logo

শুক্রবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৭ | ৭ আশ্বিন, ১৪২৪

header-ad

ছাইড়া দেন স্যার

পাঠকই লেখক ডেস্ক | আপডেট: ১১ জুলাই ২০১৭

Sir! Hold on two legs, and not mine, sir
মাফ চাই, ছাইড়া দেন স্যার,
স্যার! দুইটা পায়ে ধরি, আর মাইরেন না, স্যার। আর কোনোদিন আমু না স্যার।
তার আকুতিতে থেমে গেল মারধরকারী!

বাড়ি কই ?
…শান্তিনগর।
… দিনেদুপুরে পকেট মারছিস? তোর কত বড় কলিজা? শান্তিনগরে থাইকা অশান্তি করছিস।
শুনে পাশের লোকটা বললো, ’ভাই, থামলেন কেন? আর কয়ডা দেন, পকেট মাইরা বেড়ায়, সালারে লাইত্থান। মিছা কথার জায়গা পাস না?
এই বলেই কান বর়াবর আরেকটা বসিয়ে দিল। ছেলেটা গালে হাত দিয়ে দেয়াল ঘেঁষে বসে রইল। কান্না আর হই হুল্লাড়ের শব্দে পাশের দোকানের একজন নেমে এলেন। দেখলেন লোক জড়ো হয়ে আছে। বললেন- কি হইছে এখানে?

লোকেরা বলা শুরু করলো পকেটমার ধরছি! ছেঁচড়া পকেটমার! ওই ব্যক্তি এগিয়ে গিয়ে দেখলেন ৮-৯ বছর বয়সের ছেলে দেয়াল ঘেঁষে বসে আছে, ছেলেটির পুরো গাল চোখের পানিতে ভেসে গেছে, গায়ের রঙ কালো হলেও আঘাতের রেখাগুলো স্পষ্ট ফুটে উঠেছে।

সামনে আসাতে ছেলেটি আরও বেশি ভয় পেয়ে গেল।  
…কী করছে, দেখি?
পাশে লোকটি মোবাইল আগায় দিয়ে বললো- দেখেন, দেখেন… দিনেদুপুরে শালায় পলিথিনে ভইরা লইছে। এক্কেরে হাতেনাতে ধরছি!
পলিথিন হাতে নিয়ে উনি দেখলেন একটি মোবাইল, ৬টা আপেল আর কিছু খেজুর।
বললেন- তাই বইলা এভাবে গণপিটুনি দিচ্ছো কেন? একটা বাচ্চারে কেউ এভাবে মারে নাকি?
এবার লোক জনের উত্তেজনা একটু কমল।

ওই ব্যক্তি ছেলেটিকে জিজ্ঞ্যেস করলেন- তোর বাপ কি করে?
ছেলেটা কিছুটা স্বস্তি ফিরে পেল। বললো- সাইকেল ঠিক করতো, বাপের অসুখ তাই অহন কাম করে না। আমারে ছাইড়া দেন। আমি আগে কোনোদিন পকেট মারি নাই। কয়েকটা দোকানে হাত পাইতা একটা টাকাও পাই নাই। আমারে মাফ কইরা দেন।

পাশ থেকে লোকগুলো বলছে, এগুলা সব মিথ্যা কথা, ধরা খাইয়া এখন ভদ্রলোক।
ওই ব্যক্তি বললেন- সত্য মিথ্যা দেখে ওর বাপের কাছে জানিয়ে সতর্ক করে দেয়া হবে। ছেলেটাকে কেউ পানি দেও, ও অনেক হাঁপাইতেছে।
একজন পানির বোতল আগায় দেয়।

এক চালা টিনের ঘর, বাইরে দুয়ারে ছেলেটির বাবা বসে আছে। সবকিছু শুনে বাবাটি তার ছেলের গালে থাপ্পড় মারার জন্য হাত উঠালো। বাধা দিয়ে ওই ব্যক্তি বললেন- যথেষ্ট মার হইছে, ওরে আর মাইরেন না।

বাবাটি কাঁদতে কাঁদতে বলে- বিশ্বাস করেন স্যার, আমার ছেলেরে আমি এই শিক্ষা দেই নাই। বেশ কয়দিন ধইরা আমার অসুখ। কাম কাজ নাই, পোলাপানগো ঠিক মত খাওন যোগাইতে পারি না। কিন্তু পোলায় পকেট মারে। কোনোদিন ভাবি নাই। ও অমন পোলা না।

দুইটা বোন মন খারাপ করে ঘরে ঢুকে যায়। ছোট বোনটা মায়ের কোলে ওঠে কান্নাজুড়ে দেয়। মা আঁচল দিয়ে মুখ চেপে বাইরে বের হয়ে আসে।
মা বলে-মাইয়া দুইটা কয়দিন ধইরা কিছু খায় নাই। ওগো বাপের অসুখ। টেকা পয়সাও নাই, তাই পোলাটারে বাইরে পাঠাইছিলাম বাড়ি বাড়ি গিয়া কিছু সাহায্য চাইয়া আনতে। ছোট মানুষ বুঝে নাই, তাই ভুল করে ফেলছে।


এদিকে বাচ্চা মেয়েটা চোখ ভিজিয়ে মায়ের কাছে কেঁদে কেঁদে নালিশ করেই যাচ্ছে- মা, ভাইয়া আইজকাও কিছু আনে নাই, ভাইয়া আমাগো খালি মিছা কথা কয়!
ভাইটি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে
হঠাৎ বোনটি খেয়াল করে ভাইয়ের শার্টের পকেট ভেজা! ভাইয়া তোমার পকেটে কি? এই বলেই হাত ঢুকিয়ে দেয়, বের করে দেখে দুইটা আঙ্গুর। কুড়াইয়া লইছে।
ভাই তুমি আনছো? দুই বোনের মুখে হাসি ফুটে ওঠে!

ভাইটি এবার ভয়ে মুখ চুপসে যায়! লোক দুটির দিকে ভয়ার্তভাবে তাকিয়ে বলে- স্যার, এইটা আমি চুরি করি নাই। আশা ভরা চোখ নিয়ে ওই ব্যক্তির দিকে তাকিয়ে বলতে থাকে- বিশ্বাস করেন স্যার, এইটা কুড়াইয়া আনছি। বোইন দুইটার জন্য, সত্যি আমি চুরি করি নাই।

সবাই স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, ওই লোকটা ছেলেটারে টেনে বুকে জড়িয়ে নেয়, মাথাটা বুকে চেপে ধরে রেখে চোখের পানি ফেলতে থাকে, লোক দুইটা এবার কাঁদতে থাকে, কাঁদতে কাঁদতে ছেলেটির বাবার কাছে এগিয়ে যায়। বাবার হাত দুটি ধরে বলে- ভুল হয়ে গেছে আমাদের, আপনার ছেলের গায়ে হাত তুলছি আমরা, মাফ করে দিয়েন।
লোক দুইজনের একজন পকেট থেকে মানিব্যাগটা বের করে বাবার হাতে দিয়ে বলে- এখানে যা আছে তা দিয়ে বাচ্চাদের কিছু ভালোমন্দ খাওয়ায়েন।

আমরা এলাকায় বাসায়-বাসায় প্যাকেট বিলি করি, যাদের খাদ্য আছে তাদের মাঝেই চলে বিতরণ করি অথচ যারা অভাবী তাদের ভাগ্যে এসব জোটে না। আমরা কি পারি না সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু টাকা দিয়ে ওদের পাশে দাঁড়াতে? আমাদের মন-মানসিকতার পরিবর্তন ঘটাতে হবে।
ফেমাসনিউজ২৪/এফএম/এমএম