logo

রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ৫ আশ্বিন, ১৪২৭

header-ad

হারিয়ে ফেললাম ছায়া অভিভাবক

আবদুর রহিম | আপডেট: ২২ মার্চ ২০১৭

আবদুর রহিম সাহেব আপনি আমার রুমে আসেন। জি ভাই আসছি, মিনিটের মধ্যেই ভাইয়ের কক্ষে প্রবেশ। পকেটে কলম আছে? না ভাই। কলম নাই কেন? নেন আমারটা নেন, লিখেন। ৮/১০ মিনিট ভাই আনন্দ আর হাসি-রসে যা বলতেন লিখতাম।

এরপর লম্বা সুরে বলতেন, এবার সুন্দর করে নিউজটা করে দেন আমি শেয়ার দেব। শুধু আমি এই ছোট মানুষটা কেন, মানবিক আচরণ, বিশ্বাস আর ভালোবাসার চরিত্রের কাছে অফিসের পিয়ন থেকে নিচের দারোয়ান এবং তার অধীনস্থ কর্মকর্তাদের একেকজনের কাছে একেক রকম ছায়ার অভিভাবকও ছিলেন দৃঢ চরিত্রের প্রিয় ভাইটি।

প্রস্তুত ছিলাম না প্রিয় ভাই, তবে আজো আমি অফিসে এসেছি, বসেছিও বটে চেয়ারে। কিন্তু নেই শুধু সেই ডাকটি- ‘আবদুর রহিম সাহেব আপনি এসেছেন, আমার রুমে আসেন’। আপনিও হয় তো ওপার থেকে বলছেন, আমি তো আছি, তবে স্মৃতি হয়ে। জানি যে কক্ষে তোমাকে ডাকতাম সেটিও আছে তবে ছবি হয়ে।

সাজানো আছে আমার টেবিলটি, আছে কম্পিউটারও। পশ্চিমে জানালা দিয়ে তাকালে দেখায় যায় শহরের বুকে-পিঠে আকাশছোঁয়া দালান। উত্তর, দক্ষিণ, পূর্বে সবদিকে তোমরাও আছ ঠিক আগের মতো। নেই শুধু আমি। আমিও আছি, তবে নির্মল প্রশান্তিতে ঘুমিয়ে। আমার প্রিয় মা-বাবার সঙ্গে।

দুই-চারটি লাইন আপনাকে নিয়ে গতকাল থেকে লিখতে চেষ্টা করেছি বহুবার। কিন্তু কলম চলে না। তবুও আজ সাহস করলাম। আপনার সঙ্গে আমার শেষ দেখা মৃত্যুর প্রায় ১২ ঘণ্টা আগে ম্যাডামের কক্ষে। হাসি মুখে অফিস সংশ্লিষ্ট দু’চারটি কথাও বলেছেন। এরপর আমার হাতে তুলে দিয়েছিলেন সন্তুষ্টিচিত্তে আমার প্রাপ্য। আমি হাসতে হাসতে বললাম, ভাই আরেকটু সুদৃষ্টি। ভাই মুচকি হাসলেন। এরপর বড় একটি জিনিস দিলেন, আমিও তৃপ্তির হাসি দিলাম। নীরব থেকে ফের ভাই আরো উপহার দিলেন। আমার প্রত্যাশার বাহিরে এমন উপহার পাব, আমার চিন্তায়ও ছিল না। এরপর বললেন, রহিম সাহেব কাল দুটায় আসবেন। আমি আপনাদের ডেস্কের কয়েকজনকে নিয়ে বসব। আমি ডেস্কটাকে আরেকটু সাজাব। এ কথা বলে ভাই ম্যাডামকে নিয়ে নীরবে বের হয়ে গেলেন। খুব জোর দিয়ে বলতে ইচ্ছে হচ্ছে- অফিসে দাঁড়িয়ে অফিসকে নিয়ে ভাইয়ের মনে হয় এটাই শেষ কথা ছিল।

তবে অফিস থেকে বের হওয়ার আগে ভাইকে দেখেছি খুবই নীরব। ভাই সব সময় ভালো নিউজগুলো তার কক্ষে বসে ফেসবুকে শেয়ার দিতেন। ওইদিন খুব একটা নিউজ শেয়ার দিতে দেখিনি ভাইকে। অফিস থেকে বেরিয়ে রাত ১১টা ৫৪ মিনিটে আত্মঘাতী হামলার কৃতিত্ব নিয়ে সরব জঙ্গি সাইট! শিরোনামে আমার করা একটি নিউজ শেয়ার দিয়েছেন। মৃত্যুর পরদিন বাসায় গিয়ে ভাইয়ের প্রোফাইল দেখলাম, আমার করা নিউজটাই ছিল ভাইয়ের লাইফে শেষ শেয়ার! এ নিউজটা আরিফ ও শাকিল ভাইকে দেখিয়ে অনেক কেঁদেছি। হয়তো আমার প্রতি ভাইয়ের ভালোবাসার এটিও একটি নিদর্শন রেখে গেছেন।

খুব মনে পড়ছে, মগবাজার অফিসে পবিত্র রমজান মাসে আপনার সেই স্মৃতি। আপনি প্রতিদিনই রাজনৈতিক, ব্যবসায়িক কারণে অনেকগুলো ইফতারের দাওয়াত পেতেন। কিন্তু কখনো বাহিরে ইফতার করতেন না। ইফতার করতেন অফিসেই আমাদের নিয়ে এক টেবিলে বসে। শুধু ইফতারই নয়, আসরের পর থেকে আমাদের প্রায় ২০ জন লোকের ইফতার আপনি নিজেই তৈরি করতেন। পেঁয়াজ কাটা, ফল কাটা সব একাই করতেন। নিতেন না মুকুলের সাহায্যও!

বেসিনে এসে পুদিনা পাতাটাও নিজের হাতে ধুতেন। হলফ করে বলছি, আপনার হাতে ইফতারের স্বাদটা আমি আমার পরিবারেও পাইনি। দোয়া করি, আল্লাহ আপনাকেও ওপারে এমনভাবেই যেন খাওয়ানোর ব্যবস্থা করেন।

ঈদের দিনের সেই স্মৃতিও খুব বলতে হচ্ছে। আমার লাইফের চারটি ঈদ কেটেছে যমুনার হাউজে ভাইয়ের হাসিমুখের কথায়। মগবাজার অফিসে ঈদুল ফিতরের তিন দিন আগে ভাই আমাকে ভেতরে ঢেকে নিয়ে গেলেন। বসতে বললেন, আমি তখন বলেছিলাম না ভাই দাঁড়াই। এরপর ভাই বললেন, বাধন, মোবারক, আলো, অনি, নাজমীন, শাকিল, মুঈদ ও মুকুল সবাই তো ঈদের ছুটি নিয়েছে। রহিম সাহেব আপনি যদি যান, অফিস কি চলবে? আমি তখন থ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। আর সাহস হলো না ছুটি চাইতে। আর কীভাবেই চাইব, যে ভালোবাসার শব্দ দিয়ে বললেন, সেখানে আমি মানবের কাছে কোনো উত্তর ছিল না। যাই হোক, ঈদের দিন জাতীয় ঈদগাহে নামাজ পড়ে অফিসে আসলাম। কিছুক্ষণ পর ভাইও আসলো।

এরপর ঘণ্টাখানেক পর আমাকে রিজার্ভ সিএনজি ভাড়া দিয়ে পাঠালেন মহাখালীর আমতলীতে ম্যাডামের বাসায় খাবার আনতে। খুব স্বল্প সময়ে আমি খাবার নিয়ে চলে আসলাম। এরপর বস আমাকে ও জোবাইদাকে নিজ হাতে প্লেটে খাবার তুলে দিলেন। এক সঙ্গেই আমরা তিনজন খেলাম। খাবারের বড় একটি অংশ রেখে দিলাম আজম ভাই ও নোমান ভাইয়ের জন্য। তারা বিকেল পর্যন্ত ছুটি নিয়েছে। ঠিক একই রূপ হলো কারওয়ান বাজার অফিসে এসেও। গত ঈদুল আজহায় আমি বাড়ি যাব- সবই ঠিক। কিন্তু এবারও ভাই ঢেকে নিয়ে বললেন, রহিম সাহেব আপনাকে নাকি আপনার গুরু নয়ন সাহেব নির্দেশ দিয়েছেন ঈদে থাকতে। নয়নতো এই একটু আগে বলে গেল ভাই ও গেলে কি হাউজ চলবে! কি বলেন, রহিম সাহেব আপনি থাকছেন। আচ্ছা ভাই, নয়ন ভাই যেহেতু বলেছে, আমি থাকছি।

প্রিয় এই মানুষটার লাইফের অনেক কিছুই আমার জানা ছিল না। এই তো দুই মাস আগে জানুয়ারির শুরুর দিকে ভাইয়ের মুখেই কিছু জিনিস জানার সুযোগ হয়েছে। সেদিন মুকুল কি একটি কাজে ছুটি নিয়ে একটু তাড়াতাড়ি চলে গেল। অফিসে আছি আমি, ফারুকী ভাই, রওশন ভাই, আর সুশান্ত দাদা। অফিস বন্ধ করে নিচে নামলাম। ফারুকী ভাই, রওশন ভাই চলে গেলেন। এরপর ভাই দাদাকে বললেন, এই কারওয়ান বাজারে এই হছে, এমন হচ্ছে, এগুলো কর না কেন? তুমি কিসের ক্রাইম রিপোর্টার? দাদা তখন হাসতে হাসতে বললেন, আমার সব সময় তো আপনার কাজ করতে করতেই চলে যায়। দাদা এও বললেন, এসব তথ্য তো আমার সব জানা। এ কথা শুনে ভাই খুব হাসলেন, সঙ্গে আমিও। এরপর ভাই বললেন, ঠিক আছে সুশান্ত কাল সকাল ১০টায় যে কাজ দিয়েছি তা যেন ঠিকভাবে হয়। এই বলে চলে যাচ্ছেন- এমন সময় দাদা বললেন, ভাই ২০ টাকা দেন আমার ভাড়া নাই। এরপর ভাই আবারো হাসলেন কিছুক্ষণ। পরে পকেট থেকে ৫০ টাকা বের করে দাদাকে দিলেন। দাদা চলে গেলেন।

আজ রিকশায় না উঠে ভাই মগবাজারের দিকে আমাকে নিয়ে হাঁটতে শুরু করলেন। সোনারগাঁও হোটেলের সামনে যাওয়ার পর এক মাছ ব্যবসায়ী দৌড়ে আসলেন। ভাইকে বললেন, আপনাকে আমি আজ কয়েকদিন খুঁজছি। তাৎক্ষণিক ভাই তার সব কথা শুনে কাকে ফোন দিয়ে সমস্যাটা সমাধান করে দিলেন।

এরপর রেললাইনে হাঁটতে হাঁটতে ভাই বললেন, (সম্ভবত ৮৮ সাল বলেছেন) আমি এই ঢাকায় আসি। শিশু বয়সে আমি আমার মা-বাবাকে হারিয়েছি। চার বছর বয়সে বাবাকে, এর এক বছর পর মাও আমায় ছেড়ে চলে যান। এরপর কিছু সময় বোনের কাছে। ভাইয়ের কথা শুনে যতটুকু মনে হয়েছে, বোনের কাছে থেকেও ভাইকে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে। কথার গভীরতায় তেমনই মনে হয়েছে। এরপর ঢাকায় আসলেন, এখানে যার কাছে ছিলেন সেখানেও কিছুটা কষ্টের গন্ধ ছিল বলে মনে হয়েছে। বললেন, স্বর্ণের দোকান দেয়ার কাহিনী। দোকান দিয়েই বসে থাকেননি। ঢাকায় দোকান একজনকে চালাতে দিয়ে ভাই চলে যান সিলেটে স্বর্ণের কাজ শিখতে। সেখানেও কাজ করতে গিয়ে অনেক বাধার সম্মুখীন হয়েছেন।অনেক কষ্টে হলেন সিনিয়র কারিগর। তবে অন্যরা মালিককে যত অভিযোগ দিতেন, তিনি কোনো কথা বিশ্বাস করতেন না। জনি ভাইয়ের পরিশ্রমের কারণে মালিক তাকে অন্ধের মতো ভালোবাসতেন।

এরপর কারওয়ান বাজার নিজের দোকানেই সময় দিতে শুরু করলেন। সারাদিন সময় দিতেন। এমনকি রাতে দোকান বন্ধের পর সবাই চলে গেলেও তিনি যেতেন না। যে অর্ডারগুলো পেতেন রাতভর বসে বসে নিজেই বানাতেন। এরপর তাঁতীবাজারে যুক্ত হলেন হাত-বদল করা স্বর্ণের ব্যবসায়। জড়িয়ে পড়লেন আনুষঙ্গিক আরো কিছু ব্যবসার সঙ্গে। এরপর বললেন, আজ আমি বহু টাকার মালিক।

কেন জানি কথা প্রসঙ্গে বললেন, আমি যদি মারা যাই আমার এই সম্পদের কি হবে? কোনো চিন্তা ছাড়াই আমি তখন বলেছিলাম, ভাই একটা কাজ করতে পারেন। আপনার আব্বু-আম্মু যেহেতু পৃথিবীতে নাই, তাহলে আপনার এ বয়সে বন্ধু কিংবা ব্যবসায়ীর কাজে যে একজনকে পৃথিবীর সব চাইতে আপন মনে হয়, তার তত্ত্বাবধানে ট্রাস্টের ব্যবস্থা করে যান। যাতে দুঃস্থ, অসহায়, মিসকিনদের মাঝে তা ব্যয় হতে পারে।

সেখানে একটা কথা বলেছিলাম ভাইকে, আজ অনেকে সম্পদ শুধু মসজিদ, মাদ্রাসা, মক্তবে দিতে চেষ্টা করে। ভাই বলুন তো মসজিদ কি গরীব? ভাই তখন নীরব হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। আর আমিও শুধু বলে যাচ্ছি। ভাই আপনি তো একটু আগে বললেন, আপনার পরিবারেরও তেমন টাকা দরকার নেই। বরং আপনার পারিবারিক সম্পদ থেকে এখনো প্রতিমাসে আপনার অংশে কয়েক লাখ টাকা ভাগে আসে, আপনি তার একটি অংশও নেন না। আপনি আপনার টাকা দিয়েই চলেন। হ্যাঁ ভাই, তবে আপনার আত্মীয়দের মাঝে কেউ যদি মানবিকতার কাতারে থাকে, অসহায়, থাকে তাদের পেছনে ব্যয় হওয়ারই বেশি দাবি রাখে।

এসব কথা বলতে বলতে মগবাজার রেলগেটে কখন যে ঘণ্টা পার হয়ে রাত প্রায় ২টা বেজে গেছে কিচ্ছু টের পাইনি। কিছুক্ষণ পর খুব জোরে নিঃশ্বাস ফেলে ভাই বললেন, ঠিক আছে রহিম সাহেব, আপনি একটা কথা বলছেন, আমি কি না রেখে পারি! ... হুম যাওয়ার ভাড়া আছে এই বলেই একটা সিএনজি ডেকে আমাকে তুলে দিয়ে ভাড়া দিয়ে দিলেন।

যাই হোক, যোগ্যতার দিক থেকে আমি অফিসের সব চাইতে ছোট মানব। তবুও কেন জানি প্রিয় ভাই, আপনি আমার অন্ধ ভক্ত ছিলেন। অফিসের ছোট-খাট ব্যপারগুলো নিয়ে আমাকে ডেকে বসতেন। খুব কানে বাজছে মগবাজারের অফিস, কারওয়ান বাজারের অফিসে তৃতীয় পক্ষ নিয়ে দুই একটি ঘটনা কি হয়েছে জানতে চাইলেন। রুমে নিয়ে বললেন, আবদুর রহিম সাহেব বসেন, আজকে অফিসে কী হয়েছে বলেন। না ভাই, ঠিক আছে আমি দাঁড়িয়ে বলি।

এরপর ঘটনাটি যা হয়েছে ঠিক সেটাই বলতাম। এর মধ্যে কারওয়ান বাজার অফিসে আসার পর কয়েকবার দেশের বাইরে ও চট্টগ্রাম গিয়েছিলেন। তখনো আপনি আমায় ইমোতে কল দিয়ে অফিসের খবর জানতেন। কিন্তু আজ দুই দিন হয়ে গেছে, আপনাকে দেখিনি... আসেনি আপনার ফোনও। কীভাবেই বা পাব, এটি তো আমার স্বপ্ন। আসলে আপনি তো চলে গেছেন না ফেরার দেশে...।

ফেমাসনিউজ২৪/আরইউ