logo

বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ৮ আশ্বিন, ১৪২৭

header-ad

ত্বকী-তনুর কী হবে?

সীমান্ত প্রধান | আপডেট: ২৬ মার্চ ২০১৭

সিলেটে খাদিজাকে কুপিয়ে হত্যার চেষ্টায় বখাটে বদরুলকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দিয়েছেন আদালত। বদরুলের মতো বখাটের এমন সাজা অত্যন্ত সমুচিত। এই রায়ের ফলে অন্য বখাটেরাও কিছুটা ভয় পাবে, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। খাদিজার ওপর যে অন্যায় হয়েছে, তার বিচার সে পেয়েছে। দেশবাসীও এই বিচার নিয়ে সন্তুষ্ট। কিন্তু কুমিল্লার তনু, তার সঙ্গে যা ঘটেছে সে বিচার এখনো শেষ হয়নি! কবে শেষ হবে, আদৌ শেষ হবে কি না কেউ জানে না। তাহলে কি বিচার বৈষম্যের শিকার হতে চলেছে তনু হত্যাকাণ্ড?

বিচারব্যবস্থায় বৈষম্যমূলক আচরণ কখনই কাম্য নয়। বিভিন্ন ঘটনার ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক যে আচরণ চোখে পড়ছে তা অত্যন্ত দুঃখজনক। সর্বক্ষেত্রেই বিচারব্যবস্থার ভূমিকা সমান হওয়া বাঞ্ছনীয়। অথচ তা হচ্ছে না। ক্ষেত্র বিশেষ বদলে যাচ্ছে গতি ও প্রকৃতি। রাজন হত্যাকান্ডের ঘটনায় ত্বরিত বিচার হয়েছে। ত্বকী হত্যাকান্ডের চার বছর পেরিয়ে গেছে। অথচ বিচার প্রক্রিয়া শুরু হওয়া তো দূরের কথা, তদন্তের নামে যা হচ্ছে তাকে সময়ক্ষেপণ ছাড়া আর কিছুই বলা যাবে না। এ ঘটনাকে কতটুকু বৈষম্যমূলক বলা যাবে সে বিচারের ভার সরকারের ওপরই থাকল।

প্রেমে ব্যর্থ হয়ে সিলেট সরকারি মহিলা কলেজের ছাত্রী খাদিজা আক্তার নার্গিসকে হত্যার চেষ্টা চালায় বখাটে বদরুল। ২০১৬ সালের ৩ অক্টোবর বিকেলে এমসি কলেজ পরীক্ষা কেন্দ্রে বিএ (পাস) পরীক্ষা দিয়ে বের হওয়ার সময় খাদিজাকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে বদরুল। ঘটনার পরপরই জনতা ধাওয়া করে বদরুলকে আটক করে পুলিশে দেয়। আর খাদিজাকে সংকটাপন্ন অবস্থায় উদ্ধার করে প্রথমে সিলেটের ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ও পরে ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে পাঠানো হয়েছিল। ৪ অক্টোবর এ ঘটনায় খাদিজার চাচা আবদুল কুদ্দুস বাদী হয়ে মহানগর পুলিশের শাহপরান থানায় হত্যাচেষ্টার অভিযোগে বদরুলকে একমাত্র আসামি করে মামলা করেন।

মামলায় বদরুল আলমকে অভিযুক্ত করে তারই উপস্থিতিতে একই বছর ২৯ নভেম্বর সিলেটের চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আাদালতে চার্জগঠন (অভিযোগপত্র গঠন) করা হয়। ঘটনার ৫৫ দিনের মাথায় এই বিচার প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছিল। আর ৩৭ সাক্ষীর সাক্ষ্য শেষে ৮ মার্চ দুপুরে সিলেটের মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক আকবর হোসেন মৃধা ছাত্রলীগ নেতা বখাটে বদরুলকে যাবজ্জীবন কারাদন্ডে দন্ডিত করেন। এখানে দেখা যাচ্ছে- খাদিজাকে হত্যার চেষ্টার ঘটনার ৫৫ দিনের মাথায় চার্জগঠন এবং ঘটনার দিন থেকে ১৫৫ দিনের মধ্যে বিচারকার্য শেষ করা হয়েছে, যা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। চাঞ্চল্যকর মামলাগুলোর এমন ত্বরিত বিচারকার্য শেষ হলে ন্যায়বিচার যে প্রতিষ্ঠা হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু বিচার প্রক্রিয়ার এই ধারাটা সর্বক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় কেন? এ ক্ষেত্রে উদাহরণ হতে পারে কুমিল্লার সোহাগী জাহান তনু ও নারায়ণগঞ্জের মেধাবী স্কুলছাত্র তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী।

২০১৩ সালের ৬ মার্চ বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী। এর দু’দিন পর তথা ৮ মার্চ শীতলক্ষ্যা নদীর তীরবর্তী এলাকায় তার লাশ পাওয়া যায়। ঘাতকরা তাকে খুন করে এখানে ফেলে দিয়ে যায়। এ হত্যাকান্ডের ঘটনায় দেশব্যাপী প্রতিবাদ, নিন্দা ও বিচার দাবিতে সাধারণ মানুষ সোচ্চার হয়ে ওঠে। ত্বকী হত্যা মামলাটি তদন্ত করছে র‌্যাব। তদন্তে হত্যাকারীরাও চিহ্নিত হয়েছে। চার্জশিটও প্রায় প্রস্তুত। ২০১৪ সালের ৫ মার্চ র‌্যাব-১১ এর তৎকালীন অতিরিক্ত মহাপরিচালক (এডিজি) জিয়াউল আহসান বলেছিলেন, ‘আজমেরী ওসমানের নেতৃত্বে ১১ জন ত্বকীকে হত্যা করেছে।’ তিনি উপস্থিত সাংবাদিকদের সে হত্যার একটি খসড়া অভিযোগপত্রও প্রদান করেন। সে সময় তিনি এও বলেছিলেন, ‘যেকোনো দিন অভিযোগপত্র দেওয়া হবে।’ এরপর কেটে গেছে প্রায় চার বছর। সেই ‘যেকোনো দিন’ আজও আসেনি!

অপরদিকে ২০১৬ সালের ২০ মার্চ কুমিল্লা সেনানিবাসের ভেতরই নৃশংসভাবে খুন হন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্রী সোহাগী জাহান তনু। এ ঘটনার বিচার দাবিতে পুরো দেশ উত্তাল হয়ে ওঠে। হরতাল, মিছিল, সমাবেশ, মানববন্ধনসহ স্মারকলিপি পেশ করা হয়। বাংলাদেশব্যাপী আলোচিত এক নাম হয়ে ওঠে তনু। অথচ এ ঘটনার এক বছর হতে চললেও বিচারকাজ এখনো শুরু হয়নি। এমনকি চিহ্নিত করা যায়নি তার ধর্ষক ও হত্যাকারীদের। অনেকেরই ধারণা, এই দুই হত্যাকান্ডের ঘটনায় প্রভাবশালী মহল সম্পৃক্ত থাকায় বিচারকার্য থমকে আছে। হত্যার রহস্য অন্ধকারেই থেকে যাচ্ছে।

খাদিজার ঘটনায় জড়িত বদরুল এবং রাজন হত্যা ঘটনায় যারা জড়িত ছিল তারা কেউ-ই প্রভাবশালী ছিল না। যার ফলে এই দুটি ঘটনার বিচারকার্য ত্বরান্বিত হয়েছে।

তনু ও ত্বকী হত্যার বিচারের ক্ষেত্রে কে কতটা আন্তরিক এই নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিচারের দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেক বিচার নীরবে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়ে। খুঁজে

পাওয়া যায় না সাক্ষী, তদন্তকারী কর্মকর্তাও অনেক সময় থাকেন না কিংবা অবসরে চলে যান। অনিশ্চিত হয়ে পড়ে ন্যায়বিচার। সৃষ্টি হয় বিচারহীনতার সংস্কৃতি। সে সুযোগে অপরাধীরা আরো বেশি করে অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। বৃদ্ধি পায় অপরাধ প্রবণতা। বিঘিœত হয় আইনের শাসন।

লেখক : কবি ও সাংবাদিক

ফেমাসনিউজ২৪/আরইউ