল ধরনের আইনগত প্রক্রিয়াকালে শিশুর স্বার্থ রক্ষা করবে। এই আইনে বলা হয়েছে আলাদা কিশোর আদালত গঠনের কথা। ‘খনি আইন ১৯২৩’ অনুযায়ী খনিতে নিয়োগদান নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে ১৫ বছরের কম বয়সীদের।

রেলওয়ের কয়েকটি কাজে শিশুদের নিয়োগ এবং রেলওয়ে যানবাহনে অথবা কোনো বন্দরের অধীন এলাকায় শিশুদের ভাসমান ব্যবসা নিষিদ্ধ করেছে ‘শিশু নিয়োগ আইন ১৯৩৮’।

২০১০ সালে প্রণীত জাতীয় শিশুশ্রম নিরসন নীতি বাস্তবায়নের জন্য ২০১২ সালে গৃহীত হয় পাঁচ বছর মেয়াদি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা (২০১২-২০১৬)। তাতে অঙ্গীকার করা হয় ২০১৬ সালের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসন করা হবে। এখন পর্যন্ত আশানুরূপ পরিবর্তন না আসায় রয়েছে নতুন পদক্ষেপ। ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৮টি পেশাকে। আর ২০২১ সালের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম বন্ধের অঙ্গীকার করেছে সরকার।

শিশুশ্রম নিরসনে রয়েছে এমন অনেক পদক্ষেপ। সরকারি-বেসরকারি নানান পদক্ষেপ থাকতেও অবস্থার পরিবর্তন নেই। অনেকের মতে দারিদ্র্যই আসল সমস্যা। তবে অশিক্ষা, অনিশ্চয়তা আর সচেতনতার অভাব কম নয়। দেখা যায়, জানা সত্ত্বেও শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে সচেতনভাবে একমত হয়ে কাজ করেন না অনেকেই। এখানেও স্পষ্ট হয়, শিক্ষা আর সচেতনতা এক নয়। আর তখনই সুন্দর ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যত্ হবে, যখন শ্রমশক্তি টেকসই ও মানসম্মত হবে। আর তা সম্ভব শিশুশ্রম রোধ করে সচেতন নাগরিক ও কর্মঠ জনশক্তি তৈরির মাধ্যমে।

লেখক : শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

ফেমাসনিউজ২৪/আরইউ