logo

পাত্রী বিড়ম্বনা

 আমরা তিন বন্ধু সবে মাস্টার্স পরীক্ষা দিয়ে বনে-বাদারে ঘুরে বেড়াচ্ছি। হাতে অফুরন্ত সময়। কাটতেই যেন চায় না। আমাদের মধ্যে শিমুলের চেহারার গড়নটি খুবই আকর্ষণীয়। একমাথা ঝাকরা চুল। কালো চোখ। লম্বায় প্রায় ৫ ফিট ৮ ইঞ্চি। ফরসা টকটকে গায়ের রং। অন্যদিকে সাজিদ লম্বায় সাড়ে ৫ ফিট। কৃষ্ণকালো চেহারা। বড় বড় চোখ। হাসিটা প্রাণ কেড়ে নেয়ার মতো। আর আমি কাব্য। সাধারণ চেহারার মানুষ। দৃষ্টিনন্দন কিছুই আমার চেহারার মধ্যে নেই। গোপনে কবিতা লিখি আর বড় বড় স্বপ্ন দেখি। ৭ বছরের বিশ্ববিদ্যালয় জীবন কেটে গেছে, এখনো কেউ এসে বলেনি তোমাকে আমার ভালো লাগে। আমি হলাম ‘হেল্পিং হ্যান্ড’। এই সাত বছরে শিমুল প্রায় ১৭টি মেয়ের সাথে প্রেম করেছে। দুর্ভাগ্য, একটাও টেকেনি। অপরদিকে সাজিদের সাথে দুবার এই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে একটি মেয়েকে সাজিদই পছন্দ করত না। আর সে যাকে পছন্দ করত; সেই মেয়ে ফাইনাল ইয়ারে সাজিদকে ফাঁকি দিয়ে এক বিচারপতির ছেলেকে বিয়ে করেছে।

আর একটি মেয়ের কথা না বললেই নয়। ওর নাম প্রেমা। তুখোর ছাত্রী সে। শিক্ষকদের খুবই প্রিয় পাত্র। বই আর ক্লাস ছাড়া সে কিছুই বুঝতো না। চমৎকার দেখতে ছিল। চোখ দুটো টানা টানা। যেন মায়া ঝরে পড়ছে। ভাস্কর্যের মতো ছিল নিখুঁত চেহারার গড়ন। তাকালেই মনে হতাে কতদিনের চেনা। এই একমাত্র একটি মেয়ে আমার সাথে দুটো কথা বলতো। শুধু স্যারের লেকচার নিয়ে। কনভারসেশন শেষ হলেই সে চলে যেত। শিমুল আর সাজিদ আমাকে কত বলেছে ওদের কথা বলতে কিন্তু আমি তো জানি। প্রেমা ওসব কথা শুনতেই চায় না। ওর পরিষ্কার কথা, এখানে পড়াশুনা করতে এসেছি। প্রেম করার সময় কোথায়! বিয়ের পর প্রেম করব। তাছাড়া ওসব আমার ভালো লাগে না। খুব বিরক্তিকর মনে হয়।

মাঝেমাঝেই আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুদের নিয়ে কথা বলি। আর অকারণে হাসাহাসি করি। আমাদের তিনজনের বাড়ি একই শহরে। শিমুলের বাবা খাদ্য বিভাগে বড় অফিসার। প্রচুর টাকা-পয়সার মালিক। শহরে ওদের পাঁচতলা বিশাল বাড়ি। সাজিদের বাবা সরকারি দলের নেতা। ঠিকাদারি করে ভালো টাকা-পয়সা কামিয়েছেন। সাজিদের বাবা প্রথম জীবনে হোটেলের ব্যবসা করতেন। এখন সে জীবনের স্মৃতি তিনি ভুলে যেতে চান। আমার বাবা সরকারি কলেজে অধ্যাপনা করেন। আমরা তিন ভাইবোন। আমার বোন দুটি বড়। ওরা দুজনই প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতা করে। ওদের বিয়ে হয়ে গেছে। আমি একমাত্র পুত্রসন্তান। আমাকে নিয়ে বাবার অনেক স্বপ্ন ছিল। আমার নাকি দারুণ মেধা ছিল। কিন্তু পড়তে চাইতাম না। আমার যখন ৪ বছর বয়স। তখন ট্রাই-সাইকেল চালাতে গিয়ে পুকুরে ডুবে গিয়েছিলাম। প্রায় ২/৩ মিনিট পর আমাকে উদ্ধার করা হয়। প্রায় ছ’মাস আমি রাতে ঘুমাতে পারিনি। শুধু আঁতকে আঁতকে উঠতাম। তারপর থেকেই আমার কথা পরিস্কার হতো না। শুধু আটকে যেত। এজন্য আমার দু'বোন আর আত্মীয়-স্বজনরা খুব বকাবকি করত, স্পষ্টভাবে কথা বলতে পারতাম না বলে। আর চেহারা শ্যামা ছিল বলে, সকলে কালটু বলে ডাকতো। এসব ছোটবেলার কথা জীবনে অনেকবার শুনতে হয়েছে। তবে সুবিধা একটাই হয়েছে। আমাকে পড়াশুনার জন্য চাপ দেয়া হত না। মজার ব্যাপার হলো ক্লাসে শিমুল ফার্স্ট হলেও অঙ্ক আর ইংরেজিতে আমার চেয়ে কম নাম্বার পেত। এসব কারণে আমাকে নিয়ে অনেক আশা থাকলেও নাম্বার কম থাকার কারণে মেডিকেল বা বুয়েটে পড়া হলো না। শেষ পর্যন্ত রংপুর কারমাইকেলে ইংরেজিতে মাস্টার্স করতে হলো। শিমুল, সাজিদ আমি বিসিএস’এ ট্রাই করছি। জানি না আমাদের কপালে কি আছে।

শিমুলের মা আমাদের খুব করে ধরেছেন ওর বিয়ের ব্যাপারে। পছন্দ আছে কিনা তাও জানতে চেয়েছিলেন। আমরা জানিয়েছি ওসব কিছু নেই। ওর মা এসব শুনে খুব খুশি। তিনি শিমুলের মতামত নিয়ে মেয়ে দেখে বেড়াচ্ছেন। এই মেয়ে দেখা নিয়েই ঘটল বিশাল এক বিপত্তি। সেদিন ছিল শুক্রবার। আমরা শিমুলের বাড়িতে বসে বিশ্বকাপের খেলা দেখছি। রাত একটায় ব্রাজিল আর মেক্সিকোর খেলা। সাজিদের মাও সেদিন ওদের বাসায় ছিল। আলোচনার এক পর্যায়ে সাজিদের মা জানালেন, সাজিদের বাবা ওর জন্য গাইবান্ধায় এক পাত্রী দেখেছেন। দেখতে যেমন সুন্দর, পড়াশুনা আর ব্যবহারও চমৎকার। এদিকে শিমুলের সম্ভাব্য পাত্রীর বাড়িও গাইবান্ধায়। ফলে আলোচনায় সিদ্ধান্ত হলো- আমরা তিনজন মিলে এই দুই মেয়েকে দেখে আসব। আমাদের পছন্দ হলে গার্জিয়ানরা সিদ্ধান্ত নেবেন। আমাদেরকে দু'দিনের মধ্যে গাইবান্ধা যেতে বলা হলো।
শিমুলের একদম ইচ্ছে ছিল না। সাজিদ খুব আগ্রহ দেখাচ্ছিল। ফলে শিমুলের ইচ্ছে না থাকা সত্বেও সাজিদের ইচ্ছের কারণে আলোচনার সাতদিন পর সত্যি সত্যি আমরা গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। আমার খুব মজা লাগছিল। সাজিদ খুব টেনশন করছিল। শিমুল একেবারে নির্বিকার। শুধু সিগারেট টানছিল। শিমুলের বাবার ব্যক্তিগত জিপ গাড়ি নিয়ে আমরা যাচ্ছিলাম। শিমুলই গাড়ি চালাচ্ছিল। সাজিদ বলল, দুজনের পাত্রী গোবিন্দগঞ্জের। পরে বদলা-বদলি হবে নাতো! শিমুল বলল, তোকে আগে চয়েস দেয়া হবে। তোর যেটা ভালো লাগবে সেটাই তোকে দেয়া হবে। হাজার হলেও আমরা বন্ধু না। যাকে বলে ত্রিরত্ন। কথাটা শিমুল ভালোই বলেছে। তাছাড়া সাজিদের পাত্রীর বাড়ির ঠিকানা আমাদের খুঁজে বের করতে হবে। শুধু জানা গেছে, পাত্রীর বাবা একজন ডাক্তার। তিনি নীলফামারী হাসপাতালে চাকরি করেন। গোবিন্দগঞ্জে ডা. সিরাজ উদ্দিনের নাম বললে সবাই চিনবে। অপরদিকে শিমুলের পাত্রীর বাড়ির নাম-ঠিকানা দেয়া আছে। ওর ভাইয়ের নাম সিহাব উদ্দিন। তিনি একজন ম্যাজিস্ট্রেট। তার মোবাইল নম্বর দেয়া হয়েছে। আমাকেই ফোন করতে হলো। ফোন ধরলেন সিহাব উদ্দিন। আমরা কোথায় আছি তা নিশ্চিত হবার পর তিনি আমাদেরকে গোবিন্দগঞ্জ সার্কিট হাউজে আসতে বললেন। আমরা আধাঘণ্টা পর গোবিন্দগঞ্জ সার্কিট হাউজে পৌঁছলাম। সেখানে চারজন ভদ্রস্থ লোক অপেক্ষা করছিলেন। একজন এগিয়ে এসে বললেন, আমি সিহাব উদ্দিন। আমি হাত বাড়িয়ে বললাম, আমি কাব্য। আর এ শিমুল, ও হচ্ছে সাজিদ। তিনি শিমুলের দিকে ভালো করে তাকালেন। তার মুখটা গোপন হাসিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। এটা হবারই কথা। শিমুলকে প্রথম দর্শনেই যে কারো পছন্দ হবার কথা। ভদ্রলোকেরও শিমুলকে পছন্দ হয়েছে। আমি হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। সাজিদকে পছন্দ করলে দু’দুটো বিয়ের বরযাত্রী হতে পারবো। বন্ধু বলে কিছুটা বাড়তি যত্নও পাবো। এতেই আমি খুশি। ওরা আমাদেরকে সার্কিট হাউজে বিভিন্ন শরবত দিয়ে আপ্যায়ন করল। মিস্টিমুখও করাল। এরপর আমাদেরকে শহরের বাইরে নিয়ে যাওয়া হলো। এই প্রথম আমরা বুঝতে পারলাম সার্কিট হাউজে বিশ্রাম নেওয়ার জন্য আমাদেরকে অপেক্ষা করানো হয়েছে। এবার আমরা শিমুলের সম্ভাব্য পাত্রী তাসনিম মেহজাবিনকে দেখতে যাচ্ছি।
কুড়ি মিনিট পথ চলার পর আমরা গোবিন্দগঞ্জ-রংপুর সড়কের পশ্চিমে একটা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে গাড়ি রাখলাম। তখন বেলা সাড়ে ১২টা বাজে। বিদ্যালয়ের পিছনে মেয়ের বাড়ি। ওদের মা এই স্কুলেই শিক্ষকতা করেন। বিদ্যালয়ের ভবন পেরিয়ে পিছনে গিয়ে আমাদের চোখ আটকে গেল। দোতলা সুন্দর ছিমছাম একটি বাড়ি। তাকালেই যেন আভিজাত্য ঠিকরে বেড়িয়ে আসছে। সামনে ছোট্ট ফুলের বাগান। শিমুলের অভিব্যক্তি বদলে গেল। সাজিদের চোখ ছোট হয়ে গেছে। এত সুন্দর বাড়ি ও পরিবেশ আমরা কেউ আশা করিনি। হঠাৎ কেন যেন আমাদের আগ্রহ বেড়ে গেল। সাজিদ ফিসফিস করে আমাকে বলল, বাড়ির অবস্থা ভালো হলে মেয়ে ভালো হয় না শুনেছি। বাবা-মা-ভাইয়ের অঢেল টাকা বসে বসে খেয়ে ড্রাম হয়ে গেছে কিনা দেখ। ওর কথা শেষ হলো না ১৭/১৮ বছরের একটি মেয়ে আমাদের দেখে দরজা খুলে দিল। প্রায় ড্রামের মতো চেহারা। খেয়ে খেয়ে ফুলে ঢোল হয়ে গেছে। তবে মুখটা সুন্দর। আমি নিজেও আশঙ্কিত হলাম। তাসকিন মাহজাবিন বেশ আকর্ষণীয় একটা নাম। চেহারা আকর্ষণীয় হবে তো! আমাদেরকে প্রথমে বাইরের রুমে বসতে দেয়া হলো। আমি চারদিকে তাকাতে দেখলাম, এই ঘরে তিনটি দরজা আছে। তিনটি দরজায় ভিড় করে এই বাসার ক্ষুদে সদস্যরা উঁকিঝুকি দিয়ে আমাদেরকে দেখার চেষ্টা করছে। কিছুক্ষণ পর সব ফাঁকা হয়ে গেল। তাসকিনের মা চলে এলেন। শিক্ষক বলে কথা। তিনি প্রথম কথা বললেন, তোমাদের আসতে কষ্ট হয়নি তো। আমরা শুধু হে-হে করে হাসলাম। তিনি স্পষ্ট করে বললেন, তোমাদের মধ্যে শিমুল কে? আমি শিমুলের দিকে তাকালাম, সাজিদও তাকাল। শিমুল এমন প্রশ্নে মনে হয় বিরক্ত হয়ে গেছে। আমি দ্রুত বলার চেষ্টা করলাম, ওই যে ও হচ্ছে শি-মু-ল। আমি হাত নির্দেশ করে দেখালাম। সাজিদ চটপট করে বলল, আমার নাম সাজিদ। শিমুলের বন্ধু আমরা। সে আমাকে দেখিয়ে বলল, ওর নাম কাব্য। তিনি শুধু শিমুলকে দেখলেন। মুখটা প্রসন্ন হলো। তিনি ম্যাজিস্ট্রেট ছেলেকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ছোট তোমার বোনকে রেডি হতে বলো। আমরা আসছি।
পরিবেশটা গুমোট আকার ধারণ করল। কারণ মহিলাকে আমাদের পছন্দ হচ্ছিল না। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমরা আমার কাছে কিছু জানতে চাও। তাঁর এরকম আচরণে আমরা অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম। তিনি অভয়ের হাসি দিয়ে বললেন, তোমাদের কিছু জানার থাকলে তোমরা বলতে পারো। আমি সাজিদের দিকে তাকিয়ে মহিলাকে হঠাৎ বলে ফেললাম, আমরা অবশ্য আজকে আরো একটা মেয়েকে দেখতে যাবো। আশা করি আপনারা বেশি দেরি করবেন না। তিনি আমার কথায় অবাক হয়ে গেলেন। এমন অপ্রস্তুতভাবে তাকালেন যে, আমি নিজেও লজ্জ্বা পেয়ে গেলাম। তিনি বোধহয় ভেবেছেন আমারা শিমুলের জন্য আরো মেয়ে দেখবো। তাড়াতাড়ি ভুল শুধরানোর জন্য বললাম, সরি, আপনি আমার দোষ নেবেন না। আমি আসলে আমার এই বন্ধুর কথা বলছি। আমি সাজিদকে দেখাতে তিনি শান্ত হলেন। ঠান্ডা গলায় বললেন, সেটি কোন এলাকায়? আমি বললাম, গোবিন্দগঞ্জেই। তবে ঠিকানা পুরোটা জানি না। মেয়ের বাবার নাম শুধু জানি। এসময় তার ম্যাজিস্ট্রেট ছেলে আসল। তিনি তাকে বললেন, ছোটু এরা একজনকে খুঁজছে। দেখ চিনতে পারো কিনা। আমার কাছে নাম জানতে চাওয়া হলো। আমি বললাম, ওনার নাম ডা. সিরাজ উদ্দিন। আমার কথা শুনে মা-ছেলে বোকার মতো আমার দিকে তাকিয়ে থাকল। অতঃপর আমাদেরকে কিছু না বলে দুজনেই উঠে চলে গেল। আমরা বোকার মতো বসে থাকলাম। আমরা কি অপরাধ করলাম বুঝতে পারলাম না। একসময় সাজিদ বলে উঠল, কিরে আমার ডাক্তার শ্বশুরের নাম শুনে এরা কেঁচো হয়ে গেল কেন। পারিবারিক ঝগড়া আছে কিনা। আমি নিজেই বুঝতে পারলাম না এরা এমন আচরণ করল কেন।
বেশ কিছুক্ষণ পর মা-ছেলে ঘরে আসল। দু'জনের মুখ গম্ভীর। এবার তারা সাজিদকে ভালো করে দেখছে। আমি সাহস করে বললাম, আপনারা কি আমার কথায় বিরক্ত হয়েছেন। হয়ে থাকলে আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। ওরা কোনো উত্তর দিচ্ছে না। শিমুল অসহিঞ্চু গলায় বলল, আমাদের আরো কাজ আছে, আমরা কি চলে যাবো। ম্যাজিস্ট্রেট ছেলেটি তাড়াতাড়ি বলল, না না, আসলে হয়েছে কি...! কি হয়েছে তা আর বলল না। ওর মা ঝেড়ে কেশে বলল, ব্যাপারটা আসলেই কাকতলীয়। তারপর আমাকে দেখে বললেন, তুমি ডাক্তার সিরাজের নাম বলছিলে না। উনি আসলে আমার স্বামী। তোমরা দুজন আমার মেয়েকে দেখতে এসেছো। মনে হয় দুজনই ব্যাপারটা জানো না। এজন্য আমরাও অপ্রস্তুত হয়ে গেছি। ফলে না বলে চলে গিয়েছিলাম। তিনি একটু দম নিলেন। আমরা তিনজনই তার কথা শুনে স্তব্ধ হয়ে গেছি। কি বলছেন উনি। যেটা আমরা কল্পনাতেও আনিনি। সেই ঘটনা ঘটে গেল। আমাদের যেন ঘোর কাটছিল না। মহিলা একটু কেশে নিয়ে শান্তভাবে বললেন, তোমরা দুজনই আমার মেয়েকে দেখে যেতে পারো। তবে শর্ত আছে একটা। আমি জানি শিমুল-সাজিদ মুখ খুলবে না। তাই নিজেই উত্তর দিলাম, আমার বন্ধুরা ভালো। ওরা আপনার শর্ত মেনে নেবে। উনি শিমুলের দিকে তাকিয়ে বললেন, উহু এদেরকেই বলতে হবে। শিমুল-সাজিদ প্রায় একসাথে বলল, বলুন আপনার শর্ত। আমরা মেনে নেব। মহিলা বললেন, আমার মেয়েকে আমি স্বাধীনতা দিয়ে মানুষ করেছি। সে এই স্বাধীনতার সম্মান রেখেছে। জীবনে নিজের জন্য সে কিছুই চায়নি। আমরা যা বলেছি তাই করেছে। এবারও আমরা যা বলতাম তাই শুনতো। কিন্তু এবার আমরা সেটা করতে চাচ্ছি না। আমার তোমাদের দুজনকেই পছন্দ হয়েছে। তাই, এবার মেয়েকে তার নিজের জীবনসঙ্গী পছন্দ করার অধিকার দিয়েছি। সে তোমাদের দুজনের মধ্যে যাকে পছন্দ করবে, আমি তার সাথেই বিয়ের সমন্ধ করতে চাই। এতে তোমরা রাজি। শিমুলের মুখ হাসিতে উজ্জ্বল হলো। সাজিদও মাথা নাড়ছিল। তারা দুজনেই বলল, আমরা এই শর্তে রাজি। শিমুল আরো বলল, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটা আমাদের বাবা-মায়েরা নেবেন।
ওরা খুশি হয়ে চলে গেল।
শিমুল বলল, মেয়ে না হাতি, তার জন্য বাজি। সাজিদ শুনে বলল, আমরা পছন্দ করবো কিনা ঠিক নেই। আর উনি মেয়ের জন্য শর্ত জুড়ে দিলেন। আমি সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে বললাম, এটা কি করে হলো। পৃথিবীতে কি আর কোনো মেয়েই ছিল না। শেষে কিনা এক মেয়ের পাল্লায় তোরা পড়ে গেলি। এবার কি হবে।
সাজিদ বলল, দূর বোকা! এটা তো মজাই হয়েছে। আমরা দুজন দেখবো। তুই পছন্দ করে দিবি। যদি দুজনের পছন্দ হয়, তাহলে টস করবি। আমি বেশ চিন্তায় পড়ে গেলাম। শেষে দু’বন্ধুর মধ্যে না মনোমালিন্য সৃষ্টি হয়। শিমুল বলল, কাব্য চিন্তা করিস না, তোরও চান্স থাকবে।
কিছুক্ষণ পার আমাদেরকে ভিতরের রুমে নিয়ে যাওয়া হলো। রুমটা বেশ সুন্দর। রুমের মধ্যে এ্যামিবা আকারের টেবিলে তাজা গোলাপ শোভা পাচ্ছে। গোলাপ আমার প্রিয় ফুল। আমার চিন্তাটা সরে গেল। মা-মেয়ে দুজনে আমাদের একদিকে বসে পড়ল। অপরদিকে সাজিদের পাশেই ফাঁকা চেয়ার রাখা হয়েছে। সম্ভবত তাসকিন বসবে। অপেক্ষার পালা শেষ হয়ে গেল। মাথায় ঘোমটা দিয়ে মেয়েটিকে নিয়ে একজন সুন্দর ভদ্রমহিলা রুমে প্রবেশ করলেন। আমরা আড়চোখে তাসকিনের দিকে তাকাচ্ছি। তার মুখটা ঢাকা। তবে চেহারাটা স্লিম। আমি হাফ ছাড়লাম। তাহলে মেয়েটা মুটকি না। মা-ছেলে কোনো কথা বলছেন না। নতুন আগন্তক মহিলা তাসকিনকে লক্ষ্য করে বললেন, চুপচাপ বসো। আর ঘোমটা খুলে ফেল। আমরা অপেক্ষা করছি। সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। টেনশনও হচ্ছে। কিন্তু মেয়েটি ঘোমটা সরাচ্ছে না। এবার আগন্তক মহিলা ঘোমটা খুলতে হাত বাড়ালেন। মেয়েটি ওড়নার আড়াল থেকে দেখে হাত সরিয়ে দিল। আমাদের যেন ধর্য্যচুতি হচ্ছিল। এবার এলো সেই মুহূর্ত।
মেয়েটি এবার দু’হাত তুলে ঘোমটা সরাতে লাগল। যেন অযুত সময় পেরিয়ে যাচ্ছিল। আমরা চোখ বড় করে তাকাচ্ছি। যেন কোনো কিছু মিস হয়ে না যায়। এরপর যে ঘটনাটি ঘটল। তা যেন বজ্রপাতের শামিল। এ আমরা কাকে দেখছি! মেয়েটি ঘোমটা খুলে এক এক করে আমাদের তিনজনের দিকে তাকাল। তারপর বের হলো সেই অদ্ভুত পরিচিত হাসি। আমার মনে হলো রুমটা আলোয় ভরে গেল। সাজিদ এবং শিমুল এমন বোকা হয়েছে যে, মুখ হা হয়ে গেছে। প্রথম কথা বলল প্রেমাই, মা এই তিনজন আমার বন্ধু। আমি বোকার মতো বললাম, এ্যামা প্রেমা তুমি! এরপর সবাই চুপ হয়ে গেলাম। ঘরের প্রতিটি শব্দ যেন প্রকট হয়ে উঠল। শিমুল-সাজিদ কি বলবে ভেবে পাচ্ছিল না। প্রেমা শান্ত গলায় বলল, মা চলো আমি আমার সিদ্ধান্তের কথা জানাচ্ছি। প্রেমা ভদ্রমহিলাসহ উঠে গেল। প্রেমার মা বললেন, তোমরা আমার মেয়ের সাথে পড়েছো। তোমরা যেমন ওকে চেনো, সেও তোমাদেরকে ভালো করে চেনে। আমার মেয়ে যেই সিদ্ধান্ত নিক, তোমাদের বন্ধুত্ব যেন অটুট থাকে। শিমুল-সাজিদের ঘোর এখনো কাটেনি। ওরা কি যেন ভাবছে। আমি একটু আশঙ্কিত হলাম। প্রেমাকে ওরা দুজনই কামনা করেছিল। বিভিন্নভাবে ইঙ্গিতও দিয়েছিল। কিন্তু প্রেমা তখন পড়াশুনা ছাড়া কিছুকেই পাত্তা দেয়নি। এবার সে কাকে নির্বাচন করবে সেটা আমিও বুঝতে পারছিলাম না। শিমুলকে নাকি সাজিদকে। দূর ছাই এতো ভাবছি কেন। দেখি না কি হয়। আমি মাথা থেকে চিন্তা ঝেড়ে ফেললাম। মনটা হালকা হয়ে গেল।
প্রায় চল্লিশ মিনিট পর প্রেমার মা ও তার ছেলে আমাদের সামনে এসে দাঁড়ালেন। শিমুল আর সাজিদের বুক তখন ঢিপঢিপ করছিল। ওরা দুজনই নিজেদের নাম শোনার জন্য অপেক্ষা করছিল। শেষ পর্যন্ত মুখ খুললেন প্রেমার মা, তিনি বললেন, আমি দুঃখিত! আমার মেয়ে তোমাদের দু’জনের কাউকে পছন্দ করেনি। তোমাদের কারো সাথে ওর বিয়েটা হচ্ছে না। আমি একথা শুনে নিজেও বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। আমার বন্ধুদের জন্য খারাপ লাগছিল। শিমুল বলল, আমি প্রেমার সাথে কথা বলতে চাই। সাজিদ বলল, হ্যাঁ আমরা এর ব্যাখ্যা শুনতে চাই। ও কেন আমাদের দু’জনের একজনকেও পছন্দ করছে না। আমিও বললাম, আন্টি প্রেমা আমার সাথে কথা বলতে পারে। প্লিজ একটু কথা বলতে দিন। আমার বিশ্বাস এতে সমাধান হয়ে যাবে।
প্রেমার মা কড়া গলায় বললেন, না কোনো সমাধান হবে না। কারণ প্রেমা ওদের দুজনকে পছন্দ করলেও জীবনসঙ্গী হিসেবে কল্পনা করেনি। প্রেমা- একটু থেমে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, প্রেমা আসলে কাব্যকে পছন্দ করে। এজন্য ওকেই নির্বাচন করেছে।
আমাদের তিনজনের গালে কেউ যেন ঠাঁস করে থাপ্পড় মেরেছে। আমরা থামের মতো দাঁড়িয়ে রইলাম।

সেখ হুমায়ুন কবির সূর্য্য
সাংবাদিক, লেখক ও শিশু সংগঠক
কুড়িগ্রাম।

#####|||||#####soto golpo, short story, ছোটগল্প, story, golpo#####|||||#####পাত্রী বিড়ম্বনা, bride, patri birambona