logo

বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ৮ আশ্বিন, ১৪২৭

header-ad

মানবাধিকার শিক্ষায় জনসচেতনতা

ফাহিম আহমেদ | আপডেট: ৩০ মার্চ ২০১৭

শুধু মানুষ হওয়ার জন্যই একজন মানুষ যে সকল অধিকার লাভ করে সেগুলোকেই মানবাধিকার বলে। মানবাধিকার একটি সহজাত বিষয় যার মধ্য দিয়ে মানুষ জন্ম নেওয়ার সূত্রেই এটি দাবি করতে পারে। প্রত্যেক ব্যক্তির মর্যাদাকে সম্মান প্রদর্শনের পাশাপাশি তার স্বাধীনতা ও সমতা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে তার জীবন গঠনের ক্ষমতা মানবাধিকারই নিশ্চিত করে থাকে। কিন্তু একটি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্বল্পশিক্ষিত ও অশিক্ষিত জনগোষ্ঠী সে দেশের শহুরে শিক্ষিতের মতো মানবাধিকার বিষয়ে সচেষ্ট নয়।

আর এ লক্ষ্য পূরণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায় মানবাধিকার বিষয়ক শিক্ষা। মানবাধিকার বিষয়ক শিক্ষার মধ্য দিয়ে জনগণের প্রয়োজনীয়তা ও তাদের সমস্যার ভিত্তিতে বৈঠক, সংলাপ এবং আলোচনার মাধ্যমে নানা অধিকার ও আইন বিষয়ে বিশ্লেষণ প্রদান করা হয়। ক্ষমতা কাঠামোর পুনর্গঠন ও নিপীড়ন দূরীকরণে এ শিক্ষা অপরিহার্য। এ লক্ষ্যে বিভিন্ন দেশে মানবাধিকার শিক্ষা কার্যক্রম স্তর ও মাত্রা ভেদে বৈচিত্র্যপূর্ণ হয়ে থাকে। থাইল্যান্ডের “গাবফাই” এক ধরনের থিয়েটার কার্যক্রম যার দ্বারা স্থানীয় জনগণ এবং দুর্বল ও নিপীড়িত গোষ্ঠীকে মানবাধিকার বিষয়ে সচেতন করার প্রয়াস চালানো হয়। সাধারণ মানুষের সঙ্গে এ ধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে একটি বিষয়কে সহজভাবে বোঝা ও তার সমস্যা চিহ্নিতকরণের পাশাপাশি সমাধানের পথ আলোচনার মাধ্যমে গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। থাইল্যান্ডের চিয়াংমাই শহরে একটি স্কুলে “গাবফাই” থিয়েটারের মাধ্যমে শারীরিক শাস্তির ক্ষতিকর প্রভাবের দিকটি তুলে ধরে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মাঝে এ বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করা হয়।

মানবাধিকার শিক্ষায় আমাদের বাংলাদেশও পিছিয়ে নেই। বাংলাদেশ মানবাধিকার নাট্য পরিষদ (এমএনপি) “অ্যাকশন থিয়েটার” পদ্ধতি ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের প্রয়োজন ও সমস্যাগুলোকে তুলে ধরে। নাটকের মধ্য দিয়ে এগুলো সমাধানে স্থানীয়দের নানা পদক্ষেপ গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করতে এমএনপি’র স্থানীয় দলগুলো কাজ করে। এমএনপি কুষ্টিয়া জেলার একটি ইউনিয়নে নাটকের মাধ্যমে ধর্ষণের মতো অপরাধে সালিশের বিরুদ্ধে ব্যাপক জনমত গড়ে তুলতে সক্ষম হয়। পদ্মার চরের এ ইউনিয়নে ধর্ষণের মতো অপরাধকে সাধারণত সালিশের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হলেও এ কর্মসূচির প্রভাবে স্থানীয় চেয়ারম্যান এক পর্যায়ে প্রকাশ্য জনসভায় ধর্ষণের ক্ষেত্রে সালিশ না করে আইনি সমাধানের ঘোষণা দেন। মানবাধিকার শিক্ষায় সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে কমিউনিটি রেডিওর ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ এশিয়ার সর্বপ্রথম কমিউনিটি রেডিও নেপালের “রেডিও সাগরমাথায়” যেখানে প্রতি বৃহস্পতিবার “কাচাহারি” নামে একটি অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা হয়। ইন্টারন্যাশনাল অ্যালার্ট অ্যান্ড ফোরাম ফর উইমেন, ল অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট-এর সহযোগিতায় তৈরি “কাচাহারি” একটি রেডিও ম্যাগাজিন যা সাম্প্রতিক খবর, আইন সম্পর্কিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, জনগণের জীবনযাত্রার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নানা আলোচনা, কর্মসূচি, সাক্ষাত্কার এবং সামাজিক সমস্যার বিষয়বস্তুর ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠান সম্প্রচার করে থাকে। সমাজে নারীর প্রতি অত্যাচার, কৃষি নীতিমালা ও তার প্রভাব ইত্যাদি এ অনুষ্ঠানের বিষয়বস্তু হয়ে থাকে। ব্যাপক হারে জনগণের কাছে পৌঁছানোর মাধ্যমে মানবাধিকার সংক্রান্ত সচেতনতা প্রতিষ্ঠায় “কাচাহারি” ভূমিকা পালন করে।

নেপালের আরেকটি মানবাধিকার শিক্ষামূলক কার্যক্রম হলো “জাগরণ মিডিয়া সেন্টার”। এটি দলিত সম্প্রদায়ের সাংবাদিকদের নিয়ে গঠিত ও একটি নাগরিক সামাজিক প্রতিষ্ঠান। গণতন্ত্রের সাম্য ও জবাবদিহিতাসহ নানা অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্যগুলোর উন্নয়নে প্রতিষ্ঠানটি সমর্থন দান করে। এর অংশ হিসেবে কমিউনিটি রেডিওর মাধ্যমে এটি “কাটওয়াল রেডিও ম্যাগাজিন” নামে একটি সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন পরিচালনা করে। এর মাধ্যমে সামাজিক সাম্য ও ন্যায়বিচারের ওপর আলোচনা, নাটক, সাক্ষাত্কার ও প্রতিবেদন প্রচার করা হয়। এভাবে অনুরূপ প্রচেষ্টার দ্বারা মানবাধিকারের শিক্ষার মাধ্যমে সাধারণ জনগণকে সচেতন করা সম্ভব হলে একটি দেশে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অগ্রগতির পাশাপাশি উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নও ত্বরান্বিত করা সম্ভব। মানবাধিকার শিক্ষায় সচেতন হলে একটি দেশের সকল অঞ্চলের জনগণ সামাজিক স্থিতিশীলতা আনয়নের মাধ্যমে রাষ্ট্রের এগিয়ে যাওয়াতে অগ্রণী ভূমিকা পালনে সক্ষম হবে।

লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়