logo

বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ৭ আশ্বিন, ১৪২৭

header-ad

মানব পাচারের শেকড় উপড়ে ফেলতে হবে

মাঈনুদ্দীন হাসান তামিম | আপডেট: ১৫ এপ্রিল ২০১৭

 

মানব পাচার আমাদের দেশের অন্যতম প্রধান সমস্যা। গত কয়েক বছরের জাতীয় দৈনিকগুলো ঘেঁটে দেখেছি, প্রায় প্রতিদিনই মানব পাচারের ওপর কোনো না কোনো সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। আর প্রতি সপ্তাহেই মানব পাচারের ভয়াবহতা ও পাচারকারীদের কর্মকাণ্ডের ওপর ‘বিশেষ প্রতিবেদন’ ছাপা হয়েছে। গেল দুই সপ্তাহের জাতীয় দৈনিকগুলো পড়লেও মানব পাচারের ধারাবাহিক খবর চোখে পড়বে। এত প্রতিবেদন, এত পদক্ষেপ, এত গোল টেবিল বৈঠক, তারপরও লাগাম টানা যাচ্ছে না মানব পাচারের। এ যেন ক্রমেই নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত ৪০ বছরের পাচার হওয়া মানুষের সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়েছে। এ সংখ্যা খুবই উদ্বেগজনক আমাদের জন্য। সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, প্রতি বছর প্রায় ৫০ হাজার বাংলাদেশি সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া পাচার হয়। ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্র পথ পাড়ি দেওয়ার সময় ট্রলার ডুবে প্রাণহানি হয় অসংখ্য মানুষের। এছাড়া জলদস্যুদের হাতে বন্দি হয় ট্রলার। কখনো কখনো জলদস্যুরা তাদের খাবার ও অন্যান্য মালামাল লুট করে। আবার কখনো নারী ও শিশুদের নিয়ে যায় নিজেদের সঙ্গে করে। যেসব ট্রলার এ দুইটি ঝুঁকি থেকে মুক্ত হয় তাদের তৃতীয় ভয় হলো সমুদ্রে পথ হারিয়ে ফেলা। একবার পথ হারিয়ে ফেললে বাঁচার আর কোনো আশা নেই। খাবারের অভাবে অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটে মানুষের। একটা সময় না খেয়েই মরতে হয় তাদের। এমন ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি এক ব্যক্তির জীবনালেখ্য নিয়ে গত মাসের শেষের দিকে অপর একটি জাতীয় দৈনিক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। বাংলাদেশ প্রতিবেদনে ওই ব্যক্তি বলেন, ‘আমি আর আমার বন্ধু ট্রলারে ছিলাম। কয়েকদিনের না খাওয়ায় আমরা খুবই দুর্বল হয়ে পড়ি। কোথায় যাচ্ছি, কী করব কিছুই জানা নেই আমাদের। তবে বুঝতে পারছি আমরা পাচারকারীদের খপ্পড়ে পড়েছি। ইতোমধ্যে ট্রলারের অনেকে সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। আর কয়েকজন না খেয়ে দুর্বল হয়ে মৃত্যু বরণ করেছে। আমার সামনেই মারা গেছে আমার প্রিয় বন্ধুও। খাবার নেই, পানীয় নেই। বাধ্য হয়ে নিজের পেসাব নিজে খেয়েছি। অনেকের কাছে শুনেছি, এমন পরিস্থিতিতে মৃত দেহ থেকে মাংস খেয়ে বেঁচে থাকার লোমহর্ষক গল্পও। একপর্যায়ে আমাদের কজনকে ড্রামে ভরে সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হয়েছে। এরপরের ইতিহাস স্মরণ হলেই মূর্ছা যাই আমি।’

এ তো গেল পথ হারিয়ে ফেলার কথা। সঠিক পথে চলাও কিন্তু নিরাপদ নয় এ পথের যাত্রীদের জন্য। সঠিক পথে চলতে গেলে আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আটক হওয়ার ভয় থেকেই যায়। মোদ্দাকথা, সমুদ্র পথে যারা বিদেশে পাড়ি জমাতে পা বাড়ায়, তারা মূলত মৃত্যুকে তুচ্ছ করেই সামনে এগোয়। জীবন সংগ্রামে পরাজিত এসব সাহসী সৈনিকদের একাংশকে প্রথমে থাইল্যান্ডের গহিন জঙ্গলে আটকে রাখা হয়। এরপর তাদের ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রি করে দেয় পাচারকারীরা। থাইল্যান্ডের মত্স্য খামারে এসব ক্রীতদাসকে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতে বাধ্য করা হয়। বিবিসি, মার্কিন ম্যাগাজিন টাইম ও ব্রিটিশ পত্রিকা গার্ডিয়ানে থাইল্যান্ডের দাস ব্যবসার যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, তা স্তম্ভিত হওয়ার মতো। থাইল্যান্ডের চিংড়ি ও সামুদ্রিক খাদ্য শিল্পে কর্মরত সাড়ে ছয় লাখ শ্রমিকের মধ্যে তিন লাখই ক্রীতদাস হিসেবে কাজ করছে। মূলত কম্বোডিয়া, মিয়ানমার ও বাংলাদেশের নাগরিকরা পাচার চক্রের শিকারে পরিণত হয়ে এখানে এসে দাসের জীবনযাপন করে। পাচার হওয়া এসব ভাগ্যাহতদের মানবেতর জীবন প্রায় উঠে আসে পত্রিকার পাতায়। অনেক ক্ষেত্রে পাচার হওয়াদের স্বজনদের কাছে মুক্তিপণ চাওয়া হয়। যে পরিবারের লোকটি পাচার হয়েছে তারা তো এমনিতেই দরিদ্র। তার ওপর আবার চাওয়া হচ্ছে মুক্তিপণ। এ যে কত নির্মম ও যাতনার ভুক্তভোগী ছাড়া আর কেউ বুঝবে না।

পুরুষের পাশাপাশি পাচার হচ্ছে নারী এবং শিশুরাও। বলতে গেলে নারী ও শিশু পাচার পুরুষ পাচারের চেয়ে বেশি ভয়ংকর। পাচার হওয়া নারী ও শিশুর অধিকাংশকেই যৌনকর্মী হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ভারত, পাকিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে বাংলাদেশের নারীদের পাচার করা হয়। এদের কাউকে বিক্রি করা হয় পতিতালয়ে আবার কাউকে বিক্রি করা হয় ব্যক্তি মালিকানায়। যেভাবেই হোক নারী ও শিশু পাচার কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। মানুষ পাচারের শিকার হয় দুই কারণে। একটি হলো দারিদ্র্য ও বেকারত্ব। আরেকটি কারণ হলো অজ্ঞতা ও অসচেতনতা। আমাদের দেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ যথেষ্ট অজ্ঞ ও অসচেতন। পাশাপাশি দরিদ্র এবং বেকারও। তাই মানব পাচার রোধে যে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আগে এ সমস্যাগুলোর শেকড় উপড়ে ফেলতে হবে। এতে করে শুধু মানব পাচারই নয়—অন্যান্য বড় সমস্যাও দূর হবে বলে মনে করি। মানব পাচার রোধে সরকার ও আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী আরো তত্পর হবে, সচেতন হবে সাধারণ মানুষ, তৈরি হবে নতুন নতুন কর্ম সংস্থান—এ প্রত্যাশা আমাদের সবার।

লেখক : শিক্ষার্থী, সায়েদাবাদ, ঢাকা।

ফেমাসনিউজ২৪/আরইউ