logo

রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ৫ আশ্বিন, ১৪২৭

header-ad

নিরাপদ পানি চাই

সাঈদ চৌধুরী | আপডেট: ২৫ মার্চ ২০১৭

বেঁচে থাকার জন্য পানি নিঃসন্দেহে একটি প্রয়োজনীয় উপাদান। যার ওপর নির্ভর করে প্রতিটি জীব অথবা প্রাণিকুলের সুস্থভাবে বেঁচে থাকা। কিন্তু অমনোযোগিতা এবং অসচেতনতার কারণে প্রাণিকুলের জন্য এই পানিই হয়ে উঠছে অনিরাপদ। মাটির প্রাকৃতিক ছাঁকন প্রক্রিয়াও আজ ব্যাহত হচ্ছে বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রির অ্যাসিডীয় বর্জ্যরে কারণে। আগে বিশ বা পঁচিশ ফুট নিচের ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করা গেলেও এখন আর তা সম্ভব হচ্ছে না। নষ্ট হয়ে যাওয়া প্রাকৃতিক ছাঁকন প্রক্রিয়ার কারণেই মূলত এ রকম হচ্ছে। শুধু তাই নয়, ডাইং ইন্ডাস্ট্রি, ওষুধ ইন্ডাস্ট্রি এবং কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিতে যে রাসায়নিক ব্যবহার করা হচ্ছে তা থেকে বেরিয়ে আসা বর্জ্যরে কারণে পানিতে ভারী মৌলের উপস্থিতিও আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে। ঢাকার আশপাশের নদীগুলোর পানি কালো প্রকৃতির হয়ে গেছে। যদি শুধু ভৌত অবস্থার কথা বিবেচনা করা হয়, তবে এই নদীর পানিগুলো ধরতেও ইচ্ছে করবে না।

পানির pH থেকে শুরু করে TS, TDS, DO, Total Hardness, Total Alkalinity, Turbidity, COD, BOD Ges Color, Odor কোনোটিই ঠিক সহনীয় মাত্রার মধ্যে নেই। WHO কর্তৃক নির্দেশিত পানির উপাদানে রাসায়নিকের গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়েও অনেক বেশি অথবা কম মাত্রায় পাওয়া যাচ্ছে পানির pH-এর মান। pH-এর গ্রহণযোগ্য মাত্রা ৬.৫ থেকে ৮.৫ হলেও ঢাকার অদূরে গাজীপুরেই কোনো ইন্ডাস্ট্রির ইটিপি আউটলেটের মুখে pH-এর মান পাওয়া যায় ৩.৫-৪.৫, যা অত্যন্ত অ্যাসিডীয় প্রকৃতির। শুধু অ্যাসিডীয় প্রকৃতিরই নয়, এই পানির মধ্যে উঙ অর্থাৎ, দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা অত্যন্ত কম। যার কারণে জৈব জলীয় জীব এ পানিতে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। অ্যাসিডীয় প্রকৃতির পানি মাটিতে সরাসরি ছেড়ে দেওয়ার ফলে মাটির ক্ষারকত্ব কমে যাচ্ছে। মাটির সহজাত ছাঁকন প্রক্রিয়া চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলেই ভূগর্ভস্থ পানির মানেও দেখা দিচ্ছে বড় ধরনের সমস্যা।

একটা সময় ঢাকার রাস্তায় কালো ধোঁয়ার জন্য হাঁটা যেত না। এখন এত খারাপ অবস্থা নেই। চার স্ট্রোকবিশিষ্ট ইঞ্জিন চালুর পর থেকে বায়ুদূষণ কিছুটা হলেও কমানো গেছে। কিন্তু নদীর পানি এমন দূষণের শিকার হওয়ার পরও পরিবেশ অধিদফতর এদিকে সঠিক দৃষ্টিপাত কেন করছে না, এটা কারো বোধগম্য নয়। কোনো কোম্পানি ইটিপি সঠিকভাবে ব্যবহার করছে না-এর জন্য জরিমানা নয়, বরং প্রয়োজন কোম্পানির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ। প্রয়োজনে কোম্পানি কিছুদিনের জন্য হলেও বন্ধ করে দেওয়া উচিত।

এ মুহূর্তে পানিকে দূষণমুক্ত করতে প্রথমেই ইন্ডাস্ট্রিগুলো ইটিপি ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ শুরু করা জরুরি। প্রতিটি ইন্ডাস্ট্রিয়াল এলাকায় প্রতি ১০টি ইন্ডাস্ট্রির জন্য একটি করে সরকারি পানি পরিশোধনাগার নির্মাণ করা অথবা এটা কেন্দ্রীয়ভাবেও করা যেতে পারে। যদি কেন্দ্রীয়ভাবে করা হয়, তবে তার জন্য অবশ্যই ড্রেনেজ সিস্টেমের ব্যবস্থা করে পানি ট্রিটমেন্টের আওতায় আনা সম্ভব।

এখন যে হারে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার হচ্ছে তাতে মাটির নিচের একটা স্তর খুব ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। পানি ট্রিটমেন্ট করে পরিবেশে ছাড়া হবে-এ চিন্তার চেয়েও আধুনিক চিন্তা প্রয়োজন। সরকারিভাবে যে ইটিপিগুলো তৈরির পরিকল্পনা করা হবে সে ইটিপিগুলোতে জিরো ডিসচার্জ প্রকল্প যুক্ত করতে হবে। পানি পানের উপযোগী করা না গেলেও যদি তা কৃষিকাজে ব্যবহারের উপযোগী করা যায়, তাতেও ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারের হার কমে যাবে অনেকাংশে।

এর সঙ্গে অবশ্যই উপজেলাভিত্তিক পানির জন্য আলাদা আলাদা পানি পরীক্ষাগার স্থাপন করতে হবে, যাতে প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন ফ্যাক্টরি থেকে পানি এনে পরীক্ষা করে পানির মান পরীক্ষা করে দেখা যায়। ফ্যাক্টরিগুলোতে ব্যবহৃত পানিকে পরিশোধন করার পাশাপাশি পানির অপচয়ও রোধ করতে হবে।

বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা না গেলে আমাদের দেশের বেশির ভাগ মানুষই অসুস্থ হয়ে পড়বে। পানির অবিশুদ্ধতার কারণে কিছু কিছু এলাকায় এই সময়গুলোতেই কিডনি রোগীর হার আগের চেয়ে বেড়ে গেছে অনেক বেশি। এর মধ্যে গাজীপুর উল্লেখযোগ্য। গাজীপুরের বেশিরভাগ এলাকার ভূগর্ভস্থ পানির পিএই্চপি মান ৫.৮-৬.৫ হয়ে যাচ্ছে। যার ফলে শুষ্ক মৌসুমে পানি পান করতে কখনো কখনো অসুবিধার কথাও শোনা যাচ্ছে।

অসুবিধাগুলো বিবেচনাপূর্বক পরিবেশ অধিদফতর কর্তৃক নেওয়া ব্যবস্থাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে পরিলক্ষিত হতে পারে। এখন আর চিন্তা করে সময় নষ্ট নয়, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ব্যবস্থা নিতে পারলেই সুফল আশা করা যেতে পারে।

লেখক : রসায়নবিদ

ফেমাসনিউজ২৪/আরইউ